বুধবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-৩৫) ।। পৃথিবীর উল্টো পিঠ— বিশ্বেশ্বর রায়।। Ankurisha ।।E.Magazine ।। Bengali poem in literature ।।

 




ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-৩৫)



পৃথিবীর উল্টো পিঠ
বিশ্বেশ্বর রায়

     বাবাইয়ের অফিস ছুটি থাকলেই বা শনি-রবি ছুটির দিনে আমাদের নিয়ে কোথাও না কোথাও বেড়াতে বেরোবেই। আজও আমরা এখানে একটা Nature Museum-এ গেলাম। সেখানে কয়েকটি জীবন্ত প্রাণী--যেমন প্রজাপতি ব্যাঙ সাপ গিরগিটি মাকড়সা আরশোলা টিকটিকি বোলতা মৌমাছি কচ্ছপ ইত্যাদি প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকা পতঙ্গ ও প্রাণী ছাড়াও ছিল ফসিল এবং স্টাফড প্রাণীর প্রায় জীবন্ত রূপ। তাদের মধ্যে বাজপাখি পেঁচা কাক মাছ ছাড়াও ছিল বিভিন্ন বিশাল বা ছোট গাছের সুচারুরূপে  কাটা কাণ্ডের অংশ। যার রেখাচক্র দেখে গাছটির বয়স নির্ধারণ করা যায়। তেমন একটি কাণ্ডের বয়স প্রায় দু'শো বছর বলে লেখা আছে দেখলাম। এরপর ওখানকার বনপথে (Trail) বেশ কিছুক্ষণ হেঁটে, ছবি তুলে আমরা গেলাম অন্য একটি পার্কে। এটিকে পার্ক না বলে খেলার মাঠ বলাই ভাল। বিশাল বিশাল দু'তিনটি ফুটবল মাঠ। তার মধ্যে দু'টিতে ম্যাচ চলছিল। খেলোয়াড়দের বেশিরভাগই দেখলাম হয় স্প্যানিশ নেপালি চীনা জাপানি বা কালো মানুষ। সাদা চামড়ার মানুষ প্রায় একজনও দেখলাম না। তারা রাগবি টেনিস বা অন্য খেলাই পছন্দ করে। একটি মাঠে দেখলাম এক দঙ্গল কুকুরকে ট্রেনিং দেওয়া চলছে। নানা কৌশল শেখানো হচ্ছে। কুকুরের মালিক বা মালকিন ছাড়াও মনে হল ট্রেনারও আছে। প্রতিটি মাঠ লোহার তার দিয়ে ঘেরা। আট-দশ ফুট অন্তর লোহার পিলার এবং তার সঙ্গে দশ ফুট উঁচু তারের জাল ঘেরা মাঠগুলোতে অল্প কিছু গ্যালারিরও ব্যবস্থা আছে। জানতে পারলাম অন লাইনে কোনও দল বা সংস্থা মাঠটি ভাড়া নেয় বা খেলার অনুমতি নিতে পারে। তবে মাঠে কোনও আবর্জনা ফেললে বা ভাঙচুর করলে ওই সংস্থাকে ভাল রকম জরিমানা গুনতে হয়। তবে বলতে দ্বিধা নেই--এখানে মাঠ নোংরা করার মানসিকতা কারও নেই। এখানকার প্রত্যেকটি মানুষ, ছোট-বড় নির্বিশেষে, এত বেশি পরিবেশ সচেতন যে, যেখানে সেখানে থুতু পর্যন্ত ফেলে না। প্রস্রাব বা পটি তো দূর অস্ত। আর এখানকার পার্ক বা মাঠের পাশে মাঝে মাঝেই ময়লা ফেলার ড্রাম বা ভ্যাট রাখা থাকে। আর থাকে প্রস্রাব বা পায়খানা করার অস্থায়ী মোটা প্লাস্টিকের ছোট ছোট খুপরি। যার মধ্যে লিক্যুইড সাবান, টয়লেট পেপার ইত্যাদি রাখা থাকে। খেলোয়াড় বা ভ্রমণকারী যে কেউ তা ব্যবহার করতে পারে। আর থাকে বহু সাইকেল। টাকা দিয়ে ঘন্টা হিসেবে যা ভাড়া নেওয়া যায় পার্কের মধ্যে সাইক্লিংয়ের জন্য। আর আগেই বলেছি এখানে আবালবৃদ্ধবনিতা প্রায় সকলেই কিছু না কিছু শারীরিক কসরৎ করছেই। কেউ হাঁটছে, কেউ জগিং করছে, কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ কুকুর নিয়ে হাঁটছে আবার কেউ খালি হাতে ব্যায়াম করছে। এছাড়া বাস্কেটবল, টেনিস, ফুটবল, ভলিবল, রাগবি ইত্যাদি খেলা তো আছেই। আর আছে স্কেট বোর্ডে হাঁটা বা দৌড়ানো এবং এক চাকার ছোট্ট স্কুটারে হাঁটা বা ছোটা। গোটা জাতিটাই যেন পার্কে শরীর চর্চায় মগ্ন। এখানে তো পার্কের ছড়াছড়ি। এছাড়াও রাস্তার পাশে ফুটপাথে স্কেট বা স্কুটার চালানোর পথ এবং বড় শহরে রাস্তার পাশে আলাদা সাইক্লিং এবং জগিং রোড আছে। এত স্বাস্থ্য সচেতনতা সত্বেও কিন্তু এদেশেই স্থুলকায় মানুষের সংখ্যা পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক। এবং এই স্থুলতা যেমন তেমন নয়। আমাদের দেশের গনেশ মার্কা ভুঁড়ি-সর্বস্ব নয়। হাত পা সর্বাঙ্গই বিপুল মোটা। আর এদের ওজন তিন থেকে চারশো পাউন্ড হামেশাই হয়। তবু ওই বিশাল বপু নিয়েও তারা দিব্বি কর্মক্ষম।


     এখানে আর একটা ব্যাপার খুব নজর কাড়ে। এখানে পুলিশের গাড়ি, ফায়ারব্রিগেডের গাড়ি এবং কিছু কিছু এমার্জেন্সি সার্ভিসের গাড়ি, যেমন অ্যাম্বুলেন্স ইত্যাদিতে লাল-নীল তীব্র আলো ঝিকমিক করে। চোখে ধাঁধা লাগায়। ওইসব গাড়ির অগ্রাধিকার পথ চলায়। শুধু তাই নয় এখানে Emergency signal-ও আছে ওইসব গাড়ির জন্য। আর রাস্তায় তিন/চারটে করে লেন থাকায় এসব গাড়িকে কখনও জ্যামে আটকে পড়তে হয় না। আর এটা নিশ্চিত করার জন্য এসব গাড়ির একটা নির্দিষ্ট লেন থাকে। সেই লেনেও অন্যান্য গাড়ি চলে। তবে পিছনে এমার্জেন্সি সার্ভিসের গাড়ি এলে তৎক্ষণাৎ সেটা ছেড়ে দিতে হয়। অন্যথায় ফাইন অনিবার্য। এসব গাড়ির সঙ্গে এখানে স্কুলবাসকেও এমার্জেন্সি সার্ভিসের মধ্যে গণ্য করে। স্কুলবাসের পিছনেও এখানে নীল আলো ব্লিঙ্ক করে। তবে এমার্জেন্সি সার্ভিস হলেও এখানে সবাই সিগন্যাল মেনে চলে। এমন কি লেন বদলের ক্ষেত্রেও পিছনের আলোর সিগন্যাল দিতে হয়। আমাদের দেশে যার বালাই নেই। যে যখন যেমন খুশি হুটহাট লেন বদল করে। আর অল্প যে দু'চারটি রাস্তায় সিঙ্গল লেন, সেখানে সবাই পর পর পিছনে পিছনে চলে। ওভারটেক করে না। পাশের উল্টোদিকের লেন যদি ফাঁকাও থাকে সেখান দিয়ে কেউ ওভারটেক করে না ভুলেও। আর লেন বিভাজনের চিহ্ন যদি  নিরবচ্ছিন্ন থাকে সেখানে তো ওভারটেক করাই বেআইনি। আর লোকালয়ের কাছে, মোড়ের মুখে বড় বড় করে লেখা থাকে STOP. সামনে যদি পাঁচশো মিটারও ফাঁকা থাকে তবু কেউ হু হু করে গাড়ি ছুটিয়ে যায় না। STOP লেখা জায়গায় অন্তত এক সেকেন্ডও থেমে তবে গতি বাড়ায়।  


এটা এখানকার ড্রাইভিংয়ের প্রাথমিক শর্ত। না মানলে ফাইনের ব্যবস্থা পাকা। আর একটি আইন আছে যা সবাই মেনে চলে। এখানে পার্কিং লটের মধ্যে দু'চারটি জায়গা প্রতিবন্ধীদের জন্য চিহ্নিত থাকে। সেখানে প্রতিবন্ধী ছাড়া অন্য কেউ  ভুলক্রমেও যদি গাড়ি পার্ক করে তাহলে সর্বাধিক দু'শো পঞ্চাশ ডলার ফাইন গুনতে হবে।
     আর একটা ব্যাপার এখানে বেশ নজর কাড়ে। এখানে প্লাস্টিকের ব্যবহার মনে হয় আমাদের দেশের থেকে অনেক বেশিই হয়। কারণ, দেখেছি ওয়ালমার্ট বা যেকোনো শপিং মলে বা সেন্টারে গিয়ে পনেরো/কুড়িটা আইটেম কিনলে পনেরো/কুড়িটা প্লাস্টিক ব্যাগে আলাদা আলাদাভাবে দেয়। একই ব্যাগে দু'তিন রকম জিনিস ঢুকিয়ে দেয় না। তবে এখানে এতো প্লাস্টিক ব্যবহার সত্বেও এখানকার কোনও জলনিকাশি নর্দমা, খাল বা রাস্তাঘাটে প্রায় কোথাও একটা প্লাস্টিক ব্যাগও পড়ে থাকতে দেখা যায় না। তার কারণ, এখানকার প্রতিটি নাগরিক পরিবেশ সচেতন এবং তাঁদের নাগরিক সচেতনতা এতটাই প্রখর যে, তাঁরা যেখানে সেখানে কোনও পলিব্যাগ বা প্লাস্টিকের কোনও জিনিস ফেলবেনই না। এখানে প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্ট, বাড়ি বা দোকান-মল-এর পাশে বা কাছাকাছি ময়লা ফেলার ড্রাম, ভ্যাট বা ট্র্যাস আছে। তার কোনোটাতে সাধারণ ময়লা, কোনোটাতে প্লাস্টিক ক্যান বা বোতল, কোনোটাতে পলিথিন বা কাগজের টুকরো ইত্যাদি ফেলার আলাদা আলাদা ব্যবস্থা আছে। এবং ওই প্লাস্টিক বা পলিথিন আমাদের দেশের মতো রাস্তাঘাট, মাঠ-ময়দান, খাল, জলা, পুকুর-নদীতে না ফেলার ফলে যেমন পরিবেশ দূষণ ঘটে না এবং সেগুলি সংগ্রহ করা এতো সহজ বলে সেগুলিকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা রিসাইক্লিং করাও এখানে অত্যন্ত সহজ। কিন্তু আমাদের দেশে এগুলো সংগ্রহ করে এক শ্রেণীর নিম্নতম আয়ের মানুষ। যদিও নর্দমা, খাল, পুকুর, নদী ইত্যাদি থেকে সংগ্রহ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে স্বল্প সময়েই ওগুলি ভরে ওঠে। খাল, নর্দমা, নদী তাদের নাব্যতা হারায়। ফলে অচিরেই  পরিবেশ দূষিত হয়ে নরক সৃষ্টি করে। সুতরাং এ ব্যাপারে নাগরিক সচেতনতাই বেশি জরুরি।


(চলবে) 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন