শনিবার, ১ মে, ২০২১

আজ প্রকাশিত হল - অঙ্কুরীশা-য় বহু প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব বাঙালির গর্ব সত্যজিৎ রায়-এর জন্মশতবর্ষে কবিতা সংখ্যা-য় শ্রদ্ধাঞ্জলি।।

 






সত্যজিৎ রায়  কবিতা সংখ্যা 


সম্পাদকীয় ✍️✍️
"Here is God's Plenty." — সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে এই উক্তিটি সার্থক। সত্যজিৎ রায়  এযুগের পরম বিস্ময়। তিনি বাংলা  সাহিত্য  ও চলচ্চিত্র জগতের প্রবাদপুরুষ।বাংলা  চলচ্চিত্রের বিপুল সম্ভাবনার   দ্বার যেমন তিনি খুলে  দিয়েছেন, তেমনই বাংলা সাহিত্যকেও সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁরই  জন্ম শতবর্ষে আবার  নতুনভাবে তাঁর  শিল্পকর্ম ও ব্যক্তিত্বের মূল্যায়ন হবে পরবর্তী  প্রজন্মের কাছে।তাই তাঁর  এই জন্মশতবর্ষে 'অঙ্কুরীশা' -য় যাঁরা  কবিতায় শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছেন, তাঁদের  সকলকে 'অঙ্কুরীশা' পত্রিকা থেকে জানাই সাদর আমন্ত্রণ। 









কলমে-

দীপ মুখোপাধ্যায় 
আরণ্যক বসু 
বীথি চট্টোপাধ্যায় 
গৌতম হাজরা 
সৌহার্দ্য সিরাজ 
মুক্তি দাশ 
দীনেশ সরকার 
তপনজ্যোতি মাজি 
জগদীশ মণ্ডল 
ফটিক চৌধুরী 
দেবাশীষ মুখোপাধ্যায় 
অমিত কাশ্যপ 
দুরন্ত বিজলী 
গোবিন্দ মোদক
শাওন ব্যানার্জি 
নন্দিনী  মান্না
অশোক রায় 
রাজেশ কান্তি  দাশ 
সাত্যকি
জয়শ্রী সরকার 
বিমল মণ্ডল 











সত্যজিৎ
দীপ মুখোপাধ্যায়


আমার মনের অলিন্দে রোজ সত্যজিৎ
চিনিয়েছিল এক প্রোফেসর শঙ্কুকে
দুর্গা-অপুর বন্ধু বলে এই সেদিন
লজেন্স দিলেন পাশের বাড়ির বঙ্কুকে।

সব ব্যাপারেই ফালতু কেন অবিশ্বাস?
জিগরি আমি মুকুল এবং তপসেদার
ফেলুদা রোজ বাগবাজারে চপ খাওয়ায়
আড্ডা মারি কলেজস্ট্রিটে শুক্রবার।

ভূতের রাজার বর রয়েছে হয়তো বা
গুপী-বাঘাও করবে দেখা আজ রাতে
হীরকরাজার দেশ গিয়েছি প্রায়দিনই
জটায়ুদার গল্প পড়ি মাঝ রাতে।

অনেক কথা বলার আছে,তারপরেও
মাতিয়ে গেলেন ফুল ফোটানোর ছন্দে সে
মেঘের গায়ে আঁকনবাঁকন যেই ফোটে
পাতায় পাতায় লুকিয়ে পড়েন সন্দেশ-এ।





ও  স্বপ্ন! 
আরণ্যক  বসু


(সে  পথের  বিচিত্র  আনন্দ-যাত্রার  অদৃশ্য  তিলক   তোমার  ললাটে  পরিয়েই  তো  তোমায়  ঘরছাড়া  ক'রে  এনেছি...চল  এগিয়ে  যাই
পথের  পাঁচালী/ বিভূতিভূষণ )

পথের পাঁচালী  দেখতে  এসেছেন রবীন্দ্রনাথ  ও বিভূতিভূষণ ।
ছবি  শেষের  অনেকক্ষণ  পরেও  স্তব্ধ  বসে  আছেন  তাঁরা ।
একসময়  মৃদু কণ্ঠে  বললেন  বিশ্বকবি- --  বিভূতি, তোমার উপন্যাসটা  আমাকে  দেবে? তুমি  বরং  ওটা  সঙ্গে  নিয়েই  এসো  আগামী  বাইশে  শ্রাবণ,  আমি  সত্যজিৎকেও  আসতে  বলবো। তোমরা  দুজনে  অনেক  চারাগাছ   রোপণ কোরো  শান্তিনিকেতনের  মাটিতে ।
আহা,তোমার  উপন্যাস  যেমন,তেমনি  আশ্চর্য  সুন্দর 
সত্যজিতের  ছায়াছবি— যেন মহাকাব্য! 

বিভূতিভূষণের  চোখে  জল, সত্যজিৎ রায়  মাথা  নত  করে শুনছেন  গুরুদেবের  অমৃত  বাণী ।
বাতাসে  ভাঁটফুল, গুলঞ্চলতা,বনতুলসীর  সুবাস,ভালোবাসা,  
দূরে  মোহরকুঞ্জে  বসে কণিকা  গাইছেন---দূরে  কোথায়,  দূরে  দূরে...
 

তিনজন  বিশ্বপথিক  হাতে  হাত  রেখে  পথে  নামলেন।
                
                           
(সত্যি  বলছি, আজ ভোরে  এই স্বপ্নটা দেখলাম) 
জন্মদিনের প্রণাম 






অপরাজিত 
বীথি চট্টোপাধ্যায়

পিছনে ক্যামেরা
সামনে দাঁড়িয়ে লম্বা একটা লোক
এদেশে এমন ছবি হতে পারে 
জানতোনা দর্শক! 

বাবা রেখে যান আবোলতাবোল 
ছোটবেলা কেটে যায় 
চালানো কঠিন; রোজগার শুধু 
মায়ের অল্প আয়। 

সামনে ক্যামেরা 
পিছনে দাঁড়িয়ে লম্বা একটা লোক
টিকিট কেটে কি 
ছবিটা দেখবে এদেশের দর্শক?

যদিবা দেখেও ছবি বানাবার 
টাকা পাবে কোথা থেকে?
কাশফুল পাশে ট্রেন চলে যায় 
হাওয়ায় নিশান রেখে...

পরাধীন দেশে প্রথম চাকরি
সাহেবের কোম্পানি 
কালো লোক তাই মাইনেও কম 
শেষটা সবাই জানি। 

সিগনেট প্রেসে একটু জায়গা
শুরু সেইখান থেকে
সিনেমার কথা মাথায় এসেছে
আগে কিছু ছবি এঁকে।

ক্যামেরার পাশে 
গল্পগুচ্ছ নিরবে দাঁড়িয়ে অাছে
কাশফুল তাকে স্যালুট করল 
রেল লাইনের কাছে।






সহজ কথা সরল কথা
গৌতম হাজরা

সহজ কথা সরল কথা
এক যে ছিল রাজা, 
মহারাজ ,তোমায় সেলাম
বাঘাদা বাজনা বাজা।

গুপীর গলায় উঠলো সুর
আহা রে সে কি মধুর, 
'দেখ রে নয়ন মেলে'--
গান যে ভাসে বহুদূর। 

গানের সুরে যাচ্ছি মোরা
হীরক রাজার দেশ, 
সহজ কথা সরল কথা
আহা রে বেশ বেশ। 

সুরে সুরে ভরিয়ে দিল
সময় যে খানখান
সহজ কথা সরল কথা
সত্যজিতের গান। 






গণদেবতার আসন
সৌহার্দ সিরাজ


সেই যে আমাদের চিনিয়ে দিয়ে গেলে
 হীরক রাজার দেশ
সেই থেকে আর আমাদের আর ভালো ঘুম হলো না,
রাস্তার দিকে তাকালেই ইতিহাসের নিত্য নতুন মডেল
সামনে এসে চোখ ধাঁধিঁয়ে দেয়
আর তোমার গণদেবতার আসন স্থায়ী হয়ে যায়!

যতদূর চোখ যায় সীমানা পেরিয়ে
দরজা খুলে ভোরের বাতাস আসে;ভাবনা আসে
কী খেলা ছিল ভেতরে তোমার বিভূতি আলোর রেখায়
অপু-দুর্গার চিরন্তনের পাঁচালী!
বিমুগ্ধ পৃথিবী তোমায় সোনার শিরোপা পরায়!
শ্রদ্ধায় প্রশংসায় নুয়ে পড়ে বিদ্যোৎসমাজ !

চিন্তার এত সুক্ষ্মতা পেলে কোথায় কীর্তিমান !
পাহাড় দেখে কমলকুমার এ জন্য হেসে উঠেছিলেন!
ফ্রাঁসোয়া মিতেরা অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়েছিলেন!

বর্ষা আসে বসন্ত যায়
চারুলতার চুলের ঘ্রাণ এখনও আগের মতোই
চিত্ত বৈভবে অরুণ আকাশ!
সোনার কেল্লায় সোনার ছেলে তোমার আসন চিরদিনের।





প্রণাম সত্যজিৎ
মুক্তি দাশ

ব্যক্তিত্বের মতোই তোমার
শালপ্রাংশু চেহারা,
কোথা পেলে তুমি এমন বিশাল
বিশ্ববিরল প্রতিভা!
পৃথিবী আজকে বিস্ময়ে আর
আনন্দে হলো যে হারা-
‘ভারতরত্ন’ পেলে কি না পেলে,
এমন কী তাতে ক্ষতি বা!

অপু কি তোমার মানসপুত্র?
প্রকৃতির ছোঁয়া লাগা-
বঞ্চনা আর শোষণের জ্বালা
করেছিল অনুভব সে।
তারই বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে
এলো নাকি গুপী-বাঘা?
সমাজের ক্ষত নিরাময় বুঝি
করবে ফেলুদা-তোপসে!

তোমার স্পর্শে বাড়-বাড়ন্ত
সাহিত্য-কলা-শিল্পের,
তোমার স্পর্শে পাকা ও পোক্ত
হলো নড়বড়ে ভিত-
জীবনের ছবি ছায়াছবিতেই
খুঁজে পেলো তার মিল ফের-
সত্যই জয়ী, অস্কার জয়ী,
প্রণাম সত্যজিৎ!






শতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি
দীনেশ সরকার


'পথের পাঁচালি' যতবার দেখি
গাঁয়ের পথে যাই হারিয়ে,
অপু-দুর্গাকে আজও খুঁজে পাই
লাইনের ধারে দাঁড়িয়ে ।

গুপী-বাঘাও সুযোগের আশায়
পথে পথে ঘুরে মরে,
ভাগ্যের চাকাটা যদি ঘুরে যায়
কোনো এক ভূতের বরে ।

মুগ্ধ করেছো, সৃষ্টি করেছো
সিনেমা যত কালজয়ী,
সেরার সেরা বিবেচিত আজও
অপুর সিনেমাত্রয়ী ।

বাংলা সিনেমা তোমার হাত ধরে
বিশ্বমাঝে পেয়েছে ঠাঁই,
'অস্কার' পাওয়া যে তারই স্বীকৃতি
দিয়েছে যোগ্য সম্মানটাই ।

তোমার ফেলুদা আজও মন কাঁড়ে,
মন কাঁড়ে তোমার গানের সু্‌র,
শতবর্ষেও সৃষ্টিতে অমর
রেখেছি তোমায় হৃদয়পুর ।






নির্জন ভাষ্যকার
তপনজ্যোতি মাজি

হাজার মানুষের ভিড়েও তিনি একা। স্বতন্ত্র।
বুদ্ধির দীপ্তি নিয়ন আলোর মতো বৃত্তাকারে ছড়িয়ে পড়েছে
মেলাপ্রাঙ্গনে।
উৎসুক দৃষ্টি , অটোগ্রাফ সঞ্চয়ীদের ভিড় এড়িয়ে তিনি ,
যেন চলমান মাউন্ট কিলিমানজারো , গম্ভীর অথচ 
বাঙময়।

কি খুঁজছেন তিনি সামনে ঝুঁকে? রবীন্দ্রনাথ যেমন কোপাইয়ের 
শীর্ণস্রোতে খুঁজতেন সূর্যাস্তের সন্যাসী রঙ ,
তিনি খুঁজছেন প্রিয় বই।
দেখছেন তাঁর বেস্ট সেলার গোয়েন্দা উপন্যাসগুলো বারো থেকে
বাষট্টির ঝোলাভর্তি হয়ে চলে যাচ্ছে ড্রয়িং রুমের বুকশেল্ফে কিংবা
কিশোরীর বিছানায় বালিশের পাশে।

চারমিনারে অভ্যস্ত তাঁর ধোঁয়ারঙ ওষ্ঠে দ্বিতীয়ার চাঁদের মতো
লাজুক হাসি ছড়িয়ে পড়লো অলক্ষ্যে।
সব রহস্যের সমাধান জেনেও তিনি জানতেন
সব জানার সেরা জানা বাকসংযম।

খেরোর খাতার পাতায় আজ সন্ধ্যায়
কি লিখবেন তিনি !
সময়ের নির্জন ভাষ্যকার।






ভাবনায় সত‍্যজিৎ রায়
জগদীশ মন্ডল

খেলনা ছিলো চাবি পটকা ক‍্যামেরাও ভাবনায়
স্টিরিওস্কোপ যন্ত্রে অবাক করলেন সত্যজিৎ রায়,
মানিক নামে চিনি তাঁকে ভ্রমণ,গল্প,গান
'পথের পাঁচালী' প্রযোজনা শ্রেষ্ঠ অবদান।

'গুপি গাইন বাঘা বাইন''হীরক রাজার দেশে'
মজার ছবি ভীড় জমায় শিশুর মনে এসে,
'কাঞ্চনজঙ্ঘা' 'সোনার কেল্লা'জাগায় শিহরণ
সায়েন্স ফিকশন,গো্য়েন্দারা ভাবায় সারাক্ষণ।

'ফেলুদা' 'প্রফেসর শঙ্কু' 'ফটিকচাঁদ'এ গল্প
'যখন ছোট ছিলাম' গ্ৰন্থ পাওনাটা নয় অল্প,
নকশাআঁকা,বইয়ের প্রচ্ছদ,ছবির সাথে সক্ষ
উপন্যাস,অনুবাদ, কথা সম্পাদনায় দক্ষ।

অসামান্য ছায়াছবি জিতে নিলেন অস্কার
ভারতরত্ন,বিদ‍্যাসাগর,আনন্দ পুরষ্কার,
এমন সোনার ছেলে আবার আসুক ঘরের মাঝে
তারার মতো উঠবে জ্বলে লাগবে দেশের কাজে




বটগাছ
ফটিক চৌধুরী

আমার মামাবাড়িতে ছিল এক দীর্ঘকায় বটবৃক্ষ
সে যেন আগলে রেখেছিল একান্নবর্তী পরিবার
গ্রীষ্মে তার স্নিগ্ধ ছায়া ছিল সবার আশ্রয়।

এমনি এক গ্রীষ্মদিনে যার লৌকিক আবির্ভাবে
শিল্পকলার সবদিক হয়েছে আলোকিত,
যার সুনিবিড় ছায়ায় আমরা স্নিগ্ধ হই।

'পথের পাঁচালী' চিনিয়েছে ভারতীয় ছায়াছবি
কান চলচ্চিত্র উৎসবে, আরো কতশত
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনেছে তোমার সৃষ্টি।

শিশু কিশোরদের মন ভরিয়ে দিয়েছ সিরিয়াস 
হিউমারে আর রহস্যময়তায় টানটান থাকি
ফেলুদা, তোপসে,জটায়ু,শঙ্কু ও সেরা 'সন্দেশ'এ।

সুনিপুণ রেখায় মর্যাদা পেয়েছে কত বইয়ের
প্রচ্ছদ, 'কলা ভবনে' আড়াই বছরে যার উত্তরণ।
তোমার ছিল কত নিবিড় নিষ্ঠা ও মহান ব্যক্তিত্ব।

ছন্নছাড়া মামাবাড়ির একান্নবর্তী পরিবার আজ
নেই, নেই সেই বটগাছও। যেমন রবীন্দ্রনাথের
পর তুমিই ছিলে বঙ্গ সংস্কৃতির শেষ কর্ণধার।





এসো বারে বারে
দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়

ক্যামেরায় আলোর ঝিলিক
তোমার মহাকাব্য শুরু
পথের পাঁচালী কখন যেন
আর এক সংগ্রামের গুরু
তোমার চরিত্ররা আমাদেরই 
হাড় মাংস নিয়ে হাজির
প্রেমে অপ্রেমে সুখে দুঃখে                              
যেন ফুলগুলো সব সাজির


অপত্য করুণ রাগিনী হলে
  অপুর দুঃখ জাগে প্রাণে 
ক্যামেরায় আঁকা সব ছবি
সাজিয়েছে আমাদের গহীনে 
ভূতের রাজার বরে নড়ে ওঠে ছেলেবেলা
 মহিলাদের সুখ দুখ তুলির আঁচড়ে মেলা

অরণ্য দামাল দস্যিপনার সুখে 
যেন আয়না  সভ্যতার মুখে
পান্ডিত্যের অভিলাষ ফেলুদার মগজাস্ত্রে
প্রফেসর শঙ্কু প্রতিবেশী সুখে
বারে বারে জন্ম তোমার তোমারই মাঝে
হে প্রিয়মুখ মনদেউলে আনন্দ শঙ্খ বাজে


প্রণাম সত্যজিৎ
অমিত কাশ‍্যপ

'আজ কী আনন্দ আকাশে বাতাসে'
সত্যি আজও সেই আনন্দের রেশ
আকাশে বাতাসে সত্যজিতের ছোঁয়ায় 
কলমে অঙ্কনে সাদা-কালো ছবি থেকে 
বর্ণাঢ্য পর্দায় আভিজাত্য অভিব‍্যক্তিত্বে
মূর্ত হয়ে ওঠেন প্রতিদিন প্রতিনিয়ত 
আমাদের প্রিয় মানুষ চলচ্চিত্রের সত্যজিৎ রায়

পথের পাঁচালী থেকে যে পথ বেরিয়েছিল
সেই পথ অন্য পথের মুখে এসে দাঁড়ায়
বাঁকবদল আরও বাকঁবদল হতে হতে 
ইতিহাস, সোনালী ইতিহাসের অধ‍্যায় খুলে যেতে থাকে 
কত কী তো ঘটে যায়, ঘটনার  ঘনঘটায়
মলিন হয়, সময়ের জালে জড়িয়ে যায় 
সময়ই বলে দেয় আবার সেই কথা 
প্রিয় মানুষ সত্যজিৎ, আপনাকে সশ্রদ্ধ প্রণাম




জীবনের জলবায়ু
দুরন্ত বিজলী


জল গড়িয়ে যায় গঙ্গায়,
স্রোতোপথে ভেসে ওঠে মুখ।
অশনিসংকেত বেদনার চিহ্নগুলি
ফুটে ওঠে সেলুলয়েডের পর্দায়,
তিনি ইতিহাস রচনা করে কিংবদন্তির
পাতায় নিজেই ছবি হয়ে ইতিহাসে
স্বর্ণময় হয়ে যান।

সত্য সন্ধানের প্রয়াসে তিনি লেখনীর
সুকৌশলে প্রতিষ্ঠা করেন সত‍্যকে।
শিশুকিশোরমনে গড়ে তোলেন
সত‍্যের প্রতি অনুরাগ।

তাঁর তুলিতে অনবদ্য ভাষা ফুটে ওঠে,
তিনি সমাজকে আলোয় তুলে আনেন,
তিনি শিশুকিশোরের মনে স্বপ্ন সাজিয়ে দেন।

তাঁর এই বহুমুখী ধারায় যে কথাটি বারবার
মঞ্জরিত হয়, তা হল জনমানসে পৌঁছে দেওয়া
সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবার কুসংস্কার বিরোধী বার্তা,
বেঁচে থাকার জলবায়ু।



সত্যজিৎ রায়কে প্রণাম।
গোবিন্দ মোদক 

ক্যামেরার যে নিজস্ব ভাষা আছে তা দেখালেন যিনি, 
তাঁকে আমরা বিশ্ববরেণ্য সত্যজিৎ রায় নামেই চিনি ।
চলচ্চিত্র জগতের প্রবাদপুরুষ সত্যজিৎ রায়, 
তাঁর প্রচেষ্টায় ভারতীয় চলচ্চিত্র ভিন্ন মাত্রা পায় ।
সাহিত্যিক সুকুমার রায়ের তিনি সুযোগ্য সন্তান, 
শুভক্ষণে মাতা সুপ্রভা তাঁকে কোলে পান । 
বিবিধ বিষয়েই তাঁর ছিল অসাধারণ দক্ষতা, 
তবে কিন্তু ক্যামেরার সঙ্গেই তাঁর বেশি সখ্যতা। 
পথের পাঁচালী,  অপরাজিত,  অপুর সংসার, 
চলচ্চিত্র জগতকে দিলেন তিনি ভিন্ন উপহার । 
গুপী গাইন বাঘা বাইন, হীরক রাজার দেশে, 
সোনার কেল্লা, জয় বাবা ফেলুনাথ--গোয়েন্দার বেশে।
অস্কার পেয়েছেন, ভারতরত্ন তাঁরই গলায় সাজে, 
পাশাপাশি লেখনী তাঁর সাহিত্য সেবার কাজে ।
ফেলুদা আর শঙ্কু তাঁর অবিস্মরণীয় সৃষ্টি, 
গোয়েন্দাকে গড়লেন তিনি দিয়ে ভিন্ন দৃষ্টি ।
পত্রিকা প্রকাশ, সাহিত্য রচনা, ছবি আঁকা, গান, 
নব নব সৃজনশীলতায় ভরপুর তাঁর প্রাণ।
মহান স্রষ্টা সত্যজিৎ রায়কে কুর্নিশ জানাই,
দেশ ও জাতিকে যা দিয়ে গেলেন তুলনা তার নাই।।




আজও দেখা হয়
শাওন ব্যানার্জী



দূরপাল্লার ট্রেনে চাপলেই
দেখা হয়ে যায় নায়ক আরিন্দম-দার সাথে ।
গরম কফির কাপে একটু আড্ডা
আধুনিক সিনেমা নিয়ে ।

দার্জিলিং-এর ম‍্যালে কাকার সাথে
মর্নিং ওয়ার্ক-এ ব্যস্ত অশোক ।
পাশেই রায়বাহাদুর ইন্দ্রানাথ চৌধুরী
সপরিবারে দেখছে কাঞ্চনজঙ্ঘা।

ডাক্তার অশোক গুপ্তদের
কি আজও দেখা যায় ?
যে কোনো শহরে বা মফসলে
তাঁরা তো গণশত্রু।

হীরক রাজার দেশে 
উদয়ন পন্ডিতরা আজও লুকিয়ে থাকে
বিরিঞ্চি বাবা আজ সত্যি মহাপুরুষ
শুধু সাধারণ মানুষ খুঁজে বেড়ায় পরশ পাথর।।





ক্ষণজন্মা চলচ্চিত্রকার
নন্দিনী মান্না

অটোগ্রাফ নেওয়ার শখে,
কবিগুরু কে প্রথম দেখে,
স্বপ্ন পূরণের জন্য দ্বার খুলে,
উপস্থিত কবির চরণ তলে,
সঙ্গে ছিলেন সুপ্রভা মাতা,
অটোগ্রাফের বেগুনি খাতা।

ফরাসি চলচ্চিত্রকার জঁ রেনোর,
সহকারি হিসাবে হাতে খড়ি ,
ইতালিয় বাস্তবতাবাদী ছবি,
'বাইসাইকেল থিভস',
উদ্বুদ্ধতার ভিত্তি চিত্তের,
পথের পাঁচালী তৈরিতে।

চলচ্চিত্রের দৃশ্যে দৃশ্যে,
প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্যায়ন,
কখনো সৃষ্টি ছটায় ফেলুদা,
ঘরোয়া জীবনের ঘনঘটা,
'অপরাজিত' চলচ্চিত্রের জন্য,
"গোল্ডেন লায়ন" সম্মান অনন্য।

চলচ্চিত্রে প্রথম অস্কারজয়ী বঙ্গসন্তান,
শতবর্ষের আলোয় ক্ষণজন্মা স্মরণ,
সমস্ত সৃষ্টির জন্য জানাই সেলাম,
সৃষ্টির স্রষ্টার জন্য শ্রদ্ধার প্রণাম।।




মণি-মাণিকের শতবর্ষ

অশোক রায় 



দেখেছি অনেক সিনেমা জীবনভোর

কিছু রেশ রেখে গেছে

কতিপয় দাগ এখনও অনেক গভীর

সেলুলয়েডে আঁকা সত্য-চিত্র-সাহিত্য

কালজয়ী কিছু অনুপম চালচিত্র

বিশ্বের দরবারে রেখেছে স্বাক্ষর

কান্‌-বার্লিন-পারী-অস্কার করে জয়।

বিশপ লেফ্রয়ের ছোট্ট পরিসর

মহাতীর্থ মহাসৃষ্টির আঁতুরঘর

ভাবতে বসে অনেক কথা

শতবর্ষে মনের আকাশে নিরাশার ঘনঘটা

হয়তো আরো পাবার ছিল তাঁর কাছে

বলেছিলেন যাবার আগে রয়ে গেল অনেক বাকি

ফেলুনাথের মগজাস্ত্র লালমোহন-তোপসের বিস্ময়  

রুপোলি পর্দায় জীবন-রহস্যের নতুন পরিচয়   

পদ্মপাতায় ক্ষণিকের জল টলমল

প্রজন্মের দল ভুখাই রয়ে গেল

আরেকটা মাণিকদা পাওয়া হল না আর ।।

                             


অম্লান
রাজেশ কান্তি দাশ

গ্রীষ্মের এ তাপদাহে
তুমি হাঁটছো ছবির মতো আমার সামনে শীতল ছায়াবীথিতে
ঝরাপাতার ভিতর;
পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কলকল নদী পাখির পালকের মতো উড়ছে
এখনও দেখি এই কলকল শব্দের ভিতর সেই আলাপিত অপু, দূর্গা
মলিনতাহীন আবির বাতাসে ঝকমকে মার্বেল পাথরের মতো
নতুন রূপে নব ভাবনায় প্রজাপতি রঙে তোমার মূর্তির সামনে
ঝলমল করছে অমলিন অক্লেশে;
বরণে বরণে তোমার মননদীপ কালের সাক্ষী হয়ে আছে
রঙ, তুলির সম্মিলনে শিল্পচিন্তার মলিনতা শুদ্ধির।
এবং গাঢ় দুপুরের মতো
কিছু বিবশ বর্ণমালা থেকে মনখারাপের শব্দগুলি বেরিয়ে গেছে
সত্যজিৎ, তোমার হাত ধরে
যেভাবে ভেবেছিল একদিন এ বঙ্গ সভ্যতা ঠিক সেরকম।
পুরোনো অন্ধকার ঝেড়ে ফেলেছে এ সায়াহ্ন।
অজস্র আগুনের হলকা গলিয়ে
আমার আটপৌরে হাতে তোমার আলেখ্য আজও খুঁজি
খুঁজি তোমার সেই সকাল, দুপুর কিংবা বিকাল
আমার সামনে যে গাছ, পাখি, নদী-নালা, পাহাড় আছে
তার ভিতর
খুঁজে যাব এরকম-ই আলোহীন আলোতে অগণিত কাল।



আগন্তুক 
সাত্যকি


আকাশের গায়ে লেপটে গিয়ে বিদ্যুৎ 
                             যেভাবে ফাটল আঁকে 
তেমনই ফাটলে ফাটলে ঢাকছে 
                                              শরীর
অরণ্য খুঁজছে এই হাত 

মাথার চুলের নিচে 
অদ্ভুত এক অন্ধকার 
ছায়া শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে দিন 
বিরামহীন রাত্রির হাতছানি 

তবুও,অপেক্ষা থাকে তীব্র মাঠ 
আলুলায়িত ছায়াশীতল ঘাস 
আর উৎস সুখের গায়ে ঠেস দিয়ে আগন্তুক 

যার ছন্দবদ্ধ হাত অরণ্য ডেকে আনে 
ঘিরে ধরে মাদল আর প্রাচীন সাঁওতাল নাচ। 





শ্রদ্ধাঞ্জলি
জয়শ্রী সরকার
   
ভিন্ন ধারার শিল্পী তুমি , তুমি তো সত্যজিৎ ,স্বপ্নেই ছিল মানবোত্থান ---মানবাত্মারই হিত ।
দুর্লভ ছিল শিল্পী-সত্তা , সবকিছুতেই সেরা
সৃষ্টিকর্মে মুগ্ধ সবাই---সূক্ষ্ম-দৃষ্টি ঘেরা !

'অপু-দুর্গা'র সেই পথচলা রেলের ধোঁয়া দেখে ,
সেই আমিকেই খুঁজে পাই আজ স্মৃতির গন্ধ মেখে।
এক এক করে সব ছবিতেই বাংলা ভাগের প্রভাব
চিত্রগুলোই জ্বলজ্যান্ত---মেলোড্রামার অভাব !

'গুপী-বাঘা' আর 'ফেলুদা'---তোমার অমর সৃষ্টি
বিস্ময় নিয়ে মন বলে তাই ধন্য তোমার কৃষ্টি ।
'পরশপাথর' ফ্যান্টাসি নয়---স্বপ্নই ছিল লক্ষ্য ,
মানবজীবন স্বপ্নমেদুর---স্বপ্নের সাথে সখ্য !

'তিনকন্যা'-য় বাঙালির ছবি আজো জ্বলজ্বল করে
আশাব্যঞ্জক সেইসব রূপই বাংলার ঘরে ঘরে।
'নষ্টনীড়' আর 'চারুলতা'---এক দেহে দুই গাঁথা
পরম যত্নে তোমার সৃজন---অপার সার্থকতা !

'সদগতি' থেকে 'আগন্ত্তুক'---বোধেরই অবক্ষয় ,
মুখোশধারী মানুষগুলোর মুখেতেই বরাভয়।
চোখের আলোয় দেখে যাই তাই তোমার সৃষ্টিকর্ম
 শ্রদ্ধা এবং অঞ্জলিতে খুঁজছি তোমার মর্ম !




উজ্জ্বল পথিক
বিমল মণ্ডল 

আকাশের বাতিগুলো শেষ রাত অবধি 
হীরক রাজার দেশে- র চূড়ায় চুড়ায়
কোটি কোটি মানবের হাত - সোনার কেল্লায়

আমার ভালো লাগার সিঁড়ি ভেঙে জলসাঘরে
তুমি হেঁটে যাচ্ছ ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি হাতে
সুদূর মহানগরের পথে। 

অগণিত নক্ষত্রের  মতো  জ্বলে আছো
আমার চেতনায়  চেতনায় 
এখনও  সেই ছোট্ট  অপুতে...












                                                      


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন