মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২০

বইমেলা সংখ্যার গল্প ।। চিকিৎসা নির্দেশক (M.R) — যূথিকা দাস অধিকারী

 



বইমেলা সংখ্যার গল্প   

 চিকিৎসা নির্দেশক  (M.R)

যূথিকা দাস অধিকারী 
          


     
 চেম্বারের বাইরে রোগীদের বসার ঘর। বেশ ভিড়, কেউ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে,কেউ ঝিমোচ্ছে। রোগীর বাড়ির লোকেরা পর্দার ফাঁক দিয়ে উঁকি ঝুঁকি দিতে ব্যস্ত । কখন ডাক আসে...
দেওয়ালের গা -ঘেঁষে  চিকিৎসা নির্দেশক'দের ব্যাগের লাইন।
ডঃ অংশুমালী চট্টোপাধ্যায় রোগী দেখার ফাঁকে ফাঁকে নির্দেশক'দের সাথে কথা বলে নিচ্ছেন। তাতে রোগীর বাড়ির লোকেরা বিরক্ত হচ্ছেন,কিন্তু উপায় নেই ,অপেক্ষা করতেই হবে।
লাইনে ব্যাগ রেখে বাইরে দাঁড়িয়ে গল্প করছে সাত -আট জন নির্দেশক। না কোন কাজের কথা নয়,হাসি মশকরা ই বলা যেতে পারে। 
শুধু একটি ছেলে ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের হবে, নির্বাক  চিত্তে শূন্যে তাকিয়ে কি যেন ভেবেই চলেছে। এইভাবে  লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে তার ভালো লাগেনা। কিছুতেই নিজের কাজে পরিতৃপ্ত নয় সে। অন্য কিছু স্বপ্ন ছিল তার।
 অসহায় 'মা' দরজায় দরজায় শাড়ি ফেরি করে ,রাত-দিন সেলাই করে ছেলের স্বপ্ন পুরণ করতে পারেনি।
একটা সময় অভিরূপ বলেছিল  মা-কোথাও কোন কানা-খোঁড়া, কালা-বোবা মেয়ের বাবা যদি আমার উচ্চশিক্ষার  দায়িত্ব নেয় ...আমি প্রতিষ্ঠিত হয়ে সেই মেয়েকে বিয়ে করবো । সেদিন  ভীষণ রকম আঘাত পেয়েছিলেন রূপের 'মা'।  না...... কানা-খোঁড়া ,কালা-বোবা বৌ'এর কথা ভেবে নয়। নিজের অক্ষমতার  কথা ভেবে। বড় অপরাধী লাগছিল নিজেকে। অভাবের চাবুকে ক্ষত-বিক্ষত 'মা' সেদিন ছেলের আকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতায় ঝাঁজরা হয়ে যায়।  দুমড়ে- মুচড়ে আছাড়ি -পাছাড়ি খায় ,মা'এর অন্তরাত্মা । বুকে পাথর চাপিয়ে বলেছিল.. আমি নিরুপায় রে বাবা। সংসারের ভার তোকে নিতে হবে।
ক্যাম্পাসিং থেকে পাওয়া  চাকরিটা বাধ্য হয়েই নিয়েছিল অভিরূপ।
বেশ কয়েকটি রোগী দেখার পর  নির্দেশকদের পালা,আকাশ-কুসুম ভাবনা থেকে নজর ফিরেল  চেম্বারের দরজায়। অতনু ভেতরে ঢুকছে। মাঝে আর একজন,তার পর ই অভিরূপের ব্যাগ।
 বাইরে  একজন মাঝবয়সী লোক অসুস্থ  'মা' কে আগলে বসে আছে,বোঝা যাচ্ছেনা ঠিক কী হয়েছে।চোখে-মুখে মাছি ঢুকে যাচ্ছে,অচৈতন্য প্রায়।
অতনু চেম্বার থেকে বেরোনোর সাথে সাথে ---ঐ বয়স্ক লোকটি তার পা জড়িয়ে .. হুমড়ি- খেয়ে পড়ল! ডাক্তার বাবু ডাক্তার বাবু আমার 'মা'কে বাঁচাও। 'মা'ছাড়া আমার আর কেউ নেই গো। আমি যে অনাথ হইয়ে যাব।
অতনু অস্থির হয়ে বলল আরে থামুন থামুন আমি তো ডাক্তার নই। ভেতরে ডাক্তার বাবু আছেন,তাঁর কাছে নিয়ে যান,তিনি আপনার মা'এর চিকিৎসা  করবেন। চিন্তা নেই আপনার 'মা' সেরে যাবেন।
সে তো এক্কেবারে নাছোড়বান্দা! না... বাবু তুমিই বড় ডাক্তার আছো,তুমিতো ঐ ভিতরে বসা ডাক্তার কে  ওষুধের নাম শিখাইতেছিলে,কি রোগের কি ওষুধ লাগে ,কখন কেমুন খাইতে হবে তাও বৈলে দিচ্ছিলে।  আমি পর্দার ফাঁক দিয়া সব দেইখছি। তুমার কাছে উ ডাক্তার সব শিখছে। তুমি যা জান উ তা জানে নাই।.......... তুমি তো ডাক্তারের  মাষ্টার আছো।আমার 'মা'কে বাঁচাও বাবু,আমার 'মা'কে বাঁচাও।।
অভিরূপ  থ'মেরে সব শুনছিল। দেখছিল।হঠাৎ  চোখের সামনে ভেসে ওঠে কাঁধে শাড়ির ব্যাগ ,  চোখের নীচে কালি পড়া  বিবর্ণ  মুখটা। একজন অশিক্ষিত  ,অসহায় অতি সাধারণ লোকের অনুভূতি আর অভিব্যক্তি  এক নিমেষে  বদলে দিল অভিরূপের চিন্তাধারা।
এক ঝটকায় অতৃপ্তির শেকড় ছিঁড়ে বেরিয়ে এল এক সাচ্ছা "চিকিৎসা নির্দেশক"।



--------------------------------------------------------------------------------
আপনিও বইমেলা সংখ্যার জন্য গল্প পাঠান। 
মতামত জানান।
ankurishapatrika@gmail. com

--------------------------------------------------------------------------------      

              

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন