ধারাবাহিক প্রেমের উপন্যাস (পর্ব- ১৭)
...এবং ইরাবতির প্রেম
গৌতম আচার্য
সন্ধ্যা হয় হয়।। এমনিতেই এই সময়ে সূর্য তাড়াতাড়ি অস্ত যায়।। তার ওপর পাহাড়ি জনপদ।। গাড়িতে ফিরে এসেছে সত্যেন- ইরাবতি।। এখানে আসবার সময় পথের ধারে একটু উঁচুতে খুব সুন্দর একটি কফি সপ্ দেখেছিলো সত্যেন।। কিছুটা উঠতে হয়, কিন্তু সেই দোকানের খোলা জানালা যেন হাতছানি দিয়েছিলো সত্যেনকে।। কাছে দূরে চারিদিকে পাহাড় আর পাহাড়।। নাম কি, উচ্চতা কতো, কোন ইতিহাস আছে কিনা, কিছু জানা নেই সত্যেন এর।।
সেসব জানবার একটু আগ্রহ-ও এই মুহূর্তে সত্যেন কে উৎসাহিত করছে না।। ইরাবতির পাশে বসে এক হাতে কফি ভর্তি মগ, আর অন্য হাত ইরাবতির কাঁধে রেখে তাড়িয়ে তাড়িয়ে পাহাড়, মেঘেদের লুকোচুরি, সারি সারি উঁচু উঁচু গাছ, সাপের মতো আঁকা বাঁকা পথের ধারে পাহাড়ি গ্রাম, রঙিন জামা কাপড় পড়ে ফর্সা ফর্সা ছেলে বৌ মেয়ে, বৌদ্ধ গুম্ফা, আর নাম না জানা পাহাড়ি পাখীদের কিচিরমিচির এর ছন্দে নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করার নেশায় বুঁদ হয়ে পড়েছে সত্যেন।।
ইরাবতি বলে ওঠে, এই যে স্যার, প্রায় অন্ধকার হয়ে গেল, রিসর্ট ফিরতে হবে তো।। ইরাবতির কথাটি যেন সত্যেনের বুকে আঘাত করলো।। আর আজকের রাতটুকু।। সকাল হলেই ফেরার ঘন্টা বেজে উঠবে।। আবেগঘন হয়ে ওঠে সত্যেন।। ইরাবতি কে নিবিড় ভাবে কাছে টেনে নিয়ে বলে ওঠে, "বস্ একটি দিন কি বাড়ানো যায় না"? ইরাবতি মুখে মৃদু হাসি ছড়িয়ে বলে, "তুমি কি ভাবছো আমার খুব ভালো লাগবে কাল ফিরে যাওয়ার সময়? কিন্তু কি করবো বলো, আমি কাল না ফিরলে যে বাড়ি জুড়ে হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটে যাবে"।।
কফি সপ্ থেকে বেরিয়ে আবার গাড়িতে উঠে বসে তারা।। সত্যেন গাড়ির পিছনের দিকের কাঁচে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানায় রকি আইল্যান্ডকে।। ইরাবতি মৃদু হেসে বলে, "আমরা আবার আসবো।। সেইবার তোমার কোলে থাকবো দুজনে"।। আবেগে ঘনিষ্ঠ হয় সত্যেন এর।। সত্যেন তার বাম হাত দিয়ে ইরাবতিকে আরও নিবিড় ভাবে কাছে টেনে নেয়।। গাড়ি একটু একটু করে এগিয়ে চলে নাগরাকাটায় তাদের রিসর্টের দিকে।।
সত্যেন ড্রাইভার বিট্টুকে প্রশ্ন করে, বিট্টু বাতাবাড়ি কোথায় আছে গো?
-- স্যার কাল তো আপ্ বাতাবাড়ি হো কেই আয়ে থে- বিট্টু উত্তর দেয়।।
-- ইঁহাসে কিৎনা দূর হোগা?
-- ইঁহা সে বহুৎ দূরি নেহি হ্যায়, লেকিন হাম লোগ আভি যো রাস্তাসে রিসর্ট যা রাহা হ্যায়, ও রাস্তা ছোড় কে দুসরি রাস্তা যানে পড়েগি।।
-- কাছাকাছি না অনেক দূর?
-- আভি যো মোড় আয়েগা, উহা সে সিধা যানে সে আপ্ বাতাবাড়ি যা শেখতে হ্যায়, লেকিন আভি তো হামলোগ বাঁয়ে নাগরাকাটা যায়েগি।।
সত্যেন কিছু বলতে যাচ্ছিলো, বিট্টু তার আগেই বলে দিলো, কাল তো আপকো এনজিপি ছোড়না হ্যায়, ওহি রাস্তা মে চালসা, বাতাবাড়ি, গরুমারা ফরেস্ট, লাটাগুড়ি, ময়নাগুড়ি, জলপাইগুড়ি সব মিলেগা।।
-- "নেহি ও বাত্ নেহি হ্যায়.." কথা শেষ হয় না সত্যেন এর।। শঙ্কিত হয়ে পড়ে ইরাবতি।। বলে ওঠে, তুমি কি এখন বাতাবাড়ি যাবে? বিট্টু বললো তো কাল ফেরার সময় তোমাকে বাতাবাড়ি দেখিয়ে দেবে।। বাতাবাড়ি হয়েই তো গাড়ি যাবে।।
সত্যেন ইরাবতিকে আশ্বস্ত করে, না আমি এখন ঐ পথে যেতে বলছি না।।
-- তুমি এমন বাতাবাড়ি, বাতাবাড়ি করছো... যেন বিশেষ কেউ তোমার আছে সেখানে।। তার জন্য তুমি হঠাৎ উতলা হয়ে পড়েছো।। বলে ইরাবতি।।
-- আছে তো।। উতলা তো হবোই।।
-- গার্লফ্রেন্ড?
-- হ্যা তোমাকে বলি আর তুমি আমার মাথা ভেঙে দাও।।
-- না বলতে হবে।। বাতাবাড়িতে কে থাকে? তোমার এ্যতো কৌতুহল কিসের জন্য?
-- আরে তেমন কিছু না।।
-- ফেসবুকে আলাপ নাকি? বলো আমাকে।।
-- আরে না রে বাবা।। আমার বিজনেস এর একজন ক্লায়েন্ট।। বাতাবাড়িতে নতুন রিসর্ট তৈরি করেছে।। তাদের সঙ্গে এখন কাজ চলছে আমার।।
ইরাবতি বলে, ও: তাই বলো।। আমি তো ভাবলাম লাভ্ এ্যাফেয়ার কিছু।। সত্যেন ইরাবতিকে আরও একটু নিবিড় করে ধরে বলে, তোমাকে ছেড়ে আবার কার সঙ্গে লাভ্ এ্যাফেয়ার করবো মহারানী?
ইরাবতি সত্যেনের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বলে ওঠে, কাল বাড়ি ফিরে গিয়ে ভুলে যাবে নাতো আমায়? সত্যেন হাসে।। বলে, আমি তো এই প্রশ্নটা তোমাকে করবো ভাবছিলাম।। আমি ট্রেনে উঠে বসলাম, আর তুমি সঙ্গে সঙ্গে সব ভুলে আমি ফোন করলে জিজ্ঞেস করে বসলে, "কোন সত্যেন বলছেন? আমি তো ঠিক মনে করতে পারছি না"।। ইরাবতি ডান হাত মুঠো করে সত্যেন এর বুকে হালকা ঘুসি মেরে বলে ওঠে, টাকলুর টাক ফাটিয়ে দেবো এবার।। একসঙ্গে হেসে ওঠে দুজনেই।। গাড়ি ঢুকে পড়ে রিসর্টে।।
সত্যেন রিসেপশনের দিকে এগিয়ে যেতেই ইরাবতি সত্যেনকে ডাকে, "এখন কোথাও যাবে না।। রাতের খাবার খাওয়ার সময় ম্যানেজার বাবুর সঙ্গে কথা বলবে।। এখন সোজা আমার সঙ্গে রুমে চলো"।। সত্যেন তাকায় ইরাবতির দিকে।। ইরাবতি তার চোখ দুটি বড়ো বড়ো করে তাকায় সত্যেনের দিকে।। ফের বলে ওঠে, "কথা কানে গেলো"? সত্যেন মৃদু হেসে বলে, "ইয়েস ম্যাম্"।।
দুই তলায় রুমে পৌঁছেই ইরাবতিকে সত্যেন প্রশ্ন করে "ইরাবতি, তুমি আমাকে ভুলে যাবে নাতো"? ইরাবতি মৃদু হেসে বলে, "তুমি কি পাগল নাকি বলো তো"?
-- কেন আমাকে পাগল বলছো?
-- তুমি পাগল বলে তোমাকে পাগল বলছি।।
-- প্লিজ্ বি সিরিয়াস্।।
-- পাগলামো ছেড়ে এখন আমাকে আদর করো।। এই তো রাত হয়ে গেলো।। আজকের রাতটুকু পার হলেই তো ছাড়াছাড়ি।।
-- আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ইরাবতি।
-- আমারও গো।। সুন্দর স্বপ্নের মতো দুটি দিন পার হয়ে গেলো সময়।। আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না।।
-- কি বিশ্বাস করতে পারছো না?
-- এই যে তুমি আর আমি।। আমাদের মাঝে আর কেউ নেই।।
আবেগে সত্যেন কে কাছে টেনে নেয় ইরাবতি।। মুখে কিছু না বলে সত্যেন সাড়া দেয়।। হৃদয়ের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে ভালোবাসায় ভরিয়ে দেয় ইরাবতি কে।।
চলবে...

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন