লেবেল

বুধবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২০

ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (৫ম পর্ব)।। অষ্টভুজ রহস্য ।। অলোক চট্টোপাধ্যায়।।

 



ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (৫ম পর্ব)


অষ্টভুজ রহস্য

অলোক চট্টোপাধ্যায়


ক্লাস টুয়েলভের কেমিস্ট্রির পিরিয়ড নিচ্ছিলেন রজত রায়। ক্লাস যখন প্রায় শেষের দিকে বেয়ারা এসে একটা চিরকুট দিল তার হাতে। প্রিন্সিপ্যাল বরেনবাবু ডেকে পাঠিয়েছেন। সংক্ষিপ্ত নোট –একজন কেউ দেখা করতে এসেছেন, ক্লাসের পর আমার চেম্বারে আসুন।

মিনিট দশেক বাকি ছিল। শেষ করে প্রিন্সিপ্যালের ঘরে গেলেন রজত বাবু। বরেন বাবুর সামনের চেয়ারে বসে আছেন এক ভদ্রলোক। রজত রায় ঢুকতে উঠে দাঁড়ালেন। হাত মেলালেন তার সঙ্গে । বরেন বাবু পরিচয় করানোর বদলে মুচকি হেসে বললেন – ভুতুড়ে কান্ড-কারখানার তদন্ত করে তোমার তো বেশ নাম ডাক হয়েছে দেখছি। পুলিশের লোকেরাও তোমার খোঁজ নিচ্ছেন।

রজতবাবু কিঞ্চিৎ বিব্রত হয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছেন, তার আগেই ভদ্রলোক বললেন – আমি সুগত বাগচি। লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের অফিসার।একটা অলৌকিক ঘটনার খবর নিয়ে, কিংবা বলতে পারেন ব্যাখ্যা খুঁজতে আপনার কাছে এসেছি। তবে পুলিশ হিসেবে নয়, এসেছি ব্যক্তিগত ভাবে।

-কিন্তু আপনি কি করে জানলেন আমি এই বিষয়ে অনুসন্ধান করে থাকি? রজতঅবাবু কৌতুহল জানালেন।

-ভুতেরাই তোমার পাবলিসিটি করছে বোধহয়। কোনদিন দেবে ঘাড় মটকে তখন বুঝবে মজা। খুব চিন্তান্বিত মুখে বললেন বরেনবাবু।

বলার ভঙ্গীতে হেসে ফেললেন সুগত বাগচি। তারপর রজতবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন – আপনি নিজেকে যতটা অখ্যাত ভাবছেন ততটা কিন্তু নন। আপনার কিছু কাজ নিয়ে পুলিশ মহলেও রীতিমত আলোচোনা হয়েছে। আর লোকাল থানায় যোগাযোগ করে আপনার ডিটেল জেনে নেওয়া একজন পুলিশ অফিসারের পক্ষে মোটেও কঠিন কাজ নয়। এখন বলুন আপনি কি আমার সঙ্গে একটু আসতে পারবেন?

-বোঝো ব্যাপার! হাত উলটে কৃত্রিম হতাশা প্রকাশ করলেন বরেন বাবু। রজত রায় অনুমতি চেয়ে তাকে বললেন –এই পিরিয়ডটা আমার অফ। লাস্ট পিরিয়ডটা মহীতোষকে বলে দিচ্ছি ও নিয়ে নেবে।

-তাই কর তাহলে। প্রিন্সিপ্যাল সম্মতি জানালেন।  –তবে সাবধানে থেকো। যাদের সঙ্গে লাগতে যাচ্ছো তারা কিন্তু আমার মত নিরীহ ভালমানুষ নয়। ভালমানুষ কেন, মানুষই নয় – অ্যাজ পার ডেফিনেশন। উত্তরে রজতবাবুও খুবই বিনয়ের সঙ্গে বললেন – কি যে বলেন স্যার, আপনার মত এমন নিরীহ ভালমানুষকে যে এত দিন ধরে সামলাচ্ছে সামান্য কয়েকটা ভুত তার কাছে কিছুই নয়।

-তুমি কি আমাকে অপমান করছো নাকি? কপট কোপে ভুরু কোঁচকালেন বরেন বাবু। - যাও যাও, এক্ষুনি দূর হয়ে যাও আমার সামনে থেকে। আর যাকে যা বলার বলে এনার সঙ্গে ভুত ধরতে বেরিয়ে পড়। তার পরেই অবশ্য সুর পালটে সুগত বাবুর দিকে চেয়ে বললেন – কিছু মনে করবেন না ভাই। আমরা নিজেদের মধ্যে এরকম ভাষাতেই কথা বলি। তবে ছাত্রদের কান বাঁচিয়ে।

-আপনার প্রিন্সিপ্যাল খুব মজার মানুষ, তাইনা? স্কুল থেকে বেরিয়ে প্রশ্ন করলেন সুগত বাগচি। রজতবাবু উত্তরে হাসলেন, ওনার উৎসাহ না থাকলে এ কাজে এতটা সময় আর এনার্জি নিশ্চয়ই খরচ করতে পারতাম না। সে যাক, এবার আপনার ঘটনাটা শুনব। আমার বাড়ি একদম কাছেই, সেখানে বসে আমরা কথা বলতে পারি।

সুগত বাবু অন্য প্রস্তাব দিলেন। - তার চেয়ে আমরা যদি একটা ট্যাক্সি নিয়ে তাইতে বসে আলোচোনা করি সেটাই বেশি ভাল হবে। আসলে যার সঙ্গে ঘটনাটা ঘটেছে তিনি একে তো বয়স্ক লোক তার ওপর একটা অদ্ভুত ঘটনার ধাক্কায় একটু অসুস্থও হয়ে পড়েছেন। প্রেশার বেশ কিছুটা বেড়ে আছে। তাই আপনাকেই তার কাছে যাবার জন্য অনুরোধ করতে এসেছি। আশা করি আপনি আপত্তি করবেন না।

-না না , আমার কোনো আপত্তি নেই। রজতবাবু জানালেন। - কিন্তু ওনার বাড়ি কোথায়?

-সল্ট লেক। উল্টোডাঙ্গা দিয়ে সামনে পড়বে। সুগতবাবু বললেন। -আপনার ফেরার ব্যবস্থাও আমিই করে দেব। চলুন যেতে যেতে আমি ঘটনাটা আপনাকে বলে দিই, মানে আমি যেরকম ওনার কাছ থেকে শুনেছি। তারপর আপনি সরাসরি ওনার কাছ থেকেই যা যা জানার জিগ্যেস করে নিতে পারবেন। 

ট্যাক্সি নিয়ে সল্ট লেকের দিকে রওনা হলেন ওরা দুজন। সুগতবাবু বললেন – ভৌতিক ঘটনার সাক্ষী বা শিকার যাই বলুন, হয়েছেন ডক্টর বিজয় দত্ত। আমেরিকার একটা ইউনিভার্সিটির ফিজিক্সের প্রফেসার। ওদেশের স্থায়ী নিবাসী। মূল বাসিন্দা এখানকারই। মানে ছোটোবেলা কেটেছে এখানেই। ছোটো দুই ভাই থাকেন এখানে। ট্রান্সপোর্টের পারিবারিক ব্যবসা। অবস্থা যথেষ্ট ভাল। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার একটা গ্রামে ওনাদের দাদুর দিক থেকে পাওয়া সম্পত্তি আছে। বিশাল ফলের বাগান আছে সেখানে, আর একটা পোড়ো বাড়ি। ঘটনাটা ঘটেছে সেখানেই। গত পরশুদিন।

সংক্ষেপে ব্যাপারটা শুনে নিলেন রজতবাবু। তারপর বললেন – এ নিয়ে আপনাকে প্রশ্ন করে তো কোনো লাভ নেই। কারন সবটাই আপনার কানে শোনা। তবে একটা জিজ্ঞাস্য আছে, আপনি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন কিভাবে?

-আমার মামা আদিনাথ সান্যাল বিজয় দত্তর কলেজ জীবনের বন্ধু। সল্ট লেকে কাছাকাছিই বাড়ি। বিজয় বাবু কলকাতায় এলেই দুই বন্ধুর নিয়মিত দেখা হয়। এবারেও ওনার আমেরিকা ফেরৎ যাবার আগের দিন, মানে গতকাল, আমার মামা যান ওনার সঙ্গে দেখা করতে। গিয়ে শোনেন এই কান্ড। কিছু না ভেবেই মামা  তক্ষুনি ফোন করে আমাকে ডেকে পাঠান। সব শুনে আমিতো স্তম্ভিত। কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা ব্যাপারটার। তখন আপনার কথাটা আমার মনে এল। কদিন আগেই আপনার একটা তদন্তের কাজ নিয়ে আমরা কয়েকজন আলোচোনা করছিলাম। এই কেসটা শুনে মনে হল আপনাকে বলে যদি কোনো হদিশ করা যায়। ওখানে আপনার কথা বলতে মামা এবং বিজয় দত্ত দুজনেই রাজি হয়ে গেলেন। তারপর আর কি? তখুনি ভবানীপুর থানাতে যোগাযোগ করে আপনার খোঁজ বার করে ফেললাম।

- আচ্ছা, বিজয় বাবুর আমেরিকা ফেরার তারিখ কবে? রজত বাবু জানতে চাইলেন।

-আজকেরই টিকিট ছিল। সুগতবাবু বললেন। - আমার মামাই ওকে তারিখ পেছোনোর কথা বলেন। প্রধানত ওনার শারীরিক অবস্থার জন্যে। উনি রাজি হয়ে যান। তিনদিন পরের টিকিটও পাওয়া গেছে।

-তার মানে আমাদের হাতে আর দুদিন সময় আছে। নিজের মনেই বললেন রজতবাবু।

-আচ্ছা, পুরো ঘটনাটা শুনে আপনার কি মনে হয়? সুগতবাবু জিগ্যেস করলেন।

-যেটুকু শুনলাম তাতে প্রাথমিক ভাবে মনে হয় রিকশায় ওঠার পর কোনো কারনে বিজয়বাবু জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। ছেলেমানুষ রিকশাওয়ালা সম্ভবত বাড়ির সামনে পৌঁছোবার পর সেটা আবিষ্কার করে আর খুব অবিবেচকের মত ওনাকে কোনোমতে বাড়ির বাইরের ঘর পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে মাটিতে শুইয়ে রেখে পালিয়ে যায়। উনি পুরোনো দিনের চিন্তায় এতটাই বিভোর ছিলেন যে অজ্ঞান অবস্থার ঘোরের মধ্যে উনি ঐ সব ঘটনা কল্পনা করে নেন। আপাতত এছাড়া আর কোনো ব্যাখ্যা তো আমার মাথায় আসছে না।

-আমিও তাই ভেবেছিলাম। সুগতবাবু জানালেন। - কিন্তু ওদের বাড়িটা ফাঁকা নির্জন জায়গায় হলেও বাড়ির গলিটার সামনেই কয়েকটা দোকান আছে। রাত নটা পর্যন্ত লোকজন থাকে। সুজয়বাবু বলেছেন ওরা দাদার খোঁজে ওখানে গিয়ে প্রথমেই দোকানগুলোতে জিগ্যেস করেছিলেন ওই বাড়িতে কাউকে যেতে দেখেছিল কিনা। এমনিতে কেউ খেয়াল করেনি এটা ঠিক, কিন্তু এটাও সত্যি গলিটা চওড়া হলেও ঝোপঝাড়ের জন্যে রিকশা ঢোকার মত অবস্থা নেই । কাজেই সামনের রাস্তা থেকে কেউ যদি কোনো লোককে পাঁজাকোলা করে ওখানে ঢোকাত দোকানের লোকজন কেউ না কেউ সেটা খেয়াল করত। সুতরাং অজ্ঞান অবস্থায় বিজয়বাবুর সেখানে পৌঁছোনোর বিশেষ সম্ভাবনা নেই। 

-আচ্ছা, ভাইদের সঙ্গে বিজয়বাবুর সম্পর্ক কিরকম? রজতবাবু প্রসংগ পালটালেন? । - মানে আপনার কথা বলার সময়ে কি মনে হয়েছে?

-যেটুকু বুঝলাম সম্পর্ক বেশ ভালোই। দাদার ঘটনাটা এবং শরীর খারাপ শুনে ছোটোভাই পরদিন সকালেই শিলিগুড়ি থেকে চলে এসেছে। সকলেই বেশ উদ্বিগ্ন। কথা না শুনে একলা ঐ পোড়োবাড়িতে যাবার জন্যে দুই ভাইএরই ক্ষোভ প্রকাশের থেকে মনে হল দাদার ব্যাপারে তারা যথেষ্ট কনসার্নড। দাদাও এরকম কান্ড ঘটানোয় বেশ লজ্জিত। তবে ফিজিক্সের অধ্যাপক হিসেবে এই ঘটনার ব্যাখ্যা খুঁজে না পাওয়ায় তিনি বেশি চিন্তিত। ছোটোভাই অজয়ের কথায় মনে হল দাদা তাদের ছেড়ে আমেরিকায় সেটল করায় তার একটু অনুযোগও আছে।

-আচ্ছা, ওনাদের পৈতৃক সম্পত্তি বা দাদামশাইএর সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে কোনো মনান্তর থাকতে পারে কি?

-মনে হয় ,না। সুগতবাবু বললেন। - আপনি চাইলে একটু ডিটেলে জিগ্যেস করতে পারেন। তবে আমি মামার কাছে খোঁজ নিয়েছিলাম, উনি যা জানেন তাতে বিজয়বাবু স্বেচ্ছায় তার অংশ দুই ভাইকে ছেড়ে দিয়েছেন। কাজেই বিষয় সম্পত্তি ঘটিত কারণে ওনাদের ভেতর চাপা বিদ্বেষ থাকবে বলে মনে হয়না।



(ক্রমশ)



--------------------------------------------------------------------------------


এই ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাসটি প্রতি বৃহস্পতিবার পড়ুন। মতামত জানান।

ankurishapatrika@gmail. com


--------------------------------------------------------------------------------

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন