ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (শেষ পর্ব)
নেপথ্য সংগীতের আড়ালে
অনন্যা দাশ
সেই তখনের পর আজ প্রথম মহাশ্বেতা রায়ের মুখে গানটা শুনে আমার সেই রাতের কথা মনে পড়ে গেল তাই আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। আমি যখন ওই কথাটা কাউকে বলিনি, মানে এক রকম ভুলেই গিয়েছিলাম তাহলে রাজেশ্বর ঝা কি করে জানল? ওকেও তো আমি কথাটা বলিনি আর পুলিশকেও যখন বলিনি তখন পুলিশের রিপোর্ট থেকে পাওয়ার তো প্রশ্ন ওঠে না?”
তখন ভূষণ ব্যাপারটা বুঝতে পারে। বাড়ি ফিরে প্রভাদেবীকে ঝার বইয়ের ওই চ্যাপটারটা গড়ে শোনায়। প্রভাদেবী ইংরেজি
বুঝতে পারেন মোটামুটি কিন্তু মোটা ইংরাজি বই পড়ার মতন জ্ঞান বা ধৈর্য ছিল না তাই বইটা ওনার পড়া হয়ে ওঠেনি আগে।
ভূষণ ওই অধ্যায়টা পড়ে শোনাতে উনি বলেন, “হ্যাঁ, এই বইটা যে লিখেছে সে কালনাগ না হয়ে যায় না!” উনি বইটা
আগে না পড়ার জন্যে আক্ষেপ করছিলেন।
যাই হোক, তারপরই ভূষণ জামাইবাবুকে ফোন করে এবং যথাক্রমে আমি ফোন করি ওকে।
ভূষণ আমাকে বলে, “রাজেশ্বর ঝা-ই কালনাগ কিন্তু ওকে এমনি তো ধরা যাবে না। ওই গানের কথাটা বললে ও বলবে সেটা মাই ওকে বলেছেন। কোন প্রমাণ নেই যে মা বলেননি। তাই ওকে হাতে নাতে ধরতে হবে।”
তখন আমি ভেঙ্কাটের সাথে কথা বলে ঝার জন্যে ফাঁদটা পাতি। আমরা জানতে পারি যে রাজেশ্বর ঝা এখন কলকাতায় বিখ্যাত এক চলচিত্র নির্দেশকের বায়োগ্রাফি লেখার কাজে। তাই ফাঁদটা এখানেই পাতা হবে ঠিক হল। তখন ভেঙ্কাট এখানে এলেন। ওই পাথরটা আসলে সুইজারল্যাণ্ডের এক ভদ্রলোকের। উনি এখন জয়পুরে রয়েছেন। উনিই দয়া করে ভেঙ্কাটকে পাথরটা ব্যবহার করতে দিয়েছেন। কারণ বড় টোপ না দিলে তো বড় মাছ, থুড়ি কালনাগ ধরা পড়বে না! তবে পাথরটা একেবারে আষ্টে পৃষ্ঠে ইনসিওর করা। প্রথমে খবরটা ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে সুইস ভদ্রলোক মালোয়েশিয়ার একজনকে পাথরটা বেচছেন এবং ভেঙ্কাট পাথরটা নিয়ে যাবেন কলকাতা হয়ে। ওই মহলে খবরটা আগুনের মতন ছড়িয়ে পড়ে। আমরা দেখলাম তো ওইট্কু সময়ের মধ্যে তিনজন ওটা কিনবে বলে হাজির হয়েছিল।
আমরা আশা করেছিলাম যে ওই তিনজনেরই কেউ একজন সোজাপথে পাথরটা না পেয়ে বাঁকাপথে ওটা পেতে কালনাগের শরণাপন্ন হবে আর অত দামি পাথর শুনে কালনাগ লোভ সামলাতে পারবে না! আর হলও ঠিক তাই, সে সোজা এসে আমাদের ফাঁদে পা দিল। রাজেশ্বর যেটা আমাদের বলেননি সেটা হল, উনি কলকাতায় বড় হয়েছিলেন, তাই বাংলা উনি ভালই বোঝেন। ভাষার উপর দখল ওনার ভালই। উনি হয়তো আশা করেননি যে প্রভাদেবী ওনার কথাগুলো বুঝাতে পারবেন; কিন্তু ভাগ্যের এমন খেলা প্রভাদেবীর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু_সেই স্কুলের আমল থেকে দুজন বাঙালী এবং তাদে্গালীসঙ্গে থেকে তাদের বাড়িতে গিয়ে গিয়ে প্রবাদেবী বাংলা বোঝেন এবং ওর কথাগুলো বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু পুলিশকে সেটা না বলার ব্যাপারটা একেবারে অপ্রত্যাশিত। সেখানেই ফেঁসে যান রাজেশ্বর ঝা। ওই ঘটনাটা যেহেতু উনি জানতেন, ওটাকে ফলাও করে লেখার লোভ সামলাতে পারেননি! উনি আর যাদের পরিবারের ইতিহাস লিখেছেন তাদের কারো বাড়িতে চুরি করার অভিজ্ঞতা ওনার ছিল না তাই এই রকম ভুল আর হয়নি। মার্কিন দেশে অলবানিতে প্রভাদেবী যদি ওই গানটা শুনে অজ্ঞান না হতেন তাহলে হয়তো ঝা ধরাই পড়তেন না। শেঠজির বাড়ির ব্যাপারটাও এখন পরিষ্কার হয়েছে। গৌরবমণি চুরি করার ঝার, মনে কালনাগের অনেক দিন থেকে ইচ্ছে ছিল, আর ধূর্জটিবাবুর পাথর নিয়ে কারবার তাই ওনার খাড়ে দোষটা চাপানো সহজ হবে ভেবে আগে থেকেই ওনার বাড়িতে চুরি যাওয়া কয়েকটা মণি রেখে দেন ঝা। শেঠজির বাড়িতে ওরা যখন পাথরটা দেখছিল তখন বসন্ত ওকে দেওয়া ফোন থেকে শেঠজিকে ফোন করে এবং শেঠজি ধরা মাত্র ফোন অফ করে আলোর মেইন সুইচ অফ করে দেয়। ও অবশ্য জানত না ও কাকে সাহায্য করছে। ওকে বলা হয়েছিল ওই কাজগুলো করতে, না করলে ওর ছেলেকে মেরে ফেলা হবে! মোক্ষম হুমকি দেওয়া হয়েছিল ওকে। সেই ভয়েই ও কাজটা করেছিল। অন্ধকার হতেই ঝা পাঠকের হাত থেকে পাথরটা নিয়ে নেন। শেঠজি যদি তক্ষুনি ওদের ঘরে বন্ধ করে পুলিশ না ডাকতেন তাহলে উনি হয়তো পাথরটা নিয়ে কোথাও লুকিয়ে ফেলে পরে উদ্ধার করতেন কিন্তু শেঠজি ওদের ডিসপ্লে রুমে বন্ধ করে রেখে পুলিশ ডাকেন তাই উনি পাথরটাকে ধূর্জটিবাবুর ব্যাগে ঢুকিয়ে দেন, আর যেহেতু ওনার বাড়িতে আগে থেকেই কয়েকটা পাথর লোকানো ছিল, উনি ফেঁসে যান! ঝা অবশ্য সেটাই চাইছিলেন কিন্তু শেঠজির তৎপরতায় গৌরবমণিটা হাত থেকে ফসকে গেল। কালনাগের কাজই ছিল বড়লোকদের জন্য দামি দামি পাথর চুরি করা। এমন বড়লোক যাদের শখ আর অর্থ দুটোই প্রচুর কিন্তু সাহস নেই। তারা কালনাগকে দিয়ে অর্থের বিনিময়ে ওই চুরিগুলো করাতেন। মনে হয় তথাগত কোনভাবে আন্দাজ করেছিলেন যে অন্ধকারে পাঠকের হাত থেকে রাজেশ্বর মণিটা নিয়ে নেন এবং সেই জন্যই তাকে মরতে হল। প্রভাদেবীর হার অবশ্য এতদিন কোথায় পাচার হয়েছে সেটা জানা নেই।“
ভেঙ্কটেশ রেড্ডি আর মামার কথা শেষ হওয়ার পর অখিলবাবু বললেন, “অমি তো বিশ্বাস করতেই পারছি না যে রাজেশ্বর ঝা-ই কালনাগ!”
মামা বললেন, “কেন?”
“আর বলবেন না, দুদিন আগে আমার বইয়ের দোকানে এসে হাজির। সে কি মিষ্টি মিষ্টি কথা! প্রথমে খোলসা করে কিছুই বলেন না, অবশেষে বুঝলাম চাইছেন যে আমি দোকানে ওনার বইগুলো বিক্রির জন্যে রাখি। আমি বললাম, "দেখুন এটা তো মূলত বাংলা বইয়ের দোকান আর এখানে যারা বই কিনতে আসেন তারাও বাংলা বই কিনতেই আসেন তাই ইংরাজি বই... কিন্তু উনি শুনবেন না, একেবারে নাছোড়বান্দা। তাই রাখলাম ওনার বইগুলো আর এমনই কাকতালীয় ব্যাপার আপনার জন্যে আজকে একটা বই এনেছি কারণ জয়পুরে উনি আপনাকে যেগুলো পড়তে দিয়েছিলেন সেগুলোর মধ্যে এটা ছিল না।”
বলে অখিলবাবু তার কাঁধের ঝোলা ব্যাগটা থেকে একটা বই বার করলেন--বইয়ের মলাটেই মণিমুক্তো খচিত প্রভাদেবীর
সেই বিশাল পান্না দেওয়া হারটা। মলাটে ঝলমলে সোনালি অক্ষর দিয়ে লেখা “দা ফ্লাইট অফ দা ঈগালস- এ হিস্ট্রি অফ আ রয়াল ডাইনাস্টি” লেখক রাজেশ্বর ঝা!

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন