লেবেল

বৃহস্পতিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০

ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (পর্ব-৫)।। নেপথ্য সংগীতের আড়ালে — অন্যন্যা দাশ

 




ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (পর্ব-৫)

নেপথ্য সংগীতের আড়ালে

অন্যন্যা দাশ      


দিল্লিতে বাহাই মন্দির, কুতুব মিনার, রেডফোর্ট, ইণ্ডিয়া গেটের চক্কর মেরে ভলভো বাসে করে জয়পুর পৌঁছতে বিকেল

হয়ে গেল।
মামার অফিস থেকে সাতটা নাগাদ শেঠ কুন্দনলাল ঝভরের সঙ্গে আ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া ছিল। মা বাবা হোটেলে চলে
গেলেন আর মামা, অখিলবাবু আর জিকা-কেকা চলল শেঠজির সাথে দেখা করতে।
অখিলবাবু একটু কিন্তু কিন্তু করছিলেন অবশ্য। বললেন, “আমি সঙ্গে গেলে উনি কিছু মনে করবেন না তো?”
“তা জানি না, তবে জিকো-কেকা যদি যেতে পারে তখন আর আপনার যেতে বাধা কোথায়?”
শেঠ কুন্দনলালের বাড়ি যাওয়ার পথে হাওয়া মহলটা পড়ল। জিকো-কেকা অটো থেকে প্রায় নেমে যাচ্ছিল “হাওয়া মহল,
হাওয়া মহল!" করে!   
মামা বললেন, “এখন না জিকো কেকা, অন্ধকার হয়ে গেছে! আগে শেঠজির সঙ্গে দেখা করে নিই। এখনকার দ্রষ্টব্যগুলো
পরে দেখা যাবে।” 

জয়পুরের ভিড় রাস্তা ঠেঙ্গিয়ে মামা, অখিলবাবু আর জিকো, কেকা যখন শেঠজির বাড়িতে গৌছল তখন সাড়ে সাতটা বাজে।
মাথায় পাগড়ি পরা একজন বয়স্ক লোক এসে দরজা খুলে দিল। বাড়ির ভিতরটা হিন্দি সিনেমাতে দেখা বড় লোকদের ঘরবাড়ির মতন। কুন্দনলাল ঝভরের যে অর্থের অভাব নেই সেটা বাড়িতে ঢুকলেই বোঝা যায়। 
কুন্দনলাল ঝভর অবশ্য ওদের দেখে মোটেই খুশি হলেন না, “আপনার দেখছি সময়ের কোন জ্ঞান নেই! আমি সময়নিষ্ঠ
লোকজন গছন্দ করি কারণ আমার সময় যথেষ্ট দামি!”
মামা বললেন, “কৈফিয়েত দেওয়ার চেষ্টা করছি না কিন্তু আমরা আজকেই দিল্লি থেকে এলাম!”
“সে সব আমি জানি না! সময়ে আসতে চাইলেই সময়ে আসা যায়! যাক আপনার কি বক্তব্য বলুন।”
“আমাদের অফিস ধূর্জটি কর্মকারকে রিপ্রেসেন্ট করছে। তাই আপনার বাড়ির ঘটনাটা নিয়ে আমার কয়েকটা প্রশ্ন ছিল।”“ও বুঝেছি! তার মানে আপনারা চোরের দলে!”
“আইনে বলে অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত কেউ কিন্তু অপরাধী নয়। তাই যতক্ষণ না আদালতে প্রমাণ হচ্ছে যে ধূর্জটিবাবু চুরি করেছিলেন ততক্ষণ কিছুই বলা যায় না!”
“ও সব চুলচেরা তর্ক মশাই! ও দিয়ে চিড়ে ভিজবে না।”
“সে না ভিজুক। আপনি বলুন সেদিন ঠিক কি ঘটেছিল।”
”কেন? যাতে আপনারা ওই চোরকে বেকসুর খালাস করাতে গারেন?”
“আপনি কিন্ত প্রতিকূল আচরণ করছেন শেঠ কুন্দনলাল। আপনি যদি এই রকম ব্যবহার করেন তাহলে আমার আপনাকে
সমন পাঠিয়ে দিয়ে কোর্টে হাজির করে সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ করা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না!”
সেটা শুনে কেমন যেন মিইয়ে গেলেন শেঠ কুন্দনলাল।
“ঠিক আছে, কী জিজ্ঞেস করার আছে করুন।”
“সেদিন যা ঘটেছিল যদি একটু বলেন কোন কিছু বাদ না দিয়ে, তাহলেই হবে।”
“আসুন এঘরে তাহলে” বলে ওদের একটা ঘরে নিয়ে গেলেন শেঠজি। ঘরের মাঝখানে একটা কোমর পর্যন্ত উচু
শ্বেতপাথরের থাম মতন করা, তার উপর একটা কাচের বাকসো বসানো।
“এটা হল আমার ডিসপ্লে চেম্বার। কোন পাথর দেখাতে হলে আমি এই কাচের ভিতর রাখি আর লোকে দেখে। অ্যালার্ম,
ইনফ্রা রেড রে যা যা দরকার সব করা আছে ওই কাচের বাক্‌সোটা ঘিরে। সেদিনও সব কিছু অ্যাক্টিভেট করাই ছিল। গৌরবমণিটার জন্যে। সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখছিল তারপর ধূর্জটি হঠাৎ বলল যে ওই কাচের ভিতর থেকে ভালো করে ছবি তোলা যাচ্ছে না। তখন আমি অ্যালার্ম আর রে সব ডিঅ্যাক্টিভেট করে ওকে আ্যামেথিস্টটার ছবি তুলতে দি।”
“আর কে কে ছিল তখন ঘরে?”
“আমি, আমার সেক্রেটারি তথাগত, আমার দুই বন্ধু হিম্মতলাল খুরানা আর অজিত পাঠক, ধূর্জটি আর রাজেশ্বর প্রসাদ।““রাজেশ্বর প্রসাদটাকে?” 
“ইতিহাসবিদ। সে নামী দামি রাজারাজড়াদের ইতিহাস লেখে। হিম্মতলালের ভাল বন্ধু!”

“ও আচ্ছা।”
“যাই হোক, অ্যালার্মটা ডিঅ্যাক্টিভেট করার পর আমার সেলফোনে ফোন আসে। আমি ফোনটা ধরতে দরজার বাইরে
যাই। অন্যরা সবাই ঘরেই ছিল। ঠিক তক্ষুনি একবার আলো চলে যায়। কয়েক সেকেন্ডের জন্যে গিয়েছিল আলো। সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় চলে আসে। তখন আমি ঘরে ফিরে দেখি পাথরটা নেই। আমি সবাইকে ওই ঘরেই বন্ধ করে দিয়ে পুলিশ ডাকি। আমি বলি তোমরা সবাই সম্মানিত লোক। আমি নিজে সার্চ করে তোমাদের লজ্জিত করব না কিন্তু গৌরবমণি আমাদের পরিবারের ঐতিহ্য, সেটাকে নিয়ে কেউ পালাতে পারবে না। যা করার পুলিশ এসে করবে। পুলিশ এসে সবাইকে সার্চ করে এবং ধূর্জটির ব্যাগ থেকে বের হয় আ্যামেথিস্টটা। তারপর তো ওর বাড়িতে গিয়ে সার্চ করতে সেখানেও দুটো পাথর পাওয়া যায়। ব্যাস, আর তারপর যাকে বলে দা রেস্ট ইজ হিস্ট্রি।”
“আপনার ফোনে ফোনটা কার এসেছিল জানতে পারি?”
“সেটা আমার কাছে রহস্য। আমার ব্যাবসা সংক্রান্ত ফোন অনেক আসে কিন্তু এটা কার বুঝতে পারলাম না। নম্বর
আনলিস্টেড। আমি হ্যালো হ্যালো করতে থাকলাম কিন্তু ওদিক থেকে কেউ কোন উত্তর দিল না। আমার ঘর থেকে বেরনোটা ভুল হয়ে গিয়েছিল মনে হয় কিন্তু আমি ভেবেছিলাম ঘরে অতজন রয়েছে তার মাঝে কিছু হবে না। আমারই ভুল।”
“আলো যাওয়ার ব্যাপারে পুলিশে কি কিছু বলেছে?”
“না, সেটা নিয়ে ওরা কিছু বলেনি। একবার চোর ধরা পড়ে যেতে ওরা ওই নিয়ে আর কথা বলেনি।”
“বাড়িতে আর কে কে আছে আপনার?” 
“আমার স্ত্রী বিন্দু আছে কিন্তু সে তো নিজের ঘরে ছিল। আর আছে দুজন কাজের লোক, বসন্ত আর ফুলমোতিয়া। বাকি
কাজের লোক দিনেরবেলা আসে। বসন্ত আর ফুলমোতিয়া আমাদের অনেক দিনের লোক, বহু বছর আছে আমাদের সাথে। বসন্তই আপনাদের দরজা খুলে দিল।”
“আর আপনার সেক্রেটারি? সে কতদিন আছে?”
“দু’বছর। অফিসে আমার আলাদা সেক্রেটারি আছে। এখন ব্যাবসা এত বেড়েছে যে কাজ বাড়ি নিয়ে আসি তখন ওকে
লাগে। ও কাজ করে বিকেল তিনটে থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত।” 
“কি কাজ ওর?”
“বেশিরভাগ কাজ চিঠিপত্রের জবাব দেওয়া। আমি কমপিউটার একদম চালাতে পারি না।”
“ও আচ্ছা। তবে ধূর্জটিবাবু বলেছেন যে অ্যামেথিস্টটা ওঁর ব্যাগে অন্য কেউ রেখে দিয়েছিল পুলিশের ভয়ে।”
“হা, হা করে হাসলেন কুন্দনলাল শেঠ, “ও! আর অন্য মণিগুলো? ওর বাড়িতে বুঝি কেউ ওগুলোও রেখে এসে ছিল?
আর যে রেখেছিল সে জানত যে পুলিশ সেদিন সার্চ করবে! কি যে বলেন আপনি। ওই সব চোর-ছ্যাঁচোড়দের কথা বিশ্বাস
করেন কি করে আপনারা? আর ওকে তো শুধু চোর বলা যায় না, ও তো খুনি। কালনাগ তো অনেক লোকের প্রাণও নিয়েছে। সেই রকম লোকের হয়ে কেস নিতে আপনাদের বিবেকে একটুও কি বাধে না?”
জিকো-কেকা মুখ চাওয়া চাওয়ি করল। অখিলবাবুর মুখ কাঁচুমাচু।
মামা হেসে আবার বললেন, “ওই যে বললাম না, অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত কেউ অপরাধী নয়। ধূর্জটিবাবু আমাদের

অনেক দিনের ক্লায়েন্ট। ঠিক আছে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সব কিছু বলার জন্যে। আশা করছি আপনাকে আর বেশি বিরক্ত করতে হবে না। শুধু আপনার বন্ধুদের একটু বলে দেবেন যে আমি তাদের সাথেও কথা বলতে যাবো।”
বাইরে বেরিয়ে মামা বললেন, “জিকো কেকা আজ রাতের মধ্যে ঘটনাটা লিখে ফেলতে পারবি? তার সাথে তোদের মোটিভ
আর অ্যালিবাইয়ের চার্ট? আমার শরীরটা একটু খারাপ লাগছে। বাস স্টেশানের পাশে ওই দোকানের মিষ্টিগুলো ভালো ছিল না মনে হচ্ছে।”
বাস থেকে নেমে বাস স্টেশানের পাশের একটা দোকান থেকে ওরা চা, সিঙ্গারা মিষ্টি খেয়েছিল। জিকৌ-কেকা দুজনেই
অবশ্য মিষ্টি খায়নি। মামা মোবাইলে নিজের এক ডাক্তার বন্ধুকে ফোন করে ওষুধ কিনলেন একটা দোকান থেকে।
মামা বাবা-মা সবাইকেই ওষুধ খেতে হল। আশ্চর্যের বিষয় ওই একই মিষ্টি খেয়েও অখিলবাবুর কিছু হয়নি। ভদ্রলোক
বললেন, “জোয়ান বয়সে কত লোহা খেয়ে হজম করেছি তার ঠিক নেই! বাসি মিষ্টিতে আমাকে কাবু করতে পারবে না!”
তারপর বললেন, “তবে খুব আনন্দ পেয়েছি জানেন, ঝভর শেঠকে সিংহ থেকে কেঁচো করতে আপনার ঠিক তিনমিনিট
লেগেছে।”
সেটা শুনে মামা মুচকি হাসলেন, “আগে ওই রকম ধমক খেয়ে ভয় পেতাম কিন্তু এখন আর ভয় লাগে না। সবারই কোন
না কোন আ্যাচিলিস হীল থাকে, সেখানে আঘাত করলেই সব কুপোকাৎ1”
“আ্যাচিলিস হীল আবার কি?” অখিলবাবু কেমন যেন বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
“আ্যাচিলিস ছিল একজন বিখ্যাত গ্রিক যোদ্ধা। খুব ছোটবেলায় অ্যাচিলিসের মা ওকে স্টাইক্স নদীতে নিয়ে গিয়ে ডুবিয়ে
ছিলেন যাতে ওর শরীর এমন শক্ত হয়ে ওঠে যেন তীরের আঘাতে ওর কিছু না হয়। কিন্তু ওকে ডুবিয়ে ছিলেন একটা পায়ের গোড়ালি ধরে বলে সেখানে নদীর জল লাগেনি। সেই অংশটাই দুর্বল থেকে গিয়েছিল এবং শেষমেষ ওখানেই তীর লেগেই ওর মৃত্যু হয়।“ 



মৃত্যু হয়। যাই হোক, সেই থেকে আ্যাচিলিস হীল কথাটা চলে আসছে, যে ষত শক্তিশালী লোকই হোক না কেন, কোন না কোন দুর্বলতা তার থাকেই। যেমন শেঠজির কোর্টে যেতে ভয়।”



চলবে...


'-------------------------------------------------------------------------------------------
প্রতি শুক্রবার প্রকাশিত  এই ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাসটি  অঙ্কুরীশা-র পাতায় ক্লিক করে পড়ে নিন। মতামত জানান। 

ankurishapatrika@gmail. com

.--------------------------------------------------------------------------------------------                          


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন