ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (পর্ব-১০)
অষ্টভুজ রহস্য
অলোক চট্টোপাধ্যায়
হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝেছি? উৎসাহিত হয়ে বলল পলাশ। - আমরা বাবুবাজারে গিয়ে সেই সেই রিকশাওয়ালাকে খুঁজে বার করতে পারলেই কেল্লা ফতে। মাত্র দু তিন দিন আগের ব্যাপার কাজেই সে নিশ্চয়ই জায়গাটা মনে করতে পারবে।
-তাহলেই দেখ, একটা আপাত জটিল সমস্যা ঠান্ডা মাথায় ভাবলে কত সহজ হয়ে যায়। রজতস্যার হাসলেন। - তবে তার চাইতেও সহজ উপায়ও আছে। মনে করে দেখ, একজন বয়স্ক রিকশাওয়ালা বিজয়বাবুর রিকশার ছেলেটিকে রাস্তার একটা ডিরেকশন দিয়েছিল।
-হ্যাঁ স্যার । পলাশ বলল। - মনসাতলা – হনুমান মন্দিরের বাঁ দিকের রাস্তা। কার যেন একটা চায়ের দোকানে জিগ্যেস করে গিয়েছিল রিকশাটা।
-ভেরি গুড। স্যারের গলায় প্রশংসার সুর। - হনুমান কিন্তু প্রধাণত উত্তর ভারতের হিন্দী বলয়ের দেবতা। আমাদের এদিকে তাঁর মন্দির বড় একটা দেখা যায়না। কাজেই ছোটো একটা গ্রামের পশ্চিমপাড়া বলে একটা মহল্লায় একটার বেশি থাকবে বলে মনে হয়না।
ওদের গাড়ি ফুলবেড়িয়া ঢুকছিল। রাজিন্দারজি চুপচাপ গাড়ি চালাতে চালাতে হঠাৎ বলে উঠল – যাবার সময়ে গ্রামে ঢোকার পরে একটা মোড়ে একটা হনুমান মন্দির পড়েছিল। আমরা সেখান থেকে ডানদিকে ঘুরেছিলাম। যদি বলেন তো আমি সোজাসুজি সেখানে আপনাদের নিয়ে যেতে পারি।
-সোজাসুজি মানে? রজতস্যার জানতে চাইলেন।
-আপনারা হয়ত অতটা খেয়াল করেননি, আমাদের সামনের গাড়িটা বাবুবাজার থেকে পরপর দুটো লেফট টার্ন নিয়েছিল। তারপর বেশ খানিকটা চলার পর গ্রামটা এসেছিল। তার মানে আমরা বাসরাস্তা দিয়ে অনেকটা এগিয়ে গিয়ে আবার উলটো দিকে ফিরে এসে গ্রামে ঢুকেছি। আমার মনে হয় যদি ব্রীজ থেকে নামার পর বাঁ হাতে কোনো রাস্তা থাকে সেটা ধরলে আমরা সোজা গ্রামে পৌঁছে যেতে পারি।
-যারা নিয়মিত গাড়ি চালায় তাদের রাস্তা সম্বন্ধে একটা ধারণা তৈরি হয়ে যায়।ফলে অচেনা জায়গাতেও শুধুমাত্র দিকনির্ণয় করেই তারা সঠিক রাস্তা আন্দাজ করতে পারে। পলাশ আর কুণালের দিকে তাকিয়ে বললেন রজতস্যার। তারপর রাজিন্দারকে বললেন –ঠিক আছে, তুমি তোমার হিসেবমতই চল।
-আচ্ছা স্যার – কুণাল প্রশ্ন করল, - কে বা কারা বিজয়বাবুকে অজ্ঞান করে ঐ ভাঙা বাড়িতে নিয়ে যেতে পারে আর কারনটাই বা কি হতে পারে?
-কারণটা এক্ষুনি বলা যাচ্ছেনা। তবে নিশ্চিত ভাবেই এমন কেউ কাজটা করেছে যাদের ঐ বাগানের ভেতর ঘোরাফেরা করা সম্ভব এবং সহজ। স্বাভাবিক ভাবেই প্রাথমিক সন্দেহ পড়ে তার মালিকদের, মানে বিজয়বাবুর ভাইদের ওপর। অবশ্য ওখানে যারা লীজ নেয় তাদের পক্ষেও এটা করা সম্ভব, কিন্তু তারা তো ওনাকে চেনেই না। আর ভাইদের ওপর সন্দেহের আরো একটা কারন আছে। ভাঙা বাড়ির ভেতর একটা হালকা গন্ধ পেয়েছিলি মনে আছে?
-হ্যাঁ স্যার আপনি পরে বলবেন বলেছিলেন। তারপর আমরাও জিগ্যেস করতে ভুলে গেছি। কুণাল বলল।
-ওটা খুব সম্ভব কোনো হাইড্রোফসফেটের গন্ধ। প্রধানত কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার হয়। সাপখোপ তাড়ানোর কাজেও লাগে। যারা বিজয়বাবুকে ঐ ভাঙা ঘরের মধ্যে ফেলে রেখেছিল তারা কিন্তু ওনার যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকটাও ভেবেছিল। সেই কারনেই ভাইদের ওপর সন্দেহটা জোরালো হয়। আমি যখন জিগ্যেস করেছিলাম ওখানে সাপ তাড়ানোর কোনো কেমিক্যাল দেওয়া হয় কিনা তখন কিন্ত অজয়বাবু বলেছিলেন ওখানে কেউ থাকেনা বলে সাপের ওষুধ দেবার প্রশ্ন নেই। নিশ্চিত ভাবে মিথ্যে বলেছিলেন।
কথা বলতে বলতেই গাড়ি কংক্রিটের ব্রীজ পেরিয়ে বাবুবাজারের রাস্তা ধরে নিল। একটু বাদেই বাঁ হাতে নেমে গেছে একটা মোরাম বিছোনো রাস্তা। রাজিন্দার সেদিকে গাড়ি ঘুরিয়ে বলল – আমার আন্দাজ ঠিক হলে দু চার মিনিটের ভেতর আমরা কদমফুলি পৌঁছে যাব।
সত্যিই একটু এগোতেই বড় বড় গাছের ফাঁক দিয়ে দুটো তিনটে ঘরবাড়ি দেখা দিল। তারপরেই তারা পৌঁছে গেল একটা চৌমাথায়। চারটে রাস্তা অবশ্য ঠিক সমকোনে নেই। ওদের ঠিক উলটো দিকেই একটা ছোট্টো মন্দির। লাল রঙ দিয়ে বাইরের দেওয়ালে লেখা জয় বজরংবলী । গাড়ি থামিয়ে পথচলতি একজনকে রজতস্যার জিজ্ঞাসা করলেন – ভাই, মনসাতলার রাস্তা কোনটা?
লোকটা মন্দিরের পাশের চওড়া রাস্তাটা দেখিয়ে দিল। স্যার আবার জানতে চাইলেন – আর গ্রামের ভেতরে যাবার রাস্তা? মন্দিরের অন্য পাশের রাস্তাটা হাতের ইঙ্গিতে দেখাল লোকটা।
রাজিন্দার বলল – আমার যত দূর মনে পড়ছে স্যার, আমরা গ্রামের ভেতরের রাস্তা দিয়ে এসে মন্দিরটাকে বাঁয়ে রেখে ডানদিকের কোনাকুনি সরু রাস্তাটাতে ঢুকেছিলাম।
-তাহলে ঐটা হবে পুরোনো বাড়িটাতে যাবার রাস্তা। আর মন্দিরকে বাঁ হাতে রেখে এগোতে হলে যে পথ দিয়ে আমরা এক্ষুনি এলাম সেইটাই। একটু হিসেব করে রজতস্যার জানালেন। - মনসাতলার দিক থেকে এলে বাঁদিকের রাস্তা তো ওটাই হয়।
-একটা চায়ের দোকানও পড়েছিল স্যার। পরমোৎসাহে কুণাল জানাল। - বিজয়বাবুর রিকশাওয়ালা নিশ্চয়ই ওখানেই খোঁজ করেছিল।
আবার ঘুরল গাড়ি। একটু এগোতেই রাস্তার বাঁ দিকে খাপরার চাল দেওয়া ছোট্টো চায়ের দোকান। কাঠের খুঁটি পুঁতে তার ওপর কাঠের তক্তা পেতে বসার ব্যবস্থা। রজতস্যার বললেন – চল একটু চা খাওয়া যাক।
একটু আগেই লাঞ্চ করা হয়েছে।এক্ষুনি চা খাবার বিশেষ দরকার ছিলনা। তবে স্যারের উদ্দেশ্যটা বোঝা গেল স্পেশাল চায়ের অর্ডার দিয়ে দোকানের বেঞ্চে বসার পর। আরো জনাচারেক গাঁয়ের লোক আগের থেকেই বসে আড্ডা মারছিল। রজতস্যার গল্প জুড়লেন তাদের সঙ্গে। কথায় কথায় জানা গেল বেশ কিছু তথ্য। চার পা এগোলেই ডানহাতে ফলবাগানের গেট। এই এলাকার খুব নামকরা বাগান। চৌধুরি কত্তা বেঁচে থাকতে আরও রমরমা ছিল। তা সে বুড়োকত্তা গত হয়েছেন অনেকদিন।তার মেয়ের দিকের নাতিরাই এখন মালিক। বাগানের এদিকে নতুন বাড়ি বানিয়েছে সেও অনেকদিন হল। কেন বানিয়েছে কে জানে। কেউ তো থাকেনা। মাঝেমাঝে আসে বন্ধুবান্ধব নিয়ে পিকনিক করতে। গ্রামের লোকেদের সঙ্গে মেলামেশা নেই। এখানে থাকার ভেতর একজন কেয়ারটেকার। সে এ গ্রামের পুরোনো লোক। অনেক বাইরের লোকজন আসে তার কাছে। আর চৌধুরিদের পুরোনো বাড়ি? সে তো ধ্বংসস্তুপ। খালের গা ঘেঁষে। ওদিকে এখন কেউ যায় না। হ্যাঁ, বাড়িটার ভুতুড়ে বদনাম আছে। মাঝেমাঝেই আলোর নড়াচড়া দেখা যায়। দৈবাৎ কেউ গিয়ে পড়ে কি সব ছায়ামুর্তিও দেখেছে নাকি। তা সে পাড়াগাঁয়ে ওরকম পরিত্যক্ত বাড়িতে ভুত থাকাটা কিছু আশ্চর্যের তো নয়। এইতো কদিন আগেই নাকি-
রাজিন্দারজি চা খেল না। সামনের রাস্তায় পায়চারি করে কাটিয়ে দিল। ওরা উঠে গাড়ির দিকে এগোতে অনেকটা দূর থেকেই হাঁটতে হাঁটতে ফিরল। এসে রজতস্যারকে জানাল সামনেই ডানদিকে একটা সরু রাস্তা ঢুকে গেছে যার শেষে একটা লোহার গ্রিলের গেট আছে। ভেতরে একটা বাড়িও দেখা যাচ্ছে। রজতস্যার একমূহুর্ত ভেবে পলাশ আর কুণালকে বললেন – আমরা সকলে একসঙ্গে ওই বাড়িটার সামনে যাবনা। তোরা দুজন যা। যদি দেখিস আশপাশে কেউ নেই আমাকে ইশারায় ডাকবি। আর স্মার্টফোনে ছবি নেবার চেষ্টা করবি।
ওরা গাড়ি ছেড়ে হেঁটেই এগোলো। রজতস্যার রাস্তার মুখ অবধি এসে দাঁড়িয়ে গেলেন। ডান দিকে ঢুকে গেছে মোরাম বিছোনো পথ। দুদিকে বড়বড় গাছের সারি, নিচে আগাছার ঝোপ। তার ফাঁক দিয়ে উঁচু পাঁচিল দেখা যাচ্ছে। মাঝের রাস্তাটা দুজনের আন্দাজেই মনে হল ভাঙা বাড়িটার রাস্তা থেকে গেটের দুরত্বর মতই।
বাঁকটা ঘুরেই গেট আর গেটের পেছনে বাড়িটা দেখা গেল। গেটের কাছাকাছি এসে দেখা গেল গেটে তালা ঝুলছে। লোকজন সামনা সামনি কেউ নেই। ওরা দুজন এগিয়ে গেল গেটের কাছে। ভেতরে সোজা চলে গেছে নূড়ি বিছোনো পথ। কয়েক ধাপ সিঁড়ি, চওড়া রোয়াক, আর তার পরেই –
কুণাল আর পলাশ একসঙ্গে বলে উঠল – অষ্টভুজ !
সত্যিই পুরোনো বাড়িটার মতই প্রায় একই দৈর্ঘ্যের একটা ঘর। দুপাশের দেওয়াল ঠিক সমকোনে নেই, তেরছা হয়ে বেঁকে গেছে। উলটো দিকটা যদিও এখান থেকে দেখা যাচ্ছেনা, কিন্তু আন্দাজে বলা যায় সেদিকের দেওয়ালদুটোও এভাবে বেঁকে থাকলে এটাও একটা আটকোনওয়ালা ঘর। পেছনের বাড়িটা পুরোটাই ঘরটার আড়ালে, তবে মনে হয় সেটা একতলা বাড়ি। নাহলে ওপরের তলা দেখা যেত। কুণাল পটাপট ছবি তুলে নিল। পলাশ একবার পেছন ফিরে দেখল স্যার দাঁড়িয়ে আছেন গলিটার মুখের একপাশে। নিশ্চয়ই আড়চোখে ওদের দিকে নজর রেখেছিলেন, পলাশ ঘুরতেই তাকালেন তার দিকে। পলাশ ইশারায় জিগ্যেস করল পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢূকবে কিনা। স্যারও ইশারাতেই বারণ করলেন।
ভাগ্যিস বারণ করেছিলেন। আচমকাই ঘরের একটা জানলা খুলে কেউ কর্কশ গলায় চিৎকার করল – এই, কেরে ওখানে? কি করছিস তোরা?
পলাশ চেঁচিয়ে উত্তর দিল – আমরা ক্যানিং থেকে বেড়াতে এসেছি। স্টুডেন্ট।
-কিসের ছবি তুলছিস? কর্কশ কন্ঠ আবার ধমকে উঠল।
কুণাল তাৎক্ষণিক জবাব দিল – পাখির ছবি তুলছিলাম। এখানে ছবি তোলা বারণ নাকি? তাহলে আর তুলব না। লোকটা জানলার সামনে এসে দাঁড়ালেও ঘরের ভেতরের কম আলোয় তার চেহারাটা ভাল বোঝা যাচ্ছিল না।
-যা, ভাগ এখান থেকে। আবার গর্জে উঠল লোকটা। -নইলে মজা দেখাচ্ছি। দাঁড়া –
ওরা অবশ্য আর দাঁড়াল না। ঘুরে হাঁটা লাগাল বাইরের রাস্তার দিকে। ততক্ষণে রাজিন্দারও চায়ের দোকানের সামনে থেকে গাড়িটা এগিয়ে এনেছে। ওদের আসতে দেখে রজতস্যারও উঠে পড়েছেন গাড়িতে। ওরাও উঠে পড়ল। গাড়ি একটু এগোতেই ডানদিকে রাস্তার ওপরেই আর একটা বড় গেট। সেখানেও বাইরের দিকে তালা ঝুলছে। ভেতরে বড় বড় গাছের সারি দেখা যাচ্ছে গেটের ফাঁক দিয়ে । এটাই নিশ্চয়ই সেই ফল বাগান। কুণালের খুব ইচ্ছে একবার গেট টপকে ভেতরে গিয়ে দেখবে আরো কিছু তথ্য যদি পাওয়া যায়। পলাশেরও তাই মত। সে তো ঐ লোকটার নজর বাঁচিয়ে অষ্টভুজ ঘরটাতেও একবার উঁকি মারার পক্ষপাতী। একটু সন্ধ্যে নামলেই নিশ্চয়ই সুযোগ পাওয়া যাবে।তবে রজতস্যার এ সব অ্যাডভেঞ্চারে সায় দিলেন না। সেখানে ওদের দাঁড়াতেই দিলেন না। গাড়ি ছুটল ক্যানিং এর দিকে।
চলবে...
----------------------------------------------------------------
প্রতি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাসটি অঙ্কুরীশা-র পাতায় ক্লিক করে পড়ুন ও পড়ান।
মতামত জানান।
ankurishapatrika@gmail. com
- ----------------------------------------------------------------

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন