বুধবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২১

ধারাবাহিক ভ্রমণকথা:পর্ব-৩৪।। পৃথিবীর উল্টো পিঠ— বিশ্বেশ্বর রায়।। Ankurisha ।। E.Magazine ।। Bengali poem in literature ।।

 




ধারাবাহিক ভ্রমণকথা:পর্ব-৩৪
পৃথিবীর উল্টো পিঠ
বিশ্বেশ্বর রায়


আজকে অ্যাপার্টমেন্টে pest control দেবার দিন ছিল। অফিসে যাবার আগে বাবাই সেটা বলে গিয়েছিল।ফলে রান্নাঘরের সব জিনিসপত্র ক্যাবিনেট থেকে বের করে অন্যত্র সরিয়ে রাখতে হয়েছিল। ছেলেটা এল প্রায় তিনটের দিকে। ও স্প্রে করে চলে যাবার পর সাড়ে তিনটের দিকে আমরা দু'জন বেরিয়ে কাছেই ভেটেরান্স পার্কে গেলাম। বিশাল পার্কটা। তবে লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে। পার্কে ঢুকেই নজরে পড়ল একটা Notice. তাতে লেখা--"For your safety/ walk inside the park with a friend." নোটিসটা দেখে একটু শঙ্কিত হলাম। 'বং কানেকশন' সিনেমায় দেখেছি এখানে নির্জন জায়গায় একা কাউকে পেলে বদমাইশ লোকজন তাদের কাছে ডলার চায়। না দিলে কেড়ে নেয়। আমার পার্সে তিনশো ডলারের উপর ছিল। ফলে ভয় বেড়ে গেল। তবুও সাহস করে একটু এগোতেই দেখি দু'জন কালো মানুষ রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করছে। আমরা সেদিকে না গিয়ে দেখলাম পাশে একটা টেনিস কোর্টে দু'জন খেলছে। তার পাশের কোর্টে একজন আপন মনে প্র্যাকটিস করে চলেছে। সেখানে ঘাসের উপর কিছুক্ষণ বসলাম। আশপাশের অপূর্ব নিসর্গের কিছু ছবি তুললাম। তারপর এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে দেখি অন্য একটা মাঠে চার-পাঁচজন নেপালি বা ভিয়েতনামি ছেলে ফুটবল খেলছে। সেখানেও খানিকক্ষণ বসে তাদের খেলা দেখলাম। আশেপাশে মিলে গোটা চারেক টেনিসকোর্ট, দু'তিনটে বাস্কেটবল কোর্ট, তিনটে বেসবল কোর্ট, দূরে কয়েকটা ফুটবল ও রাগবির কোর্ট। এছাড়াও বাচ্চাদের স্লিপ, সি স, নাগরদোলা ইত্যাদি নানা খেলার সরঞ্জাম। মাঝে মাঝেই বসার চেয়ার-টেবিল। সাইক্লিং এবং জগিং ট্র্যাক। আর সারা পার্ক জুড়ে নানা বর্ণের গাছপালা এবং ফুলের ছোট ছোট বাগান। পার্কটা কখনও টিলার মত উঁচু, কখনও ঢালু হয়ে নেমে গেছে অনেকটা। আর সারা মাঠটা মখমলের মত সবুজ ঘাসে ছাওয়া। তবে ওই বিশাল পার্কটায়(আনুমানিক 25/30 একর তো হবেই) সাকুল্যে 15/20 জন মানুষ খেলছে বা ঘোরাঘুরি করছে। বাচ্চা একজনও নেই। মনে হয়  মাঝ-সপ্তাহ বলে। সপ্তাহান্তে নিশ্চয়ই এখানে ভিড় হয় অন্যান্য পার্কের মত। শনি-রবিবারে একদিন আসতে হবে আবার।
     হুসেন বারাক ওবামা দ্বিতীয়বারের জন্য আবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হলেন। তাঁর প্রতিপক্ষ রোমানি তাঁকে স্বাগত জানালেন হাসিমুখে, করমর্দনের মাধ্যমে।কী সহজ সৌহার্দ্যপূর্ণ দৃশ্য! মাসব্যাপী বিতর্কে যেমন ছিল না কাদা ছোঁড়াছুড়ি, অশালীন বাক্য প্রয়োগ বা চিৎকার চেঁচামেচি, তেমনই এই জয়-পরাজয়ের নিষ্পত্তিতেও দেখা গেল সেই শান্ত-সুন্দর দৃশ্য। যেন খেলায় জয়-পরাজয়। এখানে পরাজিত দল নির্বাচনের পরে আর বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করে না। এরপর সব দল মিলে সহযোগিতার মাধ্যমে দেশ গড়ার কাজে লেগে পড়ে। সরকারকে পদে পদে বাধা দেওয়া,তার ভাল-মন্দ সব কাজে বাগড়া দেওয়া, ভাল কাজেরও সুখ্যাতি না করা, অকারণে বিরূপ সমালোচনা করা এসব আমাদের দেশের রেওয়াজ। কিন্তু এখানে ঠিক তার বিপরীত চিত্র দেখা যায়। আগেও একবার উল্লেখ করেছি--এদেশের প্রায় প্রতিটি মানুষ মনে করে দেশটা তারও, দেশের ভাল-মন্দের দায়দায়িত্ব সকলের। যে দল জনাদেশের বলে চার বা পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় এল তাকে কাজ করার সম্পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে, সহযোগিতা করতে হবে। কারণ, দেশের ভাল হলে সরকার, বিরোধী সবারই মঙ্গল। শুধু বিশেষ একটা দলের মঙ্গলের জন্য সরকার নয়--এই বিশ্বাস এখানকার আপামর জনগণের। সরকারও মানুষের বিশ্বাসের মর্যাদা দেয়। আমাদের দেশে দেশপ্রেম ব্যাপারটাই প্রায় বিলুপ্ত। বা বলা ভাল দেশপ্রেম জাগাবার মানসিকতাই নেই আমাদের দেশের নেতা-নেত্রীদের মধ্যে। তারা মনে করে দেশটা যেন শুধুমাত্র তাদেরই এবং তাদের দলের। দেশের ভাল করার দায়-দায়িত্ব শুধু তাদেরই হাতে। অন্যরা তাতে ভাগ বসালে তাদের আত্মাভিমানে লাগে বুঝি। ফলে বিরোধীপক্ষ চায় সরকারকে পদে পদে বিড়ম্বিত করতে। তার  সব কাজে বাগড়া দিতে। তাহলেই তারা সরকারের ব্যর্থতাকে জনসমক্ষে ফলাও করে তুলে ধরে পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে পারবে। সরকারকে সহযোগিতা করলে, সরকারের সাফল্য হলে তাদের দলের কোনও ফায়দা নেই--বিরোধীপক্ষের এমনই মানসিকতার ফলে দেশের মঙ্গল কিছুতেই হয় না। দেশ জাহান্নমে যাক আখেরে তাদের দলের কোনও লাভ হল কিনা এটাই মুখ্য বিবেচ্য। তারা ভাবে না যে, সরকারকে সাহায্য করলে, দেশ গড়ায়, দেশের উন্নয়নে সাহায্য করলেও তাতে তাদের দলের ভাবমূর্তিও ঊজ্জ্বল হয়, মানুষ সেটাও লক্ষ করে। এবং তার জন্যও তারা পরবর্তীতে ক্ষমতায় ফিরতে পারে জনসমর্থনের মাধ্যমে। কিন্তু ওই নেতিবাচক মনোভাবের জন্য দেশ বা তাদের দল কারও মঙ্গল হয় না।
     এখানকার খবরের কাগজের দিকে চোখ বোলালেও আমাদের দেশের খবরের কাগজের সঙ্গে তার মৌলিক পার্থক্য চোখে পড়ে। আমাদের ওখানকার খবরের কাগজে শুধুমাত্র নেতিবাচক খবরই ছাপা হয়। খুন, ধর্ষণ, নারী পাচার, শিশু নিগ্রহ, বধূহত্যা, হুমকি, লুটতরাজ, ছিনতাই, রাস্তা অবরোধ, চলবে না চলবে না, ক্লোজার, ছাঁটাই, ধর্মঘট, বনধ্,  পুলিশি জুলুম, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা,  



দারিদ্র্যের জন্য সন্তান বিক্রি বা আত্মহত্যা, হাসপাতালে কুকুর ঢোকা বা ডাক্তারদের চিকিৎসায় গাফিলতি--তজ্জনিত অবরোধ, প্রহার--এবম্বিধ খবরেই ঠাসা থাকে পৃষ্ঠাগুলো। তার সঙ্গে সরকারের অপদার্থতা, সমালোচনা, কুৎসা। কোনও ভাল কাজের প্রশংসা নয়। কিন্তু এখানকার খবরের কাগজে এসমস্ত খবরগুলো কিছু থাকলেও বিশেষ গুরুত্ব পায় না। গুরুত্ব পায় গঠনমূলক, উন্নয়নমূলক, বিকাশশীল খবরে। এই যে এখানে বিধ্বংসী ঝড় স্যান্ডি হয়ে গেল--তারজন্য সরকারি ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলি খুঁচিয়ে তুলে হাইলাইট করা নয়, সরকারি প্রচেষ্টা এবং সাফল্যকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিভাবে ওই বিপর্যয় থেকে দেশ মুক্ত হতে পারছে বা চেষ্টা  চালাচ্ছে এগুলোই তুলে ধরে। অর্থাৎ সেই আগে দেশ এবং মানুষ, দল বা ক্ষুদ্র স্বার্থ নয়। এবং এক্ষেত্রে বিরোধীপক্ষও দেশের স্বার্থে সরকারকে সাহায্য করে বা সহযোগিতা করে। রাজনৈতিক লাভের জন্য তারা সরকারকে বিড়ম্বনায় ফেলে দেশের মানুষের দুর্দশাকে দীর্ঘায়িত করে না। অবশ্য  বলা বাহুল্য ব্যতিক্রমও আছে।


(চলবে)
 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন