অঙ্কুরীশা সাহিত্য পত্রিকা ও আপনার অভিজ্ঞতা
অভিজ্ঞতা —১১
অঙ্কুরীশা মানেই প্রাণের পত্রিকা
দীপক বেরা
বাংলা কবিতা— কবি ও কবিতা'র ওয়েবসাইট থেকে আমাদের প্রথম আলাপ। আমার একটি কবিতার কমেন্টের সাথে, নিজের ফোন নাম্বার দিয়ে যোগাযোগ করতে বলেছিল বিমল মণ্ডল। পরিচিতিলাভের আগ্রহ প্রকাশ করে আমিও ফোন নাম্বার দিয়েছিলাম। দিনক্ষণ ঠিক বলতে পারব না, তবে কোনও এক উজ্জ্বল সকালে হঠাৎই আমার মোবাইল বেজে উঠল। অন্য প্রান্তে কোনও এক যুবক আমাকে দাদা সম্বোধন করে নিজের পরিচয় দিল 'বিমল মণ্ডল' বলে। বেশ প্রত্যয়ী কন্ঠস্বর। কথায় কথায় পরিচিতি ও আলাপ জমে উঠল ও বিস্তৃত হল। জানলাম বিমল একটি উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের বাংলার শিক্ষক। শুনলাম শিক্ষকতার আগে জীবনপথের নানান বাঁকে তার উত্থান-পতনের গল্প। চরম দারিদ্রের মধ্যে দাঁতে দাঁত চেপে নিরন্তর কঠিন সংগ্রামের ভিতর দিয়ে জীবনের চড়াই-উৎরাই পথে বারবার পড়ে গিয়েও শেষমেষ তার উঠে দাঁড়ানোর গল্প। সাহিত্যকে মনেপ্রাণে ভালোবেসে শিক্ষকতার পাশাপাশি সে কিছু লেখালেখি করে এবং 'অঙ্কুরীশা' নামে একটি ওয়েব ম্যাগাজিন সম্পাদনা করে। স্বাভাবিক ভাবেই বাংলা সাহিত্যের বিষয়ে এবং লিটল ম্যাগাজিনের হাল-হকিকত নিয়ে বেশ কিছু ভাবনার আদান-প্রদান হল। বিমলের চিন্তায় চেতনায় তখন 'অঙ্কুরীশা' এবং তার ভবিষ্যৎ। সোজা কথায় 'অঙ্কুরীশা'কে পথ চলতে হচ্ছে নানারকমের বাধা-বিপত্তি এড়িয়ে। শুধু তো লেখা যোগাড় নয়, এর সাথে আছে আর্থিক দায়ভারের দিকটা। আবার পত্রিকার কোনও সংখ্যা মুদ্রিত আকারে প্রকাশ করতে গেলে, তার সম্পাদনা এবং নির্ভুল মুদ্রণও যথেষ্ট ঝক্কির বিষয়। কিন্তু যেটা বুঝলাম, 'অঙ্কুরীশা'র সম্পাদক বিমল এই ব্যাপারে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী ও আশাবাদী।
আর, তার পর থেকেই নিরন্তর যোগাযোগ ও পত্রিকা বিষয়ক আলোচনা চলতে থাকে। তার সেই দৃঢ় আত্মবিশ্বাস— যে করেই হোক এই নিষ্ঠুর ব্যবসায়িক পত্র-পত্রিকার বাতাবরণ থেকে 'লিটল ম্যাগাজিন' এর পরিসরকে স্থায়িত্ব দিতে হবে এবং বাড়াতে হবে। আমার জীবনে দেখেছি, সময়ের সাথে সাথে কত যে পত্র-পত্রিকা লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। তাই আমার চিন্তা তখন কিছুটা সংশয়ী! পত্রিকা শুরু করে কিছুদিন চালানো হয়তো কঠিন কাজ নয় কিন্তু তাকে একটা স্থায়িত্ব দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। 'অঙ্কুরীশা' পত্রিকার ক্ষেত্রেও আমি এই চিন্তার বৃত্ত থেকে কিছুতেই বেরোতে পারছিলাম না। কিন্তু বিমল একেবারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, পত্রিকাকে চালিয়ে নেবেই সে, যতই দুর্দিন সামনে আসুক না কেন। সেই অনাগত অনিশ্চয়তার কথা ভেবে আমি যতই বেসুরো কথা বলি না কেন, মনে মনে তখনই ভেবে নিয়েছি যে এই 'অঙ্কুরীশা'র যাত্রাপথে আমিও সওয়ারি হব।
যা হবার তাই হল। 'অঙ্কুরীশা' আস্তে আস্তে অনেকের কাছে পরিচিতি পেতে শুরু করল। তাতে লিখতে আরম্ভ করলাম। এখনও ভেবে তৃপ্তি পাই যে, 'অঙ্কুরীশা'য় প্রথমদিকে নিয়মিত লেখা দিয়ে যাঁরা সমৃদ্ধ হবার চেষ্টা করেছেন, তাতে আমিও সামিল হতে পেরেছিলাম। এই তৃপ্তির কারণ কী? যে কোনও লেখাই যত্ন করে লিখলে একটা মানসিক প্রশান্তি আসে। কিন্তু এক্ষেত্রে কিছু বাড়তি পাওনাও ছিল। 'অঙ্কুরীশা'র লড়াইটা ছিল বহুমাত্রিক— সমাজ ও সংস্কৃতির বিভিন্ন টানাপোড়েনকে যেমন সহজ কথায় সাধারণের মননে দাগ কাটানো যদি তার একটা প্রধান উদ্দেশ্য হয়, তবে আর একটা প্রতিজ্ঞা ছিল যে বড় ব্যবসায়িক পত্র-পত্রিকার চাকচিক্যকে তোয়াক্কা না করে এক অসম প্রতিযোগিতায় সম্মানের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়া। আজ এতটা সময় পেরিয়ে এসে 'অঙ্কুরীশা' সব অর্থেই তার অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হয়েছে এটা নিশ্চিত বলা যায়।
আমার মতো অনেক সহৃদয় ব্যক্তি ও কবি-সাহিত্যিকদের আন্তরিক সহযোগিতায় 'অঙ্কুরীশা' এখন ই-ম্যাগাজিনের দুনিয়ায় কিংবা মুদ্রিত ম্যাগাজিনগুলির নিরিখে একটি অতি পরিচিত নাম। স্বতন্ত্রতায়, স্বকীয়তায় 'অঙ্কুরীশা' আজ তার একটি নিজস্ব পরিচয় অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রত্যেক মাসে প্রতিদিনের সংখ্যায় 'অঙ্কুরীশা' এক একটি বিষয়ভিত্তিক লেখা আহ্বান করে থাকে।
'আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস' উপলক্ষ্যে বিশেষ সংখ্যা প্রতি বছর থাকে। যখন যে মাসে যে সাহিত্যিক বা মনীষীর জন্মদিন বা তিরোধান দিবস থাকে, তাঁদের স্মরণে একটি বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি সংখ্যাও প্রকাশ করে থাকে, যা বিভিন্ন নবীন ও প্রবীণ কবি-সাহিত্যিকদের কবিতা বা প্রবন্ধ সম্বলিত। এছাড়াও প্রতি বছর শারদীয়া এবং বইমেলায় অন্তত দুটি মুদ্রিত গ্রন্থ বা ম্যাগাজিন প্রকাশ করে। এর পাশাপাশি কোনও বিশেষ মুদ্রিত গ্রন্থও প্রকাশ করে থাকে। যেমন— "দশের বারান্দায় একুশের রোদ্দুর", "জীবনানন্দ, এক আশ্চর্য মনীষা", "মধুসূদন ২০০"... প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
অঙ্কুরীশা'র সম্পাদক শ্রী বিমল মণ্ডলের বৈশিষ্ট্য হল ঠিক সময়ে ঠিক জিনিসটাকে আলোর পাদপ্রদীপে নিয়ে আসা। তাই বলা যায় 'অঙ্কুরীশা' এখন বিভিন্ন রঙে বিচ্ছুরিত এক রামধনু।
'অঙ্কুরীশা'র দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছরের পথচলার নিদর্শন হিসাবে উপরের বিষয়গুলির অবতারণা। অনেক সময়েই অনেক বিষয়ে চিন্তা আসে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে অনেক তর্ক-বিতর্ক চলতে থাকে। কিন্তু একে লেখায় বাস্তবায়িত না করলে, মানে কলমকে হাতিয়ার বলে মনে গেঁথে না নিলে, এই চিন্তাগুলি বুদবুদের মতো মিলিয়ে যায়। কালকের আলোচনায় আজকের চিন্তা আংশিক প্রকাশ পায়। 'অঙ্কুরীশা'র বিশেষত্ব এখানেই যে, আমাদের মতো অলস লেখকদের কলম ধরতে সে বাধ্য করেছে। যখনই লিখব লিখব করেও কলম বন্ধ করে সহজলভ্য বিনোদনের জগতে গা এলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি, 'অঙ্কুরীশা'র সম্পাদকমশাই মনের জানালায় কড়া নাড়া দিয়েছে। তখন কোথাও একটা দায়বদ্ধতা এসেছে যার থেকে আমি পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেও পারি নি। নথিবদ্ধ করেছি আমার মনের ভাবনাকে।
হ্যাঁ, এই 'অঙ্কুরীশা'র সুযোগ্য এক ও একমাত্র সম্পাদক শ্রী বিমল মণ্ডল আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন অনুজপ্রতিম ভ্রাতৃসম। একাধারে শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। তার সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয়, সে আপাদমস্তক নিপাট একজন সহজ সরল ভদ্রজন এবং নিরহঙ্কার। পাশাপাশি একজন লড়াকু, সৎ ও নির্ভিক এক ব্যক্তিত্ব।
পরিশেষে ভাই বিমল ও 'অঙ্কুরীশা'র দীর্ঘায়ু কামনা করি, সেইসঙ্গে নিরন্তর রয়েছে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শুভ কামনা।
এই পত্রিকার সাথে যেসকল কবি, সাহিত্যিক ও গুণীজন যেকোনও ভাবে যুক্ত আছেন, তাঁদের সকলকে আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ধন্যবাদ জানাই।
লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্র ও আদর্শ রক্ষা করে 'অঙ্কুরীশা' এ যাবৎকাল বাংলা সাহিত্যের যে আদর্শ ও ধারা বয়ে নিয়ে চলেছে আগামীদিনে পাঠকবর্গ সহ আপনাদের সকলের আন্তরিকতা ও আনুগত্য থেকে বঞ্চিত না হলে তা অব্যাহত থাকবে এক সুদীর্ঘ পথের কাণ্ডারী হয়ে, সেই দৃঢ় বিশ্বাসটুকু এই বর্তমান প্রতিবেদকের আছে। ভালো থাকবেন সবাই সতত। নমস্কার।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন