শুক্রবার, ২ এপ্রিল, ২০২১

মিষ্টি প্রেমের গল্প।। তনিমা সাহা।। Ankurisha ।। E.Magazine ।।Bengali poem in literature

 





মিষ্টি প্রেমের গল্প

তনিমা সাহা

প্রেমের পর


রাতুলের সাথে মিষ্টুর প্রেমটা একদম জমে উঠেছে। রাতুল সেই কব্বে থেকে মিষ্টুর পেছনে পরেছিল। মিষ্টু এতোদিনে গিয়ে গ্রীন-সিগন্যাল দেখিয়েছে। গতমাসে চাকরীটা জুটিয়েই আজ মিষ্টুকে বিয়ের জন্য প্রপোজ করতেই মিষ্টু কোমরে হাত দিয়ে বলল, "মশাই এই ডিপার্টমেন্টটা কিন্তু আমার দাদাদের..মানে অরুনদাদার আর বরুনদাদার"। ফিক করে হেসে রাতুল বললো, "ও-বাবা! এ তো দেখছি অরুন, বরুন, কিরণমালার গপ্পো"। মিষ্টু হেসে বলে, "হমম্! প্রায় প্রায় ওইরকমই...গল্পে ওরা ওদের মা-বাবা থেকে হারিয়ে গিয়েছিল আর আমার গল্পে মৃত্যু আমাদের মা-বাবাকে হারিয়ে দিয়েছে"। সাহসী বীরের মতো বুক চিতিয়ে রাতুল বললো, "ঠিক হ্যায়...কৌই নেহি...হাম ভি পরীক্ষা দেগা"। দুহাতে কানচাপা দিয়ে মিষ্টু বললো, "ঈশশশ্! আবার সেই ভয়ঙ্কর হিন্দী বলা শুরু করলে। এই হিন্দী বললে কিন্তু দাদারা যে তোমার সাথে আমারবিয়ে দেবে না সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত"। দুজনেই হো হো করে হেসে ওঠে শেষে। 

রাতে মিষ্টু ফোন করে জানায় যে আগামী পরশুদিন রাতুলের সাথে ওর দাদারা দেখা করতে চেয়েছেন। মিষ্টুর সামনে যতই বড়ো মুখ করে কথা বলুক না কেন এখন দাদাদের দেখা করার কথা জানতে পেরে রাতুলের বেশ ভয়-ই করছে। ঠিক কিভাবে কথা শুরু করবে তা ভাবতে ভাবতেই রাত কাবার করে ফেললো। পরদিন সকালে ওঠেই তাড়াতাড়ি কাগজ কলম নিয়ে এক বিরাট লিস্টি বানালো….বিভিন্ন প্রতিকুল পরিস্থিতির জন্য। অফিস সেরে বিকেলে মিত্র ক্যাফেতে মিষ্টুর সাথে অ্যাপো করতে এলো রাতুল। রাতুলের ঝুলে পরা মুখ...বোজা বোজা চোখ দেখে মিষ্টু প্রায় হামলে পরে বললো, "রাতুল….তুমি নিশ্চয়ই টেনশন করছো….রাতে নিশ্চয়ই ঘুমাওনি ঠিক করে...আরে আমার দাদারা তো অসুর নয় যে তোমাকে দেখলেই একদম কাঁচা খেয়ে ফেলবে….অত ভয় পাচ্ছো কেন"? রাতুলের মুখে একটা ভেবলানো মার্কা হাসি আর মনে মনে ভাবছে, "ওফ! এই দস্যিটাকে নিয়ে হয়েছে এক জ্বালা… কি করে জানি সব আগে থেকে বুঝে যায়।"

 

যাইহোক নির্ধারিত দিনে রাতুল আধুনিক কেতাদুরস্ত হয়ে ঢিপঢিপ বুকে মিষ্টুদের বাড়ি গেল। মিষ্টুদের বাড়িটা ঠিক চৌরাস্তার মুখটায়। বেশ বড়ো দোতলা বাড়ি। গেট দিয়ে ঢুকতেই সামনে পরে একটা সরু মোরাম বিছানো রাস্তা। রাস্তাটার দুপাশে বিভিন্ন ফুলের বাগান। মিষ্টু জানালো যে তার মায়ের খুব শখ ছিল ফুলের বাগানে। ভীষণ যত্ন করতেন ফুলগাছের। মায়ের মৃত্যুর পর অরুনদাদা দায়িত্ব নিয়েছেন এই বাগানচর্চার। বাড়ির পেছন দিকেও খানিকজায়গা আছে। সেখানে বরুনদাদা মিষ্টুর প্রিয় ফলের গাছ মানে আতা, ডালিম, লিচু, আম,সবেদা এইসব গাছ লাগিয়েছেন। যাতে বোনের যখন ইচ্ছে তখনই ফল খেতে পারে। বাড়ীর ভেতরটাও বেশ খোলামেলা। মানানসই আসবাবপত্রে সাজানো। বাড়ীর ভেতর ঢুকতেই একটা ছোটো বৈঠকখানা আছে। মিষ্টু সেখানে রাতুলকে বসিয়ে দাদাদের ডেকে আনলো। রাতুলের আচমকাই পেটটা মোচড় দিয়ে উঠলো। 

অরুন আর বরুন দুজনেই যমজভাই আর দুজনেই প্রায় ছ'ফিট এবং বেশ তাগরাই শরীর। রাতুল তো ওদের দেখেই প্রায় ভিরমি খাচ্ছিল। অনেককষ্টে নিজের স্নায়ু নিয়ন্ত্রণ করলো। ওদের রাধুনীদাদা সকলের জন্য চা-বিস্কুট দিয়ে গেল। টুকটাক কথাবার্তার পর চা শেষ করে মিষ্টু উঠে পরে বললো, "তোমরা কথা বলো...আমি রান্নাঘরে যাই। দেখি দুপুরে খাবার কি বানানো যায়"। তারপর রাতুলের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললো, "দুপুরের খাবারটা কিন্তু এখানে করতে হবে তোমাকে, কেমন"। রাতুল মুখে একটা হাসি দিয়ে মনে মনে ভাবে, "আহাহা...এই হাসিটার জন্য সবকিছুই করা যায়"। মিষ্টু চলে যেতেই গমগমে গলায় বরুন বললো, "তুমি কি কোনো 'পারস্পরিক সাক্ষাৎকারের' জন্য এসেছো"? ওই গমগমে গলাটা রাতুলের কাছে এক ভীষণ বজ্রপাতের মতো মনে হলো। সঙ্গে সঙ্গে সে অনুভব করলো যে তার কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বেরোচ্ছে আর চোখে শর্ষেফুল দেখছে। এবার অরুন জিজ্ঞাসা করলো, "আমাদের বোনকে কেন বিয়ে করতে চাও? বিয়ে করার জন্যে তো আরো অনেক মেয়ে আছে….তবে আমাদের বোনটাই কেন"? এই প্রশ্নের উত্তরটা একদম তৈরী করে এসেছিল রাতুল...কিন্তু টেনশনের চোটে এখন আর কিছুই মনে পরছে না। কপাল চুঁইয়ে ঘাম ঝরছে...তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ...পাগুলোও যেন ঠকঠক করে কাঁপছে। বহুকষ্টে মিনমিনিয়ে রাতুল বললো, "আজ্ঞে….এক গ্লাস হবে"। সে এতোই ধীরে বলেছিল যে অরুন বা বরুন কারোরই কথাটা কানে যায় নি। প্রায় হুঙ্কারের মতো করে বরুন জিজ্ঞেস করলো, "কি বলছো….স্পষ্ট করে বলো"। রাতুলের আর দ্বিতীয়বার জলের জন্য জিজ্ঞেস করার সাহস কুলোলো না। মনে মনে ইষ্টদেবকে স্মরণ করতে করতে রাতুল ভাবলো, "ঠাকুর এ কি কঠিন পরীক্ষায় ফেললে আমায়। তবে কি একেই বলে, 'যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়'। এইবারটা না হয় পার করে দাও ঠাকুর"। রাতুলকে ওইরকম চোখ বন্ধ করে বিরবির করতে দেখে মনে মনে বড়ো বিরক্ত হলো অরুন। ফিসফিসিয়ে বরুনকে বললো, "বোন এ কাকে পছন্দ করেছে। এ তো একটা বড়োসরো ভীতুর ডীম। একটু গলা হরকাতেই কেঁপে-টেঁপে অস্থির"। এদিকে রাতুলের বুকের ভেতর ভয়ানক অস্বস্তি হতে শুরু করলো। গলার কাছটায় দমটা যেন বন্ধ বন্ধ ঠেকছে। ভাবলো একটু পায়চারি করলে ভালো লাগবে….কিন্তু যেমাত্র সে উঠে দাঁড়াতে গেল ঠিক তখনই চোখ অন্ধকার করে দাঁড়ানো অবস্থাতেই ধপ্ করে পরে গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় অরুন আর বরুন দুজনেই খানিকটা ভয় পেয়ে গেলেন। মিষ্টু ওদের প্রানের থেকেও প্রিয়। তাই যখন মিষ্টু বললো যে সে রাতুলকে পছন্দ করে তখন দুভাই মিলে যুক্তি করে যে রাতুল আসলেই তাকে বেশ করে ভরকিয়ে, বাজিয়ে দেখতে হবে। কিন্তু এখন ওদের মনে হচ্ছে এই তরকানো-ভরকানোটা একটু বেশিই হয়ে গেছে। বরুন একটু ভয় পাওয়া গলায় হাঁক দিলো, "বোন….ও..বোওওন….দেখ যা এই রাতুল কেমন যেন করছে"। মিষ্টু তখন রান্নাঘরে রাধুনীদাদার সাথে দুপুরের রান্নার আয়োজন করছিল। বরুনের হাঁক-ডাক শুনে দৌড়ে বসার ঘরে এলো। রাতুলকে দেখে মিষ্টুর ঠিক ভালো ঠেকলো না। সে তাড়াতাড়ি তাদের পারিবারিক চিকিৎসক ডঃ কুন্তলকে ফোন করলো। ডঃ কুন্তল মিষ্টুদের বাবার বন্ধুর ছেলে। ম্যাডিকেল পড়া শেষ করে দিল্লির স্যার গঙ্গারাম হাসপাতালে চাকরি করতো। সহকর্মিনী লিজার সাথে প্রেম ও বিয়ে….এই বছর চারেক আগেই কোলকাতায় পাকাপাকিভাবে চলে এসেছেন। এখানে অ্যাপেলোতে পোস্টিং। 


ফোন পেয়ে ডঃ কুন্তল এলেন। রাতুলকে ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন, "এনার প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে। খুব হাইপার টেনশনে ছিলেন"। মিষ্টু একটু কটমটভাবে অরুন-বরুনের দিকে তাকালো। মিষ্টু বললো, "হ্যাঁ টেনশনে ছিলো একটু। কিন্তু তা বলে এমনটা হয়ে যাবে ভাবিনি"। ডঃ কুন্তল বললেন, "এমনিতে চিন্তার কিছু নেই। আমি ইঞ্জেকশন একটা দিয়েছি...একটুপরেই জ্ঞান আসতে শুরু হবে"। খানিকপরেই রাতুল চোখ মেলে চাইলো। ডঃ কুন্তল আরেকবার চেক আপ করে, কিছু ওষুধপত্র দিয়ে বিদায় নিলেন। ডঃ চলে যেতেই মিষ্টুর নির্দেশে অরুন-বরুন মিলে ধরাধরি করে রাতুলকে গেস্টরুমে নিয়ে এলো। বরুন প্রেসক্রিপসনটা নিয়ে গিয়ে দোকান থেকে সব ওষুধ কিনে আনলেন। সেদিনটা মোটামুটি রাতুলের একপ্রকার ঘোরেই কেটে গেল। মিষ্টু অভিমানে দাদাদের সঙ্গে কথা বললো না। পরদিন সকালে একটু সুস্থ্যবোধ করাতে রাতুল ধীরে ধীরে উঠে বসলো। কালকের অযাচিত ঘটনাটির জন্য নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগ হলো। ভবিতব্য যে কি সে আর বুঝতে রাতুলের বাকি রইলো না। আস্তে আস্তে খাট ধরে উঠে দাঁড়ালো। তারপর ঘর থেকে বেড়িয়েই দেখে সামনে বৈঠকখানা। সদর দরজাটা খোলা। কাঁপাকাঁপা পায়ে সদরদরজা দিয়ে বেরিয়ে এলো। মোরাম বিছানো রাস্তাটা কোনোমতে পেরিয়ে চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা অটোর অপেক্ষা করতে লাগলো রাতুল। মাথাটা তখনও ঘুরে যাচ্ছে। হঠাৎ ধপ্ করে কেউ একজন রাতুলের কাঁধে হাত রেখে বললো, "কি হলো পালিয়ে যাচ্ছো যে বড়ো। এই তোমার ভালবাসা…"। রাতুল দেখলো অরুন পাশে দাঁড়িয়ে। অরুন বললো, "চলো ঘরে চলো...আমাদের তো ঠিক করে কথা বলাই হলো না"। আজ আর অরুনের গলাটা রাতুলের কাছে গমগমে গর্জনের মতো শোনাচ্ছে না। বরং সেই স্বরে ছিল পরম যত্ন, স্নেহ ও শাসন।






আরও পড়ুন 👇👇👇


https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/04/ankurisha-emagazine-bengali-poem-in.html



 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন