বৃহস্পতিবার, ৯ জুন, ২০২২

ধারাবাহিক প্রেমের উপন্যাস (পর্ব—১৮) ।। . ... এবং ইরাবতির প্রেম।। গৌতম আচার্য।।Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 









ধারাবাহিক প্রেমের উপন্যাস (পর্ব—১৮)


.


... এবং ইরাবতির প্রেম
গৌতম আচার্য


কখন রাত্রি ভোর হয়ে গেছে, বুঝতে পারেনি কেউই।। ভোরের আধো অন্ধকারে জেগে ওঠা পাখির প্রথম কলতানে সম্বিত ফেরে দুজনের।। ইরাবতি সত্যেনকে বলে ওঠে, "শয়তান কোথাকার।। সারা রাত জাগিয়ে রাখলো"।। সত্যেন মুচকি হেসে বলে, হানিমুন তো এটাই।। আবেগে ইরাবতিকে আবার নিজের বুকের মধ্যে টেনে ধরে সত্যেন।। এবার ইরাবতি বলে ওঠে, আর একদম শয়তানি নয়।। তার কথায় একটি মৃদু প্রচ্ছন্ন উস্কানি লক্ষ্য করে সত্যেন।। সত্যেন হেসে গেয়ে ওঠে, "ও কেন এ্যতো সুন্দরী হলো.....  সামনে এসে ফিরে তাকালো, দেখে তো আমি মুগ্ধ হবোই, আমি তো মানুষ"।। মৃদু ধাক্কা দিয়ে গানের সুর ধরে ইরাবতি বলে ওঠে, মানুষ নয়, বলো "আমি তো শয়তান"।। ইরাবতি সত্যেনের বুকে মুখ লুকায়।।

এগারোটার সময় দুজনে নেমে এলো রিসেপশনে।। ম্যানেজার বাবু বলে ওঠেন, গুড মর্নিং ম্যাম্, গুড মর্নিং স্যার।। প্রত্তুতরে দুজনেই ম্যানেজার বাবুকে গুড মর্নিং করে এগিয়ে গেলো খাওয়ার টেবিলের দিকে।। খুব সুন্দর করে পরিপাটি সাজানো ডিস্, কাঁটা- চামচ।। ম্যানেজার বাবু এগিয়ে এসে বললেন, সারভিস করতে বলি স্যার? সম্মতি জানায় সত্যেন।। ম্যানেজারবাবু চিৎকার করে কিচেনের উদ্দেশ্যে বলে ওঠেন, এ্যাই, রুস্তম, খাবার দিয়ে দাও।।

খাওয়া দাওয়া শেষে হোটেলের বিল পেমেন্ট, টিপস্ পর্ব শেষ করে ইরাবতির দিকে তাকিয়ে সত্যেনের মন খারাপ হয়ে ওঠে।। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা।। ইরাবতি মুচকি হেসে তাকায়।। ইরাবতির হাসিতে ভরা, টোল খাওয়া গাল দুটির দিকে তাকিয়ে সত্যেনের বুকে কি এক বিরহের সুর বেজে ওঠে।। এখন বিচ্ছেদ মূহুর্তে ইরাবতি আরো অনেক বেশি সুন্দর হয়ে উঠেছে।। কি এক বেদনার বেসুরো মূর্ছনায় সত্যেনের অন্তর কেঁদে ওঠে।। তার বুক, শরীর, বেহাগের ব্যর্থ সুরে দিশাহারা চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে।। বারবার মনে হয়, যেন বড্ডো তাড়াতাড়ি কেটে গেলো সুন্দর দুটি দিন, অসাধারণ দুটি রাত।। মায়াময় স্বপ্নের আবেশে পার হয়ে গেলো সবকিছু।। সত্যেনের মনের ভিতরটি যেন ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠছে।।

ইরাবতিকে একটু পরেই ছেড়ে চলে যেতে হবে কতো দূরে।। মন চাইছে না।। ইচ্ছে করছে, বাকি জীবনটাই যদি কাটিয়ে দেওয়া যেতো ইরাবতির পাশে পাশে..।। আবার কবে দেখা হবে, জানেনা সত্যেন।। ইরাবতির সঙ্গে কাটানো স্বচ্ছ সুন্দর সময়টি কিছুতেই হারাতে মন চাইছে না।। মরিয়া সত্যেন বলে ওঠে, একবার ঘরে যেতে হবে, লাস্ট মিনিট টয়লেট করে নিতে হবে।। ইরাবতি মৃদু হেসে বলে, এই তো সবকিছু সেরে নামলে।। আবার যেতে হবে? সুগার হয়ে গেল নাকি? যেন প্রশ্নটি জানাই ছিলো সত্যেনের।। সপ্রতিভ ভাবে উত্তর করলো, "এমন সুগার মিলের সঙ্গে ঘর করলে, সুগারের পরিমাণ না বেড়ে কি হাইপোগ্লাইসিমিয়া হবে"? ইরাবতি তার সুন্দর মুখ ভেংচিয়ে বলে ওঠে, পাক্কা শয়তান।। তাড়াতাড়ি এসো।।

সত্যেন ঈশারায় ইরাবতিকে তার সঙ্গে রুমে যাওয়ার ইঙ্গিত করে।। মাথা নেড়ে ইরাবতি বলে, "তাড়াতাড়ি নেমে এসো, আমার একটি প্ল্যান আছে"।। সত্যেন বলে, তুমি না গেলে আমারও যাওয়ার দরকার নেই।। চলো তোমার কি প্ল্যান আছে দেখি।। আবার ইরাবতি বলে ওঠে, "কি ব্যাপার বলো তো তোমার, সবসময় কি মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি ঘোরাফেরা করে"? দুজনে গাড়ির দুই প্রান্তের দরজা দিয়ে গাড়িতে উঠে বসে।।

চালসা মোড় পেরিয়ে গাড়ি এবার বাতাবাড়ি পৌঁছে গেছে।। বিট্টু গাড়ি সাইড করে বললো "স্যার ইয়ে বাতাবাড়ি আ গ্যায়া, বলিয়ে কাঁহা জানা হ্যায়- বাঁয়ে কি ডাহিনা"? ইরাবতি বলে ওঠে, "তোমার কি এখানে অনেক দেরি হবে"? সত্যেন বলে, থাক দরকার নেই, ছেলেরা কাজ করছে, করুক, গেলে তোমার পরিচয় কি দেবো? ইরাবতি হাসতে হাসতে কটাক্ষের সুরে বলে, "স্যারের দৌড় শেষ হয়ে গেলো ? এই না সকাল পর্যন্ত হানিমুন করছিলে আমার সঙ্গে? আমার সঙ্গে হানিমুন করলে, অথচ পরিচয় দিতে এ্যতো কুন্ঠা কিসের"? সত্যেন বলে, আমার কোনো অসুবিধা নেই, ওদের সামনে তুমি এমবারাস্ট ফিল্ করবে নাতো? ইরাবতি হেসে বলে, "বিট্টু টাইম লস করোনা, এখানে সময় নষ্ট না করে গাড়ি স্টার্ট করো"।। জী ম্যাডাম-- গাড়ি এগিয়ে চলে।।

কিছুক্ষণ গাড়ি এগিয়ে চলার পর ইরাবতি সত্যেনের কোলে হাত রেখে বলে, "তুমি তো তোমার স্টাফদের সামনে ভয়ে কাঁটা হয়ে গেলে, দ্যাখো এবার তোমাকে আমি কোথায় নিয়ে যাই.... আমার কোনো দ্বিধা দ্বন্দ নেই"।। লজ্জিত, হতবাক সত্যেন প্রশ্ন করে, আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি? "হুঁ.. হুঁ, গেলেই বুঝতে পারবে, সারপ্রাইজ দেবো"।। উচ্ছল ইরাবতি হাসি মুখে জবাব দেয়।। তুমি প্লিজ বলোনা, আমরা কোথায় যাচ্ছি? উদ্বিগ্ন সত্যেন প্রশ্ন করে ইরাবতি কে।। এবার ইরাবতি একমুখ গর্ব নিয়ে হাসতে হাসতে সত্যেন কে বলে, "আমার মায়ের সঙ্গে তুমি আলাপ করতে যাচ্ছো"।। উচ্ছাসে সত্যেন বলে ওঠে, ও: ফ্যান্টাস্টিক।।

একটি বাজার দেখতে পেয়েই সত্যেন বিট্টুকে বলে, বিট্টু গাড়ি রোকো।। আপত্তি জানায় ইরাবতি।। বলে, "এই যে চায়ের নেশারু, আমার মা তোমাকে একবার কেন, পাঁচ বার চা খাওয়াবে।। এখন আর চা খেতে গিয়ে সময় নষ্ট করো না"।। সত্যেন উত্তর দেয়, ধ্যাৎ এই অজ পাড়া গাঁয়ে চা কে খেতে চাইছে? আমি কি খালি হাতে তোমার বাড়ি যাবো? কিছু কিনে নিয়ে যেতে হবে না? আর তাছাড়া আমার পায়ে মোজাও নেই।। শুধু জুতো।। তোমার বাড়ি যাবো।। পায়েতে মোজা ছাড়া যাওয়া যায় নাকি? "ঠিক আছে, ঠিক আছে, যা করবার তাড়াতাড়ি করো।। মনে রেখো তোমার ট্রেন ধরার আছে"।।

কিছুটা এগোতেই ইরাবতি বিট্টুকে নির্দেশ দেয়, বিট্টু সামনের ডান দিকে চলো।। এঁকে বেঁকে একবার বাঁয়ে একবার ডাইনে করে গাড়ি একসময় থেমে যায় ইরাবতির নির্দেশে।। দুজনে নেমে পড়ে গাড়ি থেকে।। ইরাবতি কে অনুসরন করে সত্যেন।। ইরাবতি বড় রাস্তা ছেড়ে একটি গলি রাস্তায় ঢুকে পড়ে।। কিছুটা গিয়েই টিনের পাঁচিল ঘেরা একটি বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে ইরাবতি।। ইরাবতি সত্যেনকে ডাকে, এ্যাই ভেতরে এসো।।

প্রায় এক ঘন্টা কাটিয়ে, পরিচয়, গল্প, খাওয়া, বাড়ির চতুর্দিকের সীমান্ত পর্যবেক্ষণ করে, একটি বেশ বড় কাঁঠাল গাছ দেখে ইরাবতির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে সত্যেন বলে, "আর কিছু লাগবে না, শুধু ঐ কাঁঠাল গাছ টি আমার ভাগের সম্পত্তি দখল হিসেবে আমার চাই"।। হেসে ইরাবতি বলে, পাগল কোথাকার, শুধু পাগলামো করা।। সত্যেন গম্ভীর হয়ে বলে, আমি কিন্তু সিরিয়াস কথা বলছি।। ওটার ভাগ আমি ছাড়বো না।। গরমকাল ভোর আমি কাঁঠাল খাবো আর শুয়ে বসে কাটাবো।। তুমি জানো কাঁঠাল কতো প্রোটিন, মিনারেলস্ আর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ? তার কথা শুনে ইরাবতির মা হেসে ওঠেন।। বলেন, "তুমি সত্যিই পাগল।। যাও, আজ থেকে ওই গাছ তোমার।। যা মুচি ধরেছে গাছে, কেউ আমরা হাত দেবো না।। পেকে কাঁঠাল হলে সব তুমি খাবে"।। উপস্থিত সকলে হো হো করে হেসে ওঠে।। সত্যেন বলে, জ্যৈষ্ঠ মাসে আমি সিওর চলে আসছি।।

প্রণাম পর্ব সেরে এবার ফেরার পালা।। এক ঘন্টারও কম সময়ে চলে এলো পাহাড়পুর মোড়।। এখানেই গাড়ি থেকে নেমে যাবে ইরাবতি।। নাগরাকাটা রিসর্টে বসে সত্যেন দেখে ছিলো ইরাবতির মোবাইল ফোন সমস্যা করছে।। ইরাবতির থেকে জেনেছিলো, ফোন টির যথেষ্ট বয়স হয়েছে।। এবার বদলের প্রয়োজন।। সত্যেনের পকেটে হাজার ছয়েক ক্যাশ টাকা ছিলো।। সত্যেন সেই টাকাটা ইরাবতিকে দিয়ে বললো, তুমি তোমার পছন্দ মতো একটি মোবাইল ফোন কিনে নিও।। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর পাঠিয়ে দেবে।। বাকি টাকা আমি এন.ই.এফ.টি করে পাঠিয়ে দেবো।। দ্বিধা নিয়ে ইরাবতি বললো, তুমি এ্যতোটা পথ যাবে, বিট্টুকে পেমেন্ট দিতে হবে।। হেসে সত্যেন বললো, এন.জি.পি. ষ্টেশনে এ.টি.এম. আছে।। তোমার চিন্তা করতে হবে না।।

পাহাড়পুর মোড়ে গাড়ি থেকে নেমে ইরাবতি আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেলো বাস, অটো, রিক্সা ধরবার জন্য অপেক্ষায় থাকা মানুষের ভিড়ে।। বিট্টু গাড়ি স্টার্ট করে দিয়েছে।। পেছনের কাঁচের ভিতর দিয়ে সত্যেন তাকিয়ে থাকে ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া ইরাবতিকে খুঁজে বার করতে।। বিট্টু গাড়ি নিয়ে এগিয়ে চলে এনজিপি ষ্টেশনের দিকে।।


চলবে..... 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন