বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২০

প্রসঙ্গঃ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও কাঁথি

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও কাঁথি প্রসঙ্গ
--------------------------------
বিমল মন্ডল 


আধুনিক বাংলা সাহিত্যে যিনি সম্রাট সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন , তিনিই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। উপন্যাস ও প্রবন্ধ সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর এই অভিধা সর্বতোভাবে প্রযোজ্য।   

সেই সঙ্গে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের যোগাযোগ। বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৬০ খ্রীস্টাব্দের জানুয়ারিতে চাকরি সূত্রে তৎকালীন 'নেগুয়া' মহাকুমার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর হয়ে এসেছিলেন। যা বর্তমানে 'কাঁথি' মহাকুমা নামে পরিচিত। সেই সুবাদে  তিনি প্রায় দশমাস কাঁথিতে ছিলেন। এই দশমাসে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা তথা কাঁথিতে থাকাকালীন তিনি ঘুরে বেড়াতেন কাঁথির বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে। তাঁর অসাধারণ সাহিত্য সৃষ্টিতে ঐ সময়ের এক অনবদ্য  গল্পকাহিনী "কপালকুণ্ডলা" উপন্যাস  উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন পাঠককে।
যা পরবর্তী সময়ে বারুইপুরে গিয়ে তিনি ১৮৬৬ খ্রীস্টাব্দে "কপালকুণ্ডলা" উপন্যাসটির লেখা  শেষ  করে ছিলেন ।
তৎকালীন 'নেগুয়া " মহাকুমা বর্তমানে কাঁথি মহাকুমা নামে পরিচিত। এই কাঁথি থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে রসুলপুর নদীর অবস্থান। রসুলপুর নদী ও বঙ্গোপসাগরের সংযোগস্থলে বালিয়াড়ি ঘেরা ঘন জঙ্গল বেষ্টিত বিস্তৃত জায়গাটি 'দারিয়াপুর ' নামে পরিচিত। যা বর্তমানে কাঁথি শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দারিয়াপুর। এখন এই গ্রাম দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছে ঐতিহাসিক 'কপালকুণ্ডলা'    মন্দিরের নামে। দারিয়াপুরে একটা লাইটহাউস আছে । এই লাইটহাউসের অনতিদূরেই বয়ে যাচ্ছে রসুলপুর নদী। পেটুয়াঘাট এই জায়গাটি বর্তমানে এখন  'ফিসিংহারবার' নামেই পরিচিত।   

'বাঁকিপুট' দারিয়াপুর থেকে একটু দূরে অবস্থিত। বাঁঁকিপুটও ছিলো কপালকুণ্ডলা উপন্যাসের অন্যতম প্রেক্ষাপট। বিট্রিশ আমলের একটা লাইটহাউস বাঁকিপুট সমুদ্র সৈকতে কাছাকাছি। এই লাইটহাউসের উপর থেকে সমুদ্রের অনন্য গতিপথ উপলব্ধি করা যায়।       

এই উপন্যাসের  গল্পে  যে চরিত্রটির কথা আগে মনে পড়ে, সেই চরিত্রটি হলো কাপালিক। এই কাপালিক  আর তাঁর  পালিত কন্যা কপালকুণ্ডলাকে নিয়ে এই জঙ্গলে থাকতো। আর  সেই নামেই এখন কপালকুণ্ডলা মন্দির। সবার ধারণা যে এই মন্দির কাপালিক আর কপালকুণ্ডলা থাকতো। সেই কাপালিক  এই উপন্যাসের নায়ক নবকুমারকে বলি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। সেই জঙ্গল ঘেরা  সমুদ্রতীরের মন্দিরটি বছরের পর পড়ে থেকে ধ্বংসপ্রায়  হয়ে গিয়েছিলো। 

পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদ ও হেরিটেজ কমিশনের  উদ্যোগে বেশ কয়েক বছর আগে আমূল সংস্কার করা হয়েছে। এই কপালকুণ্ডলা মন্দিরে প্রতিদিন নিয়ম মেনে  কালীপুজো হলেও   ঐ মন্দিরের  মধ্যে কোনো কালীর প্রতিমা নেই। এই মন্দিরের সামান্য দূরে  রয়েছে একটা শিব মন্দির। দারিয়াপুর গ্রামবাসীর তত্ত্বাবধানে শিব মন্দিরের সামনে একটা কালী মন্দির তৈরি করা হয়। সেই মন্দিরের নামও দেওয়া হয় কপালকুণ্ডলা মন্দির। সেই মন্দিরের কাছাকাছি  গ্রামবাসী সাহিত্যসম্রাটের স্মরণে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করেছেন।  প্রতিদিন কালীপুজোর পাশাপাশি 
সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কেও প্রদীপ জ্বালিয়ে পুজো ও সম্মান জানানো হয়। 

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুর (১৮৯৪খ্রীঃ ৮ই এপ্রিল)  পর  কাঁথি তথা তৎকালীন যুগে 'নেগুয়া' মহাকুমার সমস্ত মানুষ কেঁদেছিলেন। আর সেই থেকে দারিয়াপুর গ্রামে  প্রতিবছর মহাসমারোহে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের নামে একটা মেলা হয়ে থাকে। সাতদিন ধরে নানান অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দূর -দূরান্ত  থেকে আসা মানুষ  মিলিত হন। 
 'কপালকুণ্ডলা' উপন্যাসের  কারণে কাঁথি আর বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একে অপরের সমার্থক হয়ে উঠেছে। 

  আজ ৮ই এপ্রিল। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের  ১২৬ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানাই ।     -
----------------

বিমল মণ্ডল। স্কুল শিক্ষক। কবি ও প্রাবন্ধিক। রয়েছে বেশ কিছু কবিতার বই। 
ঠিকানা -কাঁথি
পূর্ব মেদিনীপুর।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন