ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (পর্ব-১২)
নেপথ্য সংগীতের আড়ালে
অনন্যা দাশ
২০.
পরদিন সকালবেলার ফ্লাইটে ওদের উদয়পুর যাওয়ার। সাতটায় ফ্লাইট তাই ভোর সাড়ে পাঁচটার গাড়ি আসতে বলা হয়েছিল, এয়ারপোর্টটা ওদের হোটেল থেকে কিছুটা দূরে বলে। সাড়ে পাঁচটায় কিপ্তু বেরনো হল না, বেরতে বেরতে সেই ছটাই হয়ে গেল। মামা ছাড়া সবাই তৈরি। গাড়িও হাজির। আনন্দমোহনকে আজ পাওয়া যায়নি, ওর অন্য জায়গায় সারাদিনের ডিউটি আছে বলে। মা তো বেশ ঘাবড়েই ছিলেন, “আমাদের ফ্লাইট আজ মিস হবেই।”
হুড়োহুড়িতে ট্যাক্সিতে উঠতে গিয়ে অখিলবাবুর পাঞ্জাবিটা গাড়ির হাতলে আটকে গিয়ে ফচাৎ করে অনেকটা ছিড়ে গেল। অখিলবাবু সব সময় টিগটপ থাকতে পছন্দ করেন। জামার ওই রকম ফর্দাফাঁই দশা দেখে উনি মাথা নেড়ে বললেন, “আপনারা এগিয়ে যান। আসি জামা ছেড়ে অন্য ট্যাক্সি নিয়ে পিছন পিছন আঁসছি। সুটকেস খুলে অন্য জামা বার করে পরতে সময় লাগবে। আর আমি ফ্লাইট মিস করলে কিছু হবে না। সাগরবাবু তো আছেন আমি ওনার সঙ্গে থেকে যাবো বা পরের কোন ফ্লাইট নিয়ে উদয়পুর চলে যাবো। প্লেনে টিকিট বদল করার অভ্যাস আমার প্রচুর আছে।”
অগত্যা ওরা রওনা হয়ে গেল। হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কে আরেকটা ট্যাক্সি ডাকতে বলে অখিলবাবু মামার ঘরে গিয়ে জামা পালটে আবার রওনা হলেন।
এয়ারপোর্টে পৌঁছে দৌড়াদৌড়ি করে ভিতরে ঢুকে বোর্ডিং পাস নিতে গিয়ে জানতে পারলেন যে কুয়াশার জন্যে উদয়পুরের ফ্রাইট ডিলে করা হয়েছে।
প্যাক বাবা বীচা গেল!” বলে উনি সিকিউরিটি চেক করিয়ে বসার জায়গায় ঢুকে জিকো, কেকা বা ওদের মা-বাবা কাউকেই
দেখতে পেলেন না।
“এটা তো ভীষণ অদ্ভুত ব্যাপার হল! সবাই গেল কোথায়?” বলে মাথা চুলকে এদিক ওদিক দেখতে লাগলেন অখিলবাবু!
বেশ কিছুক্ষণ ধরে খুঁজে দেখে কি হয়েছে বুঝতে না পেরে অখিলবাবু ফোনটা বার করে পরিচিত একটা নম্বরে ফোন করলেন।
ওপাশ থেকে মামা ধরলেন, “বলুন অখিলবাবু। কি হয়েছে? ফ্লাইট মিস করেছেন?”
“না, ফ্লাইট তো কুয়াশার জন্যে ডিলে হয়ে গেছে কিন্তু অন্য একটা ব্যাপার হয়েছে।”
“কী হয়েছে?”
“আমি তো বোর্ডিং পাস নিয়ে সিকিউরিটি চেকিং করিয়ে বসার জায়গায় ঢুকে গেছি কিন্তু এখানে জিকো-কে্কা বা দাদা-
বৌদি কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না। ওদের কি হল বলুন তো?”
“আপনি ঠিক করে দেখেছেন?”
“হ্যাঁ, অনেকক্ষণ ধরে। এই জায়গাটা বিশেষ বড়ো তো নয় আর আমি বাথরুম টাথরুম গিয়েও খুঁজে এসেছি। এরা তো আমাকে বলতে চাইছে না যে ওদের চেক ইন হয়েছে কিনা।”
“না, ভা তো বলবে না। এ তো খুব গণ্ডগোল। তা আপনি কি করবেন, ফ্লাইট ধরবেন?”
না, না, ওরা না গেলে আমি একা একা গিয়ে কি করব? দেখি এখান থেকে বেরতে পারি কিনা।”
না শুনুন, আপনি এক কাজ করুন, আপনি কিছুক্ষণ ওখানেই থাকুন। ওরা না এলে ফ্লাইটে না হয় উঠবেন না। কি কৈফিয়েত দেবেন ভেবে রাখুন। তবে বলাতো যায় না, ওরা যদি ট্রাফিক জামে আটকে থাকে বা গাড়ির টায়ার পাংচার জাতীয় কিছু। আমি এদিকে দিদির মোবাইলে ফোন করে দেখছি।“
“ওটা আমিও চেষ্টা করেছি। অফ করা।”
“ঠিক আছে দেখি কি করা যায়।“
২১.
রামু কাঠিটা দিয়ে পিঠটা খোঁচাতে খোঁচাতে এদিক ওদিক দেখল। না কালুয়াকে কোথাও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। ভারি
দুষ্টু হয়েছে ছাগলটা, সব সময় দলছুট হয়ে এদিক ওদিক পালাবে! কোথায় কোন ফাঁক ফোকরে সবুজ পাঁতা দেখে খেতে ছুটেছেহয়তো। ওর জন্যে রোজ রামুর স্কুলে দেরি হয়, 'কালুয়া, বলে ডাকতে যাচ্ছিল রামু কিন্ত হঠাৎ একটা শব্দ শুনে থমকে গেল।
একটা ধুসর রঙের গাড়ি এসে থেমেছে ওখানে। কেন? এই কেল্লাটা দেখতে তো কেউ আসে না, একেবারে ভগ্নদশী। কি মনে করে একটা বড় পাথরের পিছনে লুকিয়ে পড়ল রামু। গাড়িটা থেকে একটা লোক বেরলো। মাথায় ঝাঁকড়া চুল চোখে রঙিন চশমা।
লোকটাকে দেখে ভাল লাগল না রামুর, কেমন যেন হিংস্র মতন। তার পরে যা হল সেটা দেখে রামু তো থ। কেল্লার ভিতর থেকে আরেকজন বেরিয়ে এল। দুজনে মিলে ধরাধরি করে গাড়ি থেকে চারজন অচৈতন্য লোকজনকে ধরে ভিতরে নিয়ে গেল!
যাদের নিয়ে গেল তারা যে ভদ্রলোক সেটা তাদের পোশাকআসাক থেকেই বোঝা যাচ্ছিন। না, ব্যাপারটা মোটেই ভাল ঠেকছে না। জামায় টান খেয়ে চমকে তাকাল রামু কালুয়া কোথা থেকে জানি এসে হাজির হয়েছে! ওর জামা ধরে টানছে!
“চলরে কালুয়া, একবার থানায় যেতে হবে তারপর স্কুল। এখানে একটা কিছু গণ্ডগোল হয়েছে সেটা পুলিশকে জানাতে হবে।”
২২.
জিকোর যখন জ্ঞান হল তখন ওরা চারজন একটা ঘরে বন্দী। ওদের সবার হাত পা শক্ত করে বাঁধা। ওরা যেখানে রয়েছে
সেটা মনে হয় কোন একটা পুরনো কেল্লার ঘুপচি ঘর। দেওয়ালগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। এখন দিনেরবেলা তাই আলো আসছে, রাতে কিছুই থাকবে না। ওদের মনে হয় ক্লোরোফর্ম জাতীয় কিছু দিয়ে অজ্ঞান করে এখানে আনা হয়েছে কারণ গাড়িতে ওঠার পর একটুখানি পর থেকে আর কিছু মনে নেই।
কেকা জিজ্ঞেস করল, “কিরে তুই ঠিক আছিস?”
“হ্যাঁ।”
মাকে দেখে মনে হচ্ছিল বেশ রেগে আছেন। বললেন, “সব সাগরের জন্যে হয়েছে। কতবার বলেছি গুন্ডা বদমায়েশদের সাথে কারবার হলে আমাদের টানিস না কিন্তু কিছুতেই শুনবে না!”
বাবা বললেন, “আমাদের ব্যাগ, মালপত্র মোবাইল সব কিছু নিয়ে নিয়েছে। এখন তো অপেক্ষা করা ছাড়া কোন উপায়
নেই।”
“অখিলকাকু নিশ্চয়ই আমাদের না দেখতে পেয়ে মামাকে বলবেন।”
“হ্যাঁ, যদি না ওনার প্লেন মিস হয় আর উনি ভেবে বসেন যে আমরা প্লোনে চড়ে উদয়পুর চলে গেছি।”
“হ্যাঁ।“
“এরা কারা কে জানে। কালনাগের লোক কি?”
একটু পরেই দরজা খুলে একটা লোক এলো। ওদের সকালের ট্যাক্সি ড্রাইভারটা।
সে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় বলল, “দেখো তুমাদের সাথে হামার কৌন দুশমনি নেই কিন্তু তুমরা যাকে মদত করছ তাকে আর
মদত করতে পারবে না। সে খরাব কাজ করেছে আউর তার জন্যে তাকে সাজা পেতে হবে।”
বাবা বললেন, “আপনি কার কথা বলছেন?”
“আরে ওই যে ছোকরা সোওয়াই জয়সিং কলেজে পড়ে তার কথা ।”
“ও, মানে প্রিয়ব্রতদার কথা বলছে!” কেকা বলল!
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওই। তুমরা চলে যাও।”
“আমরা তো চলেই যাচ্ছিলাম। আপনিই তো আমাদের ধরে এখানে পুরে দিলেন তাই আমাদের ফ্লাইটটা মিস হয়ে গেল।”
“না, না। তুমরা গেলে তো হবে না। হোটেলে যে আছে তাকেও যেতে হবে, সে কেন থেকে গেল? সবাই মিলে যাও।”
“ঠিক আছে তাই হবে। আমরা সবাই মিলে জয়পুর থেকে বেরিয়ে যাবো আর প্রিয়ব্রতর ব্যাপারে সাগর আর কোনরকম
মাথা ঘামাবে না।” মা ঘোষণা করলেন।
চলবে...
---------------- ---------------- ---------------- ---------------- ---------------- --------
এই ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাসটি প্রতি শুক্রবার অঙ্কুরীশা-র পাতায় ক্লিক করে পড়ুন আর মতামত জানান ।
---------------- ---------------- ---------------- -----------

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন