একগুচ্ছ
নববর্ষের কবিতা
তন্ময় চট্টোপাধ্যায়
১.
ছেলের জন্য পাখা
ছোটবেলা থেকে অমলকান্তি খুবই ভালোবাসে মাকে
বাবাকে বলে সে বাবামনি আর মাকে মাম্মীই ডাকে।
ছেলের গরবে গরবিনী মা যে,যাকে পায় তাকে বলে
ছেলে যে আমার হীরের টুকরো সেটা না বললেও চলে।
ছেলে ছেলে করে ব্যতিব্যস্ত নাওয়া খাওয়া গেছে ভুলে
ইহকাল আর পরকাল সবই মামনি রেখেছে তুলে।
কি খাবে যে ছেলে সারাদিন ধরে ম্যাগি নাকি চাউমিন
সেই চিন্তায় হাড় জিরজিরে আর স্লিম হয় প্রতিদিন।
সেই মাকে নিয়ে অমলকান্তি চিন্তায় জেরবার
রাখবে কোথায় কত ভালো ভাবে চিন্তাতেই কাবার।
ঘরেতে রাখলে খুবই ছোট ফ্ল্যাট নিজেদেরই কোনমতে
গৃহকোন তাও ঠাসা আসবাবে এসেছে অসৎ পথে।
ঘরে রাখে যদি ঘুমাতে দেবে না কি খেলি কি খেলি করে
গল্প শুনবে আদরের নাতি পরকাল ঝরঝরে।
সবচেয়ে ভালো বৃদ্ধাশ্রম সারাদিনই বিশ্রাম
অসম বয়সী থাকে খুবই কম গল্পই অবিরাম।
খবর জোগাড় হলো এ শহরে অনেক পরিশ্রমে
সবচেয়ে ভালো রাখা যাবে মা কে পাড়ারই বৃদ্ধাশ্রমে।
মা আছে ভালোই নাই প্রতিবাদ মুখে নাই কোনো কথা
চেপে আছে বুকে অচল পাথর জীবন জমানো ব্যথা।
কিছু দিন পরে ছেলের আদরে মা যখন ধরাশায়ী
মা পাঠালো ডেকে নিজের ছেলেকে তাড়াতাড়ি আসা চাই।
মা বলেন শোন বলিনি কখনও অচল মাথার পাখা
রাতের বেলায় আসেনাকো ঘুম পৃথিবীটা লাগে ফাঁকা।
বললো মাম্মীকে এতদিন পরে পাখাটা সারানো কেন
সারাটা জীবন পাখাটা ছাড়াই বলোনি তো কখ্খনো ।
কতো না কষ্টে সময় কেটেছে চেপে গেছো সব দুঃখ
সয়েছো সকলই এত অনাদর কখনও হওনি রুক্ষ।
নাতিকে বলেছি বাবা হলে বুড়ো রেখে যেও এই ঘরে
তোমারই তো বাবা ঠিকই থেকে যাবে একটু কষ্ট করে।
যখন তোমার আসবে না ঘুম একটু হাওয়ার তরে
মনকে বোঝাবে হাওয়া না থাকলে মানুষ যায়না মরে।
আমি চলে যাবো এই ঘর ছেড়ে,তোমারই বিছানা খানি
সে কথা ভেবেই পাখাটা সারানো কমে যাতে হয়রানি।।
২.
ঋতুরং
গরম নাকি দেখতে বেঁটে কালো,
পায়েতে নখ,মাথাতে তার সিং,
হাতের ছড়ি জড়িয়ে মাঠে ঘুরে
নিজেকে ভাবে এই ধরারই কিং।
নিজের পোষাক জমকালো বেশ দামী
এলাকাতে নাম ডাক তার খুব,
বর্ষা এলেই পোশাকটা জ্যাবজ্যাবে
মুখ লুকিয়ে কোথায় যে দেয় ডূব।
বর্ষা কখন ফর্সা,অন্ধকার
বুঝি না ভাই এই রূপের কি মানে
পোশাকটা তার ভীষণ আলুথালু
লুকোচুরি খেলতে ভালোই জানে।
শরৎবাবু ভীষণ পরিষ্কার
দিবসে মেঘ রাতের বেলায় তারা
মেঘ শিকারায় চাপিয়ে মনের ঝাঁপি
মাতিয়ে বেড়ায় দাপিয়ে সকল ধরা।
হেমন্ত কি ঘুমিয়ে থাকে সদাই
নইলে সে কি ভীষণ লাজুক নাকি ,
কখন যে সে আসে কখন যায়
দেখতে যে পায় সে জন ভীষণ লাকি।
ঠান্ডা নাকি দেখতে ভীষণ মোটা
বড্ড শীতে খুব গিয়েছে জমে,
অনেক ভায়াই তার জ্বালাতে কাবু
সিঁটিয়ে থাকে শীত দাদার ই নামে।
শীত কি থাকে সব খানেতেই এক
ভারখয়ানস্ক কিংবা অ্যানটার্কটিকা
কর না রে সার্চ গুগুলদাদার ঘরে
সবকিছুই তো সেথায় আছে লেখা।
কোট জ্যাকেটে মুড়িয়ে শরীরটাকে
শীত নাকি খুব মিষ্টি সাদা রংএ,
দাঁড়িয়ে থাকে ম্যালের গলির মুখে
গোল্ডরাসেরই চ্যাপি দাদার ঢংএ।
বছর শেষে বসন্তটা আসে
সব সময়েই মেজাজটা ফুরফুরে,
চায়না যেতে বাংলাদেশের থেকে
আসতে যে চায় সদাই ঘুরে ফিরে।
যখন যে যার টপ ফর্মে রয়
ভাসিয়ে বেড়ায় ধরার সকল লোকে,
গ্রীষ্মে পোড়ে ধরার সকল কনা
জীবন্তরা থাকে গভীর শোকে। ।
৩.
ভুলোমন
অপূর্ববাবু প্রতিদিন ই যান শহরের থেকে গ্রামে
অনেকেই যায় বাসে ট্রেনে চেপে শহরেতে ভীন কামে।
নামেই শহর,বাসাটা আসলে যোজন খানেক দূরে
রাস্তা তেমন হয়নি তৈরি,যেতে হয় বহু ঘুরে।
সেখানে এখনও হয়নি তেমন মোবাইলের চলাচল
চিঠিই এখনও যোগাযোগ আর খবরের সম্বল।
মিতালি যে লেখে মাঝে মাঝে চিঠি,দেয় সে বরের ব্যাগে
চিঠির আগেই মা আসেন ঘরে,মিতা থাকে উদ্বেগে।
কত না কষ্টে লেখা হয় চিঠি,হয় কত মেহনত
সে চিঠি যদি না পায় প্রাপক,না পায় নিজের পথ।
তবে সে তো বড় চাপের ব্যাপার,সময় পয়সা নষ্ট
ভেবে ভেবে মনে ধরে যায় জ্বালা,বিষয়টা অস্পষ্ট।
লিখেছিলো চিঠি পুজোর আগেই,পৌঁচেছে বড়দিনে
মনের ইচ্ছে দেখা করে আসে,দিয়ে আসে কিছু কিনে।
শুনেছে শহরে ট্রেন লেটে যায় দু তিন দিনের পরে
এ চিঠিতো লেট পুরো কোয়ার্টার,পৌঁছুতে কারো ঘরে।
যখনই নতুন ব্যাগ মিলে যায়,পুরনোকে ফেলে রেখে
কাগজ পত্র পুরোনো ব্যাগের,নতুনের পেটে ঢোকে।
গোছায় যতেক কাগজপত্র নিজের মতন করে
তখনই যা কিছু পুরোনো পত্র ফেলে দেয় ডাকঘরে।
সে দিন দিবসে বসে আছে বাসে,আপিসের পথ ধরে
বললো যাত্রী পেছনের থেকে ‘চিঠি ফেলো মনে করে ‘।
অপূর্ব ভাবে বার্তা পরের আনজন কেউ হবে
সে যে একা নয় না ফেরার দলে,আরও কেউ আছে তবে।
আপিসেতে ঢুকে বসেই চেয়ারে,চুমুক চায়ের কাপে
‘ফেলেছেন চিঠি’?চায়ের বয়টা বাবু পড়ে যান চাপে।
আপিসের বস,বড় রাসভারী,সেও কাছে এসে বলে
অপূর্ব তুমি বড় ভুলোমন,চিঠি দিতে যাও ভুলে।
মনে মনে রাগে মিতার উপরে,তাকেও অবিশ্বাস
কার তরে তবে এই বেঁচে থাকা,জীবন নাভিশ্বাস।
নিজের ঘরনী,এত জানাজানি,বাইরের লোক মাঝে,
এ সব কারনে বড় হয়ে ওঠে সামান্য ঘটনা যে।
চিঠিটাই নয় ফেলা হয়নিকো,তাতে এত হেলাফেলা
হেস্তনেস্ত আজই ঘটাবে,শেষ হবে এই খেলা।
অজানা অচেনা লোকও আজকে পেছনেতে মারে লাথি
ব্যাঙ বাবাজিও ল্যাঙ মেরে যায় কাদাতে পড়লে হাতি।
সাত পাঁচ এই ভাবতে ভাবতে ঘরের কপাটে টোকা
ছিটকিনি খুলে রয়েছে দাঁড়ায়ে আদরের বড় খোকা।
এসে বলে খুকি পাটা ধুয়েছো কি,এসে কি গিয়েছ বাথে
চা-টা তেলেভাজা আনি একথালা,খাই সবে একসাথে।
জামাটা খুলেই যেই না রেখেছে দেয়ালের আলনায়
অপূর্ব যেন তড়িতাহত,মরে যায় লজ্জায়।
জামা খুলে দেখে পিঠে লেখা আছে’উনি বড় মনভুলো
কোন সহৃদয় বলে দেন যেন ফেলে দেন চিঠিগুলো।।
---------------------------------------------------------------------
এই বিভাগে আপনিও মৌলিক ও অপ্রকাশিত লেখা পাঠান। মতামত জানান।
ankurishapatrika@gmail. com
---------------------------------------------------------------------

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন