শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২১

আজ প্রকাশিত হল— সদ্য প্রয়াত কবি শঙ্খ ঘোষ স্মরণ সংখ্যা ।। কবি শঙ্খ ঘোষ (স্মরণে ও মননে) নিবেদিত অঙ্কুরীশা-র কবিতাঞ্জলি।Ankurisha ।।E.Magazine ।।Bengali poem in literature ।।

 


 

কবি শঙ্খ ঘোষ স্মরণ  সংখ্যা ।।  কবি শঙ্খ ঘোষ  (স্মরণে ও মননে) নিবেদিত অঙ্কুরীশা-র কবিতাঞ্জলি।


শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনে—



জ্যোতির্ময় দাশ 

তৈমুর খান 

দীপ মুখোপাধ্যায় 

গৌতম  হাজরা 

রবীন বসু

রবীন বনিক

ফটিক চৌধুরী 

দুর্গাদাস মির্দা 

সুধাংশুরঞ্জন সাহা

মায়া দে

বিকাশ চন্দ

তপনজ্যোতি মাজি 

অমিত কাশ্যপ 

অশোক রায়

সেন্টু রঞ্জন চক্রবর্তী 

কুমকুম বৈদ্য

নির্ঝর মুখোপাধ্যায় 

মনোজ ভৌমিক 

বাবলু গিরি

দেবাশীষ মুখোপাধ্যায় 

শঙ্কর তালুকদার 

রাজেশ কান্তি দাশ

বিমল মণ্ডল 

সর্বাণী  ঘড়াই

অলোক চট্টোপাধ্যায় 

শান্তুনু গুড়িয়া

অতনু চৌধুরী 

দিরন্ত বিজলী 

দীপক বেরা

সৌহার্দ  সিরাজ

অজয় দেবনাথ 

নিমাই জানা

জয়তী মান্না 

হীরক বন্দ্যোপাধ্যায় 

পার্থ মৈত্র

সুব্রত চৌধুরী 

ভবানীপ্রসাদ দাশগুপ্ত 









গন্ধরাজের সন্ধানে এখন জ্যোতির্ময় দাশ প্রণতির চরণগুলো একে একে চলে যাচ্ছে দূরে ভেঙে পড়ছে আমার অঞ্জলি দেবার মন্দির বেদি এতকাল হেঁটেছিলাম মহীরুহের নিবিড় স্নিগ্ধতায় সেইসব বনবীথি শেষ হয়ে গেল শূন্য অসীমে এবার আহত হতে হবে অকরুণ কাঁটাগুল্ম পথে রক্তাক্ত গন্তব্যের শেষে থাকবে না বিশ্রামের প্রিয় প্রতিশ্রুতি কথা ছিল একটা গন্ধরাজ কোথাও রেখে যাবে তুমি অবশিষ্ট শেষকটি দিন কাটাতে হবে তারই সন্ধানে...







স্নেহস্পর্শ
দীপ মুখোপাধ্যায়


সঙ্কটে ছিলে শুধু জাগ্রত বিবেকের মতো
কবিতায় বারে বারে হয়েছিলে ভারী উদ্ধত
প্রিয় কবি,প্রিয়জন,ছিল তবু শান্ত উপস্থিতি-
বিপন্ন মুহূর্তে এসে বিষ্মৃত হওনি ন্যায়-নীতি।

তুমি ছিলে সঙ্কুচিত জনপরিসরে,কুচো ভিড়ে,
স্থিতধী মুখখানি প্রতিবাদী হল আস্তেধীরে
সর্বদা জাগরূক চেতনার নিঃসঙ্গ পরিমন্ডলে
জেগে ওঠে ভাষা সত্তা,কবিতার ফুল হয়ে দোলে।

ক্ষমতার প্রাসাদে যেন সুদৃঢ় বিঘ্নসৃষ্টিকারী
হওনি উচ্ছিষ্টভোগী প্রকট হয়নি বাড়াবাড়ি
দেখেছি স্পর্ধিত পা হেঁটে গেছে নাগরিক মিছিলে
দায়বদ্ধ কবি তুমি অন্ধ আনুগত্য ঠেলে দিলে।

ক্ষমতার বিপ্রতীপে জেগে ওঠে তোমার সমাজ

কবির মৃত্যু নেই আছে শুধু প্রত্যাভিজ্ঞা আজ।







নিঃশব্দের তর্জনী 

তৈমুর খান 


পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ নিয়ে সময় পেরোচ্ছি রোজ 

আমার সন্ততি বেঁচে থাক 

                            জানু পেতে বসেছি পশ্চিমে 

এখানে মেঘের ঘোর, বজ্রপতনে ঘুম ভাঙে 

ধ্বংসের সকাল হয় দেখি 

আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি 

এখনো জেগে ওঠে দ্যাখ নিঃশব্দের তর্জনী 


গান কি ভুলে যাচ্ছি তবে? 

মুখ ঢেকে আছে বিজ্ঞাপনে 

নিয়ত মানুষ আছে তবু 

বহুস্বর স্তব্ধতায় তারা জাগে 


মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয় একথা জেনেছে সব আলো 

তবু তো অলীক এসে প্রতিশব্দে এভিটে কাঁপায় 

সে অনেক শতাব্দীর কাজ 

আমাদের অসময় আর নিয়ত বিনাশ একদিন মুছে যাবে 

স্নায়ুর ভিতরে বহমান কাল 

জন্ম দেবে, জন্ম দেবে রক্তিম প্রবাল… 






অন্য কন্ঠস্বরে
গৌতম  হাজরা 


কবিতার মুখ পালটাতে পালটাতে যখন
ভাবনার খোলা বাতাসে গিয়ে দাঁড়াই
তখন দেখি অন্ধকার ভেঙে চলে গেছে এক
              উথালিপাথালি ঢেউ
পৃথিবীর মায়া ছেড়ে আর এক অনন্তের দিকে
যেখানে পোড়া কাঠের ছাই উড়ে গিয়ে
                                     মিশে যায়
                   অনায়াসে প্রতিবাদী অন্য কন্ঠস্বরে! 





অগ্নিস্নান

রবীন বসু 


একটু স্তব্ধ হও, শব্দহীন বসো একপাশে

এখানে কবি শুয়ে আছেন,

এখানে দাঁড়ের শব্দ এখন ছলাৎহীন

এখানে মগ্ন অক্ষর পাঁজরে লেগে আছে

প্রহরজোড়া ত্রিতাল দুঃখ নিয়ে স্থির;

আমাদের শোক নম্র উচ্চারণে

পড়ে নিক কবিকে; আজীবন তীব্র তীক্ষ্ণ 

অক্ষরের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি,

দাঁড়িয়েছেন মানুষের পক্ষে;

কবিতাকে তির করে প্রতিবাদ ছুঁড়েছেন।


আজ এই স্থানে প্রকৃত মানুষ আসুক

প্রকৃত কবি ছাড়া অগ্নিস্নান শুদ্ধ হয় না…






শঙ্খ–শ্বাস
রবিন বণিক 

পোড়া  কয়লার  ভেতর  কতো  বক্র  ইতিহাস

কেড়েই  নিতে  পারো  শুধু,  শুধু  শঙ্খশ্বাস

 

শরীরে  শরীরে  সরে  যায়  রোদ,  লিপিতে  সকাল

শূন্য  এঁকেছে  চাঁদ  কি  পর্ণমোচী  বিকাল


প্রয়াত  একটি  অসমাপিকা  আয়ুর  মত  শব্দ

হে  সময়–  কতটুকু  রাত  ছিল  সমুদ্র–প্রার্থনা  লব্ধ

 

জানি,    দেহ  হারিয়ে  যাবে  করাত,  চির  হরপ্পায়

মাতৃভাষার  মত  প্রিয়  শঙ্খ,  লিপি–সমুদ্র  কাঁপায়





শঙ্খ-ধ্বনি

ফটিক চৌধুরী



আগুন-ঝরা সকালে কী আর চাইব !
কার কাছে ? জীবনের অফুরন্ত অবকাশে ?
'আদিম লতাগুল্মময়' জড়িয়ে আছে জীবন
পাথরকে দিয়েছি পুজো, সে কী কথা শোনে !
তবুও 'দিনগুলি রাতগুলি' উদাসীন মায়া।

এখন শুনি 'মুখের কথা সভায়' আর পাই
'পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ', তবুও প্রতিবাদ দেখি
এখনও আপনার কলমে।

শরীর ঈষৎ ঝুঁকে পড়লেও বক্তব্যে অবিচল
বন্ধুরা তরজায় মাতলেও আপনি থাকেন স্থিতধী
আগুন-ঝরা সকালে কবিতাই শেষ পরিচয়
যতই বলুক মুর্খ বড়ো, বলুক সামাজিক নয়।





প্রণাম
দুর্গাদাস মির্দা 


আজ আমার সবটুকু গোপনীয়তা 
ছুয়ে থাক তোমাকে। 
হে বিষণ্ণতা! তুমি স্তব্ধ হও
বৈরাগী আকাশের মতো। 
অনিঃশেষ যে আলোকিত পথ
তাকে আজ অন্ধকারে ঢেকে দাও। 
ছিদ্র হীন বদ্ধ ঘরে যে নিমন্ত্রণ ছিল
এতদিন তোমার কবিতায় তার কাছে
আজ আমি কত ঋণী
শুধু তুমি জানো। 
ধ্রুব শঙ্খের মতো তুমি আজীবন
বেজে যাবে হৃদয়ে আমার। 
বিনিময় সে তো তোমার 
পাথেয় নয় তবু কিছু শ্রদ্ধা 
 রেখে যেতে চাই তব পদতলে
 সু কন্ঠে গীত গীতাঞ্জলির মতো। 
 না আর ভাবনা নয়
 সব ভাবনার চাবি নিয়ে গেছে তুমি
 মরণের সাথে সাথে। 



বাতাসে কান্নার স্রোত 
সুধাংশুরঞ্জন  সাহা


তেমন দীর্ঘ ছিল না শেষ যাত্রা তাঁর।
ঈশ্বরচন্দ্র আবাসন থেকে নিমতলা ঘাট।
অনাড়ম্বর সাদা ফুলে ঢাকা ছিল তাঁর শব ।

জানি, প্রকৃত কবির কোন মৃত্যু নেই ।

এই আবাসনে কত যে এসেছে শাসকের দূত,
হাতে নিয়ে সবিনয় বড় বড় নানান প্রস্তাব।
কিন্তু না। কোনদিন তাঁর কন্ঠ কাঁপেনি এতোটুকু।
শাসকের দূত এসে শূন্য হাতে ফিরে গেছে।
ব্যর্থ হয়েছে তাদের সব রাজকীয় আয়োজন।

অবিচল তিনি শুধু বলেছেন :
কবি কেবল মানুষের কাছেই নতজানু হয় ।
দুঃখী মানুষের ক্ষতে রাখে স্বহৃদয় হাত।
কবি কোনদিন শাসকের নিকটজন হয় না,
বন্ধুও হতে পারে না।

অক্ষর নয়, শব্দ নয়, কবিতাও নয়,
মানুষই তাঁর কাছে সব।
বাতাসে আজ তাই কান্নার স্রোত...।






তারা খসা
মায়া দে


আকাশ থেকে খসল তারা ।
হে নিশুতির তারা----
অন্ধকার আকাশের বুক চিরে
অবিশ্বাসী হৃদয়কে আলো দাও।
আশ্বাসে ঘ্রাণ মেশাও।
আঁধার দেখে ও  মানুষ অন্ততঃ বাঁচুক।


"দেখ খুলে তোর তিন নয়ন
রাস্তা জুড়ে খড়্গ হাতে
দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন"---
এ অমোঘ বাণী কার?
স্নায়ুযুদ্ধ --আগুন সমাজ
তীক্ষ্ণ কলম মানে নি হার।
নেই পরিহাস।
নেই তঞ্চকতা।
তুমি আমাদের। তুমি আমার।

ধুম লেগেছে হৃদকমলে তারা খসার শোক।
সইব কেমন?
আকাশে গোলা পাকায় নাভিশ্বাস।
কালো মেঘ জড়ো হয়।
দাউ দাউ জ্বলছে আগুন--
শরীরটা পুড়ে খাক।
যে আগুন জ্বলছে বুকে শঙ্খ সেখানে থাক।।





বিবেক প্রহর
বিকাশ চন্দ

সকল নীল চোখ অবনত হয়েছিল হৃদয় অক্ষর
বহুবার শব্দাবলী কবিতা প্রণয় দেখেছিল ম্লান শাসকের চোখ
কবিতা বেঁধেছিল কখন শব্দের আত্মায় আলোর বৃত্তে
এত আলো এত আলো ঝলসে গেছিল কি স্তাবকের চোখ
এতো ধর্মাধর্ম ভুলভুলাইয়া থমকে পিছু ফিরে দেখেছিল
একটি দৃঢ় হাতের আঙুলের ডোগায় কলমের শব্দের রূপ টান
সকল সাম গান অক্ষর প্রতিমা কখন বিবেক বাসনায় 
প্রতিবাদে ঘুম থেকে ডেকে তোলে অজস্র মানুষের সাথে 
আহা, কী ধূম লেগেছে ফুলে ফলে গাছে এখন কথার মরশুম। 
#
এ কেমন একটা নিশ্চুপ প্রহর
কেমন গুম মেরে আছে পথ ঘাট শহর প্রান্তর
অজাত শত্রু সময় ও স্থীর বিদেশ বিভুঁই মরু প্রদেশ
বরফ পাহাড় কোথাও না কোথাও বিশ্বময় জাগে কালের তর্জনী 
শান্ত স্বরে আহ্বান "আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি"
এখন শব্দের ওড়া উড়ি দুধ সাদা পায়রার পালক ওড়ে আর
অজস্র পায়রার সারি শূন্যে ভাসায় শঙ্খ-বুক-মুখ
মাটিতে জেগে রয় শব্দ অক্ষর আর অজস্র বিবেক প্রহর। 
#
অবিনাশী নীল চোখ থমকে থেকেছে নীরব ভাসান বেলা
বুকের রক্তের মতো ছলকে উঠেছিল গঙ্গা জোয়ার
মানুষের বুকের কথাগুলিই হয়ে উঠেছিল কবিতার মুখ
হৃদয়ের কেনা-বেচা কবে কে ভেবেছিল পাশব বেসাতি 
বেসাতি আবার শুরু দেশ কাল মাটি বালি পাথর জল
কথায় কথায় কেবল মুখোশ আঁটা খয়রাতি সামাজিক ব্যাধি
তবুও এ-সময় সবিনয়ে বলি এ বড়ো দুঃসময়---
অন্তত একবার সত্যের মুখোমুখি হতে 
গদ্যে-পদ্যে-মহানুভব কবি শঙ্খ ঘোষ পড়ি। 






নিঃশব্দের তর্জনী
তপনজ্যোতি মাজি

কফি হাউসে বন্ধুদের হাত ফেরি হয়ে সেই প্রথম।
আজও নিঃশব্দ ঢেউ কোনও কোনও মুহূর্তে
কাঁপিয়ে দেয় ভারসাম্যের জীবন।

বুঝতে পারি অক্ষরপাঠ শেষ হলেও
অনিঃশেষ চলতে থাকে সমারোহহীন 
অন্তরপাঠ।

নিরাসক্ত পাঠে জন্মান্তরের অনভ্যাস।
আপনাকে পাঠ করার সময় এলো।
অনভ্যাস পারবে কি, যেমনটা 
আপনি পেরেছেন!

দশদিকে তর্জনীমুখর কোলাহল,
এরই মধ্যে নিঃশব্দ অতিমারীর দ্বিতীয় ঢেউ।
এ আমির আবরণ ছেড়ে চলে গেলেন
মহাসিন্ধু পারে।

অদীক্ষিত উত্তরাধিকার আমাদের।
সংশয় হয়।
বড়ো সংশয় হয়।

জাগ্রত মিথ্যার মধ্যে নিঃশব্দের তর্জনী।
অক্ষরে অক্ষরে দাঁড়ের শব্দ।
সাদা পাতায় এক বিন্দু 
মনখারাপের জল।







জাতক
অমিত কাশ‍্যপ

'তখন সন্ধে হয়ে এসেছে কিন্তু আলো জ্বলেনি কোথাও 
বটমূলের আবছায়ায় বসে আছেন শাস্তা
আমরা তাঁকে ঘিরে আছি মুখে  ত্রাস শিরদাঁড়া ভাঙা
স্খলিত স্বরে আমরা বলছি কী দেখেছি কী শুনেছি 
কীভাবে তিনি ভেঙে যাচ্ছেন  ঊর্ধ্বতন পাহাড়শিলায়'

আমরাও ভেঙে যাই এভাবেই 
চারিপাশের মানুষ, পড়শি, প্রিয় আত্মীয় পরিজন
কেমন অন্যরকম ছিন্ন দেখায়
দূরে সরে গেলে যেমন ভয়ংকর ত্রাসের মুখ সরে না 
দুর্বল সেতু যেমন ভাঙনের মুখে নড়ে ওঠে 
চারিপাশের হতশ্রী যেমন ব‍্যথিত করে 
অগ্নিবলয় যেমন ঘিরে রাখে
আমাদের কিছুই কি করার নেই 

ভয়ার্ত আমরা তাঁর সামনে বসে থাকি নতজানু 
সময় থেকে কখন তিনি উঠে দাঁড়ান
হয়তো এই জন্মে নয়, আরেক জন্মে
হয়তো আরেক জন্মের ভেতর 
পরিত্রাণের গল্পের ভেতর জেগে উঠবে 
ভোরের আলোর সুন্দর সুষমায়







বাজো হে বিজয়ী শঙ্খ
অশোক রায় 

ওরা বলে বাজবে না আর শঙ্খ

এখন শুধু শুক্‌নো পাতা ঝরে পড়ার শব্দ

জীবন থেকে ছিন্ন চিত্ত প্রেম বন্ধনী

চির নীরবতায় নিথর ললিত লেখনী

মহাতাপস হে কবি মৌনী মহাকালে বিলীন

পিতৃ-নিধনে আমরা সহসা অভিভাবকহীন

 

সুপ্ত গভীরে জাগে ঋজু মন্দ্র ধ্বনি

সামাজিক অন্যায়ের প্রতিবাদ রেণু গুনি

অসীম ক্লেশে রবীন্দ্রকোষ গাঁথেন যে মালাকার

ঠিকানা চাঁদপুর থেকে চাঁদপাল দ্বার

শঙ্খনাদে ভোর্-ললাটে দিগন্ত খোঁজে মিল  

শ্বেত-শঙ্খ স্তব্ধতার বালুচরে গর্জে ওঠো নীল।।

                               







তুমি
সেন্টু রঞ্জন চক্রবর্তী


তুমি
অবশেষে গঙ্গার বুকে ভেসে ভেসে
চিরপরিচিত মোহনার গা ছুঁয়ে গেলে
সমুদ্রের কোলে,
সবার অলক্ষ্যে হাতছানি দিয়ে
হয়তো আমাদের ডেকে গেছো
আমরা বুঝতে পারিনি |

আমরা শুনেছি
তোমার পুঞ্জীভূত সমস্ত অভিমান
সংগোপনে লালন করে গঙ্গার কাছে
সন্তর্পনে সমর্পন করেছো,
তুমি নীরবে নিভৃতে চলে গেলে
আমাদের মাঝিরা অনেক অপেক্ষায় ছিলো
তোমার হাত ধরে আরেকটা ভাটিয়ালি গান গাইবে বলে |

আমাদের কষ্টগুলি
কঠিন পাথরে চেপে রেখেছি বহুকাল,
হারানোর রিক্ততার হিসেবের বালাম বইয়ের স্তুপে
ইতিহাসের ঘুন পোকা রাতদিন কাটে সম্পর্কের জাল |







শঙ্খ ঘোষ কে শ্রদ্ধা
কুমকুম বৈদ্য


চার কুড়ি পেরিয়েছে আয়ু-
দেহ সেও আজ নিল বিশ্রাম
লিখে লিখে লিখে গেছো যে আয়ু অক্ষয়
শব্দ কি কঠিন তরবারি বারং বার করেছো প্রমাণ
রাষ্ট্র ও হয়েছে ভীত দেখিয়েছে ভয়
তুমি ছিলে কলম নির্ভর, নির্ভীক
কত সহজেই ছোঁয়া যেত তোমায় ,তুমি কবি, তুমি শিক্ষক
শোক সেতো তোমার   জন্য় নয়, তুমি অক্ষয়
"স্রোতের ভিতরে ঘূর্ণি,ঘূর্ণির ভিতরে স্তব্ধ
লেখো আয়ু লেখো আয়ু

চুপ করো, শব্দহীন হও"





শঙ্খ ঘোষ 
নির্ঝর  মুখোপাধ্যায়

মনে আছে ,
একবারই তাঁর সঙ্গে 
হয়েছিল কথা,
প্রায় দশক দুই আগে
তাও টেলিফোনে----
স্যার, আপনার মৃত্যু সংবাদ পড়লাম!!!
শিলাদিত্য কাগজে শারদ সংখ্যায়।
সেই জল কি তোমার ব্যাথা বোঝে স্বরে---
ভালোই তো।
বোধহয় হেসেছিলেন খবরটা শুনে
কিন্তু শুনতে পাইনি আমি।
স্বভাব সিদ্ধ শঙ্খ 
হাসি টুকু রেখে দিয়েছিলেন
শুধু নিজের উপভোগের জন্য.... 






 নক্ষত্র হয়েই বেঁচে থাক
 মনোজ ভৌমিক 


ও শঙ্খ আর বাজবে না দিনে রাতে! 
বাজবে না আর উন্নয়নের খাতে!! 
শুনবে না আর গণতন্ত্রের আর্তনাদ! 
শঙ্খ কলমে উঠবে না সেই নিনাদ!! 

কালো অক্ষরে দেখবো শুধুই প্রতিচ্ছবি, 
রক্তমাখা উন্নয়নে গর্জে উঠবে না কবি!
পরিবর্তনের পরিকাঠামো নিপাত যাক, 
অমৃতলোকে নক্ষত্র হয়েই বেঁচে থাক।












মহাপ্রস্থান 
বাবলু  গিরি  

এ কোন নিস্তব্ধ যাত্রা  
মহামৃত‍্যুর দ্বারে, এ কেমন যাত্রা-
মহাপ্রস্থানের পথে, সৃষ্টির শঙ্খ বাজিয়ে ।
বাজুক শঙ্খ নিনাদে, অক্ষরে, 
মহাপৃথিবীর ঘরে ঘরে।
যাত্রা করো যাত্রা করো হে মহা মানব,
আবার জন্ম নিতে হবে কোনো এক অক্ষরমণ্ডলে ।
বাজুক শঙ্খ, সাজাও অমৃতলোক,
ওই  আসছেন অক্ষর ও শব্দ নিয়ে,
বরণ করো মহাযজ্ঞে, শঙ্খের নিনাদে ।


সেই তো আছো
দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়
            

অক্ষর গুলোকে সাজিয়ে যে সিঁড়ি
তাই ধরে তুমি নেমে গেলে অনেক নীচে এক আলোর সমুদ্রে
এক বলয় গড়ে উঠল তোমার চারপাশে
মানুষের বলয়,নিপীড়িত স্বর সব
তুমি ঝোলা থেকে ছড়িয়ে দিলে 
মুঠো মুঠো অক্ষর, শিরদাঁড়া সোজা করার শিক্ষা
জীবনজয়ী মুষ্টিবদ্ধ হাতে সব আলোকমালা
ফিরে চলল তারা আগুন নিয়ে লড়াইয়ে
কিন্তু তুমি ফিরলে না...
মিলিয়ে গেলে দিক
চক্র বালে হিরণ্যগর্ভ আলোয়
অশ্রুসিক্ত রজনীগন্ধা হাতে দেখলাম 
পড়ে আছে তোমারই শব্দরা
" আমি যদি নাও থাকি তবুও আমিই পড়ে থাকে"।




কবি শঙ্খ ঘোষ
শঙ্কর তালুকদার


আকাশ মাটি মানুষের কথা,
প্রাণের সাথে মনের ব্যথা,
সবখানে তাঁর ছিল চলন যথা,
তাঁর সৃষ্টির মাঝে অনেক কথা!

আজ যে তিনি হারিয়ে গেলেন,
গৌন সব অসামঞ্জস্যতা এমন,
ঠান্ডা লাগা কোভিড-১৯ পেলেন,
প্রাণ হারিয়ে চলেও গেলেন!

সাহিত্যের এ যে অমোঘ ক্ষতির,
এমন সৃষ্টিকারী প্রাণপুরুষ হানীর,
শূন্যতাই কেবল জুটবে কালের-
শঙ্খঘোষ ছাড়া আগামী সময়ের!

কালের হিসেবে শূন্য নেই জানি,
তাঁর কৃষ্টির ছোঁয়ার সে পরশমনি,
নূতন দিনেই বুঝি কাটবে গ্লানী-
কাটিয়ে এ অতিমারীর সময়খানি!

শ্রদ্ধা আর প্রণাম তাই তাঁর প্রেরণায়, 
বুঝি এটি মৃত্যু নয় মোটেও সৃষ্টির,
প্রাণ প্রকৃতি ও তাঁর জীবন সাধনায়-
কবি শঙ্খ ঘোষ মনেতে রইবে সবার !




রাজহংস
রাজেশ কান্তি দাশ


দিনগুলো আর নেই, সব রাতগুলি;

ক্ষয়ে গেছে পাহাড়সম আলোকরেখা
কোমল হাওয়ায় উড়ছে উত্তপ্ত তাপ আর কলুষতা। কলুষতা। কলুষতা।
লোকালয়ে জ্বলে উঠছে লাল আগুন
বন, নদী, মাঠ,পাখি...সব-ই আছে
তবু কেন গত হচ্ছে নবরঙা ফাগুন?

ঘৃণা-বিদ্বেষ, শ্মশানের ধোঁয়া, করোনার হিন্দোল
বিষাক্ত সরীসৃপের মতো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে
একই কাতারে একই বাতাসে সব আজ
এদের কাজ; শুধু ধ্বংস, ধ্বংস আর ধ্বংস
তবুও জলে ভাসছে একটি রাজহংস।

তোমার মৃত্যু নেই হে পাহাড়সম আলোকরেখা
অন্যায়ের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ তোমা থেকেই জেনেছি শেখা।
তুমি দেখিয়েছো আলোকের পথ
ঢেকে দিয়ে সব অকল্যাণ, অন্ধকার, বিপথ...

তোমার সৃষ্টিকর্ম তোমাকে রাখবে মহীয়ান
এখনো আমার "মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে";
রাস্তায়, রাজপথে..."যমুনাবতী সরস্বতী" আমার প্রাণে
অনন্তকাল পড়বে মানুষ
তুমি বেঁচে থাকো, লহ প্রণাম, যুগযুগ; হে শঙ্খ ঘোষ।










শঙ্খ -কাল
বিমল মণ্ডল 


ইতিহাস রেখে যায়  অক্ষত  শঙ্খ কাল
কবিতার সংজ্ঞার  শেষ এই সকাল 

লিপির প্রহরী  যায় ঢেকে  অন্ধকারে 
গভীর গাছেদের মাঝেই অবিশ্বাস ভরে

প্রত্যয় থেকে প্রত্যাশা ব্যপ্তি ঈশ্বরতলার
বাধাহীনতার আলপনা এক উজ্জ্বলতার


সময় প্রার্থনা সমুদ্রের গভীরে প্রয়াত আয়ু
ঘন অন্ধকারে ডুবে যায় অক্ষরতরীর ঢেউ

প্রহরে প্রহরে  বিদায়ের ভীড় সূর্য আড়ালে 
অক্ষরাকাশে তারাদের মাঝে বিদায় জানালে।



কবি শঙ্খ ঘোষ স্মরণে
   সর্বাণী ঘড়াই


ভীষ্মের শরশয্যা ও শুনেছিল মহাভারতের যুদ্ধের শঙ্খধ্বনি
প্রতিটি শুভারম্ভের  আগেই বেজে ওঠে শঙ্খ
ছড়িয়ে যায় আকাশে বাতাসে
হাজার শব্দ
ধ্বনিত  হয় কাব্যিক ভাবনায়

যে  আয়ু হামাগুড়ি দিয়ে ছুঁয়েছে বৃক্ষ
সে বৃক্ষ আজ ছায়া দিতে দিতে ছাই হয়ে  মিশে যায় জীবন সরণির আত্মশুদ্ধিতে

হে শঙ্খ বাজাও তোমার ধ্বনি
হাজার আয়ু নিয়ে জন্ম হোক হাজার কবিতা
প্রাণপ্রতিষ্ঠা হোক পূর্ণতায় ।




প্রত‍্যয় 
অলোক চট্টোপাধ্যায় 

যেখানে পুলিশ কোনো অন‍্যায় করেনা, তারা
যতক্ষন 'আমার ' পুলিশ -
যেখানে উন্নয়ন খড়্গ হাতে নেচে যায় 
রাস্তার মোড়ে -
যেখানে শপথ রক্ষা অক্ষরে অক্ষরে
প্রতিবাদী কন্ঠস্বর নরকে পাঠায় -
সেখানেই এতদিন শোনা গেছে শঙ্খের নির্ঘোষ।
প্রতিবাদে, ব‍্যাঙ্গের কশায়
ছিঁড়ে দিয়ে মূঢ় আস্ফালন। 

সে শঙ্খ কি থেমে যাবে? 
তা কখনো হয়?
তাকে তো আঁকড়ে আছে আমাদের গভীর প্রত‍্যয়।



শঙ্খনিনাদ
শান্তনু গুড়িয়া

 আমার ভেতরে যে-শঙ্খ বেজে ওঠে
 তার নিনাদ ছাপিয়ে যায় পান্ডুলিপির নৈঃশব্দ্য
 অজস্র শোকগাথার ভিড়ে
 মেদুর চশমা টুকে রাখে গুরুর গাম্ভীর্য
                        প্রজ্ঞার প্রমিতি 
                  মেরুদন্ডের ঋজুতা
 আশ্চর্য এলিজি লেখা হয়ে যায়
 বৈশাখী সকালে 
 অতিমারীর করাল ছায়া
 ডুকরে-ওঠা প্রার্থনায় স্তব্ধ
 মন্ত্রমুগ্ধ কবিতাপাঠক|




ধ্রুবতারা
অতনু চৌধুরী


সরোবর তো কবেই গিয়েছে শুকিয়ে
সেই সঙ্গে পদ্মেরাও গিয়েছে ঘুমিয়ে;
এখন সে একটা পাঁকে ভরা ডোবা মাত্র
এই সেদিনও একটা উজ্জ্বল শাপলা হাওয়ায় হাওয়ায় দোল খাচ্ছিল দিবারাত্র,
আজ দেখি সেও পড়ল ঘুমিয়ে।
এখন কীটেরা সেথায় বাদ্য বাজাবে রমরমিয়ে।
সকালের বিবেক ঘুমিয়ে পড়েছে যখন
হাঙরের দল সেথায় অত্যুৎসাহে আসবে তখন,
আঁধার অদ্ভুদ এক নামলে পরে
মোচ্ছব করবে তারা পদ্মমধু ঘিরে ধরে।
পদ্মশোভিত পদ্মসায়র আর হয়ত থাকবে না,
থাকবে নামে,নাম,যশ,মাহাত্ম,মর্যাদা আর হাসবে না,
প্রতিবাদের কন্ঠ যেখানে রুদ্ধ হয়েছে বিক্রি হয়ে যাওয়ার হাটে
নির্ভীক,নিঃশঙ্ক, তেজোদীপ্ত ধ্রুবতারা জেগে রবে মানব সাগর তটে।



অশ্রু ও অক্ষরমালা
দুরন্ত বিজলী


তুমি তখন আবছা ভাসাভাসা শব্দপরিচয়ে,
কবিতাকর্ষণের দিনগুলির ভেতর আমিও তখন তোমার পাঠক।

তারপর ক্রমশ এগিয়ে যাওয়া কাদামাটির পথ পেরিয়ে পিচরাস্তার পর নদী অতিক্রম করে তোমার কাছাকাছি।
মঞ্চের ওপর তুমি। আমি ও আমার বন্ধুরা অদূরে মুগ্ধ দর্শকশ্রোতা। তোমার সিংহাসনে উজ্জ্বল দিনগুলি।

সে আলোয় তোমাকে রেখেছি হৃদয়ে বাচিক সম্ভাষণে,
প্রবাদপ্রতিম অক্ষরমালায় দীপ্ত ফসলভূমি।

সেই তুমি চলে গেলে অসীম আকাশে।
প্রতিবাদী শব্দঅশনি, হদয়ভেদী বেদনার কথা-উপকথা কে পৌঁছে দেবে জনতার দরবারে ?

অশ্রুর ভেতরেও জানি জলের কথা লেখা থাকে।  



দাঁড়ের শব্দ
দীপক বেরা


তুমি আছ জীবন ছুঁয়ে যাওয়া কবিতায়
তুমি আছ আমাদের ঘুমে-জাগরণে নিরন্তর 
চেতনার আলো জ্বালিয়ে শঙ্খনিনাদে
তুমি দুর্বার আগুন জ্বালিয়েছ জলে
তুমি আছ তরুণ মনের দোলাচলে 
নিচু স্বরের স্পর্ধায়, যেখানে 
সময়ের আলতা অথবা রক্তমাখা পা
তার ছায়া ছায়া ছাপ ফেলে যায় নীরবে
নৈঃশব্দ্যের পুজারি তুমি 
তোমার মনের গতি অতলান্ত অন্তরে  
যেখানে নিহিত আছে রাজনৈতিক প্রতিস্পর্ধা
আত্মা খুঁড়ে উঠে আসে বজ্রভেদী ব্যক্তিগত উচ্চারণ 
তুমি এক মগ্ন মৈনাক উন্নত শির
তুমি আজ মিলিয়ে গেছ দিগন্তের ওপারে
রেখে গেলে সমাজের আলো-আঁধারিতে 
মধ্যবিত্তের বুকে তোমার কবিতার আশ্রয় 
আর, কেবল দাঁড়ের শব্দ,.. শব্দ আর সত্য 
যা টের পাবে বহু মানুষ তাদের পাঁজরে পাঁজরে চিরকাল! 






বিমূর্ত দহনের রথ
সৌহার্দ  সিরাজ


শান্তি আর কল্যাণের রাস্তায় যখন
জল- জঙ্গল আর শ্বাপদ এনে বসিয়ে দেয় কেউ
তখন মানুষ অমোছনীয় হৃদয়সূত্রে স্বপ্ন দ্যাখে
তোমার সুমিত স্বরের,মানবিক আলোকবন্যার।

মিথ্যে প্রতিশ্রুতির নোনা সুগন্ধি মেখে সবাই স্নান করে না 
এ কথা সত্য বলে আড়ালের ভাষা ফেলে নতুনের স্পর্ধা
তোমার হাত ধরে অন্য রকম হয়ে এলো, 

শহর আর গ্রাম
কালো মেঘের জরুরী সাইরেন
বিশ্বাস ভঙ্গের শিকার  হলে মধ্যবিত্ত কষ্ট ফেরি করে—
চোখে আঙুল দিয়ে দেখালে।

'পিছনের দিকে এগিয়ে চলুন' ; 
ক্লান্তিবোধের আকাঙ্খাকে উপেক্ষা করে
এ কোন সন্ধিক্ষণে জড়িয়ে নাও ভোর!
'পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ' কাঁপিয়ে দেয়
 সাম্রাজ্যবাদের গ্লোবালাইজেশান মিথ!

জমিতে ভেঙে গেলে যতির গভীরতা—
তোমাকে দেখলাম!
চাঁদপুরের কোলন-সেমিকোলনের মোহনা ছেড়ে 
চিত্তপ্রিয় শঙ্খ বাজিয়ে পথের প্রান্তে থামালে বিমূর্ত দহনের রথ!আমাদের চেতনার বাড়িঘরে চিতার হাহাকারে শঙ্খনাদ উড়ে এলো!




শঙ্খ

জয় দেবনাথ

 

সেদিন একুশে এপ্রিল

পেটের জ্বালা মুছে গেল এক বুলেটে

ভুখা-মিছিল গুঁড়িয়ে দিল স্বাধীন পুলিশ।

দিগন্তে ঝলসে উঠল কলম

রক্তাক্ত রাজপথ লিখে নিল প্রতিবাদ

শিরায়-ধমনীতে, বাতাসের প্রত্যয়ে…

 

সেদিনও একুশে এপ্রিল

বিবাহের আঠাশতম বার্ষিকী, উৎসবের প্রস্তুতি চলছিল

চঞ্চল মন হঠাৎ থমকে গেল, বাতাসে স্তব্ধতা

বিয়োগান্ত মিছিল ক্রমশ দীর্ঘ…

খসে গেছে আরও একটি নক্ষত্র, রেখে তার ছায়া…

যমুনাবতীর শোকে কাঁদবে না সে আর

প্রতিবাদী মিছিলের রাজপথে পড়বে না চরণচিহ্ন।

 

তবুও রয়ে গেছে, থেকে যাবে সে…

বর্ণমালায়, প্রতিবাদী পথের ধুলায়, অনুভবে পাঞ্চজন্য

 

পঞ্চভূতে হয়ে লীন

বুক পেতে ছাওয়া বটবৃক্ষের ছায়ায়, আড়ালের আশ্রয়ে

খর রৌদ্রে কিংবা এলোমেলো… অশনিসংকেতে

স্থির চিত্তে রেখে যেতে অবিচল।




কাঁচের জ্বর ও বৈরাগ্য
নিমাই জানা



নীলাভ আবাদের জন্য সাম্রাজ্যের সূচনা করছেন তিনি
মৃত্যুর সাথে লাউয়ের বীজ পুঁতে দিলে তরতর হেঁটে যাচ্ছে অকালবোধনের গ্ৰামে
নিমগাছ তেতো বলেই ঈশ্বর রাত্রিকে ছুঁয়ে থাকে আপাদমস্তক গভীর রাত্রিতেও
গায়ের সকল নিঃস্বার্থ কঙ্কাল-খুলে ফেলে বিনিদ্র রক্তচাপের কাছে  , ধোঁয়া কে কখনও পরম বন্ধু বলে মনে হয়
উদ্বায়ী কে ? বরফের জোনাকি না  সোনালী ধানের পরকীয়া

সাদা সাদা বরফের স্তুপ খুলে রেখে বৈরাগ্যের পোশাক ধরতে কয়েকটি মুহূর্ত সময় লেগেছিল
তাকে অনাবৃত দেশলাই কাঠি বলি
যার অন্তঃস্থ অক্ষরকে ভরে রাখি নিরাময় জলের মতো
অক্ষরের ভেতর হেঁটে যাচ্ছেন সাম্রাজ্যের ঘর্মাক্ত পুরোহিত

পোড়া চুল্লীর জ্বর মাপছে কালবৈশাখী ও কাঁচের সেলসিয়াস স্কেল 




শব্দহীন হও -রাষ্ট্রীয় সম্মানে বিদায়

জয়তী মান্না


শঙ্খের শব্দে চাঁদপুরে উদয় চিত্তপ্রিয় রবীন্দ্র গবেষক, 

পেশা ও নেশার খাতিরে শিক্ষক ও লেখক।


বাংলা কাব্য ভূমে মহাবট বৃক্ষের সমাপতন,

বাবরের প্রার্থনা- উপেক্ষিত হয়ে ইন্দ্রপতন।


স্বপ্ন বাস্তবে জতুগৃহের মাঝে অমর একুশে,

বহির বাস্তবের রেখা ও রঙে শিল্পের শাঁসে।


লেখাতে শব্দ আর সত্যের চুনি-পান্না,

জলই পাষাণ আছে, পাচ্ছে কান্না।


উর্বশীর হাসি যেন নিঃশব্দের তর্জনী,

কুন্তক ছদ্মনামে রাগ করোনা রাগুনী।


সময়ের ফাঁকে বন্ধুরা মাতি তরজায়,

কবির অভিপ্রায় মূর্খ বড় সামাজিক নয়।


করোনা যুদ্ধের নিজস্ব পছন্দ হোম আইসোলেশন,

অবস্থা অবনতিতে হাসপাতালে ভেন্টিলেশন।


নয়া-নের দ্বিতীয় ঢেউয়ের উৎপাত,

শেষ পাণ্ডবের নিবিড় বুনোটের যবনিকাপাত।


ইচ্ছে প্রদীপে ধুম লেগেছে হৃদ কমলে,

শহর পথের ধুলো সন্ধ্যা নদীর জলে।


মিনি বুকের ভিতর এত অন্ধকার,

আরোপ আর উদ্ভাবনে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার।


সাহিত্য জগতের আজকের তাজা খবর,

ছদ্দবেশী শঙ্খ ঘোষের কোভিড যুদ্ধে হার।





শঙ্খ পুরাণ
হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়

শূন্যতার শেষ থেকে, দূরত্বের দূরতম প্রান্ত থেকে
তুমি ডাক দিয়েছো অযুত নিযুত কত আলোকবর্ষ
অপেক্ষা করে আছে মূর্খ বড়ো সামাজিক নয়
বলেছিলে তুমি এই ভূমি নতজানু সেই থেকে
বীজ হয়ে বেচেঁ আছে প্রতিটি শিরায় উপশিরায়
জাইলেম ফ্লোয়েমে জেগে আছে গান্ধর্ব কবিতা গুচ্ছগুলি সেই থেকে রক্ত করবীর গানে সবকিছু স্থির
বাবরের প্রার্থনা থেকে তুমি তো তেমন গৌরী ন ও...
আকাশে সপ্তর্ষিমন্ডল বাতাসে আজান
সন্ধ্যায় স্বাতী নক্ষত্র সমাবেশ হয়তোবা এভাবেই
কেটে যেত আমাদের দিনগুলি রাতগুলি
কিন্তু কী এমন তাড়া ছিল যেতে
ছিলে নেই মাত্র এই তো নয়
চোখ ঝাপসা হয়ে আসে
যতবার গেছি কথাতো হতো না বেশি
এমনকি কবিতার কথাও শেষদিকে তবু ছিলে
থাকা মানে থাকা ই  না এর বিরুদ্ধে 
দাঁড়ানো,আর কিছু নয় অস্তিত্বটুকু খুজেঁ পাওয়া।




হৃদয়ের গোপন গভীরে
পার্থ মৈত্র

বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও
গভীর প্রত্যয়ে তুমি অস্বীকার করেছো
 বিজ্ঞাপনের মুখ। 

খাঁটি প্রত্যয়ে তোমার ঋজু অক্ষরমালা
শাণিত প্রতিবাদে বিস্ফোরিত হয়েছে 
বারবার। 

তোমার মহাশঙ্খধ্বনিতে
অমঙ্গলের সর্বনাশ ঘোষিত হয়েছে আজীবন। 
ভয়ঙ্কর গর্জনে কম্পিত হয়েছে শত্রুর কৃপার। 

প্রিয় চিত্তের চিত্তপ্রিয় তুমি! 
নীরবে বিদায় নিয়ে চলে গেলে নিভৃত লোকে। 

তোমার সঙ্গ ছাড়া অসহায় আমাদের ভাষা! 
তাই যতো দূরে যাও, 
রয়ে গেছো তবু তুমি আমাদের হৃদয়ের গোপন গভীরে! 






প্রনাম

সুব্রত চৌধুরী


তোমার কাছে নিয়েছিলাম

ছন্দের প্রথম পাঠ,

দহনকালে ছেড়ে গেলে

ছন্দ কাব্যের মাঠ।


মারন ব্যাধি নিলো কেড়ে

ছন্দ গুরুর প্রাণ,

বিদায় বেলায় লও হে কবি

সশ্রদ্ধ প্রণাম 



নক্ষত্র পতন
ভবানী প্রসাদ দাশগুপ্ত

কবি শঙ্খ ঘোষ ছিলেন
বরেন্য আধুনিক কবি,
তাঁর কবিতায় গল্পে আঁকতো
বাংলা মায়ের প্রতিচ্ছবি।

পূর্ব বাংলার কোট চাঁদপুরে
ঊনিশ শত বত্রিশ সালে,
জন্ম নিলেন চিত্ত প্রিয় ঘোষ
বঙ্গে ব্রিটিশ শাসন কালে।

পৈতৃক ধাম তাঁর বরিশালে
মনীন্দ্র ঘোষ তাঁর পিতার নাম, 
চাকরির সূত্রে বদলী হলে
পাবনা হয় পিতার কর্মধাম।

পাবনা স্কুলে  লেখা  পড়ায়
কাটায় দুরন্ত কৈশোর কাল,
দেশ বিভাগে ভারত গেলো
ঊনিশ শত সাতচল্লিশ সাল।

প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে
বাংলায় স্নাতক ডিগ্রী নিলেন,
কলকাতা ইউনিভারসিটি
থেকে স্নাতকোত্তর হলেন।

বিদ্যা শিক্ষা শেষ করে
কলেজের অধ্যাপক ছিলেন,
অধ্যাপনার ফাঁকে ফাঁকে
নিত্য কাব্যচর্চ্চা করেন।

কাব্য আর সাহিত্য কর্মে
সম্মানে পেলেন পুরস্কার,
জ্ঞানপীঠ পদ্মভূষণ খেতাব
দিলেন তাঁকে ভারত সরকার।

কাব্য চর্চ্চায় রবীন্দ্রনাথ 
ধ্যানে প্রেরণা হয় শুরু
জীবনানন্দ দাস ছিলেন
আধুনিক কবিতার গুরু।

পাঠক ভক্ত সবার কাছে
কবি পেতো যোগ্য সম্মান,
মহামারীর ছোবলে আজ
হলো তাঁর জীবনাবসান।

শঙ্খ ঘোষের জীবন মরণ
স্রষ্টার বিধান হয় না খণ্ডন,
ভবের মাঝে ক্ষণিক ভ্রমণ
এটাই ছিলো বিধির লিখন।

কাব্য প্রেমিক পাঠক ভক্ত
ঝরায় অশ্রুজল নয়নে,
মরেও অমর থাকবেন তিনি
বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে।











৩টি মন্তব্য:

  1. প্রত্যেকটি লেখাই চমৎকার। ধন্যবাদ সম্পাদক মহাশয়কে এত সুন্দর একটি স্মরণ সংখ্যা প্রকাশ করবার জন্য।

    উত্তরমুছুন
  2. কবিকে শ্রদ্ধা জানাবার এই সুন্দর প্রয়াস, ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে। প্রতিটি কবিতা হৃদয় ছোঁয়া।কবি শঙ্খ ঘোষকে পাঠক,নবীন প্রবীণ কবিরা কত ভালোবাসতেন তাঁর স্নেহ স্পর্শ পাওয়া ভাগ্যবানেরা,তাই কবিতার লালিত্যে ফুটে উঠেছে।

    উত্তরমুছুন
  3. খুবই আনন্দিত। কৃতজ্ঞচিত্তে ধন্যবাদ জানাচ্ছি

    উত্তরমুছুন