মঙ্গলবাবের গল্প
বার্তা
তপনজ্যোতি মাজি
সংক্ষিপ্ত বার্তায় কৌশিক লিখেছিল, খুব বোরড লাগছে, ফ্রী থাকলে
মেসেজ করো।
কথাকলি জানে কৌশিক আজ অস্থির হয়ে আছে।এমনিতে শান্ত স্বভাবের।
কিন্তু অস্থির হলে অন্যরকম।আজ নিশ্চিত তাই। এমনিতেই ঠিক নেই
দশদিকের কোনও কিছুই। কোভিড ১৯ প্রাণ কেড়ে নিল কাছে দূরের
লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষের। পৃথিবীর পরিসংখ্যান অন্তত তাই। কষ্ট পেল
কত মানুষ। শারীরিক আর্থিক এমনকি সামাজিক ভাবেও।সাধারণ থেকে সেলিব্রিটি। সেইসঙ্গে মনের ওপর বিস্তার করেছে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার
ছায়া। সে নিজেও তো ভালো নেই। মন দিয়ে কিছুই করতে পারছেনা বেশ
কিছুদিন। কতদিন নিজের সঙ্গে বসা হয়ে উঠছেনা তার।
প্রতিদিনের কাজের পরও তার নিজের একটা জগৎ অনেক যত্নে ও
ভালোবাসা দিয়ে তৈরি করেছে কথাকলি। কবিতা ও গানের স্নিগ্ধ ভুবন।
তার তপস্যা ক্ষেত্র। কতদিন হলো কবিতার বই নিয়ে বসাই হচ্ছেনা তার।
মনের মধ্যে কবিতার পংক্তিগুলো অ্যাকোয়ারিয়ামের রঙিন মাছেদের মতো
সাঁতার কাটে মনে। ঐ পর্যন্তই। উচ্চারণের উন্মাদনা অনুভব করা হয়ে ওঠেনি
বেশ কিছুদিন হলো।
মন হয়ে আছে মরুভূমির মতো লাবণ্যহীন।বোধকরি ভালো নেই কেউ।
মনে পড়লো কবিতার পংক্তি,' এ বড় সুখের সময় নয় '। কৌশিকের
মেসেজটা আবার পড়লো।ভাবলো কিছু একটা লিখবে। এমন সময়
'অনিতা কলিং' ভেসে উঠলো স্ক্রিনে। 'বল', বলে কল'টা নিল।
অনিতা কথাকলি'র বন্ধু। ইস্কুল বেলার।এখন জামশেদপুরে থাকে। ওর
বর সুমানস রাষ্ট্রায়ত্ত একটি প্রোডাকশন ইউনিটের সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার।
অনিতা হৈ হৈ করে কথা শুরু করে দিল।প্রসঙ্গ যা হোক, অনিয়ার কথা
ছড়িয়ে পড়ে তরঙ্গের দোলা তুলে।আজও ব্যতিক্রম নেই। হবেই বা কেন?
ওর বরের প্রমোশনের খবর দিতে ফোন। কথাকলি জানে আজ কমপক্ষে
আধঘন্টা শুনতে হবে ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপণ।মানুষ কত সাধারণ বিষয়ে আনন্দে আত্মমুগ্ধ হয়ে থাকে। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার হলো অন্য প্রান্তের মানুষটির
মানসিক অবস্থান , ব্যস্ততা কিংবা সময়ের কথা না ভেবেই অনর্গল কথা
শুরু করে দেয়। যাক, এই অভ্যাস থেকে অনিতাকে সরানো যাবেনা।অতএব,
শুনতেই হবে আত্মখ্যাতির ধারাভাষ্য।
একটু একটু করে শীতের সন্ধ্যা রাত্রির উঠোনে পা রাখছে। মফস্বলের এই
জনপদে সন্ধ্যা শেষ হয়ে যায় দ্রুত। রাত্রির কোনও কল্লোল এখানে টের
পাওয়া যায়না, উৎসবের দিনগুলি ছাড়া। 'শ্রীময়ী বিউটি পার্লার' এর কণিকার
কাছে সাড়ে সাতটায় সময় নেওয়া আছে।মনে এলো কথাকলির। ভ্রূপল্লব
ও চুলের লেংথটা একটু ঠিক করে নিতে হবে। আধ ঘন্টার মতো সময়
লাগবে। পার্লার বন্ধ করার আগের সময়টাই কথাকলির প্রিয়।এই সময়টা
পার্লারে ভিড় কম থাকে। ওরও চাপ থাকেনা।
অনিতার কথা শেষ হতেই স্মার্ট ফোনটা বিছানার ওপর রেখে দিয়ে ওর
নিজের ওয়ার্ডরোবের দরজা খুলে একমিনিট নির্বাচনী দৃষ্টিতে দেখলো।
গাঢ় নীল লিনেন পছন্দ হলো মূহুর্ত্তেই। সন্ধেতে ওর ডার্ক কালার পছন্দ।
আজও তাই করল। চেঞ্জ করার পর একমিনিট আয়নার সামনে দাঁড়াল।
চিরুনি নিয়ে আলতো আদরে উদাসীন চুল গুলোকে ঠিকঠাক করে নিল।
একটা ছোট টিপ বসিয়ে নীল ভ্রূযুগলের সন্ধি স্থলে। প্রিয় শুভ্র শরীরের
ডিও টা নিয়ে স্প্রে করলো নিখুঁত দ্রুততায়।দর্পণে নিমেষে উদ্ভাসিত হলো
কবিতা শরীর। ফোনে মেসেজ টোন।ফোন তুলে দেখলো, পার্লার থেকে
কণিকা টেক্সট করেছে। আলো নিভিয়ে , বসার ঘর ও সিঁড়ির মুখের আলো
জ্বেলে নেমে এলো নীচে। গেট বন্ধ করে , চাবি লাগিয়ে পা রাখলো পথে।
পার্লারের দূরত্ব বাড়ি থেকে তিন থেকে চার মিনিট।
আজ রবিবার। সুশোভন দুপুরে জেলা শহরে গেছে । বাস চলছে অনিয়মিত।
গাড়ি করে গেছে। কিছু কাজ আছে।ফিরতে একটু দেরি হবে। টেক্সট করে
জানিয়েছে। ফেরার সময় ওর সঙ্গে বর্ণমালাও ফিরবে। এইসব মনের মধ্যে
নিয়ে পার্লারের স্মোকড গ্লাসডোর ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করলো কথাকলি।
পার্লার থেকে ফিরে আসার কুড়ি মিনিটের মধ্যেই সুশোভন ও বর্ণমালা
ফিরে এলো। গিজারের সুইচ অন করে রেখেছিল কথাকলি। পোশাক
ছেড়ে ওরা ফ্রেশ হবে। নিজেও ফ্রেশ হয়ে সমুদ্র রঙের স্ট্রাইপড হাউস
কোটের ওপর হালকা বাটিকের চাদর নিয়ে শীত আড়াল করেছে।
কিচেনে ঢুকলো দ্রুত পায়ে। বর্ণমালার প্রিয় কিছু তৈরি করতে হবে।
কদিন পর মেয়েটা ফিরল। এগ চাউমিন ও ঘন দুধের কফি। বর্ণমালার
সান্ধ্য পছন্দ। সুশোভনের আলাদা পছন্দ নেই। গল্প করতে করতে
কফি পর্ব শেষ হলে সুশোভন বেডরুমে টিভির সামনে গিয়ে বসল।
বর্ণমালা ওর রুমে গিয়ে ল্যাপটপ অন করলো।
লিভিং রুমে কথাকলি একা।
টেবিলের উপরে পড়ে থাকা স্মার্ট ফোনটা নিল।
মেসেজ চেক করতে গিয়ে মনে পড়লো, কৌশিকের টেক্সট এর
উত্তর দেওয়া হয়নি।
বড় আলোটা নিভিয়ে হালকা আলোতে তার আঙুল কিবোর্ডের
ওপর খেলা করতে লাগলো। স্মার্ট ফোনের নীল আলোতে
কথাকলির মুখখানি অভিব্যক্তিময়।
---------------------------------------------------------------------এই বিভাগে মৌলিক অপ্রকাশিত লেখা পাঠান । মতামত জানান।
ankurishapatrika@gmail.com
---------------------------------------------------------------------
,

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন