সোমবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২১

৭২তম প্রজাতন্ত্র দিবস এবং কিছু ভাবনা — বিমল মণ্ডল ।। Ankurisha।। E.Magazine।। Bengali poem in literature।।

 



৭২তম প্রজাতন্ত্র দিবস এবং কিছু ভাবনা 

বিমল মণ্ডল

  

২০২০ -এ কোভিড-১৯ কেড়ে নিয়েছে আমাদের ভালো মন্দ, সুখ-দুঃখ, হাসি - কান্না। আর আমাদের নিজস্ব ব্যক্তি স্বাধীনতা। একটা গোটা বছর ভয়ে ও আতঙ্কে কেটে গেল। তবু্ও আবার ফিরে এলাম নতুন বছরে। বছর শুরুতেই  আমরা  অনেক আশা নিয়ে নতুন ভোরের আলোতে আবারও মেতে উঠবো বলে। সেই গভীর প্রত্যাশা নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ২০২১ এ পথ চলা। আজ নতুন বছরের ২৬তম দিন, ২৬শে জানুয়ারি ২০২১, সার্বভৌম প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতবর্ষের ৭২তম প্রজাতন্ত্র দিবস। এ দিনটি শুধু ক্যালেন্ডারের পাতার কোনো জ্বলজ্বলে লাল তারিখ নয়, নয় কেবল শীতশীত আলসেমিমাখা মাঘ মাসের ছুটির একটি দিন, বছরের এই দিনটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য কিন্তু কোনভাবেই ফেলনা নয়।


ছোটবেলা থেকেই জানি প্রজাতন্ত্র দিবস মানেই একটা গোটা ছুটির দিন।ইচ্ছামত চলার দিন। স্কুলের মাঠে, খেলার ক্লাবে,মোড়ের মাথায়, পাড়ার শহীদ বেদীতে তেরঙ্গা পতাকা তোলার ভীড়,দড়ি ধরে একটা টান, তারপর,ফুলের পাপড়ীগুলো ঝরঝর ঝরলেই, কচিকাঁচাদের গলা ছাপিয়ে মাইকে কান ফাটানো দেশভক্তির গান, একটা কলা কি কমলালেবু ,দুটো লজেন্স, কি একমুঠো বোঁদে,কিছুটা মুড়ি,  সাথে ফ্রী ভাষণ। নেতাজী, গান্ধী, জহরলালের ছবিতে টাটকা ফুলের মালা।পাড়ার স্টেশনারী দোকানে তিনরঙা ফেস্টুন, টুপি,পতাকার দারুণ সেল । অদ্ভুত এক আনন্দে ডুবে যেতাম।    আজ  আকাশটা তিনরঙা না হলেও অনেক তিরঙ্গা আকাশের পটভূমিকায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে দেখছি। আজ এই আনন্দ কোথাও যেন মিলিয়ে গেছে। মুখে মাস্ক,হাতে স্যানিটাইজার নিয়ে দূরে দূরে দাঁড়িয়ে তেরঙা পতাকা উত্তলনে করছি  এককথায়  সব কিছু দূরত্ব বজায় রেখে। 

        

এবার ফিরে আসি প্রজাতন্ত্র দিবসে। এই    

প্রজাতন্ত্র দিবস মানেই মাইকে বা টিভিতে তারস্বরে দেশভক্তির গান বা সিনেমা , লালকেল্লার সরকারী অনুষ্ঠান, সামরিক বা বেসামরিক কুচকাওয়াজ, স্কুল বা বিভিন্ন ক্লাব প্রতিষ্ঠানের তরফে প্যারেড।আর আমরা কি করছি?এই সমগ্র ভারতের আম জনতা? আমি - আপনি’র ? ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপের প্রোফাইল পিকচারে জাতীয় পতাকা, বা ভারতের ত্রিবর্ণ ম্যাপ, স্ট্যাটাসে দেশভক্তির চরম পরাকাষ্ঠা, টিভির ভল্যুমটা বাড়ানো - এই সবের মধ্য দিয়ে প্রজাতন্ত্র দিবস পালনে ব্যস্ত। আজকের এই বিষয়   ফেসবুক   পোস্ট করতে না করতে কয়েক হাজার   লাইক, কমেন্ট! 


এদিকে স্কুল কলেজ বন্ধ। কোথাও কোথাও দেশাত্মবোধক গান ভেসে আসছে। আবার      মোবাইলে ভার্চুয়াল  প্রজাতন্ত্র দিবস পালন হচ্ছে বহু জয়গায়  যা ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপ খুললেই দেখা যায়। কোনও কোনও মোবাইলে       স্পেশাল রিংটোন বাজছে, ‘সারে যাঁহা সে আচ্ছা হিন্দুস্থান হামারা’…


আমার মনে বারবার প্রশ্ন আসে যে এই সব করে কি সত্যিই প্রজাতন্ত্র দিবস পালন করা যায়?  এর সার্থকতা কোথায়? ছোটোবেলায় আমার মনে কয়েকটি গান  নাড়া দিয়েছিল যা আজ এই দিনে  সেই গান পড়ে যায়। তা হল-

১. 'জনগণমন অধিনায়কও জয় হে'। 

২.'মা তুঝে সালাম'   

৩. বন্দেমাতরম         



এই সব গান আজকের প্রজন্মকে কি বেশি  আবেগপ্লুত করে তুলেছে? না কর্মহীন হয়ে  এই সবে কি ঝোঁক কমে গেছে? এই সব কিন্তু    বিতর্কিত বিষয় সন্দেহ নেই। কিন্তু আসল বিষয় হল  প্রজাতন্ত্র দিবসের ব্যাপারটা কি? খায় না মাখায়?  দেশ প্রজাতান্ত্রিক হলে তাতে দেশবাসীর কি লাভ? আরও কত কত প্রশ্ন আসে। তাহলে এর উত্তর খুঁজতে গেলে  প্রথমেই সর্বজ্ঞানের ভান্ডার গুগল কি বলে দেখে নিই —“একটি প্রজাতন্ত্র হল এমন একটি সরকার ব্যবস্থা যেখানে সর্বোচ্চ ক্ষমতা ভোগ করে জনগণ বা জনগণের একাংশ"। ইংরেজি ভাষায় "প্রজাতন্ত্র" শব্দের প্রতিশব্দ "republic" এসেছে  লাতিন শব্দবন্ধ res publica শব্দবন্ধটি থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ "জনগণ-সংক্রান্ত একটি বিষয়"। সাধারণত রাজশক্তি-বিহীন রাষ্ট্রকেই প্রজাতন্ত্র বলা হয়।


১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট, এ দেশের মানুষ অনেক আত্মদান, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করল । পতাকা বদল হলো, ইউনিয়ান জ্যাকের বদলে উড়লো তিরঙ্গা। আমরা সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে অখন্ডতা খুইয়ে স্বাধীনতা পেলাম। যদিও গান্ধীজি বলেছিলেন, দেশভাগ হলে আমার লাশের ওপর দিয়ে যেতে হবে। তবুও দেশভাগ হল, দু’ দুটো নতুন দেশ ‘হিন্দুস্তান’ (ভারত) ও ‘পাকিস্তান’ (বর্তমান বাংলাদেশ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল) তৈরী হল।  দিল্লীর মসনদে মোগলসাম্রাজ্যের পতনের পর বিদেশী শক্তির হাতে প্রায় দু’শো বছর পরাধীন থাকার পর এই যে ইংরাজ শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলাম…কেন? এ প্রশ্ন তো আসেই। মাঝরাতে চুপিসারে দেশ চালানোর ক্ষমতা দুধসাদা আচকানের পকেটে পুরে নিয়ে নেহেরুবাবু  স্বাধীন ভারতবর্ষের জন্মক্ষনে বলেছিলেন- "At the stroke of the midnight hour when the world will sleep India will awake for life and freedom".  এ প্রসঙ্গে পরে আসছি, আপাতত বলি, আমাদের এই স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল প্রধানত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি। আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের সঙ্গে গণতন্ত্রের যোগাযোগ ওতপ্রোত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ছিল গণতন্ত্রের আকাঙ্খা। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের সংবিধান প্রণীত হয় এবং আমাদের দেশ সেদিন থেকেই বিশ্বের দরবারে ‘ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সেই থেকে দিনটি আমাদের দেশের প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। প্রজাতন্ত্র দিবস, মানে যে দিন স্বাধীনতা লাভের পর ভারত এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে তার প্রথম সংবিধান গ্রহণ করেছিল,  তার মানে ভারতীয় সংবিধানের জন্মতিথিই হল ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস।  সংবিধানে বলা আছে সেখানে রাষ্ট্রের সব মানুষের জন্য সমানাধিকার? বলে কি? জাতি ধর্ম নির্বিশেষে শিক্ষার সমান অধিকার, আইনের সমান অধিকার, রুজি রোজগারের সমান অধিকার, ধন সম্পত্তি কায়েমের সমান অধিকার, এমনকি লিঙ্গ নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নবজাতকের ও নবজাতিকার সমান বাঁচার অধিকারও নাকি সংবিধানে স্বীকৃত! সত্যিই কি তাই? 


তাহলে রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে আমলা, টাটারাও পর্যন্ত তাঁদের দেখলে বোঝা যায়। সত্যিই কি   আমরা সমান অধিকার পাচ্ছি? এসব শুধু কয়েকটি  ফাঁকা বাক্য  মাত্র। যাঁরা আজ আমফানে কুঁড়েঘর টুকু হারয়েছেন তাঁরা সমস্ত সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা ভাবুন তাঁদের সংসার কি ভাবে চলেছে এই লকডাউন পর্বে। এসব কি এক?আমরা কি সবাই এক?না, এ সবের কোন মানে হয়?  শুধু কাগজে কলমে বড় মহান বড় উদার আমাদের এই ভারতীয় সংবিধান , এখানে সব মানুষ সমান। এ-সংবিধান এ-দেশের সকলের জন্য সুবিচার, স্বাধীনতা, সমতা ও সৌভ্রাতৃত্ব কায়েম করার নীতিমালায় বিশ্বাসী। আজ দেখুন কি ভাবে জনগণের টাকা নয় ছয় হচ্ছে রাজনীতি নেতারা যে যাঁর স্বার্থে তা এই সংবিধানকে ব্যবহার করছেন। তারমধ্যে কাদাছুড়াছুড়ি তো আছেই শুধু  এই দাবা খেলায় আমরা অর্থাৎ আমজনতারা স্বাধীন প্রজাতন্ত্রের দেশে আমরা সবাই পুতুল, যেমন খুশী নাড়ো চাড়ো,  মুখ বন্ধ রাখো। শুধু বিজ্ঞাপন ছেয়ে যায়।জনগণের টাকা এইভাবে লুট হয়ে যায়।      

এমনই প্রজাতন্ত্র দিনে তেরঙার পরিবর্তে কত ধরনের রঙের   পতাকা  ঝলমল করছে এই শুভদিনে। এমনই ছবি আমরা এই দিনেও দেখছি।   প্রজাতন্ত্রের মূল ক্ষমতা জনগনের ভোট ভিত্তিক, অতএব ইমামি ফতোয়ার জোরে, গান্ধীবাবার ছবি ছাপা নোটে, বস্তাবন্দী চাল-গম, বা কম্বলের বিনিময়ে মাপা হচ্ছে ভোটের পারানি। সারদা - নারদার কত কেলেঙ্কারি।  অনেক জায়গাতেই সীসার গুলি, বন্দুকের নল, রক্তের দাগ লাগা মাটি ও ঘরছাড়া নিরাপত্তাহীন মানুষদের।  আজ আমরা   চোখবন্ধ করে আমি.. আপনি.. আমরা সবাই.. একদিনের দেশপ্রেমিক সাজছি ।অথচ সীমান্তে কোথাও বালি পাচার, গরু পাচার রোধ করতে পারদ শরীরে নিয়ে অতন্দ্র পাহারায় খাকি পোশাকের ক‘টি মানুষের মত মানুষ,বাড়ী ছেড়ে, পরিবার ফেলে যাদের রোজ মৃত্যুর সাথে লুকোচুরী,আপনার আমার স্বার্থে দেশের সীমানার সুরক্ষায় জেগে ভারতীয় সেনা,ওরা আছে বলেই নিশ্চিন্ত আমার দেশে ধর্মের বোলবালা,ডাস্টবিনে কন্যাভ্রূণ,নারী নির্য্যাতন, ধর্ষন,ডাইনি হত্যা, আরো কত কি,ওরা আছে বলেই পুরো দেশ উৎসবে মগ্ন আর কাগজকলম নিয়ে প্রজাতন্ত্র দিবসের  প্রলাপ লিখে চলেছি আমরা।  


  প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে সারা ভারত জুড়েই নানা রকম জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় ,যেমনটি প্রতিবার হয় আর কি? শুধু এই বছর  এক আধটু সামাজিক দুরত্ব মেনে পালন করা। আর দূরত্ব?  মিটিং মিছিল সভা সবই তে তো নিয়মের তোয়াক্কা না করে সবই বাবুরা করছেন আর শুধু গালভরা বক্তৃতায় বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে। আদপেই কিছুই হচ্ছে না।     স্বাধীনতা দিবসের মত বছরের এইদিনেও সারা ভারতের সরকারী অফিস-আদালত, জেলখানা থেকে পাগলাগারদ, স্কুল কলেজ সব জায়গাতেই একটা খুশির আমেজ দেখা যেত তা যেন আজকের এই প্রজাতন্ত্র দিবস বেশির ভাগ ম্রিয়মাণ। কারণ স্কুল,কলেজ বন্ধ। ছাত্র - ছাত্রীরা সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত। তবুও কম -বেশি  এই  ২৬শে জানুয়ারিতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারত ‘যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ৭২তম প্রজাতন্ত্র দিবস কম -বেশি  উদযাপিত হচ্ছে সারা ভারতবর্ষে। এই প্রজাতন্ত্র দিবসে সবাই ভালো থাকুন। সবাইকে এই ৭২তম প্রজাতন্ত্র দিবসে গভীর শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।      


জয়হিন্দ

বন্দেমাতরম ।     



 ----------------------------------------------------------------    


 



৩টি মন্তব্য: