বুধবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-৩৬) ।। পৃথিবীর উল্টো পিঠ —বিশ্বেশ্বর রায়।। Ankurisha ।। E.Magazine ।।Bengali poem in literature ।।

 



ধারাবাহিক ভ্রমণকথা(পর্ব-৩৬)

পৃথিবীর উল্টো পিঠ
বিশ্বেশ্বর রায়

     আরও একটা ব্যাপার এখানে খুবই স্বাভাবিক এবং ভাল লাগে। সেটা আমাদের শিক্ষণীয়ও বটে। এখানে পথ-কুকুর, বিড়াল, গবাদি পশু নেই বললেই চলে। সেগুলি কারও না কারও পোষ্য। এখানে কুকুর-বিড়ালও অনেকে দত্তক নেয়। সেসব প্রাণীকে এরা আপন সন্তানের চেয়ে কম আদর-যত্ন করে না।অনেক ক্ষেত্রে মনে হয় বুঝিবা বেশিই যত্ন-আত্তি করে। তবে যেটা অনুকরণীয় তা হল--এইসব পোষ্যরা যেমন খাওয়া-দাওয়া করবে তেমনি প্রস্রাব-পায়খানাও  করবে। তারজন্য মালিক সর্বদা কাগজ বা পলিব্যাগ সঙ্গে রাখেন। আর সঙ্গে থাকে দস্তানা বা গ্লাভস। রাস্তাঘাটে, পার্কে পোষ্যরা যেখানেই পটি করুক না কেন হাতে গ্লাভস পরে সেই পটি তুলে কাগজ বা পলিব্যাগেনিয়ে নিকটবর্তী কোনও বিন বা কন্টেনারে ফেলেন। সঙ্গে যদি কাগজ বা পলিব্যাগ না থাকে তাও চিন্তা নেই, পার্কের মধ্যে স্থানে স্থানে টয়লেট পেপার রাখা থাকে সর্বসাধারণের জন্য। মোটকথা রাস্তাঘাট, পার্কে কোথাও কুকুর-বিড়ালের বিষ্ঠার পড়ে থাকে না উন্মুক্ত স্থানে। আমাদের দেশে এর ঠিক বিপরীত চিত্র নজরে পড়ে। কুকুর-বিড়ালের বিষ্ঠা তো কোন্ ছার, মানুষের বিষ্ঠাও যত্রতত্র পড়ে থাকতে দেখা যায়। এছাড়া প্রত্যেকটি পার্কে অনেকগুলো বসার জায়গা থাকে। আর থাকে গাছগাছালি,  ফুলের বাগান এবং মখমলের মত তৃণাচ্ছাদিত ক্ষেত্র। যা দেখলেই বসতে বা শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। এছাড়া প্রায় প্রতিটি বড় পার্কে একটি-দুটি জলাশয় বা লেক এবং পায়েচলা রাস্তার ধার বেয়ে বয়ে চলে স্বল্পতোয়া ঝিরঝিরে নদী। সেখানে কেউ কেউ মাছ ধরে। জলে হাঁস ভেসে থাকে অজস্র, ফোয়ারায় জল ওঠে। কোথাও কোথাও প্যাডেল বোট থাকে। সবই বিনামূল্যে প্রাপ্তব্য। কোথাও কোনও প্রবেশমূল্য নেই। সবই সরকারি বা কোনও ট্রাক্টরে অধীন।
     অনেক বড় বড় পার্কের মধ্যে রেস্টোরেন্ট আছে। আর আছে রেস্ট রুম বা টয়লেট। এখানকার প্রতিটি রেস্ট রুম বা টয়লেটে লিক্যুইড সাবান, টয়লেট পেপার, তাড়াতাড়ি হাত শুকনোর গরম হাওয়ার মেশিন বা কাগজ ইত্যাদি রাখা থাকে। এবং  বলা বাহুল্য সমস্তকিছুই বিনামূল্যে।
     ম্যাকডোনাল্ড, ওয়ালমার্ট, সেভ আর লট, ডলার ট্রি, ফ্যামিলি ডলার, সাবওয়ে, কে এফ সি, ট্যাকোবেল, বার্গার কিং বা যেকোনো মলে বা বাস ডিপোতে, স্টেশনে,  এয়ারপোর্টে সর্বত্রই এমন রেস্টরুম আছে। কিছু না কিনলেও শুধুমাত্র টয়লেট করার জন্যও সেখানে গিয়ে যেকেউ বিনা পয়সায় পরিষেবা পায়। সারা দেশে শুধুমাত্র টয়লেট পরিষেবায় যত টাকা খরচ হয় সেই টাকায় আমাদের দেশে কয়েক হাজার গ্রামীণ পায়খানা বানানো যায়।
     আবার দিন চলেছে মন্দাক্রান্তা ছন্দে। এখন দু'দিন কোথাও ঘুরতে যাওয়ার প্রোগ্রাম নেই। বাইশ তারিখে আমরা South Carolina-র একটা নামকরা Beach-এ ঘুরতে যাবে তিন দিনের জন্য। তার আগে অবশ্য অনেক কেনাকাটা, গোছগাছ করতে হবে এই দু'দিন। কারণ, ওখানে খাওয়া খরচ ভীষণ বেশি। তাই যতটা বাইরের খাওয়া কমানো যায় তার জন্যই অনেক শুকনো খাবার, ফল, দুধ, চা-কফি ইত্যাদি সঙ্গে নিতে হবে। কিছু খাবার তৈরি করেও নিতে হবে। সেই উদ্দেশ্যে Wal-Mart-এ যাওয়া হল সন্ধ্যায়। তবে বাবাই-এর এই project-টা এত বিশ্রী রকমের tough যে ও সারা দিন-রাতে বিশ্রাম প্রায় পাচ্ছেই না। সকাল সাতটা থেকে call শুরু হয়। নটা সাড়ে নটা পর্যন্ত call সেরেই ছুটতে হচ্ছে অফিস। সেখানেও সেই একটানা call attend বা meeting attend. কোনও কোনও দিন তো দুপুরের খাবার খাওয়ারও সময় পায় না। যে খাবার নিয়ে যায় তার সবই প্রায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এরমধ্যে সাতটা সাড়ে সাতটায় বাড়ি ফিরে আবার সঙ্গে সঙ্গে Wal-Mart বা Patel Brothers-এ গিয়ে কিছু কেনাকাটা সেরে বাড়ি ফিরে কোনোরকমে একটু রাতের খাওয়া সেরেই আবার call-এ বসতে হচ্ছে। চলছে প্রায় বারোটা বা কোনও কোনও দিন রাত দেড়টা-দু'টো পর্যন্ত। কখন ঘুমোবে বা একটু বিশ্রাম নেবে তার সময়ও প্রায় নেই। এই মাসখানেকের মধ্যে ওর শরীরটা বেশ কাহিল হয়ে পড়েছে বেশ বুঝতে পারছি। তার উপর 'গোদের উপর বিষফোঁড়া'! আগামী সপ্তাহে এখানে ওর একমাত্র work partner মিমি এক সপ্তাহের ছুটিতে যাবে। On site-এর পুরো দায়িত্ব এখন একা ওর ঘাড়ে। অবশ্য ওর P. M.-ও খুব খাটছে। কিন্তু সে তো সবসময় ওকে প্রায় খুঁচিয়ে চলেছে project-এর হাল হকিকত জানতে। তার উপর আছে clients side-এর নানা প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, তাদের সঙ্গে ঘন ঘন মিটিংয়ে বসা। এর সঙ্গে যোগ হয় off sore-এর পঞ্চাশ জনের নানা প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, তাদের সঙ্গে call-এ বসা।
     এইজন্যই এই weekend-এ দু'দিন ছুটি পাওয়া এবং তার সঙ্গে শনি-রবি যোগ করে চারদিন একটানা ছুটি হয়ে যাওয়ায় ও ঠিক করেছে তিন রাত্রি চার দিনের একটা tour করা হবে। Internet-এ খুঁজে খুঁজে পাওয়া গেল এখান থেকে প্রায় দেড়শো মাইল দূরে, পরের স্টেট South Carolina-য় খুব সুন্দর একটা beach আছে। নাম Myrtle Beach. ষাট মাইল লম্বা এই বীচটা। আমরা গাড়িতে যাব। Hotel booking হয়ে গেছে। আমাদের খাবারদাবারও প্রস্তুত।


আগামীকাল সকালে যাত্রা করা হবে ওই প্রমোদ-ভ্রমণে। ঠিক ছিল সকাল দশটা-সাড়ে দশটার মধ্যে যাত্রা শুরু করা হবে। কিন্তু বাবাইয়ের ঘুমই ভাঙল প্রায় দশটায়। ও ছুটি পেয়ে অনেকদিন পরে এমন বেঘোরে ঘুমাচ্ছিল যে, ওকে ডাকতে মায়া হল। যাইহোক, সবকিছু প্রস্তুতি সেরে বেরোতে বেরোতে বারোটা বাজল। আমাদের check in বিকেল তিনটেয়। G P S-এর দিদিমণি  দেখাচ্ছেন যে, ঠিকঠাক চললেও আমাদের পৌঁছাতে সাড়ে তিনটে পার হয়ে যাবে। মাসখানেক আগে যখন Smokee Mountain-এ ঘুরতে গিয়েছিলাম তখন রাস্তার দু'ধারের গাছপালাগুলো ছিল অনেক সতেজ, সবুজ এবং  Falfoliage-এর জন্য বিচিত্র বর্ণের। লাল হলুদ মেরুন ইত্যাদি রঙের বাহার ছিল সারা পথে। এখন গাছগুলো সব পাতা ঝরিয়ে যেন পোড়া পোড়া দেখাচ্ছে। বিশেষত আপেল ম্যাপল্ ওক এবং পাতাঝরা নানা গাছের পাতা অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে দিন পনেরোর মধ্যে প্রথমে রঙিন হয়, যাকে এখানে বলে falfoliage. তারপর পাতাগুলো শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে ঝরে পড়ে। এখন সেই ঝরার পালাও প্রায় শেষ। ফলে গাছগুলো ন্যাড়া পোড়া বিবর্ণ।


(চলবে)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন