আদর
বিমল মণ্ডল
বয়স পাঁচ কি ছয়
মনটি নির্মল হয়
হাল্কা আদর গায়ে
মায়ের দিকে চেয়ে
মায়ের কাছে আছে
ছায়ার মত আছে
মা ছাড়া কিছুই নয়।
অভাব আছে তার
খেলার সময় নেই আর
সারাদিনের শেষে
আলুভাতে বসে
চাওয়ার নেই বেশী
নেই তার রেষারেষি
আদর খায় মার।
মা ছাড়া জীবনে তার
বাবা,দাদা, দিদি সে আর
মা আর আভাব চলে সমানে
উঠানে বসে খোঁজে তার মানে
বাইরের জগৎ চেনেনা সে
তবুও সবার সাথে দুঃখ ভুলে হাসে
মার জন্য শিক্ষা পেল সে আবার।
একদা মা চলে গেল তাকে ছেড়ে
বড়ো হয়েছে তবুও কাঁদে অন্তরে অন্তরে
অভাব হয়তো আর নেই তার
মার অভাব থেকে গেল আবার
অভাব নিয়ে চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে
আদরের পাওয়ার জন্য সে পথে পথে ঘোরে
এমন সময় কেউ তার পেছনে এসে হাত দুটো ধরে।
সব অভাব মুছে যাবে আদর মাখানো শরীরে
তোমায় খুঁজে পেল সে এতো মানুষের ভীড়ে
ঝগড়া হবে, আড়ি হবে তবু্ও তুমি আদর দেবে
মায়ের মতো সমস্ত শরীর ছায়ায় ঘিরে রাখবে
তাই তো তুমি তাকে জড়িয়ে ধরবে আদরে।
শপথ
বিমল মণ্ডল
তোমাকে আমি দেখেছি গভীর সুখে
ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছি তোমার চোখে মুখে
হাত বাড়িয়ে টেনে নিও তোমার হৃদয় মাঝে
অন্তরেতে রাখবো তোমায় আমার কাছে কাছে
ভুল করে দিওনা কষ্ট দিওনা দূরে ফেলে
ছোট্ট থেকে কেউ আমাকে ভালোবাসেনি বলে
বুঝেছি তোমারও আমার মতো কষ্ট অনেক আছে
তাই তো বলি তুমি আমি থাকবো কাছে কাছে
বাধা আসবে জেনেও সামলে তুমি নেবে
তোমার মতো আদব কায়দা শিখিয়ে তুমি দেবে
পরস্পরের এই শপথটি দুটি হৃদয়ে যদি থাকে
রক্তের সম্পর্ক ছাড়া এই শপথ টিকে রাখে।
পান্তা ভাতের গন্ধ আসে
বিমল মণ্ডল
পুকুরপাড়ে মায়ের শরীর ঘিরে গোবরের দাগ
মাঝেমধ্যে বাতাস গিলে
ছেঁড়া কাপড়খানা পরে বাড়ি -পুকুর হেঁটে চলে ভাতের খোঁজে।
পান্তা ভাতের টক গন্ধ বারান্দা থেকে ভেসে আসে
মাটির দেওয়ালের পাশে অলৌকিক হাত
যে হাত স্নেহময় আদরের।
দুঃখ মহাকাল হয়ে জন্ম -মৃত্যুর নিজস্ব চিহ্ন মাখে
যেখানে জন্মের পর
পৃথিবীর জাগতিক নিয়মে পরিচিত
সেখানে মৃত্যুতে শেষ হয়ে যায়
এই জন্ম -মৃত্যুর নিজস্ব প্রেম কি করে পাবে?
এই রহস্যময় ঘেরা পৃথিবীর কিনারে
আজও পান্তা ভাতের গন্ধ আসে।
জীবন
বিমল মণ্ডল
জীবন শব্দের সাথে কঠিনতা যুক্ত থাকে
জীবনের ক্রম ঘুড়ির দড়ির মতো বিছিয়ে যায়
গোছানো খুব সহজ হয়ে ওঠে না
আলো আর অন্ধকারে ভাসা আর ডোবা এই জীবন
প্রতিনিয়ত নিজের মানুষের কাছে সুখের আশা খোঁজে
জীবন জলে সুগভীর খাদে পড়ে যায়
ভাসতে ভাসতে অচেনা মানুষের হৃদয় পায়
বাঁচাতে চায় নতুন করে নতুন ভাবে জীবন কে নিয়ে
সামান্যতম সংকোচে শরীর এলিয়ে দেয় জীবন ঘিরে
দুটো হাত জড়িয়ে ধরে সারা শরীর ঘিরে ।
এক বয়স্কা মায়ের গল্প
বিমল মণ্ডল
রুগ্ন শরীর , শরীরে বয়সের ছাপ
আদি - অন্তহীন প্রহর গুনছে ভাবলেশ হীন মুখে
যৌবনের স্মৃতি মনে এলে ভাবে এ কোন অভিশাপ
ছেলে তাঁর বিশেষ রত্ন তবু নেই যেন সুখে
ছেলে ছিল মস্ত অফিসার কত কর্মচারী ছিল কাছে
হৃদয় এখন পাথর হয়েছে ছেলের দুঃখ দেখে
ছেলের স্বপ্ন উড়ছে আকাশে তাই বেঁচে আছে
প্রতিটি সময় হাঁটছে ছেলে আগের উদ্দেশ্য সামনে রেখে
দিন - রাত চিন্তাতে আর ঘুম আসে না
ছেলে আবার আগের মতো দাঁড়াক এটাই কামনা।
তুমি
বিমল মণ্ডল
তুমি যখন আমার কাছে এলে
তোমার দুচোখে দেখেছি সীমার মাঝে অসীম
আমার হৃদয়ে তুমি ভালোবাসা দিলে
রাত্রিময় আকাশে তোমার দান অপরিসীম।
বেদনা আর কষ্টে গড়া তোমার শরীর
চিন্তার মাঝে খুঁজে পেয়েছো আমায়
তুমিই প্রতীক আমার পৃথিবীর
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আমি শরীরের অর্ধেক দেবো তোমায়।
কতবার তুমি আঘাত খেয়েছো কাঁটার
কতবার তুমি ধরেছো বেদনার গান
হৃদয়ে শূণ্যতার সুর পেয়েছো কতবার
তোমার সান্নিধ্যে আজ পেয়েছি অপরূপ ঘ্রাণ।
জীবনে ধরে রাখো জয়ের সাক্ষর
এ তোমার সব চেয়ে বড়ো পাওয়া
আমি তোমার হয়ে করবো ঝঙ্কারমুখর
তোমার কাছে শুধু এই টুকু চাওয়া ।
অন্ধকার থেকে আলোর পথে এলে
তোমার মুখে তবুও মধুর অস্ফুট সুরে
অস্থির অবগাহনে ডুব দিয়ে তুমি গেলে
চিরকাল তুমি যেন আমাকে ছেড়ে যাবে না দূরে।
যা কিছু তুমি- আমি ভাগ করে নেবো
আমার ভালোবাসায় খাদ নেই জানো
তাই আমি তোমায় সাথে পত্রপুটে খুঁজে যাবো
যেখানে তুমি, তোমার স্পর্শে ভালোবাসা দেবে।
জীবন
বিমল মণ্ডল
জীবন শব্দের সাথে কঠিনতা যুক্ত থাকে
জীবনের ক্রম ঘুড়ির দড়ির মতো বিছিয়ে যায়
গোছানো খুব সহজ হয়ে ওঠে না
আলো আর অন্ধকারে ভাসা আর ডোবা এই জীবন
শপথ
বিমল মণ্ডল
তোমাকে আমি দেখেছি গভীর সুখে
ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছি তোমার চোখে মুখে
হাত বাড়িয়ে টেনে নিও তোমার হৃদয় মাঝে
অন্তরেতে রাখবো তোমায় আমার কাছে কাছে
ভুল করে দিওনা কষ্ট দিওনা দূরে ফেলে
ছোট্ট থেকে কেউ আমাকে ভালোবাসেনি বলে
বুঝেছি তোমারও আমার মতো কষ্ট অনেক আছে
তাই তো বলি তুমি আমি থাকবো কাছে কাছে
বাধা আসবে জেনেও সামলে তুমি নেবে
তোমার মতো আদব কায়দা শিখিয়ে তুমি দেবে
পরস্পরের এই শপথটি দুটি হৃদয়ে যদি থাকে
রক্তের সম্পর্ক ছাড়া এই শপথ টিকে রাখে।
হিসেব
বিমল মণ্ডল
জন্মে মায়ের সাথে
হিসাব হাতে হাতে
কৈশোরে পড়াশোনা
হিসেব হয়ে যায় জানা
পড়ার শেষে একটা চাকরি
হিসেব কষাটা একদম জরুরি
সম্পর্ক ঠিক কি রক্তের?
এটা বলা একেবারে শক্তের
বিয়ের পরে বৌয়ের হাতে
হিসেব তুলে দেয় সাথে সাথে
মা, বাবাকে ছেড়ে শহরে
চলে গেল বৌয়ের হাত ধরে
সম্পর্ক তো ছিল রক্তের!
সারা গায়ে দাগ এখন ক্ষতের
আত্মার টানে ভালোবাসা ফেরে
রক্ত সেখানে মিলবে না একেবারে
সারজীবন এই ভালোবাসা
তোমার আমার মেটাবে আশা
ভুল করে আঘাত দেবে না মোটে
চিরকাল যেন তোমাকে নিয়ে কাটে
আপন যদি হিসেবে আপন হয়
পর তবে হিসেবহীন পর নয়।
দুঃসময়
বিমল মণ্ডল
দু'দিন আগে ভালোবাসার
কথা হলো
রাতের চাঁদ আড়িপাতে
সমস্ত কাজ ফেলে গনতন্ত্রকে ভালোবেসে
রাতে পৌঁছেদেয় নির্বিবাদে
সকাল হতেনা হতে বেলপাতা আসে ভেসে
সব ভুলে ধরি এক এক করে
সহসা ঝড় ওঠে অজানা বাতাসে
নিজ চেষ্টায় নির্ভয়ে সরে যায় একটু দূরে
লুটিয়ে পড়ে তাজাতাজা রক্তে ভেসে
স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে আকাশে চেয়ে ভাত মাগে
তিন টুকরো হয় শরীরের অবয়ব
এই কাজ কি আজ গনতন্ত্রে লাগে?
----------------
আঘাত
বিমল মণ্ডল
-সেই ছোটো থেকেই
অভাব, অনটন , দৈন্যতা
আমাকে গাছ হতে ভাবিয়েছে
-আমার মায়ের আঁচল , মায়ের হাঁটা , মায়ের অভাব
আমাকে সমুদ্র হতে শিখিয়েছে
-আমার শিক্ষা , আমার নীতি , আমার ভাগ্য
আমাকে মানুষ হতে শিখিয়েছে
আসলে এসবের পেছনে আমার মা, আমার চেষ্টা , আমার শিক্ষা
সব পেয়েও আঘাত, বেদনা আমাকে ক্ষত বিক্ষত করেছে
তারপর তোমার স্পর্শ
মুহূর্তে ভালোবাসতে শিক্ষা দিলে
কাছে অনেক কাছে
হৃদের গভীরে আমার শেকড় তোমাকে ঘিরে
শুধু ভয়ে ভয়ে থাকি আঘাতের
ততক্ষণে ছড়িয়ে পড়েছে দুজনের শক্ত শেকড় ।
হৃদয়
বিমল মণ্ডল
আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ
রাতে সব পথ চেনা চেনা লাগে
মায়াবী ভালোবাসা কিছুটা চেনা যায় কিছুটা যায়না
রাতের সবুজবীথি হৃদয় ঘিরে
জ্যোৎস্নার গভীর আলোকে অস্পষ্ট হয় ভালোবাসা
চাওয়া পাওয়ার আবর্তে ঘুরপাক
আদর, অনাদর মাখা হৃদয় থেকে ভালোবাসা সরে যায়
রাত কেটে ভোর আসীন
হৃদয়ে ভুল ভাঙে
ক্রমশ হৃদয়ে হৃদয় মেশে
দূরত্ব আর বাড়ে না
আসলে আমার হৃদয় তোমাকে দিয়েছি
আজীবন ভরে ।
উত্তরসূরী
বিমল মণ্ডল
যদিও তুমি আমাকে নিয়ে স্বপ্নে থাকো
জেনে নাও তোমার স্বপ্ন মিথ্যা নয় সত্য
ঢেলে দিয়েছ আমার হৃদয়ে দুর্জয় বল
তোমার ভাবনার বাগানে কত ফুল ফুটে উঠেছে
তবুও তোমার চিন্তা মিশে যায় বায়ুস্তরে
আমাকে ঘিরে - বৃহৎ তোমার সৃষ্টি ভাবনা
শরনার্থী হয়ে তোমার কাছে, সন্তান হয়ে যোগ্য উত্তরসূরী -এ অদ্ভুত ক্ষুধা তোমারও
আমি ধীরে ধীরে জনরবহীন প্রান্তরে যাই হারিয়ে
তুমি এ জগৎ শূন্য ভেবে আমাকে নিজ সন্তানের সুখ দিলে
তোমার অসমাপ্ত গল্পের উত্তরসূরী হয়ে
বেঁচে থাকার নেশা আমাকে ঢের বল দেয়।
বাঁচতে শেখাও
বিমল
যখন যেমন পেয়েছি আমার জীবন
দুঃখ, কষ্ট সব সহেছি জীবনে
মায়ের শক্তি পেয়েছি আমি মনে
বাঁচার জন্য লড়াই করেছি অভাব মাথায় নিয়ে
লোভ- লালসা ছিল না আমার জীবনে
অকৃত্রিম ভালোবাসা খুঁজেছি সারজীবনে
কত রঙের ভালোবাসা পেয়েছি আবার হারিয়েছি
আমার জীবনে
অবশেষে অভয় জানালে তুমি
দিক্ষা দিলে আমায়
মুঠোমুঠো মন্ত্র ছড়িয়ে
বাঁচতে শেখালে তুমি
তোমার কষ্টের রক্তে
আমার শরীর রাঙিয়ে
তুমি তোমার করে নিলে।
বৃত্তের ভেতরে
বিমল মণ্ডল
অক্ষরে-অক্ষরে সাজিয়েছি অভিনব করে
তুমি তখন এলে আমার অন্তরে
তুমি এসে ভাবালে আমায়
উড়ালে হাওয়ায় হাওয়ায়
তোমার কোলে বসিয়ে আমায় দিয়েছিলে কথা
এই পৃথিবীতে যতদিন তুমি, ততদিন রাখবো তা
দেখেছি আমি তোমার চোখে মুখে
তাকিয়ে ছিলে আমার মুখের দিকে
বৃত্তের ভেতরে তুমি কাছে যদি ডাকো
তবে তোমার স্বপ্ন স্বাদ পূরণ হবে দেখো।
ঘুমের মধ্যে মা আসে
বিমল মণ্ডল
নিশিরাতে ঝড়ো হাওয়া জানালা দিয়ে হুহু করে বইছে
মায়াময় বিষাদে পূর্ণ রাতের আকাশে চুপচাপ বসে চাঁদ
আমি ঘুমের ঘোরে স্বপ্নের ভেতর মা কে দেখি সারারাত
অন্ধকারে মায়ের মুখ স্পষ্ট বোঝা যায় না
তবে আগের মতো বুকে সর্দি বসে। বেশ খারাপ হয়ে গেছে শরীর।
দীর্ঘ কথাবার্তায় কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ
হটাৎ জোর হাওয়ায়
মিলিয়ে যায় মা আর কথাগুলো
চঞ্চল হয়ে বিছানা ছেড়ে মা'কে ডাকি
কারা যেন অন্ধকার জানালা ধরে বাতাসে বলে যায়-
মায়ের ভালোবাসা
আর হাতের আদর ঘুমের মধ্যে মায়ের স্বপ্ন বাতাসে ছড়িয়ে।
চাঁদের পেছনে লুকিয়ে মা
বিমল মণ্ডল
অন্ধকারে বাবলা ফুলের গন্ধ ভেসে আসে
আমার মাটির ঘরের পাসে
আমি তখন চাঁদের আলোয় মা কে খুঁজছি বসে
গভীর রাতে নক্ষত্রেরা গুনগুন সুর ধরে
চেয়ে দেখি চাঁদের পেছনে
লুকিয়ে বসে মা
বলছে আমায় মা যে শুধু -
"তোর পাশেই আছি চিরকাল"।
এই আনন্দে ঘুমিয়ে পড়ি
সকাল হয়ে যায়।
মায়ের রান্নাঘর
বিমল মণ্ডল
বৃষ্টি ভেজা খড়ের কুঁড়ে ঘর
উপর থেকে জল চুঁয়েচুঁয়ে
মায়ের রান্নাঘরে পচাগন্ধ ছড়ায় আর উনুনের সামনে জল ঘিরে রাখে
সারা ঘরময় বঙ্কিম ধোঁয়া
মায়ের শরীরে ঢোকে
সংশয় থেকে দুঃখ বারে বারে চোখে মুখে ধরা পড়ে
কেরোসিনের লম্ফ ঝড়ো হাওয়ায় নিভেযায়
নাক দিয়ে সর্দির স্রোত
সারা শরীরে ধোঁয়ার কলঙ্ক আঁকা
উদ্বেগ নিয়ে বাইরে যখন মা, তখন সবাই আমরা ভুখা পেটে মাটিতে শুয়ে
চিৎকারে করে ডেকে
পরম আদরে ফ্যান ভাত
থালায় সাজিয়ে
মা কাঁদে রান্নাঘরে ডুকরে ডুকরে ।
তোমার মুখে হাসি দেখে
বিমল মণ্ডল
কতগুলো ঝড় সামলে
ফণী ঝড়ের সামনে পড়েছিলে একেবারে
চোখে মুখে বিষাক্ত বিষের ছোবল যেন
সারাদিন দূরন্ত ঝড়ের তান্ডবে তোমার শরীরে গভীর বিষন্নতার ছাপ
যা আমার আরশিতে মেঘের ছায়ায় ধরা পড়ে
বিপন্ন-বিস্ময়ে সারারাত প্রদীপ জ্বালিয়ে বসে থাকা
এইসব শুধু তোমার সাথে শেয়ার করে নেবো বলে
তোমার ভালোটা একান্ত ভাবে চেয়েছি
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে
একটা সাহসের গন্ধ ফোনে ভেসে আসে
সারাদিন আমলকী রোদে তোমার বিষাদময়তা কেটে যায়
তোমার চোখে মুখে সূর্যমুখীর দীপ্তি
শরীরে এক নতুন প্রেমের আবেদন
কতদিন পরে
তোমার মুখে হাসি
আবার সেই আগের মতো
কতগুলো আনন্দ তোমার হাসিতে আমি খুঁজে পাই
আজ...৪ঠা মে।
:
আপন - পর
বিমল মণ্ডল
জন্মানোর পরে পরে আপন- পরের পরিচিতি
সঠিক -বেঠিক সময় গণনা
আমায় আপন করেছে কতজন হিসেব নেই তার
আমায় পর করেছে কতজন তারও নেই হিসেব
রোদ - বৃষ্টির ইচ্ছে গুলো আপন - পরের আশ্রয়ে
আমার শুধু একটি ইচ্ছে -আপন -পরের বিবাদ না করে
এই পৃথিবীতে শান্তিতে থাকি আপন মনে
যে যার মতো কথা আপন - পরে
সামান্য -অসামান্য চেতনায় ঘুরে ঘুরে আসে
আপন হারিয়ে যায় চেনা দেশে
পর কাছে আসে একান্ত ভালোবেসে।
একবার ভালোবেসে দেখো
বিমল মণ্ডল
আমার সামান্য নিবেদন
শুধু তোমার কাছে
একবার ভালোবেসে দেখো
তোমার নিজের হয়েছি কি না?
দেখবে কঠিন হৃদয়ে বরফ গলবে
পুকুরে কাদার পরিবর্তে পাথরের স্তুপ
তা যেন মাছেদের বুকে ঝরে পড়ে
চাঁদ , সূর্য , নদী, সমুদ্র সবই কত কাছের হবে
তুমি ভালোবেসে দেখো
তোমার বুকে জমে থাকা পাথর নেই আর
শুধু প্রতিধ্বনিত হবে ভালোবাসা
তুমি নিজের গোপনীয়তা আড়ালে না রেখে
একটা স্থায়ী ঘর গড়ো
যেখানে ভালবাসার স্তম্ভ তৈরি হয়
তুমি ভালোবেসে দেখো
তোমার নিজের হয়েছি কি না?
মায়ের মৃত্যুতে পাখিরাও কেঁদেছিল
বিমল মণ্ডল
শীতের এক ভোরে
মায়ের মৃত্যুতে সবাই যে যার মতো শেষ নিবেদন জানায়।
পুকুর থাকে কুয়াশা মাখা আশঁটে গন্ধ পাড়ায় পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে
মা শুয়ে উত্তর -দক্ষিনে
সহসা শীতের মধ্যে জমে যায় ভীড়
খালি গায়ে মায়ের পা চোখের জলে ভিজে যায়
মেয়েরা , বৌমারা শীতভোরে কেঁদে যায়
গাছে গাছে পাখিরা জেগে ওঠে
যারা এতোদিন খেলা করেছিলো মাঠে, বাগানে আর বাজারে
উঠানে মুড়ি ছড়িয়ে মনের কথা বলতো
তারাও কুয়াশার ভোরে কেঁদে ছিল সেদিন
সে দিন মা উত্তর - দক্ষিণে শুয়ে চিরনিদ্রায় ।
নিরাশা
বিমল মণ্ডল
সকলেই হাঁটে - আমিও হাঁটি
নির্দিষ্ট এক সীমান্ত ধরে
মাঝখানে নাগরিকের দেয়াল
ইউকেলিপটাস গাছের দীর্ঘ যাপন
অজস্র মুখের নিস্তব্ধতা অন্ধকারে ছায়া পড়ে
অদ্ভুত নিরাশা থেকে মুক্তি নেই
নেই বাঁচার অধিকার
জনতার মাঝখানে নিরুদ্দেশ হই
দিগন্তের প্রান্তরেখায় শব্দহীন অনুভূতি
আশ্বাস আর বিশ্বাস নীলাকাশে নিরাশায় ভাসে
আশায় থাকা নিরাশা একটু একটু করে বিলীন হয়
আমি তখন নিরাশার জ্বালায় জ্বলতে থাকি।
পদচিহ্ন
বিমল মণ্ডল
ভোরের আলো দীর্ঘ বাঁশবনে স্পর্শ অনুভব করে
মা তখন পুকুর ঘাটে বাসি থালা-বাসন মাজে
সবুজ সবজি বাগানে
কলসি নিয়ে জল দিচ্ছে বাড়ির ছেলে বৌরা
রাক্ষুসে রোদ শরীর গিলে খায়
হাল্কা হাওয়ায় আমপাতাগুলো সারা বাগানে ছড়িয়ে পড়ে
মায়ের হাঁটা চলায় দূরন্ত ক্লান্তি
আজ আর ঘাটে বাসি বাসন কেউ মাজে না
বাগানে জল কেউ দেয় না আর
শুধু প্রতিদিন গুণে যাই সকাল থেকে সন্ধ্যে
মায়ের পদচিহ্ন।
সময় হলে
বিমল মণ্ডল
জীবনের পাতা থেকে
একটা গোটা দিন চলে গেল
তোমার নিরবতা তখনও পর্দা ঘেরা জানালার পাশে
অসহায় পড়ন্ত বিকেলে
তোমার -আমার কয়েক দিনের
জমা -খরচের পাতা টেনে স্মৃতিভরা আবেগে বোবা কণ্ঠে
অজানা নেশায় সর্বাঙ্গে কষ্ট নিয়ে বসে থাকি
ঠিক সময় হলে
তোমার থেকে চলে যাবো
এক বুক নিরবতা নিয়ে
প্রার্থনার মতো
অনেক দূরে
সেদিন খুঁজেও পাবেনা আমায়
সময় হলেও...
:
জীবনের অপর নাম কবিতা
বিমল মণ্ডল
জীবন মানেই কবিতা
কারণ জীবনে প্রতি সেকেন্ড , প্রতি মিনিট , প্রতি ঘন্টায় , প্রতিটি দিন, প্রতিটি বছর কত সহস্র শব্দ,কত ছন্দবদ্ধ , নানান অলংকার প্রয়োগের শিকড়গেড়ে কবিতার শাখায় কত ফুল ফোটে আর দুলতে থাকে প্রতিটি জীবনে
এভাবে চলতে চলতে দিগন্ত ঘিরে
কত অক্ষর আর শব্দের স্তুপ
প্রতি অস্থ মজ্জায় উর্বর হয়ে ওঠে
ছিঁড়ে যাওয়া পুঁথি আর হারানো প্রাপ্তি প্রিয় নারী মুখের আয়নায় নির্মাণ হয়ে থাকে
প্রতিটি জীবনে কবিতার জন্ম
প্রতি অক্ষরে-অক্ষরে ঈশ্বর
লুকিয়ে থাকে
তাই ঈশ্বর জীবনের সাথে কবিতা জড়িয়ে থাকে
তাই জীবনের অপর নাম জীবন
যুগযুগ ধরে কবিতায় প্রতিটি জীবন সহবাস করে বেঁচে থাকে
প্রতি অক্ষর অক্ষরে-অক্ষরে আর শব্দ - শব্দ।
স্বপ্নের কথা
বিমল মণ্ডল
স্বপ্নের কথা বলছি
পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই
স্বপ্ন দেখছে সবাই
প্রত্যকেই ভাবে যে যার থেকে একটু যেন বড়ো হতে
কেউ হবে কি হবে না
না হলে কি হবে
এ সব প্রশ্ন স্বপ্নে আসে আর যায়
কারণ অনেকে স্বপ্ন দেখতে ভালো বাসে
আর সারাজীবন শুয়ে বসে ভাবে হচ্ছে হচ্ছি
প্রতিরাতে বিছানায় স্বপ্নের কঠিন নিস্ফলতা
এক অনবদ্য আনন্দরসে সারারাত ঘিরে রাখে
আর বাকি জীবন মৃত্যুর দিকে।
সম্পর্কের বন্ধনে
বিমল মণ্ডল
দুর্বোধ্য খরায় জলাশয়কে দাঁড় করে রেখে
পাড়ার মেয়েরা মাথায় গামছা বেঁধে
দু'পায়ে কাদা চটকায়
সাংসারিক অনুভূতির পরশে
নিজেরা খরা মেখে জলাশয়ে বিপন্ন বিস্ময় খোঁজে
বাবলা ফুল ঝরে পড়ে হাওয়ায়
ভেজা শাড়ীর ভেতর দিয়ে শরীরে চরিত্রহীন সূর্য কলঙ্ক এঁকে দেয়
চোখে -মুখে ক্লান্তির ছাপ
উনানে শুধু ভাতের জল ফুটছে
সংসারের প্রতিটি সদস্যদের সাথে
মেয়েটি,উনুন , ভাতেরজল ফোঁটা এ-সম্পর্কের বন্ধন
অনাদি-অনন্তকালের।
তপশীলি মেয়েদের বসন -ভূষণ
বিমল মণ্ডল
অর্ধ উলঙ্গ শরীরে
নাভীমূলের কাছে স্তন ঝুলে পড়ে
পরনের শাড়িটি নোংরা ও শত ছিদ্রে দারিদ্র্যতা মিছিল করে
গরুগুলো নিয়ে ঘুরেবেড়ায় মাঠে মাঠে
কঠিন রোদে কালো করে দেয় অর্ধেক শরীর
দা নিয়ে পাকাধান তোলে আনে ঘরে
তবুও সিঁথিতে সিঁদুর মোরগ ফুলের মতো লাল হয়ে থাকে
ছোটো ছোটো ছেলে -মেয়েরা মায়ের সাথে হাঁটে
যে যার মতো করে
তবুও তপশীলি মেয়েরা
দিন রাত করে কামনা হীন
সুন্দর নিটোল মনে
সংসার সামলায়।
আঁচল
বিমল মণ্ডল
দুটো হাত কতগুলো হাত টেনে নিয়ে যায়
রাগ, অভিমান, আদর, ভালবাসা, ঘৃণা , হতাশা বক্ররেখায় চলে
দুঃখিনী মায়ের আঁচলের ছায়ায় সংসার শান্তি খোঁজে
কি শীত, কি গ্রীষ্ম , কি হেমন্তে এসে
শুকনো পাতা কিংবা শুকনো খড়ের আগুন জ্বালে সেঁতসেঁতে উনানে
এলোমেলো ধোঁয়া মায়ের আঁচল দেয়াল হয়
দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আঁচল নাকে চেপে
মুহূর্তে সংসার ঝড়ে
আঁচল উড়ে যায়
লজ্জায় , ঘৃণায় লুকিয়ে বসে থাকে
জীবন - আঁচলের আশায়
যা শরীরে শান্তির ছায়া দেবে।
আদর্শ আদরের ঘ্রাণ
বিমল মণ্ডল
পাড়ায় পাড়ায় উৎসবের মেজাজে কড়াইশুঁটি শুকনো করার আয়োজন
উসকোখুসকো চুলে মেয়েরা সারিবদ্ধভাবে ভাবে ব্যস্ত
পুকুরে সরপুঁটি আর চাঁদামাছ দলবদ্ধ হয়ে আড়িপাতে
পাশে কচুবনে অদ্ভুত ঘ্রাণ নেয় মোরগ - মুরগী
লাউ গাছগুলো উপর কুয়াশার জল আর শিশিরের জল যখন মাকড়সা জাল বুনতে থাকে ধীরে ধীরে
শান্ত -স্নিগ্ধ সাধারণ মেয়েরা
এক আদর্শের আদরের ঘ্রাণ মেখে
উদাসী হাওয়ায় মেঘের গায়ে রোদরঙ আঁকে
চারপাশে পুকুর , ডোবা , নানান ঝোপঝাড়ে আদর্শ আদরের ঘ্রাণ চিরকাল ভেসে বেড়ায়।
পিপাসা
বিমল মণ্ডল
শীতের সন্ধ্যায় খালি গায়ে আমি
মায়ের কাছে উনুনের পাশে বসি
মা দুটি হাতে নিখুঁত শিল্পের আবর্ত রচনা করে চলছে কতগুলো খড় দিয়ে
আমি তখন ছাত্র -ব্যকুল পিপাসা নিয়ে বলি-
তোমার এই সব খড় , খিরিশের শুকনো পাতা, শুকনো বাঁশ পাতা -এতো সব নিয়ে অর্ধেক রাত
কোনও কথা সেদিন বলেনি মা
শুধু জুলুজুলু চোখে দিগন্ত অন্বেষণে গভীর ব্যকুলতা ভেসে ওঠে
অপলক দৃষ্টিতে অফুরন্ত পিপাসা নিয়ে কখন মায়ের কাছে ঘুমিয়ে পড়ি
সস্নেহে মা সেই পিপাসা মেটায়।
ভাগ্য এবং
বিমল মণ্ডল
তুমি চলে যাওয়ার পরও আমি একাই দাঁড়িয়ে ছিলাম -
কোলাহল মুখরিত মেট্রোস্টেশনে
এভাবে দুই যুগ কত দিন, কত রাত
এই ভাবে একা দাঁড়িয়ে আছি
প্রয়োজনে যে যার কাজ সেরে ফিরে যায় বাড়ি
সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছি তোমাকে
নিজেকে নিঃস্ব করেছি
একেবারও প্রাণ খুলে ডাকেনি আমায়
তবুও তুমি চলে যাওয়ার পর আমি একা দাঁড়িয়ে মেট্রোস্টেশনে
যে ভাবে সবাই যায় বাড়ি ফিরে
সেভাবে ফিরে যায় আমার ভাগ্য এবং...
একান্তে
বিমল মণ্ডল
একটা মানুষ নির্জন নদী তীরে কিংবা জনমানবহীন , প্রাণহীন রাস্তার পাশে একান্তে ভাবতে থাকে
ভাবতে থাকে চিরপরিচিত স্মৃতি
কখনো খোলা হাওয়ায় সাদা বকের মতো এলিয়ে দেয়
আবার মেঘেদের মতো ভেসে ভেসে দিগন্তে মিশে যায়
তবুও একান্তে মন পাথর হয়ে যায়
সীমাহীন অবজ্ঞায় কঠিনতা কিনারে স্তুপ করে
তখন নিজের আর পর পাঁচিল ভেঙে দেয়
সব শূন্যতা হাহাকার হয়
তাই একান্তে সিদ্ধান্ত
না নেওয়াই ভালো।
মা
বিমল মণ্ডল
'মা' শব্দটি আজ বুকের মধ্যে বাজে
শৈশবে মায়ের স্নেহময় আদরে সবুজ দিনগুলো
কত শাসন , কত ভালোবাসা মেশানো
অভাব যখন মায়ের সংসারে
তখনও মা দুটি হাতে স্নেহ স্পর্শ করে
কৈশোরে , যৌবনেও মা সহস্র বাধা পেরিয়ে আশা দিয়ে যায়
দুমুঠো ভাতের খোঁজে মা
বাজারে বাজারে সবজি ফেরি করে
কখনো একবেলা কখনো বা না খেয়ে জুগিয়েছে ভাত
সেই মা আজ নেই
সারাক্ষণ খালি খালি লাগে আমার
আমার সু-সময়ে মা চলে যায় দূরে
অনেক...অনেক দূরে
মায়ের ভালোবাসা আজ আমায় ঘিরে
আজ ১২ই মে মাতৃ দিবস
মাকে জানাই শ্রদ্ধার্ঘ আর প্রণাম
যেখানে থাকো ভালো থেকো মা
এটাই আমার তোমার কাছে নিবেদন।
অহংকার
বিমল মণ্ডল
মাটির বাড়ি। খড়ের ছাউনি দিয়ে ঘেরা। খিরিশ গাছের তক্তার দুটো দরজা মাত্র।
মাঝে মাঝে চাঁদ এসে বসে।
আমি মায়ের সাথে সাথে ঘুরে বাড়াতাম কষ্ট চোখে মুখে এঁকে।
আমাকে নিয়ে মোট দশ জন।বাবা লাঙ্গল ধরে ধরে হাতে ঘা। পুকুরে চারাপোনার করে লেনদেন।
সারা বাড়ি জুড়ে মায়ের আর্তনাদ
নিজের জলখাবার বাঁচিয়ে খাওয়াতেন আমাকে
অসম্ভব পরিশ্রম গরীবের নিঃশ্বাসে ভোরের পাখি হয়ে জেগে ওঠে।
অভাব হামাগুড়ি দিয়ে বাবা -মায়ের হাতটা ধরে কৃপণ ভরে
অলসতা আসেনি অপ্রাসঙ্গিক জীবন থেকে
দারিদ্র্যতা সময় ধরে আসে না
তবুও আমার না পাওয়ায় চেষ্টাতে কত অহংকার ভীড় করে
আমার এই অহংকার
একান্ত নিজেরই
আমি বড্ড ভালোবাসি।
মায়ের স্বাদ
বিমল মণ্ডল
মায়ের স্বপ্ন জেগে ভাঙা চোরা বাড়ির উঠানে।
তুলসী তলায় অফুরান ভালবাসা । মায়ের লাগানো নারকেল গাছে কত সবুজ ডাব তাকিয়ে সূর্যের দিকে।কচি বাতাবিলেবু দেওয়াল ঘেসে দুলছে হাওয়ায় ।
প্রাচীরের গায়ে নিমফুল মায়ের কান্না হয়ে ঝরে পড়ে
পুকুরের জল স্তিমিত সূর্যের তাপে নীরবতা খেলা করে।
চাঁদা, সরপুঁটি আর বালকুড়ি মাছের আনন্দ ঝরে জলের উপর।
বাবা কোদাল হাতে মাটি চষে আলু গুলো লাগায় ঘাম ঝরে
মায়ের অপূর্ণ স্বাদ
এখনো বাড়ির চারধারে ঘুরেফিরে ।
নদী -মাঝির গল্প
বিমল মণ্ডল
নদীর গায়ে আকাশ শরীর ঢালতে পারলেই অস্থিরতা খোদাই করে মাঝি।
হলদি নদীর দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে চেনা বসতি। বাবলা গাছ আর কাঁটা গাছে যন্ত্রণা পেয়ে শখের গল্প সারে মাঝিদের সাথে।
মাঝেমধ্যে বাতাসে মাঝি নদীতে সোনালী আলো খোঁজে। সাবলীলভাবে মাঝিদের ভাটিয়ালি সুর আসে না । বড্ড অসময় মাঝিদের।
নদীর শরীরে ছোঁয়াচে রোগ -
পচা পাতা, মৃত জীবজন্তুর দেহ আরও কত কি তা ভেবে।
নিয়তি সন্ধ্যা নিয়ে আসে। মাঝি আর নদী জানে রাতও আবার হবে।
সবাই সময় ধরে ঘরে ফেরে
মাঝি নৌকা নিয়ে নদীতে
সারা দিন-রাত ইতিহাসের গল্প বলে।
আত্মপরিচয়
বিমল মণ্ডল
বয়স আট
করি বাজার হাট
মায়ের সাথে সাথে
কত ঘুরেছি পথে পথে
সবজি নিয়ে মাথায়
গেছি যেথায় সেথায়
ছেঁড়া জামা পরে
স্কুলে গেছি কত করে
খাওয়ার জোটেনি আমার
তবু্ও কষ্ট করেছি বারবার
মায়ের সান্নিধ্যে
মাধ্যমিক তার মধ্যে
কষ্ট শুরু নতুন করে
ভিক্ষা করে পেট ভরে
আট কিলোমিটার হাঁটা পথে
স্কুলে যেতাম হাঁটতে হাঁটতে
মা আরো বেশ কষ্ট করে
উচ্চমাধ্যমিকও পাশের পরে
কলেজে পড়ার উদ্দ্যোম বাড়ে
ক্লাস করি কলেজ ঘরে
রান্না বান্না নিজের হাতে
অনেক কাজ আরো এক সাথে
এমনই করে করি কলেজ পাশ
এটাই ছিলো আমার অভ্যাস
উচ্চ শিক্ষা করবো বলে
বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম চলে
ভর্তি হলাম, কিন্তু থাকবো কোথায়?
এসব আবার ঘুরতে থাকে মাথায়
অনেক কষ্টে পেলাম বাড়ি
পেয়ে আমি শ্বাস ছাড়ি
দু একটা শর্ত তাঁদের
মেনে নিলাম একে বারে
রান্নাবান্না, বাসন মাজা, কাপড় কাচা
জল আনা,বাজার করা, ঘর মোছা
এসবই তে আমি রাজি
পড়তে হবে এটাই বুঝি
কিছুদিন যেতে না যেতে
ওদের কাজ করি হাতে হাতে
দু একটা টিউশন করে
হাত খরচ করতাম ঘরে
পড়ার সময় পড়লো ভাঁটা
এভাবেই আমার জীবন কাটা
এম.এ পাশ করলাম আমি
রেজাল্টটা জানে অন্তর্যামী
বি.এড টা করতে হবে
মায়ের আদেশ মেনেই তবে
কাঁথিতে ভর্তি হলাম
বাড়ি থেকে এলাম গেলাম
সারা রাত টিউশন করে
সকালে যেতাম ঘরে ফিরে
এমনই করে বি.এড পাশ
মিটালাম আমার আশ
মনের জোরে গেলাম যাদবপুর
এম.ফিলে ভর্তির নেশায় করি ঘুর ঘুর
ফর্ম তুলে পরীক্ষা দিয়ে আসছি ঘরে ফিরে
ফেরার পথে গাড়িটি এক্সিডেন্ট করে
মায়ের জন্য পেলাম আবার নতুন এক জন্ম
মৃত্যু থেকে ফিরলাম কিন্তু শিরদাঁড়া ভগ্ন
অভাব বাড়তে থাকে মায়ের সংসারে
উচ্চশিক্ষা পেয়ে ঘুরছি বাইরে বাইরে
অনেক মানত করে মা মন্দিরে মন্দিরে
চাকরির পরীক্ষায় পাশ করি বারে বারে
অবশেষে চাকরি পেলাম একটা স্কুলে
চাকরি পেয়ে বাবা মাকে গেলাম না ভুলে
মায়ের আশীর্বাদ রেখে মাথায় শুরু করি জীবন
হঠাৎ মায়ের মৃত্যুতে ভবিষ্যৎ জীবনেরহলো অবসান।
মাকে হারিয়ে আমি অনেক কষ্ট পেলাম
মা ছাড়া জীবন যুদ্ধে সত্যিই হেরে গেলাম।
নতুন পৃথিবীতে একা
বিমল মণ্ডল
একদিন আকাশ আমাকে নক্ষত্রপুঞ্জের ভেতর বাঁচতে শেখায়
সে ছিল চাঁদের মতো অক্ষত
সারা সময় ইচ্ছে মতো খেলেছি কতো।
আজ সমস্ত মায়াজাল ঘিরে চুবিয়ে রেখেছে আমায়
সারা শরীর এঁকে দিয়েছে অনন্ত কষ্ট
সীমাহীন স্বার্থ দিন রাত ঘিরে থাকে
তবুও মালাচন্দন নিয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে
সংকীর্ণতা চিরমাতৃজলে পা ডুবিয়ে বসে
মুহূর্তে আনন্দ ঝরে আমার সামান্য জীবন
আমি ভালোবাসি সম্মান আর আনন্দকে
সহসা অর্থ শক্তি কেড়ে নেয় সব
সহসা বসি চুপচাপ
অন্ধকারে আমাকে স্বপ্ন খোঁজে
এই পৃথিবীতে ঘুমহীন চোখে বসে আমি একা।
মানবিকতা
বিমল মণ্ডল
সুন্দর গঠনমুলক আলাচনায় বসে
পড়ে গেলাম বন্ধুদের অগাধ আক্রোশে
এপর্যন্ত সব কাজ করেছি একা একা
ওরা থাকে বিদেশে হয় মাঝে মাঝে দেখা।
সব জেনে আমি নিয়েছি গুরুদণ্ড ভার
টাকা দেন বলে অসম্মান করে বারবার
অর্থকে ভালোবাসে মানুষটিকে নয়
বাতাসে প্রচারিত টাকাতে সব হয়
জীবনে কত কষ্ট পেয়েছি এই পথে হাঁটতে হাঁটতে
সংকীর্ণ মানবিকতা আজ হাঁটে রাজপথে
অবাক হয়ে ভাবছি আমি অতীত দিনের কথা
মান,মর্যাদা , প্রতিপত্তি সব হারিয়ে পাচ্ছি এখন ব্যথা
টাকা দিলে সব কাজ হয় না নিজের মতো
ভালোবাসায় ফিরে পেতে নিজেদের টাকা যতো
পরিশ্রমের সম্মান পাবো এই ছিলো আশা
মিছে অর্থের দম্ভে আমাকে করলো নিরাশা
ফিরে পাবো আমি আমার অতীত গৌরব
সে দিন দেখবে চারিদিকে কত পাখিদের কলোরব
ভিড়তেও পারবে না ওদের কাছে
মূল পুঁজি নিয়ে তখন আসবে আমার কাছে
নিজেদের আনন্দ ভাগকরে করে নেবো সেদিন
মানবিকতা পৃথিবী জুড়ে সবার মাঝে আসবে যে দিন।
একটা নতুন পৃথিবী গড়বো বলে শপথ নিয়েছিলাম
সুস্থ মানবিকতা নিয়ে আমি এই পৃথিবী গড়লাম।
পারাপার
বিমল মণ্ডল
ভীষণ সুন্দরী অপরূপা হলদি নদী
চলেছে এঁকে বেঁকে পার হয় যদি
সীমাহীন অবজ্ঞায় ভাঙ্গছে দুই তীর
পূর্ণ সচল ধারা গূঢ়চারী গহন গম্ভীর
প্রকৃতির স্নিগ্ধ ধারায় বিছিয়ে ঐশ্বর্যসম্ভার
অসীমের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত চালক সমুদার
চারদিকে প্রসারিত কত পার করো তরী
শহর থেকে গ্রাম থৈথৈ করো ভরী
জন্ম থেকে তুমি বড্ড উচ্ছৃঙ্খল , দুর্বার
শান্তির ঘোষণা করে পারাপার করো একবারে।
সিঁড়ির পাঁচটি ধাপ পেরিয়ে
বিমল মণ্ডল
১.
জ্ঞান পড়ার পর দেখেছি মায়ের কষ্ট
দিন রাত অভাবের ঝুড়ি নিয়ে ঘুরেছে হাঁটে বাজারে
বাঁশ গাছের দৌরাত্ম ভেঙে অসম্ভব সাহস চোখে মুখে
সন্তানের পেটে সাদা ভাত তুলে দেয় হেঁটে এসে।
২.
বাবা তক্তপোশে বসে বিড়ির ধোঁয়া মুহূর্তে ছাড়ে
বিরক্ত মুখে চোখ রাঙায় ছেলে আর বৌকে
ঝুড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায় পুকুর পাড়ের দিকে
কচুশাক আর কলমীশাক তুলে আনে ঘরে।
৩.
দাদারা সব নিজের মতো দেওয়াল ধরে রাখে
মা, বাবা ওরা হয়েছে সব নিয়েছে কেড়ে
একটু ভাতের আশায় মা প্রাণ নিয়ে ছোটে
দাদারা তখন আমায় দেখে বিকৃত করে হাসে।
৪.
দিদিরা স্বাধীন নয় পরের ঘরে
দারিদ্র্যতা তাদের ঘরে বিদ্রোহ করে
অসময়ে মা আমার জন্য দুমুঠো ভাত মাগে
বাড়িময় বিষাদ সুর ভেসে শুধু আসে।
৫.
এতো সিঁড়ি পার হয়ে আমায় মা নিয়ে চলে
আমার চোখে মুখে ভালোবাসা খেলে
উদ্দেশ্য নিয়ে হাঁটছি আমি পৌঁছাতে হবে
মুছে দিলাম মায়ের চোখের জল
তাই স্বপ্ন আমার হয়েছে সফল ।
প্রতিক্ষা
বিমল মণ্ডল
ফাঁকা বাড়িতে কার পায়ের শব্দ শুনি?
জানি কোনও দিন ফিরবে না আমার জননী
শুধু অঞ্জলি দিয়ে থাকি মায়ের ছবির পাশে
সারা গাঁ জুড়ে মা ডাক ফিরে ফিরে আসে
মাঠে ফসল নেই শুধু করে হাহাকার
কতবার আমি ডেকেছি তোমায় প্রাণভরে
মহাশূন্যে ভেসে বেড়াও মৌন আবেশে
বিরক্তিকর মুখে আমি খুঁজি অতীতকে
অতীত আর নেই কাছে
সে শুধু শূন্যে ভাসে
আগামী দিনেও থাকবো তোমার প্রতিক্ষায়
আমি পেয়েছিলাম আমার জীবনের উজ্জীবনের প্রেরণা
যা দিয়েছিলে কয়েক যুগে
তা আজ আমি রেখেছি মনের স্তরে স্তরে
এখন তোমাকে ছেড়ে পেতেছি আমি নতুন সংসার
সময়ের স্রোতে প্রতিজ্ঞাও বদলে যায়
স্বার্থ যেখানে অমোঘ নিধান
জীবন পীড়িত প্রত্যয়ে প্রত্যয়ে
আমি খুঁজে বেড়াই তোমাকে পাবো বলে
তোমার প্রতিক্ষায় থাকবো মা গো সারাজীবন ধরে ।
সন্ধ্যার ঝড়ে
বিমল মণ্ডল
এই সন্ধ্যায় -ঝড়ে
গ্রামে এবং শহরে
অন্ধকার জানালা থেকে নক্ষত্র দেখা যায়
হাল্কা হাওয়া - শরীরে
গ্রাম - শহরে -ঝড়ের পরে
আলো -অন্ধকার খেলা করে
ঝড় থেমে গেলে -আকাশে অসংখ্য নক্ষত্রের ভীড়ে
আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে দেয় আনন্দের সুরে
অন্ধকার জানালা থেকে নক্ষত্র দেখা যায়।
সুখ
বিমল মণ্ডল
খালপাড় ধরে আকন্দের নেতৃত্বে নোনা গাছের নাচ।কাছাকাছি চিমনির ধোঁয়ায় ছড়িয়ে দেয় সুখ।টলমল টলমল চোখে খুব সকালে কাজের খাতায় হয় সই।
নীল শাড়ি পরা হাঁটা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে কেউ।
সময় ঘুরেফিরে পাশাপাশি হাঁটাচলা
কাজের ফাঁকে দু'একটা ভাব ভালোবাসার কথা।
সমস্ত সুখ প্রলেপ বুলিয়ে সারা শরীরে ।
তপশীলি মেয়েদের গল্প
বিমল মণ্ডল
রাঢ়ী ভাষায় মেয়েরা কথা বলে পাড়ায় পাড়ায়
আঁড়চোখে লেজঝোলা পাখিটা ভাষা শোনে
বিড়ি,তামাকের সুগন্ধি ধোঁয়া সুখ ছড়িয়ে দেয়
হাঁটা চলায় নেশার ক্লান্তি
তেঁতুলগাছের নরম পাতা কাটায় স্বাদ
সারা ঠোঁটে কাজলের দাগ
পুরুষের ভয় সারা শরীরে
পুকুরের জল ভাতের গন্ধে মেশে
পবিত্র মন সুস্বাদু বিড়ির গন্ধে আকাশে সংসার পাতে
তপশীলি মেয়েদের সারা শরীরে
কিসের ক্লান্ত দুঃস্বপ্নের ছায়া পড়ে।
২৩/০৪/২০১৯
[5/25/2019, 5:39 PM] bimalmondalpoet: দেখেছি যে নারীকে
বিমল মণ্ডল
পড়ন্ত বিকেলে লাল মাটির রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছে যে নারী
সহসা মেঘ মিশেছে নারীটির চুলে
নিস্তব্ধতা তার দেহরেখায়
সূর্যাস্তের আলো মেখে হেঁটে যায়
কোনো এক পাড়াগাঁয়ে
আমি দাঁড়িয়ে প্রতিক্ষার তটে
দু'চোখে স্বপ্ন নিয়ে
পরম সুখে ঘুমাবো
আনন্দ ভরে
দেখেছি যে নারীকে...
মৃত্তিকাচারী
বিমল মণ্ডল
খরো রোদ নেয় শক্ত ঢিলার ঘ্রাণ
প্রতিবেশী মেয়েটি হেঁটে যায় লাল ব্লাউজের শরীরে
কলঙ্ক এঁকে দেয় সূর্য নামের পুরুষ
সূর্যমুখী ফুলের ছায়ায় কিছু সময় নীরবতা
অতন্দ্র সীমান্তে মাটির দেওয়াল
প্রাণভয়ে মেয়েটি লজ্জাবস্ত্র গায়ে জড়ায়
ঝোঁকে পড়ে সূর্য আদর মাখায়
নতুন আলোর প্রাণে সারা গাঁ বেঁচে ওঠে
মৃত্তিকাচারী মেয়েটির স্পর্শে ।
সময়ের সেতু
বিমল মণ্ডল
বাঁশগাছের ফাঁকে পূর্ণ দৃষ্টি । রাতের খাওয়া সেরে জানালার পাশে বসি।বাইরে অল্প অল্প ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, রাতপাখি রহস্যময়
ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে পাশ দিয়ে উড়ে গেল। হঠাৎ শোঁ শোঁ শব্দে জোলো হাওয়া। এক বিন্দু শান্তি শরীরে আসে।
সারা ঘরময় ছড়িয়ে ঠান্ডা হাওয়া খেলা করে
চেয়ে থাকা চোখে ঘুম জুড়ে আসে
দৈনিক সময়ের সেতু ধরে...
একা
বিমল মণ্ডল
'একা' শব্দটি বড্ড মানুষকে ঝাঁকায়
আসলে মানুষ যখন একা হয়
তখন সে আরও দু'জন কে চায় আপাতত একজন
একটা মানুষ আর একটি মানুষের সুখ দুঃখের ভাগ নেবে
ভাষায় আদান-প্রদান
নিঃশব্দে বসে থাকা পাশে
একজন আর একজনের অন্নদাতা তা ঠিক নয়
কারণ যে যার নিজের অন্ন বস্ত্র জোগাড় করতে পারে
কলাহল থেকে দূরে সে মানুষটি
সে একা থাকতে চায়
সম্পূর্ণ একা নয়
সে চায় এমন মানুষ অন্তত যে হৃদয় বুঝে চলে
মানুষ একা হতে চায়
সম্পূর্ণভাবে দু'জনে।
রোদ
বিমল মণ্ডল
আশ্চর্য জাদুকরী রোদ
বিচিত্র প্রতিমা হয়ে অসম্ভব তাপের কাছে
পরিষ্কার ফাঁকা মাঠে শস্য ছড়ায়
প্রাচীর ভেদে প্রতিমা দৃষ্টি এড়িয়ে
ছাতা হীন কয়েকটি যুবক দাঁড়ায় ছায়া পেয়ে
বিড়ির ধোঁয়া শব্দ করে ক্লান্ত শীর্ণকায় দেহে
রোদের প্রতি চোখের কোণে কোণে যৌবনের পরশ
শুধু হারানোর ভয়ে নেই রোদের সাথে থেকে
শুধু রোদের বিচিত্রিতা মেখে
ক্লান্তি সারা শরীরে ঢেকে ।
স্বপ্ন পুড়ে যায়
বিমল মণ্ডল
বয়সের সাথে সাথে
স্বপ্নও পুড়ে যায় ভাঁটায়
কবে সে কত বড়ো হওয়ার স্বপ্ন দেখেছি
খিস্তি , খেউড়, আরও কত ভাষার সৎ ইঙ্গিত
আমি ধাপে ধাপে গড়েছি কবিতার বাসস্থান
রাতে মাথার ভেতরে শব্দ , অক্ষরে খচখচানি
প্রেম, ভালোবাসা ফুটপাতে ঘোরে
স্বপ্ন পুড়ে যায় আমার হৃদয়ে।
আড়াল
বিমল মণ্ডল
হাল্কা হাওয়ায় মাতাল পেয়ারা পাতা
চারদিকে ছড়িয়ে সুগন্ধি পেয়ারা ফুল
একটু দূরে অবোধ মেয়েটি বাঁশপাতা ঝাঁটিয়ে
ছেঁড়া গামছায় বাঁধে
প্রতিবেশী ছেলে মেয়েরা চোখলুকানি খেলছে
প্রতিটি দেওয়াল আড়াল
শেষ আড়ালের পেছনে
শুধু তুমি
আর না যেন আড়াল করো আমায়
তোমারই সামনে পেছনে তোমার মতো হয়ে খেলা করি
তাই আর আড়ালে নয়
তুমি এসো আমার সামনে
আমি তোমার সামনে...
ঋণ
বিমল মণ্ডল
জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনে নানান ঋণ জমে
মায়ের মাতৃগর্ভ অন্ধকারে অনেক ঋণ
সেই জন্মের ক্লেদ মেখে নতুন আলোতে ঋণের যাত্রা শুরু
চলার পথে পথে অনেক ঋণ জীবনে এঁকে দেয় যোগ বিয়োগের খাতায়
বস্তুগত জীবন ভাবনায়ও ঋণ
নদী , পাখি , গাছ ও মানুষের কাছে কত ঋণ এই পৃথিবীতে
তবুও জীবনের ঋণ কে শোধে কার কাছে
মায়ের গর্ভবেদনা শোধ হয় কী কোনো দিন?
বাবার স্নেহময় আদরের ঋণ কি ভোলা যায়?
পৃথিবীর রোদ , ছায়া, নদী ও জলের ঋণ কে শোধাতে পারে?
এ সমস্ত ঋণ বাড়তে থাকে নির্দিষ্ট চক্রবৃদ্ধি হারে
মৃত্যুর কিনারে এসে সর্ব শান্ত হয়ে উঠে জীবন
অনেক ঋণ বাকী থেকে যায় জীবনে
তেমনি কিছু ঋণ হয়তো তোমার কাছে বাকি
জীবনের শেষে এসে
কিছুটা ঋণের বোঝা
শোধ হবে হয়তো!!
ঘাস আর মৃত্তিকার গল্প
বিমল মণ্ডল
নিঃস্বার্থ এক সুন্দর রাতে
মৃত্তিকার তরঙ্গ নিয়ে সাথে
ঘাসেদের প্রেম ভাসে কথাতে
খানিকটা সৃষ্টির ক্লান্ত ধূসর আকাশে
ঘাস আর মৃত্তিকার যাপন ভালোবেসে
আকাশে নক্ষত্রের আলো ছড়িয়ে প্রকাশে
আকাশ ঘুমিয়ে আকাশে আকাশে
মৃত্তিকা ঘুমোয় ঘাসের শরীর ঘেঁষে।
নুন
বিমল মণ্ডল
জন্মের সাথে সাথে মাতৃদুগ্ধে নুনের স্বাদ আসে
যা মানুষ জীবন শুরুতে নুন দিয়ে প্রথম পাঠ শুরু
নীল সমুদ্রের ফেনায়িত ঢেউয়ে
মানুষের রক্ত মজ্জায় নুনের ছিটা
নোনা মাটির স্পর্শ সাধারণ মানুষ খাবারের থালায় নুনের স্বাদ পায়
পৃথিবীর সবখানে নোনা জলে।
অনর্থক
বিমল মণ্ডল
আমি হেঁটে যাওয়া মাটি রাস্তার পাশে নতুন এক বাড়ির প্রাণ দিয়েছি
প্রতিদিন আসে ভোরে রাজমিস্ত্রী আর প্রসন্ন ছুতোর
এই ঘরে প্লাস্টার হয়নি,দরজা ও জানালার পাল্লাও হয়নি একটাও
রাজমিস্ত্রীরা বালি সিমেন্ট ঘেঁটে টিনে টিনে অভাব মেটায় দেওয়ালে দেওয়ালে
হাতুড়ি , র্যাঁদা, বাটালি নিয়ে বসে পড়ে মেঝেতে
সহসা প্রস্তুত করে আদল মাখা দরজার পাল্লা
অদ্ভুত শ্রদ্ধা যোগে তৈরি আমার বাড়ি
সব দিক ঠিকঠাক
অনর্থক হয়নি আমার বাড়ি।
পান্তা ভাতের গন্ধ আসে
বিমল মণ্ডল
পুকুরপাড়ে মায়ের শরীর ঘিরে গোবরের দাগ
মাঝেমধ্যে বাতাস গিলে
ছেঁড়া কাপড়খানা পরে বাড়ি -পুকুর হেঁটে চলে ভাতের খোঁজে।
পান্তা ভাতের টক গন্ধ বারান্দা থেকে ভেসে আসে
মাটির দেওয়ালের পাশে অলৌকিক হাত
যে হাত স্নেহময় আদরের।
দুঃখ মহাকাল হয়ে জন্ম -মৃত্যুর নিজস্ব চিহ্ন মাখে
যেখানে জন্মের পর
পৃথিবীর জাগতিক নিয়মে পরিচিত
সেখানে মৃত্যুতে শেষ হয়ে যায়
এই জন্ম -মৃত্যুর নিজস্ব প্রেম কি করে পাবে?
এই রহস্যময় ঘেরা পৃথিবীর কিনারে
আজও পান্তা ভাতের গন্ধ আসে।
সরোবরের ভেতর চাঁদ
বিমল মণ্ডল
খালপাড় ধরে নোনার গাছ পেরিয়ে হেঁটে চলেছি
গাঁয়ে যেতে হবে বলে কাদামাটি রাস্তায় এখনোও হাঁটছি
সন্ধ্যা এলো নেমে। পাখিরা পাখা মেলে ফিরে যায়।
হাওয়া দিচ্ছে গাছে গাছে
পথের দু'ধারে বাবলা আর মাঝে মাঝে ঝাউগাছের ছায়া পড়েছে
চাঁদের ছায়া সারা শরীরে
মা ব্যস্ততার মাঝে সন্তানের অপেক্ষায়
সরবরের পাড়ে চেয়ে
কেননা আর কোনো পথ নেই
রাত হয় আরও গভীর
ঝিঁঝিঁ ডাকে রাতের ভালোবাসা কে
মা তখনও দাঁড়িয়ে
আমি হেঁটে চলেছি সরবর ঘেঁষে
আমার সাথে চাঁদও আছে
মা দূর থেকে চিৎকার করে ছুটে আসে
আর সারা সরোবর ঘিরে চাঁদের আলো ছড়িয়ে দিনের মতো
রাত আর রাত নেই
চাঁদের আলোর ভেতরে
অগণিত মানুষের ভীড়ে
মা হারিয়ে যায়
দীর্ঘ অপেক্ষায় আমি আজও সরোবরে রাতের অন্ধকারে বসে।
হাওয়ায় মৃত্যুর গন্ধ
বিমল মণ্ডল
আদর করে মা বাঁধের ঘাস কাটে দা তে
ধান ক্ষেতে শামুকের সংসার
কলমি দারোয়ান হয়ে জড়িয়ে ধরে
তখন বেতের ফলের মতো বিপন্ন রোদ
মায়ের আঁচলে অনায়াসে ভেদ করে শত্রুরা
মুহূর্তে রক্তজবার মতো সারা শরীরে লাল হয়ে ওঠে
প্রায় ঠোঁট প্রায় মুখ
সহস্র ক্ষতের মতো প্রস্ফুটিত
নিঃশব্দে মায়ের চোখ ভিজে যায়
অসম্ভব হৃদয়ে বেদনা নিয়ে
বাড়ি ফিরে অবোধের মতো
কিছু বোঝার আগেই
বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ ছড়িয়ে
দৃষ্টিহীন অন্ধকারে নিথর দেহ
বারান্দায় শুয়ে মা।
মায়ের জীবন যখন ধূসর বয়স
বিমল মণ্ডল
কচু গাছের ভেতরে ঝিঁঝি ডাকছে
অন্ধকারে কচুরিপানার শিরশির মধুরতা কিসমিস গাছের ফুল
সারা বাড়ির উঠানে ছড়িয়ে পড়ে
মা'র জীবনে তখন ধূসর বয়স
সারারাত জেগে থাকতে ভালোবাসে
বাড়ির দেওয়াল চিরে ফালাফালা করে ইঁদুর
উসকোখুসকো মেঝেতে মা ছেঁড়া মাদুর পেতে শোয়
চোখে তাঁর গভীর বেদনার ছবি
একটার -পর একটা -একটার পর একটা
স্মৃতির পাতায় বসে
গভীর অন্ধকারে
ধূসর বয়স গুণে
ধীর স্থির মনোযোগে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন