বইমেলা সংখ্যার গল্প
ধনঞ্জয় জ্যেঠু
শিবব্রত গুহ
আজ যে কাহিনী আমি আপনাদেরকে শোনাবো, তা কিন্তু, গল্পের মতো মনে হলেও নয় গল্প। এ হল
এক সত্যি ঘটনা। যা আমার জীবনের একটা ঘটনাও বলা যেতে পারে। এই ঘটনা ঘটেছিল,
আজ থেকে দশ বছর আগে।
আমার বাবা অমল চন্দ্র গুহের ঘনিষ্ঠ পরিচিত
ছিলেন ধনঞ্জয় চক্রবর্তী। আমরা থাকি দক্ষিণ কোলকাতার ঢাকুরিয়াতে। ধনঞ্জয় জ্যেঠুর
বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার জিয়াগঞ্জে। উনি আমার বাবার থেকে বয়সে বড় ছিলেন। তাই, আমি ওনাকে ডাকতাম ধনঞ্জয় জ্যেঠু বলে।
মানুষ হিসাবে উনি ছিলেন একজন প্রাণবন্ত, হাসিখুশি মানুষ। সবসময় উনি হাসতেন।
ওনার হাসি ছিল বড়ই মধুর৷ উনি খুব মজার মানুষ ছিলেন। ওনার পরিবার ছিল বেশ বড়।
ওনার তিন ছেলে, বড় ছেলের নাম সঞ্জয়, মেজ ছেলের নাম পুরঞ্জয় ও ছোট ছেলের নাম মৃত্যুঞ্জয়।
ধনঞ্জয় জ্যেঠু, ছিলেন হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক।
তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল দেখবার মতো। তাঁর অনেক ছাত্র বর্তমানে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।
সারা জিয়াগঞ্জে, সবাই তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করতো।
তিনি ছিলেন একজন মানুষের মতো মানুষ।
স্পষ্টবাদী ছিলেন তিনি। তিনি সবসময় দৃপ্তকন্ঠে,
অন্যায়ের করতেন প্রতিবাদ।
সঞ্জয় প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা করতো। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। মৃত্যুঞ্জয় করতো ব্যবসা।
তার এক ছেলে। পুরঞ্জয় খুব বদমেজাজী ও
গুন্ডা প্রকৃতির ছেলে, ওর এক মেয়ে রয়েছে।
পুরঞ্জয় কোন কাজ করতো না। ও শুধু গুন্ডামী
করতো ও মদে চুর হয়ে থাকতো। ও বাড়িতে বেশি
আসতো না।
ওর জ্বালায় সারা জিয়াগঞ্জের মানুষ অতিষ্ঠ হয়েছিল। ওর জন্য ধনঞ্জয় জ্যেঠু ও তাঁর পরিবারের অনেক অনেক সন্মানহানি হয়েছিল।
ও বারকয়েক জেলও খেটেছিল। ওর জন্য,
বেশ কয়েকবার ধনঞ্জয় জ্যেঠুর বাড়িতে এসেছিল
পুলিশ। ওকে ছাড়া, ওনার পরিবারে আর কোন অশান্তি ছিল না।
জিয়াগঞ্জে, অনেক বিষয় সম্পত্তি ছিল ধনঞ্জয় জ্যেঠুর। উনি আমাকে বড় ভালোবাসতেন।
আমার গান শুনে, উনি আমাকে একদিন বলেছিলেন, " তোর গলাটা খুব ভালো। তুই
গানটা মন দিয়ে গেয়ে যা। গানের রেওয়াজ একদম বন্ধ করবি না। "
ওনার বাড়িতে আমরা গেলে, উনি ও ওনার পরিবার, আমাদের খুব খুব আদর যত্ন করতো।
ওনার ছোট ছেলে মৃত্যুঞ্জয়ের সাথে আমার সখ্যতা বেশি ছিল। আমি জিয়াগঞ্জে গেলে,
মৃত্যুঞ্জয় আমাকে ওর বাইকের পেছনে বসিয়ে,
কত জায়গায় ঘোরাতো, তার ঠিকঠিকানা ছিল না।
সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। হঠাৎ ঘটে গেল এক
অঘটন। সেদিনটা ছিল রবিবার। সকাল ৭ টার সময়, আমাদের বাড়ির ল্যান্ডফোনটা সজোরে উঠলো বেজে। বেশ কয়েকবার বাজার পরে ঘুমন্ত
চোখে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফোনটা ধরলাম। ফোনের ওপার থেকে ভেসে এল একটা পুরুষ কন্ঠস্বর।
আরে, এই কন্ঠস্বর তো আমার পূর্ব পরিচিত।
এতো, মৃত্যুঞ্জয়ের কন্ঠস্বর, আরে, ও কাঁদছে কেন?
মৃত্যুঞ্জয়ের থেকে যা জানতে পারলাম, তা জেনে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম! এও কি সম্ভব!
গতকাল অর্থাৎ শনিবার সকালে, ধনঞ্জয় জ্যেঠুর এক আত্মীয়ের বিবাহের অনুষ্ঠান ছিল মুর্শিদাবাদের লালগোলায়। বাড়ির সবাই সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলেও, যাননি কেবল ধনঞ্জয় জ্যেঠু। কারণ, দিনকাল খারাপ, সবাই মিলে বিয়েবাড়ি চলে গেলে, বাড়ি ফাঁকা থাকবে,
তখন বাড়িতে চুরি - ডাকাতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। তাই, সবাই গেলেও ধনঞ্জয় জ্যেঠু বিয়েবাড়ি যাননি। তিনি একাই বাড়িতে ছিলেন।
সেদিন গভীর রাতে, পুরঞ্জয় মদের নেশায় চুর হয়ে,
বাড়িতে এসে, সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ শুরু করে দেয়
ধনঞ্জয় জ্যেঠুর সাথে। বিবাদ যখন চরমে উঠে যায়, তখন সে হঠাৎ করে, তার কোমর থেকে রিভলভার বের করে, ফটাফট গুলি চালিয়ে দেয়
। গুলি গিয়ে লাগে ধনঞ্জয় জ্যেঠুর বুকে ও মাথায়।
সাথে সাথে মারা যায় ধনঞ্জয় জ্যেঠু। এদিকে, গুলির শব্দে, জেগে যায় আশেপাশের মানুষজন।
তারা ছুটে আসে। তাদের আসের আগেই চম্পট দেয় পুরঞ্জয়।
এই দুঃসংবাদ শুনে, আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। একি
শুনলাম আমি! নিজের কানকেও যে বিশ্বাস করতে পারছি না! আমাদের বাড়িতে নেমে এল শোকের ছায়া। এও কি সম্ভব? যে সন্তানকে বাবা
রক্ত জল করে ছোট থেকে বড় করে তোলে, সেই
সন্তান বড় হয়ে, তার সেই বাবার ওপর গুলি চালায়, তাকে করে নির্মমভাবে হত্যা, একি সামাজিক অবক্ষয় নয়? এ কোন সমাজে বাস
করছি আমরা? যেখানে, সামান্য বিষয় সম্পত্তির জন্য, বাবাকে খুন করতে হাত কাঁপে না ছেলের!
আজো আমি ধনঞ্জয় জ্যেঠুকে ভুলতে পারিনি।
ওনার কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে।
ওনার কথা যখন মনে হয়, তখন আমার দুই চোখ
বেয়ে বয়ে যায়, অশ্রুধারা, অশ্রুধারা, শুধুই অশ্রুধারা।
শিবব্রত গুহ
আজ যে কাহিনী আমি আপনাদেরকে শোনাবো, তা কিন্তু, গল্পের মতো মনে হলেও নয় গল্প। এ হল
এক সত্যি ঘটনা। যা আমার জীবনের একটা ঘটনাও বলা যেতে পারে। এই ঘটনা ঘটেছিল,
আজ থেকে দশ বছর আগে।
আমার বাবা অমল চন্দ্র গুহের ঘনিষ্ঠ পরিচিত
ছিলেন ধনঞ্জয় চক্রবর্তী। আমরা থাকি দক্ষিণ কোলকাতার ঢাকুরিয়াতে। ধনঞ্জয় জ্যেঠুর
বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার জিয়াগঞ্জে। উনি আমার বাবার থেকে বয়সে বড় ছিলেন। তাই, আমি ওনাকে ডাকতাম ধনঞ্জয় জ্যেঠু বলে।
মানুষ হিসাবে উনি ছিলেন একজন প্রাণবন্ত, হাসিখুশি মানুষ। সবসময় উনি হাসতেন।
ওনার হাসি ছিল বড়ই মধুর৷ উনি খুব মজার মানুষ ছিলেন। ওনার পরিবার ছিল বেশ বড়।
ওনার তিন ছেলে, বড় ছেলের নাম সঞ্জয়, মেজ ছেলের নাম পুরঞ্জয় ও ছোট ছেলের নাম মৃত্যুঞ্জয়।
ধনঞ্জয় জ্যেঠু, ছিলেন হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক।
তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল দেখবার মতো। তাঁর অনেক ছাত্র বর্তমানে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত।
সারা জিয়াগঞ্জে, সবাই তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করতো।
তিনি ছিলেন একজন মানুষের মতো মানুষ।
স্পষ্টবাদী ছিলেন তিনি। তিনি সবসময় দৃপ্তকন্ঠে,
অন্যায়ের করতেন প্রতিবাদ।
সঞ্জয় প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা করতো। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। মৃত্যুঞ্জয় করতো ব্যবসা।
তার এক ছেলে। পুরঞ্জয় খুব বদমেজাজী ও
গুন্ডা প্রকৃতির ছেলে, ওর এক মেয়ে রয়েছে।
পুরঞ্জয় কোন কাজ করতো না। ও শুধু গুন্ডামী
করতো ও মদে চুর হয়ে থাকতো। ও বাড়িতে বেশি
আসতো না।
ওর জ্বালায় সারা জিয়াগঞ্জের মানুষ অতিষ্ঠ হয়েছিল। ওর জন্য ধনঞ্জয় জ্যেঠু ও তাঁর পরিবারের অনেক অনেক সন্মানহানি হয়েছিল।
ও বারকয়েক জেলও খেটেছিল। ওর জন্য,
বেশ কয়েকবার ধনঞ্জয় জ্যেঠুর বাড়িতে এসেছিল
পুলিশ। ওকে ছাড়া, ওনার পরিবারে আর কোন অশান্তি ছিল না।
জিয়াগঞ্জে, অনেক বিষয় সম্পত্তি ছিল ধনঞ্জয় জ্যেঠুর। উনি আমাকে বড় ভালোবাসতেন।
আমার গান শুনে, উনি আমাকে একদিন বলেছিলেন, " তোর গলাটা খুব ভালো। তুই
গানটা মন দিয়ে গেয়ে যা। গানের রেওয়াজ একদম বন্ধ করবি না। "
ওনার বাড়িতে আমরা গেলে, উনি ও ওনার পরিবার, আমাদের খুব খুব আদর যত্ন করতো।
ওনার ছোট ছেলে মৃত্যুঞ্জয়ের সাথে আমার সখ্যতা বেশি ছিল। আমি জিয়াগঞ্জে গেলে,
মৃত্যুঞ্জয় আমাকে ওর বাইকের পেছনে বসিয়ে,
কত জায়গায় ঘোরাতো, তার ঠিকঠিকানা ছিল না।
সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। হঠাৎ ঘটে গেল এক
অঘটন। সেদিনটা ছিল রবিবার। সকাল ৭ টার সময়, আমাদের বাড়ির ল্যান্ডফোনটা সজোরে উঠলো বেজে। বেশ কয়েকবার বাজার পরে ঘুমন্ত
চোখে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফোনটা ধরলাম। ফোনের ওপার থেকে ভেসে এল একটা পুরুষ কন্ঠস্বর।
আরে, এই কন্ঠস্বর তো আমার পূর্ব পরিচিত।
এতো, মৃত্যুঞ্জয়ের কন্ঠস্বর, আরে, ও কাঁদছে কেন?
মৃত্যুঞ্জয়ের থেকে যা জানতে পারলাম, তা জেনে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম! এও কি সম্ভব!
গতকাল অর্থাৎ শনিবার সকালে, ধনঞ্জয় জ্যেঠুর এক আত্মীয়ের বিবাহের অনুষ্ঠান ছিল মুর্শিদাবাদের লালগোলায়। বাড়ির সবাই সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলেও, যাননি কেবল ধনঞ্জয় জ্যেঠু। কারণ, দিনকাল খারাপ, সবাই মিলে বিয়েবাড়ি চলে গেলে, বাড়ি ফাঁকা থাকবে,
তখন বাড়িতে চুরি - ডাকাতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। তাই, সবাই গেলেও ধনঞ্জয় জ্যেঠু বিয়েবাড়ি যাননি। তিনি একাই বাড়িতে ছিলেন।
সেদিন গভীর রাতে, পুরঞ্জয় মদের নেশায় চুর হয়ে,
বাড়িতে এসে, সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ শুরু করে দেয়
ধনঞ্জয় জ্যেঠুর সাথে। বিবাদ যখন চরমে উঠে যায়, তখন সে হঠাৎ করে, তার কোমর থেকে রিভলভার বের করে, ফটাফট গুলি চালিয়ে দেয়
। গুলি গিয়ে লাগে ধনঞ্জয় জ্যেঠুর বুকে ও মাথায়।
সাথে সাথে মারা যায় ধনঞ্জয় জ্যেঠু। এদিকে, গুলির শব্দে, জেগে যায় আশেপাশের মানুষজন।
তারা ছুটে আসে। তাদের আসের আগেই চম্পট দেয় পুরঞ্জয়।
এই দুঃসংবাদ শুনে, আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। একি
শুনলাম আমি! নিজের কানকেও যে বিশ্বাস করতে পারছি না! আমাদের বাড়িতে নেমে এল শোকের ছায়া। এও কি সম্ভব? যে সন্তানকে বাবা
রক্ত জল করে ছোট থেকে বড় করে তোলে, সেই
সন্তান বড় হয়ে, তার সেই বাবার ওপর গুলি চালায়, তাকে করে নির্মমভাবে হত্যা, একি সামাজিক অবক্ষয় নয়? এ কোন সমাজে বাস
করছি আমরা? যেখানে, সামান্য বিষয় সম্পত্তির জন্য, বাবাকে খুন করতে হাত কাঁপে না ছেলের!
আজো আমি ধনঞ্জয় জ্যেঠুকে ভুলতে পারিনি।
ওনার কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে।
ওনার কথা যখন মনে হয়, তখন আমার দুই চোখ
বেয়ে বয়ে যায়, অশ্রুধারা, অশ্রুধারা, শুধুই অশ্রুধারা।
----------------------------------------------------------------------------আপনিও এই বিভাগে মৌলিক ও অপ্রকাশিত লেখা পাঠান। মতামত জানান।
ankurishapatrika@gmail. com
----------------'-----------------------------------------------------------

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন