বৃহস্পতিবার, ১১ মার্চ, ২০২১

ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস ( পর্ব- ১৫)।। নেপথ্য সংগীতের আড়ালে — অনন্যা দাশ।। Ankurisha।। E.Magazine ।।Bengali Poem in literature ।।

 




ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস ( পর্ব- ১৫)

নেপথ্য সংগীতের আড়ালে 

অনন্যা  দাশ 


শেঠ কুন্দনলালের বাড়িতে সবাই জড় হয়েছিল। প্রথমে এই জামায়েতটার কথা ওনাকে বলতে উনি বেশ ভালই রৌদ্রমূর্তি ধরেছিলেন, “এই সব কি হচ্ছে মিস্টার দতআমার সময় খুব দামি। তার উপর আমার সেক্রেটারি মারা গেছে তো জানেনই। তার শুন্য পদ পূর্তি করতে আমাকে গুচ্ছের লোককে ইন্টারভিউ করতে হচ্ছে। কাজ তো কিছু হচ্ছেই নাউপ্টে প্রচুর সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তারমধ্যে যদি আবার আপনি এই সব করেন!”

এটা অত্যন্ত জরুরি বৈঠক শেঠজি। তথাগতকে কে খুন করেছে সেটা আপনি জানতে চান না?”

সেটা শুনে শেষমেষ রাজি হলেন শেঠ কুন্দনলাল।

শেঠজির বাড়িতে হিন্মতলাল খুরানারাজেশর ঝাঅজিত পাঠকধূর্জটি কর্মকারপপ্রিয়ব্রত সেন__সবাই এসেছেন। শেঠজিও রয়েছেন আর রয়েছে মামাঅখিলবাবুজিকো-এবং কেকাসবাই এসেছে দেখে মামা পরিচয় করিয়ে দিলেন।পরিচয় করিয়ে দিই। এই হচ্ছে প্রিয়ব্রত সেন। আপনাদের মধ্যে থেকে কেউকেউ হয়তো ওকে চেনেন। কিছুদিন আগে ওর সঙ্গে আমার আলাগ হয়েছে। ওর দাদা কলকাতায় আমাদের বাড়িতে এসে বলেছিলেন যে কিছু লোক প্রিয়ব্রতকে খুব বিরক্ত করছে। সময়ে অসময়ে ফোন করে তয় দেখাচ্ছেপিছু নিচ্ছেএই রকম সব অথচ কেন সেটা বোখা যাচ্ছে না। ওকে ওরা বলছে যেও খুব বাজে গর্হিত কাজ করেছে এবং তার জন্যে ওকে শাস্তি পেতে হবে! সেই কাজটা যে কি প্রিয়ব্রত নিজেও ধরতে পারছিল না। একদিন ঘুম থেকে উঠে ও দেখে দুজন ভয়ানক মুখোশ এবং পোশাক পরা লোক ওর ঘরে! তারপর কালকে ওর বালিশে মরার মাথার খুলি! ভয়ে ওর সব কাজে গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল। কলেজে যেতে পারছিল নাখাওয়াদাওয়া কোন কিছুতেই ওর মন বসছিল নাওর ধারণা হচ্ছিল ও বুঝি পাগল হয়ে যাচ্ছে। ওর বাড়িতে কারা যেন অবাধে ঘোরাফেরা করে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু কেনকি করেছে প্রিয়ব্রত?” মামা একটু থেমে জল খেতে জিকো চট করে একবার সবার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে নিল।

শেঠজি মুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে বসে রয়েছেন আর অন্যরা সবাই মোটামুটি মন দিয়ে শুনছে। অখিলবাবু জয়পুর থেকে কেনা একটা লীল-কালো ছোপ টাই ডাই করা জামা পরেছেন যেটা চোখে বেশ ধাঁ করে লাগছে!

 

মামা আবার শুরু করলেন, “আজ সকালে কারা যেন আমার দিদি-জামাইবাবু আর জিকো-কেকাকে ধরে নিয়ে গিয়ে শহরের বাইরে একটা ভাঙ্গা কেল্লায় রেখেছিল। তারাও বলছিল প্রিয়ব্রতকে যেন আমি কোন সাহায্য না করি। যাই হোকওদের অনেক খারাপ কিছু হতে পারত কিন্তু ভাগ্য ভালএকটা বাচ্চা ছেলে ছাগল চড়াতে গিয়ে ওদের দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয় এবং তৎপর পুলিশ ইসপেক্টার নিজের লোকজন নিয়ে কেল্লায় হানা দিয়ে ওদের উদ্ধার করেন। ফিরে আসার পর জিকো ইন্টারনেটে নিজের বন্ধুদের ওর রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে একটা জিনিস দেখতে পায়। সেটা অবশ্য হয়েছে এখানকার একজন স্থানীয় বালি ছেলের সাথে ফেসবুকে বন্ধুত্ব হয়েছিল বলে। ফেসবুক থেকে নেওয়া এই প্রিন্ট আউটটা আপনারা দেখতে পারেন। আমি পুলিশকেও দেখিয়েছি। জনৈক পিবিএস লিখেছে_-জয়পুরের বাসিন্দারা শোনো! তোমাদের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে আমি অবগত করাতে চাই। কিছুদিন আগে আমার শরীরটা খারাপ হয়েছিল বলে আমি ডাক্তার দেখাতে যাই। এখানকার মোটামুটি নামকরা ডাক্তার অজিত পাঠক। কিন্তু তিনি আমার ভয়ানক ভুলভাল চিকিৎসা করেন। এত বেশি উল্টোপাপ্টা ওষুধ দেন যে সেগুলোর প্রতিক্রিয়ায় আমি আরো অসুস্থ হয়ে পড়ি। তখন উনি আরো কিছু কড়াকড়া ওষুধ দেন এবং আমি আরো কাবু হয়ে যাই। তার ফলে আমার জীবনের বেশ কয়েকটা মাস নষ্ট হয়ে যায। সেই ক্ষতিপূরণ কে দেবেতাই বন্ধুরা তোমরা ওই হাতুড়ে ডাক্তার থেকে সাবধান থেকো” এই ছিল ফেসবুকে পোস্ট প্রিয়ব্রতর সঙ্গে কথা বলে আমি জেনেছি যে ও প্রায়ই এই রকম করে থাকে। কোন সবজিওয়ালা খারাপ সবজি দিয়ে বেশি দাম নেয়কোন দোকানের মিষ্টি/পচা বা বাসিসেই সবকিছু ফেসবুকে লিখে দিয়ে সবাইকে জানিয়ে দেওয়াটাও নিজের নৈতিক কর্তব্য বলে মনে করে! ও একবার ভেবেও দেখেনি যে এর পরিণাম কি ভয়ানক হতে পারে বা কার ব্যাবসা নষ্ট হয়ে যাবে কি অন্য কারো কোন ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। প্রিয়ব্রত অবশ্য ওটা নিজের পুরো নাম দিয়ে লেখে নালেখে পিবিএস নামে কিন্তু সেটা কে জেনে নিতে বেশি সময় লাগেনি অজিত পাঠকের। ছোট বরফের গোলা যখন গড়াতে শুরু করে তখন চারিদিকের বরফ মাখতে মাথতে সে যে বিশাল আকার ধারণ করে ফেলে সেটা অনেক সময় অনুমান করা যায় না। এক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল। অজিতবাবুর রুগীরা সবাই হঠাৎ এটা সেটা বাহানা বানিয়ে বেঁকে বসতে শুরু করে। আগুনের মতন কথাটা ছড়িয়ে গড়ে। আর গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতন চেম্বারের বাড়ির জলের পাইপের সমস্যা দেখা দেয়চেম্বার বন্ধ করতে হয়। ওই অবস্থায় অন্য জায়গায় ভাড়া নেওয়ার আর চেষ্টা করেননি উনি। যাই হোক পাঠক ডাক্তার তখন রাগে প্রিয়ব্রতর পিছনে লাগেন। দুই ভাড়াটে গুন্ডা নকুল আর রাজেন ওনাকে ওই ব্যাপারে সাহায্য করছিল। ওরা প্রিয়ব্রতর বাড়িওলাকে ভয় পাইয়ে ওর ফ্ল্যাটের চাবি জোগাড় করেছিলআর প্রাণের ভয়ে উনি ওদের না দেখার মিথ্যা অভিনয় করে গেছেন ক্রমাগত। ভাক্তারের উদ্দেশ্য ছিল প্রিয়ব্রতকে এমন অতিষ্ঠ করে তোলা যে হয় ও নিজে নিজের ফেসবুকের কথাগুলো নামিয়ে নিতে বাধ্য হবে অথবা ওকে পাগল প্রমাণ করতে পারলে ওর কথাগুলো পাগলের প্রলাপ বলে চানানো যাবে।”

জিকো আবার একবার সবার মুখগুলো দেখে ফেলল। শেঠজিকে আর বিরক্ত দেখাচ্ছে না! বেশ উদ্গ্রীব হয়েই মামার কথা শুনছেন। অজিত পাঠক শান্ত হয়েই বসেছিলেন। এবার বললেন, “ও যদি ফেসবুকে সব্জিওয়ালা,দুধওয়ালা সবার নামে খাতা লিখে থাকে তাহলে আপনি কি করে বলতে পারেন যে আমিই ওকে ভয় দেখিয়েছিযে কেউ তো হতে পারো ”মামার চোখ ছোট হয়ে গেছে, “আমি তো বলিনিবলেছে তো নকুল আর রাজেন। ওরা এখন পুলিশের হেফাজতে! ওরাই পুলিশের কাছে বলেছে আপনি ওদের টাকা দিয়ে কি করিয়েছেন

“মিথ্যে কথা। ওরা ধরাই ..” অজিত পাঠক একবার ঝলসে উঠেই আবার মিইয়ে গড়লেনবুঝতে পারলেন কি ভুলটা করে ফেলেছেন।আপনার টাকার দরকার সবচেয়ে বেশি ছিল অজিতবাবু। সেদিন আলো যখন নিভে যায় তখন মণিটা আপনার হাতে ছিল  সেটা প্রায় সবাই আমাকে বলেছে। আর যারা বলেনি তারা নিজেকে আপনার বন্ধু মনে করে চুপ করে গেছে। আর একটা কথা।  এএইমসের (ছাত্র তালিকায় ১৯৯০ সালে এমবিবিএস পাস করা অজিত পাঠকের যে ছবি বার করা গেছে তার সঙ্গে কিন্তু আপনার কোন মিল নেই! আপনি কে?”অজিতবাবু মুখ নিচু করে বসে ছিলেন। এবার অস্ফুট স্বরে বলেন, “আমি অজিত মিশ্র। অজিত  পাঠক আমার বন্ধু ছিল। ওষুধের দোকান ছিল আমাদের। ছোটবেলা থেকেই দোকানে বসতাম তাই ওষুধ সম্পর্কে জান আমার ভালই ছিল। দিল্লি  থেকে জইয়পুর বেড়াতে আসছিলাম আমরা দুই বন্ধু যখন দুর্ঘটনাটা ঘটে। পাঠক দুর্ঘটনাটায় ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছিল। তখন আমার মাথায় ফন্দিটা আসে। আমি অজিত মিশ্র থেকে অজিত পাঠক হয়ে যাই ওর সব সার্টিফিকেট ইত্যাদি নিয়ে। ও দিল্লিতে কাজ করছিল তাই আমি দিল্লিতে আর না গিয়ে জয়পুরে এক জেনারাল ফিজিশিয়ানের সহকারী হয়ে ঢুকলাম। সেখানেই অনেক কিছু শিখলাম আর কিছুটা ন্যাক ছিল। ব্যাস সেই থেকেই।”

 আর গৌরবমণি?” শেঠজি প্রশ্ন করলেন।

হ্যাঁআলো যখন যায় তখন মনিটা আমার হাতে ছিল। আপনার সেক্রেটারি সেটা দেখেছিল এবং সে আমাকে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করে! কিন্তু ওই অন্ধকারের মধ্যে কেউ আমার হাত থেকে মণিটা নিয়ে নেয়।”

“একটা মিথ্যা কাজ যখন আপনি করেছেন তখন তো আর আমরা আপনার অন্য কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারব না মিস্টার পাঠক!” ওসি মনোজ জৈন কখন জানি ঘরে এসে ঢুকেছেন। “আমরা প্রমাণ করব আপনি কালনাগ এবং লাহিড়ি আপনাকে ব্ল্যাকমেল করছিল বলে আপনি তাকে হত্যা করেন!”




চলবে...




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন