শুক্রবার, ১৯ মে, ২০২৩

উন্মুক্ত কবিতাগুচ্ছ —২৭ ।। দেবপ্রসাদ জানা -র পাঁচটি কবিতা।। Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 



উন্মুক্ত কবিতাগুচ্ছ —২৭



দেবপ্রসাদ জানা -র  পাঁচটি কবিতা 



১.

 চিত্তহারিনী



প্রায়ই কোনো অনুসঙ্গ ছাড়াই মনে পড়ে তাকে

কখনো তীব্র ভাবে, কখনো অস্পষ্ট, 

কখনো স্নান ঘরে। কখনো আয়নায়।

চোখের সামনে আসে আর চলে যায়।


আমি চেষ্টা করেও তার মুখচ্ছবি ভুলতে পারছি না

কখনো ঘোর অন্ধকারে,চিলেকোঠায়।

কখনো বর্ষা রাতে আলোছায়ায়।

প্রখর রোদ্রে এক্সপ্রেস ওয়েতে মরীচিকায়।


মস্তিষ্ক হারিয়ে ফেলে বোধ। 

চেয়ার পেতে বসে পড়ে স্নায়ুকোষ।

একটা ঠান্ডা শিহরণ বয়ে যায় মেরুদন্ড বরাবর।


সে আসে শরীরে রক্ত চলাচলের মধ্যে মিশে যায়।

ক্ষরণের মতো কিছু ঘন তরল মেরদন্ড দিয়ে বইতে থাকে।

বিষন্নতায় আচ্ছন্ন হয়ে আসে শরীর। 

কখনো সে আসে, কখনো চলে যায় নিঃশব্দে নীরবে।


সমুদ্রের জলে সত্তরভাগ ডুবে থাকা পৃথিবী বাঁচতে চায়।

হাবুডুবু খায়। সাঁতরে ডাঙ্গায় উঠতে চায়।

কি সেই আত্ম প্রবঞ্চনা? কে সেই চিত্তহারিনী?

কেন সে আসে?কেন চলে যায়, কেন যে যায় না দেখা।

আকাশের রঙে মিশে,হারিয়ে যাই আমি একা ।।



২.

বিরক্ত 


কানের দুই পাশের অবাধ্য চুল গুলোর মতো 

তোমাকে বিরক্ত করতে ভারি ভালো লাগে।

বিরতিহীন অবাধ্যতা আইন অমান্য আন্দোলনের মত। 

কিছুক্ষন তাড়া খাও। 

দশ মিনিটির কারা বন্দী -

আবার অবাধ্যতা। আবার বিরক্ত করা।

কী কঠিন অসুখ আমার। 

পুরাতনী টপ্পা গানে যেমন না শুনে বাঃ বাঃ করি।

অবুজ মন তোমার না চাওয়াকে লজ্জা ভেবে -

হামলে পড়ি আকাঙ্ক্ষায়।

খোপার আলগা হয়ে যাওয়া এক গোছা চুল।

তোমার কানের পাশে অনবরত সুড়সুড়ি দিয়ে

বিরক্ত করে যেমন 

আমার ও তোমাকে কথার ফাঁকে ফেলে 

বিরক্ত করতে ভালো লাগে।


৩.

শুভ নববর্ষ


যে বর্ষ জন্মায় নিজেই 

সময়ের বাঁক ধরে ডাল পালা ছড়ায় নিজেই।

সে দুঃখ জানে না, সুখ মানে না,ভয় নেই 

অসুখও নেই।

তার শরীর জুড়ে সহস্র সৃঙ্গার।

সে সিঁথিতে সিঁদুর পরে। 

আলতা লাগায় পায়ে।

জন্মেই সে যুবতী, শিশিরস্নাত ভোরবসন্তের ফুল।

একটা বর্ষের আয়ু মাত্র একটি বছর।

তাই তোর অত্যাশ্চর্য অনন্যতায় প্রজন্মকে প্রজন্ম পার করে দ্বিধাহীন।

একটা বছরের প্রান তন্ময় নারীর মতো ভালোবেসে 

কত শত জীবন তুমি প্রতিভাত করো,

আলোকিত করো। 

যতই জীবনের স্তব্ধতা আসুক 

পৃথিবী অসুস্থ হোক।

কুয়াশা যদি পীড়িত করেও বার বার 

তুমি এসো নতুন রূপে প্রতিবার।

শুভ নববর্ষ।।


৪.

আজ কেন মুখ ভার

ও আকাশ ও নীল আকাশ 

আজ কেন মুখটা ভার।

কাল যে খুব আঁধার বেলা 

চোখের জলে ভাসালে।

আজ কেন শান্ত এত?


ও বাতাস আজ এত শান্ত কেন?

কাল যে খুব রাগ দেখালে 

ভাঙ্গলে সুখের ঘর।

কাল দেখে মনে হচ্ছিল কেমন পর পর।

ভাঙ্গলে সব গাছগাছালি 

ভাঙ্গলে টিনের ঘর।

শহরতলী গুঁড়িয়ে দিলে গ্রাম চটকিয়ে।

দেখোতো কেমন ক্লান্ত ওরা,

তোমার সাথে লড়াই করে । 

আজ নড়তে পারছে না,চলতে পারছে না।

গায়ে ভীষন ব্যথা। পাকা ফোঁড়া ব্যথা।

বেলফুল গাছে ফুল ফুটতে দাও নি একটিও।

জবা ফুল গুলোও রাগে ছিঁড়ে ফেলেছ।


দেখতে পাচ্ছো ও বাতাস 

থাকতে পারতে আরো কটা দিন।

আমরা লড়াই শিখে গেছি।

আয়লা ফনি বুলবুল,

তারাও করেছে ভুলটুল।

তারাও ছিল টান টান।

কি যেন নাম? আমফান 

আমরা লড়াই শিখে গেছি।

এত বড় মহামারী,মরেছেও বাড়ি বাড়ি।

ভয় পাই না আর। 

দেখো আজ তোমার মুখটাই ভার।


৫.

ক্ষমা কোরো মা 

আমাকে ক্ষমা কোরো মা -

আমি পারলাম না , তোমার স্বপ্ন গুলো পূরণ করতে।

তোমার স্বপ্ন ছিল আমি যেন বাবার মতো সুন্দর

সূবর্ণকান্তি হই। আমি হতে পারিনি।

আমি যে তোমার মতো হয়েছি মা। 

তোমার মত ভালোবাসতে পারি।

পুরো গোটা একটা পৃথিবী তুমি আমায় দিয়েছো।

বুকের অমৃত সুধা আমার শরীরে দিয়েছ।

কত অমূল্য সময় তুমি আমাকে বিলিয়ে দিয়েছ।

আমি যখন দুধের শিশু, কত রাত্রি তুমি জেগে।

কতবার আমি তোমার গায়ে কাপড় ভিজিয়েছি 

তাও যাওনি রেগে।

ছোট মাসির বিয়েতে, 

সকলে কত আনন্দ করেছে তুমি পারোনি।  

আমি যে শিশু, তোমার উষ্ণতা ছাড়া যে আমি ভীত। 

কত চিন্তা তোমাকে পীড়িত করছে।

কবে আমি স্কুলে যাবো 

কোন স্কুলে ভর্তি হবো, 

স্কুলটা ভালো কিনা?

সকালের টিফিনটা খেলাম কিনা?

শরীরটায় তাপমাত্রা ঠিক আছে কিনা?

কত অমূল্য শিক্ষা পথে ঘাটে আমাকে দিয়েছ।

স্কুলের বন্ধুর থেকে তুমিই তো ছিলে আমার প্রিয় বন্ধু।

তবু আমি পারিনি তোমার স্বপ্ন গুলো পূরণ করতে।

গত বাইশটা বসন্ত তুমি আমাকে গোছাতে শেষ করলে।

আমার একটা সুন্দর বৌ হোক। 

কিন্তু আমি প্রেমে পড়েছি, 

ভালোবাসার জোয়ারে নিজেকে ভাসিয়ে 

তোমাকে বহু দূরে ফেলে এসেছি।

তুমি কোন প্রতিবাদ করো নি।

তোমার ভালোবাসার বাইশ বছর,

আমাকে তোমার কাছে রাখতে পারে নি মা।

একটা বছরের প্রেম, হারিয়ে দিল বাইশটা বছর।

আমি হারিয়ে যাচ্ছি মা। 

নীল ঘুম আমাকে ডাকছে। 

ঐ দশতলার কার্নিশ থেকে। 

তোমার সব স্বপ্ন গুলো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল মা। 

পূরণ করতে পারলাম না।

ভালোবাসা হারাতে হারাতে আমি ক্লান্ত পরিশ্রান্ত।

জীবনের স্রোত ঠেলে ঠেলে অনন্ত স্রোতে।

ঐ দেখো টাল মাটাল নৌকাটায় ঝড় লেগেছে।

ঘুমঘোর চাঁদ ডাকছে আমায়,একটু ঘুমাতে চাই।

আত্মীয় পরিজন বাবা আর তুমি।

তোমাদের ভালোবাসা।

সব ওই মেয়েটার কাছে হেরে গেল আজ।

রক্তের ভিতরে জাগরন প্রেমপীড়ার ঘুম।

দুচোখ ভরে তোমার স্বপ্ন গুলো চুরি করে চলে যাচ্ছি মা।

ওই দশতলার কার্নিশে দাঁড়িয়ে আমার নিয়তি।

আমি যে তোমার মতোই ভালোবাসতে পারি,

জীবনের শেষদিনেও। 

কিন্তু সে যে বুঝলো না।।

1 টি মন্তব্য: