বুধবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২০

ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (পর্ব- ৯) ।। অষ্টভুজ রহস্য - অলোক চট্টোপাধ্যায়

 



ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (পর্ব- ৯) 

   অষ্টভুজ রহস্য

অলোক চট্টোপাধ্যায়  


ফেরার পথ সেই আঁকাবাঁকা গ্রামের রাস্তা পেরিয়ে বাবুবাজার হয়ে বাসরাস্তা। নতুন ব্রীজে ওঠার আগে সুজয়বাবুদের গাড়িটা দাঁড়িয়ে গেল। রাজিন্দারও গাড়ি থামাল। সুজয়বাবুরা নেমে ব্রীজের রেলিং এর ধারে গিয়ে ওনাদের বাগান দেখালেন। খানিকটা দূর থেকে হলেও বেশ দেখা গেল ঘন গাছের সারি। প্রধানত আমগাছ, তবে অজয়বাবু জানালেন ভেতরের দিকে কাঁঠাল, পেয়ারা, জাম আর কয়েকটা লিচুগাছও আছে। তারই মধ্যে সারি বেঁধে মাথা উঁচু করে খাড়া রয়েছে অনেকগুলো নারকোল গাছ। খালটা এখানে একটা ছোট্টো বাঁক নিয়ে আবার সোজা হয়ে গেছে। ফলে বাঁকের ধারের বাগানের অংশটা অনেকটা দেখা যায়।
খালে জল এখন বেশ কম। জল আর শক্ত পাড়ের মাটির মধ্যের জায়গাটা কাদায় ভরা। তার অপর কয়েকটা লম্বা কাঠের পাটাতন পড়ে ছিল। প্রায় কুড়ি বাইশ ফুট মতন লম্বা আর ফুট খানেক করে চওড়া। কিছু আবার দুটো করে লম্বা তক্তা আড়াআড়ি কাঠ দিয়ে একসাথে জোড়া। পলাশ জানতে চাইল ওগুলো কি। সুজয়বাবু উত্তর দেবার আগেই কুণাল বলে উঠল – ওগুলো ভাঁটার সময় জল নেমে গেলে নৌকো থেকে পাড়ে যাতায়াতের জন্যে ব্যবহার হয়।
কুণালের মামার বাড়ি বর্ধমানের একটা গ্রামে। পাশে একটা নদিও আছে। তাই এই ব্যাপারটা তার জানা। সুজয়বাবু বললেন – ঠিক বলেছ ভাই। আমাদের ফলের চালান খাল দিয়েও কিছুটা হয়। বাঁধানো ঘাটও আছে আমাদের। বাঁকের ওপাশে বলে এখান থেকে দেখা যায় না।
বাসন্তী হাইওয়েতে পড়ে একটা লাইন হোটেলে লাঞ্চ করার জন্যে দাঁড়ানো হল। রাজিন্দার শুধু ওদের সঙ্গে খেল না। কাছাকাছি কোথাও ওর কোনো বন্ধুর অটো পার্টসের দোকান আছে। রজতবাবুর অনুমতি নিয়ে গাড়ি নিয়েই সে ঘুরে আসতে গেল সেখানে। রজতবাবু শুধু বললেন আধঘন্টার ভেতর ফিরে আসতে। এমনিতেই অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। কলকাতায় পৌঁছোতে সন্ধ্যে পেরিয়ে যাবে।
রাজিন্দার অবশ্য মিনিট কুড়ির মধ্যেই ফিরে এল। ততক্ষনে এরাও হাল্কা লাঞ্চ সেরে যাবার জন্য তৈরি। এখান থেকে দুটো দলের রাস্তা আলাদা। সুজয়বাবুদের গাড়ি ফিরবে বাসন্তী হাইওয়ে ধরে। রাজিন্দারের গাড়ি ক্যানিং হয়ে বারুইপুরের রাস্তা ধরবে। দক্ষিণ কলকাতার লোকদের জন্যে এই পথটাই সুবিধের। বিজয়বাবু এবার নিজেদের গাড়িতে উঠলেন। তার আগে হাত মেলালেন ওদের সঙ্গে। 
-কালকে সন্ধ্যের দিকে একবার আমাদের বাড়িতে একবার আসুন মিস্টার রায়। রজতবাবুকে বললেন বিজয়বাবু। -পরশু আমার ফেরার টিকিট। তার আগে একবার –
-আপনি না বললেও কাল আপনাদের ওখানে আমরা যেতাম। তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে রজতবাবু বললেন। -এই ব্যাপারটা নিয়ে আরো কিছু  আলোচোনা করার আছে। 
শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর দুটো গাড়ি রওনা হল। একটু এগিয়েই রাজিন্দারের গাড়ি ঘুরল বাঁ দিকে, ক্যানিং এর রাস্তায়। সুজয়বাবুদের গাড়ি সোজা বেরিয়ে গেল বাসন্তী হাইওয়ে ধরে।
মোড় ঘুরেই কিন্তু গাড়ি দাঁড় করালেন রজতস্যার। নেমে গেলেন গাড়ির থেকে। রাস্তার ধারে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। যেন অপেক্ষা করছেন কারো জন্যে। তারপর ফিরে এসে রাজিন্দারকে বললেন গাড়ি ঘোরাতে। আর রাজিন্দারও যেন এমনি নির্দেশের অপেক্ষাতেই ছিল, কোনো প্রশ্ন না করে সোজা ইউ টার্ন নিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে আনল আগের রাস্তায়। তারপর একপাশে দাঁড় করিয়ে দিল।
-একটু অপেক্ষা কর এখানেই। রজতবাবু বললেন। - খেয়াল কর ওদের গাড়িটা কোনো কারণে ফিরে আসছে কিনা।
-কি ব্যাপার স্যার? আমরা কি এখন ফিরছি না? কুণাল প্রশ্ন করল।
-নাঃ। আমরা এখন আবার যাব কদমফুলিতে। রজতবাবু মুচকি হেসে বললেন। পলাশ আর কুণাল উত্তেজনায় সোজা হয়ে বসল। তার মানে তাদের স্যার সত্যি সত্যি হাল ছেড়ে দিননি।
সে কথা বলতেই স্যার হেসে ফেললেন। - আরে, ওরকম না বললে কি আর ওনারা নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ির পথে রওনা হতেন? সেই জন্যেই বলতে হল সবসময়ে সব অলৌকিক কান্ডের ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায়না ইত্যাদি। সে যাই হোক তোরা এবারে বল, এই পুরো ঘটনাটা তোরা কিভাবে করবি ?
উত্তর দিতে দেরি হলনা। স্যারই ওদের শিখিয়েছেন কিভাবে সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মত এক একটা ঘটনাকে বিশ্লেষন করতে হয়। কি করে এক একটা ব্যাখ্যা তৈরি করে তার সম্ভাব্যতা বিচার করতে হয় আর নানা থিওরির ভেতর থেকে একটাকে বেছে নিয়ে তার স্বপক্ষে যুক্তি বা প্রমান খুঁজতে হয়। পলাশ শুরু করল – প্রথমে, আপনি যেটা বিজয়বাবুকে বললেন, মানে ওনার রিকশার ওপরে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা ঘুমিয়ে পড়া এবং স্বপ্ন দেখা। বোঝাই যাচ্ছে ওটা আপনি ওনাদের কিছু একটা বোঝাতে হয় বলে বুঝিয়েছিলেন। কারন সওয়ারি অজ্ঞান হয়ে গেছে বলে রিকশাওয়ালা তাকে রাস্তায় নামিয়ে চলে যেতে পারে, কিন্তু খেটেখুটে তাকে অন্তত পঞ্চাশ মিটার বয়ে নিয়ে গিয়ে ভাঙা বাড়ির ভেতরে রেখে আসবে না। 
-ঠিক কথা। রজতস্যার বললেন। বলার সঙ্গে সঙ্গে রাজিন্দারজিকে গাড়ি স্টার্ট করার ইশারা করতেই গাড়ি আবার রওনা হল ফুলবেড়িয়া কদমফুলির পথে। রজতস্যার ওদের দিকে ফিরে বললেন - তারপর ?
-একটা সম্ভাবনা, বিজয়বাবু সমস্ত ঘটনাটাই বানিয়ে বলেছেন। এবারে কুনাল বলল। - কিন্তু এই থিওরির মুশকিল হল এই বানিয়ে বলার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারন আপাত ভাবে দেখা যাচ্ছেনা।
-সেটা আমিও ভেবেছি। রজতস্যার বললেন। - কারনের অভাব ছাড়াও আর একটা পয়েন্ট আছে। আমি পুরো বর্ণনাটা ওনার মুখে দুবার শুনেছি। একবার ওনাদের বাড়িতে, দ্বিতীয়বার গাড়িতে আসার সময়ে উনি যখন তোদের বলছিলেন তখন। বানিয়ে বললে ডিটেলে একটু এদিক ওদিক হওয়াটা স্বাভাবিক । কিন্তু সেরকম হয়নি।
-এদুটো যদি বাদ দেওয়া যায় তাহলে আর একটা সম্ভাবনাই বাকি থাকে। পলাশ বলল। - আর সেটা হল, বিজয়বাবু বাস্তবিক কোনো একটা জায়গায় পৌঁছেছিলেন। সেখানে উনি, মনে হয় কফিতে মেশানো ঘুমের ওষুধের প্রভাবে অজ্ঞান হয়ে যান। সেখান থেকে ওনাকে কোনোভাবে ঐ পুরোনো বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছিল। যেখানে উনি গিয়েছিলেন সেই জায়গাটা, মানে ঘরটা, ঘটনাচক্রে ওনাদের দাদুর বাড়ির অষ্টভুজ ঘরের মত দেখতে।
-এর স্বপক্ষে যুক্তি বা প্রমান কি কি আছে?
-ঘরটা দেখে উনি অষ্টভুজই ভেবেছিলেন। কাজেই নিশ্চয়ই সেটা প্রায় একই রকম দেখতে। আর যেহেতু, একটা ঘর কয়েক ঘন্টার মধ্যে ওরকম ভাঙাচোরা অবস্থায় বদলে যেতে পারেনা, কাজেই  নিঃসন্দেহে বলা যায় ঘরদুটো আলাদা। কুনাল বলল। আর তার কথার রেশ টেনে পলাশ জানাল - আর খুব জোরালো না হলেও প্রমানও একটা আছে। ঐ বাঁধানো ছবিটা স্যার। আপনি ভাল করে দেখতে বলাতেই আমরা খুঁটিয়ে দেখেছি। ছবিটা অনেকদিন ওভাবে ঝুলে থাকলে ওটার পেছনের দেওয়ালে ধুলো ময়লা জমার কথা নয়। কিন্তু আমরা এক ফাঁকে ছবি সরিয়ে দেখেছি, পেছনের দিকটা অন্য জায়গার মতই ধুলোয় ভর্তি। মানে খুব সম্প্রতিই ওটা ওখানে টাঙানো হয়েছে। সম্প্রতি মানে বিজয়বাবুকে বয়ে আনার সময়েই ওটা আনা হয়েছিল ঘরের বদলে যাওয়াটা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে।
-সাবাশ। রজতস্যার খুশি লুকোনোর কোনো চেষ্টা করলেন না। - তোরা আমার ইশারাটা ঠিক ধরতে পেরেছিলিস। ওই কাজটা আমি করতে গেলে সকলে খেয়াল করত। এবার আর কয়েকটা জরুরি প্রশ্ন, সেই অন্য ঘরটা কোথায় হতে পারে? দুটো ঘর, তাও একটা ছোট্টো গ্রামের মধ্যে, একরকম দেখতে হল কি করে? তারপর, সেখান থেকে বিজয়বাবুকে অজ্ঞান অবস্থায় এ বাড়িতে নিয়ে আসা হল কিভাবে, কোন পথে? আর সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন, এ কাজ কে করল আর কি উদ্দেশ্যে করল?
ওরা দুজনে এতদুর ভাবেনি। ওদের চুপ করে থাকতে দেখে স্যার বললেন –সময়টা আটটা থেকে সাড়ে আটটার ভেতর। বাড়ির সামনে দিয়ে আসতে গেলে দোকানের লোকেরা দেখে ফেলত। যারা এ কাজ করেছে তারা কিছুতেই এতটা ঝুঁকি নেবেনা। আচ্ছা, তোদের হোগলা বনের ভেতরটা দেখতে বলেছিলাম, ইশারায় অবশ্য। কিছু খেয়াল করেছিস ওখানে?
পলাশ সংক্ষেপে বিবরণ দিতে দিতে হঠাৎ উত্তেজনায় সোজা হয়ে বসল। - আমি বুঝতে পেরেছি স্যার জলাজমির কাদাটা ওরকম সমান কি করে হয়েছিল আর কোন পথে বিজয়বাবুকে ওই বাড়িতে আনা হয়েছিল।
-ঠিক ধরেছিস। রজতস্যারের মুখে হাসি। - ঐ জলাজমির ওপর নৌকোয় ওঠানামার লম্বা পাটাতনগুলো পেতে রাস্তা বানান হয়েছিল। মাঝখানের সোজা দাগটা দুটো তক্তার মাঝের ফাঁকের জন্যে হয়েছিল। জলার অন্যদিকে বাগান। রাতে অন্ধকার থাকাই স্বাভাবিক। সেখান দিয়ে দু-চার জন লোক সকলের নজর এড়িয়ে অনায়াসেই একটা লোককে চ্যাংদোলা করে এদিকে নিয়ে আসতে পারে।
-কিন্তু তাকে কোথা থেকে আনা হয়েছিল? কুনাল জিগ্যেস করল। - মানে ঠিক কোথায় তাকে কফি খাইয়ে অজ্ঞান করা হয়েছিল সেটা কিভাবে জানা যাবে?
-সেটা একটা সমস্যা বটে -, স্যার বললেন। - তবে একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবি সমস্যাটা সেরকম কঠিন কিন্তু নয় । ইন ফ্যাক্ট, আমরা এখন কদমফুলি যাচ্ছি সে ঘরটাকেই খুঁজতে।


চলবে...

----------------'---------------------------------------------------------------------------

এই ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাসটি প্রতি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত  অঙ্কুরীশা-র পাতায়   ক্লিক করে পড়ুন ও পড়ান। মতামত জানান। 

ankurishapatrika@gmail.com

------------------------------------------------------------------------------------------------                           

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন