মঙ্গলবার, ১১ মে, ২০২১

আজ ১২ই মে ।। আন্তর্জাতিক নার্স দিবস।। জনস্বাস্থ্যের প্রথম দিশারীঃ ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলঃ শ্রদ্ধা ও স্মরণে - নন্দিনী মান্না।। Ankurisha ।।E.Magazine ।।Bengali poem in literature ।।

 






আজ ১২ই মে

আন্তর্জাতিক নার্স দিবস: 



জনস্বাস্থ্যের প্রথম দিশারীঃ  ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল

শ্রদ্ধা ও স্মরণে - নন্দিনী মান্না 

  


 স্বামী বিবেকানন্দের কথায়---" জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর"। আধ্যাত্মিক বাণীর মুর্ত প্রতীকী রূপে, ঈশ্বরের হাতের ছোট্ট পেন্সিল দিয়ে মানবসমাজের নতুন পথের রূপ দান করেন। আশ্চর্য প্রদীপের শিখার মতো হয়ে উঠেছিলেন, আধুনিক নার্সিং পদ্ধতির দিকবর্তিকা, প্রবক্তা, লেখিকাও পরিসংখ্যানবিদ রূপে। এই মহীয়সী নারী ছিলেন ও আছেন শপথ ও শৃঙ্খলা  নিয়ামক রূপে, সেবিকা জাতির মানস সরোবরে - বরণীয়া নাম "ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল"।


        আঠারোশো কুড়ি সালের ১২ই মে প্রথম প্রকৃতির আলো দেখেন। ফ্রান্সের ফ্লোরেন্স শহরে ছিল পারিবারিক বসতি। বাবা ছিলেন উইলিয়াম এডওয়ার্ড নাইটিঙ্গেল এবং মা ছিলেন রত্নগর্ভা ফ্রান্সিস। চরম মানবদরদি ও  লোক হিতৈষী ছিলেন ছোটবেলা থেকেই। বাবার জমিদারি ছিল। সেই জমিদারি এলাকায় গরিব দুঃখী ও অসুস্থদের সেবায় আগ্রহী ভূমিকা পালন করতেন।তখনকার দিনে সমাজে নারী শিক্ষা ও অবাধ নারী স্বাধীনতা তেমনভাবে ছিলনা। ১৬ বছর বয়স, স্রষ্টার দৈবাদেশ ও নিজ একান্ত ইচ্ছার কথা মা-বাবাকে জানান। ফলে সমাজ ও পরিবার থেকে প্রচুর বাধা-নিষেধের মুখে পড়েন। তখন এই পেশাকে খুবই নিচু নজরে দেখা হতো। তিনি সমসাময়িক সামাজিক নিয়মকানুন, রীতি ও সংস্কারকে উপলব্ধি করে দারুণ অবাক হন। নিয়তির ডাকে ১৭ বছর বয়সে পারিবারিক ও সামাজিক সব বিরোধিতা কে জয় করেন। তিনি আদর্শ  কর্মযোগী বেশে অনন্ত পরিকল্পনায় ব্রতী হয়েছিলেন ।


১৮৪৪ সালে ২৪ বছর বয়সে তিনি জার্মানি যান।সেখানে সেবিকার ছাত্রী হিসাবে প্রশিক্ষণ নিলেন। ১৮৫০ সালে প্রশিক্ষণের কাজ শেষ করে লন্ডনের এক  হাসপাতালে সেবিকার কাজ  নেন। পরের বছর প্রগাঢ়  নিষ্ঠা ও দক্ষতা পূর্ণ কাজের জন্য সুপারিনটেনডেন্ট পদে উন্নীত হন। সেই সময় কলেরা মহামারী দেখা দেয়। তিনি মেধা, শ্রম, দক্ষতা ও সেবার দ্বারা সঠিক সময়ে সঠিক উপায়ে মহামারীর মোকাবিলা করেন। তিনি উপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধির মাধ্যমে মৃত্যুহার অনেকখানি কমিয়ে আনেন। তিনি নবীনতার ও আধুনিক পদ্ধতির মানোন্নয়নে অদম্য জেদ ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। পীড়িতদের সেবা করাই ছিল তাঁর জীবনের মহান ব্রত ।


কালের অমোঘ নিয়মে ১৮৫৪ সাল উপস্থিত হয়। এই সময়ে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ শুরু হয়। এই  যুদ্ধে নিহত ও আহত সৈনিকদের দুর্দশা ছিল , তাঁর উপলব্ধির পটভূমিকা। তিনি সৈনিকদের ব্যারাকে নার্সিং টিম নিয়ে হাজির হয়ে কয়েকটি অব্যবস্থা দেখেন। যার জন্য অসুস্থতার ও মৃত্যুর হার বেশি। যেমন - আঘাত ও আহত  সৈনিকদের যত্ন খুবই খারাপ, ঔষধ সরবরাহ যথাযথ নয়, পরিচ্ছন্নতার অভাব, প্রচুর সংক্রমণ, সঠিকভাবে বাতাস চলাচলের অসুবিধা, একঘরে  প্রচুর সৈনিক, উপযুক্ত পুষ্টির অভাব প্রভৃতি।ব্রিটিশ সরকার ও  টিম নার্সিং- এর সম্মিলিত চেষ্টায়- পরিছন্নতা, হাত পরিষ্কার, উপযুক্ত ঔষধ, খাবার সরবরাহ প্রভৃতির দ্বারা সৈনিকদের মৃত্যুর হার ৪২ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনেন।এই সময়ে সাবেকি কথার বিপরীতে গিয়ে তিনি তার প্রিয় বিষয় অংক কে নিপুনতায় প্রয়োগ করলেন। এর মাধ্যমে রোগী, রোগীর সংখ্যা, আক্রান্ত, পরিছন্নতা, স্বাস্থ্যবিধি প্রভৃতি একনজরে সহজে  বাড়া- কমার পরিসংখ্যান বোঝার মৌলিক ও সঠিক চিত্র উপস্থাপন করেন, নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলেন- যা পরিসংখ্যান বিদ্যা বা রোজ  ডায়াগ্রাম নামে পরিচিত।

  সৈনিকদের ব্যারাকে থাকাকালীন প্রতিরাতে করিডোরে রোগীদের প্রয়োজন দেখতে হাতে মোমবাতি নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, তাই তিনি "লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প" নামে নতুন পরিচিতি পেয়েছিলেন।সমস্ত প্রতিকূল পরিবেশ কাটিয়ে রোগীদের রোগশয্যা থেকে অপারেশন থিয়েটার, এমনকি মৃত্যু বা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার সময় পর্যন্ত প্রধান ভরসাস্থল হওয়ার পথ দেখালেন। গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার ধারনার উপরে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে উন্নত জনস্বাস্থ্য কিভাবে দেওয়া যায়- তার পথনির্দেশক ছিলেন। তিনি স্বাস্থ্যবিধিহীন অন্ধকার সময়কে সঠিক দিশা দেখালেন। তিনি নারীবাদী না হয়েও নারীমুক্তির উন্নয়নের ও উত্তরণের ধাপ সংস্কার করলেন ।

 

অবদান:-- ১৮৫৩-১৮৫৪- লন্ডনের "কেয়ার অফ সিক জেন্টেল ওম্যান ইনস্টিটিউটে"র তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন।১৮৫৪ সালে ৩৮ জন সেবিকা কে প্রশিক্ষণ দেন। ১৮৫৫ সালে  ক্রিমিয়ার সেবিকাদের প্রশিক্ষণের জন্য "নাইটিঙ্গেল ফান্ড" গঠন। ১৮৫৯ সালে " নোটস অন নার্সিং" বই লিখেন।" রয়েল স্ট্যাটিসটিক্যাল সোসাইটি"র সদস্যা  নির্বাচিত হন। ১৮৬০ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে অবদানের জন্য রানী ভিক্টোরিয়া আড়াই লক্ষ পাউন্ড দেন। সেই অর্থে লন্ডনে "সেন্ট থমাস হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র" প্রতিষ্ঠা করেন।" নাইটিঙ্গেল ট্রেনিং স্কুল" প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৬৫ সালে ওই ট্রেনিং স্কুলের নাম পরিবর্তন করে নাম দেন- "ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল স্কুল অফ নার্সিং এন্ড মিডওয়াইফারি"। ১৮৬৭ সালে নিউইয়র্কে "উইমেন্স মেডিকেল কলেজ" চালু করেন।


  পুরস্কার  ও উপাধি:-- ১৮৮৩ সালে রানী ভিক্টোরিয়া দ্বারা "রয়েল রেডক্রস" পান। ১৯০৭ সালে প্রথম নারী হিসাবে "অর্ডার অফ মেরিট" ও ১৯০৮ সালে লন্ডনের "অনারারি ফ্রিডম" পান।


   অমরত্ব লাভ:-- ১৯১০ সালের ১৩ ই আগস্ট ঘুমন্ত অবস্থায় শান্তির দেশে পাড়ি দেন।


   স্বীকৃতি:-- ইস্তানবুলে তাঁর নামে চারটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা। লন্ডনে ওয়াটারলু ও ডার্বিতে রাখা আছে তাঁর প্রতিকৃতি । লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতাল "ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল" নামে একটি মিউজিয়াম আছে। ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে রেকর্ডেড কণ্ঠস্বর সংরক্ষন করা আছে। তিনি বলেছেন-" যখন আমি থাকবো না ,সেই সময়  আমার এই কণ্ঠস্বর আমার মহান কীর্তিগুলোকে মানুষের কাছে মনে করিয়ে দেবে এবং এসব কাজের জন্য উৎসাহ যোগাবে"।১৯২৯ সালে" দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প" নামে নাটক মঞ্চে নিজে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন।তাঁর  জীবন ভিত্তি করে চারটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।তিনি আধুনিক চিন্তাভাবনায়  সেবিকাবৃত্তিকে এনেছিলেন সম্মান, স্বীকৃতি ও প্রচারের আলোয়।যুদ্ধে ও শান্তিতে যেখানেই জীবনের স্পন্দন রয়েছে, সেখানে শান্তিতে, সেবাতে ও প্রেরণায়  উজ্জল অবদান তাঁর। চিরকালের সেবিকা জাতির ইতিহাসে অমূল্য  মনিখচিত উচ্চতায় আসীন থাকবেন।  তিনি ছিলেন আধুনিক মহান পেশা নার্সিং পদ্ধতির নয়া বাহক ও সমাজ সংস্কারক। উনারই স্মৃতি সম্মানে উনারই জন্মদিনে ১৯৬৫ সাল থেকে  প্রতিবছর ১২ ই মে পালিত হয়-"আন্তর্জাতিক নার্সিং দিবস"। 


তাঁর  এই জন্মদিনে  কবিতার মধ্য দিয়ে  জানাই শ্রদ্ধাজ্ঞলি —



মুক্তি মহীয়সী


তুমিই সেই অনন্যা ছিলে,

সচ্ছল পরিবারে জন্ম নিলে।

এতে ছিলো না কোনো দম্ভ,

নিজেকে বানালে সমাজ- স্তম্ভ।


খ্রীস্টের উপহারে ধারণ মৃত্যুহীন প্রাণ,

মন প্রাণ করে গেলে সেবায় দান।

মুক্তির আলো জ্বালালে মহিলা জাতির,

আধুনিকীকরণের নতুনত্বে সেবিকা জাতির।


আধুনিক নার্সিংয়ের জন্মদাত্রী,

নারী আলোক- বর্তিকার অভিযাত্রী।

সেবার প্রয়োজনে বাঁধলে ক্যাম্প,

চিরকালের "লেডি  উইথ দা ল্যাম্প"।



    

অভ্যাসের সাঁচ


পথিকের বিশ্বাসে আলোর প্রাসাদ,

আত্ম- উৎসর্গে প্রত্যয়ের  আশ্বাস।

স্বার্থত্যাগে মহানতার আস্বাদ,

নিয়ম- শৃঙ্খলায় অভ্যাসের বুনিয়াদ।


মুখের কথায় মিষ্টির ভান্ডার,

মাথার বুদ্ধিতে বরফের পাহাড়,

হৃদয়ে উজাড় ভালোবাসার শীতলতা,

হাতে কাজের দক্ষতার অদম্য জেদ।


সাবলীল পরিকল্পনার নিপুণতা,

স্বাভাবিক একাগ্রতার কর্মকুশলতা।

বৈচিত্র্যময় সেবিকার রূপের সংগঠক,

সভ্যতা সংকটে উদ্ধারের সংস্কারক।



    

সেবিকার মান


সেবিকা হলে ও তো নারী,

বেজায় সমাজের মুখ ভারী।

নারী রূপকে, আবার সম্মান!

ড্রেস পরে দেয়তো ইঞ্জেকশন।


সেবায় নেই ভয়- লজ্জা- ঘৃণা,

তবুও অবিরাম সমালোচনা।

বিভিন্ন বিপর্যয়ে সদা জাগ্রত,

ঝামেলাতে করেনা মাথা নত।


ছোঁয়াচে রোগেতে ও  সম্মুখ- যোদ্ধা,

মানুষ হয়ে ও অবুঝ সব বোদ্ধা।

চোখ রাঙ্গানিকে করে চলে উপেক্ষা,

রোগীর কাজে, নেই সময়ের অপেক্ষা।



   

অভিযাত্রিকার প্রতীক



আজন্ম খিড়কি থেকে সিংহদুয়ারে,

ভিসায় সম্মানপত্রে ঘরে- বাইরে।

সমাজের নিয়মে অশ্রুর সাগরে,

দূরদৃষ্টির বিচারে সুখের সরোবরে।


রামমোহনের দেখানো পথে,

বিদ্যাসাগর তত্ত্বে এল সাথে।

বেন্টিঙ্কের ছাড়পত্রে আইনি রূপ,

নারীজাতির পেল নিজস্বতার স্বরূপ।


দশ- দেশের সেবার দরবারে,

যুঝিবার অস্ত্র দিলে  সমদ্বারের।

সমাজের উপকারে দেখালে প্রতীক,

বাস্তবে স্বাধীনতা অর্জন আর্থিক।









কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন