শুক্রবার, ৭ মে, ২০২১

রবি স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি - ২৫।। আরণ্যক বসু।। Ankurisha ।। E.Magazine ।।Bengali poem in literature ।।

 






রবি স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি - ২৫

আরণ্যক বসু 




১.

আমি গীতাঞ্জলির পাতা

   


আমার   শান্ত হৃদয়ধ্বনি

আমার   হিয়া দুরুদুরু বুক

মহা      শ্রাবণের ধারাজল

ভরা      বৈশাখে উন্মুখ !


আমার      হৃদয়েশ্বর নেই

আমি   আকাশের মতো একা

সেই   দুর্বিপাকের পথে

ভানু    তোর সাথে হল দেখা !


আমি    বিপন্ন ইতিবৃত্ত 

তুমি    আশি বছরের আলো

শুধু   ব‍্যর্থ মালাটি গাঁথি

যদি   গীতসুধারস ঢালো !


যদি   আগামী জন্মে দেখি

হয়ে   ঝড়ের কৃষ্ণকলি

না না   ও নাম আমার নয়

তবু    একটা কথাই বলি ?


ওগো    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 

হবে    আমার গানের খাতা ?

হও   অপাপবিদ্ধ মরণ 

আমি    গীতাঞ্জলির পাতা


তুমি     নিভৃত হৃদয়কথা

লিখো  গভীর হাওয়ায় রাতে

সেই   ভরা পঁচিশের স্মৃতি

ছোঁবো  শ্রাবণের বর্ষাতে...









২.

চারুলতা থেকে কাদম্বরী

   


( হৃদয় আমার আকুল হল ,

নয়ন আমার মুদে এল রে--

কোথা দিয়ে কোথায় গেল সে॥

গীতবিতান/ প্রেম /১৯২ )


ঘরবন্দী পঁচিশে বৈশাখের প্রতীক্ষা ছিল 

টিভির পর্দায় সকালের চারুলতা থেকে রাতের কাদম্বরী পর্যন্ত ।


আমারও অপেক্ষা ছিল সেই কোন অতীতে ফিরে , অভিযাত্রিকের পাতা হয়ে জিপসী ক‍্যাম্প ভ‍্যানিশেস ইনটু দ‍্য ব্লু'র রূপকথার স্বপ্ন-কথায়...


ও কবি , যে যায় , সে কি ছায়ার মতো একেবারেই মিলিয়ে যায় ?


আমার প্রতীক্ষা ছিল , বুদ্ধদেব বসুর তিথিডোর উপন্যাস থেকে আপনার নষ্টনীড় ছোটগল্প পর্যন্ত ! কারণ ?  আকাঙ্খার বিবাহলগ্ন, আবার দীর্ঘ জীবনপথে হারানো সত্তা

ফিরে পাওয়ার আমোদিত ইচ্ছেটুকু যে ভীষণ ও আন্তরিকভাবে জড়িয়ে থাকে  কবিগুরু!


না রজনীগন্ধা, না পলাশ,না উলু উলু মাদারের ফুল, না কাশ-শিউলি-সাদা পালের স্নিগ্ধ হাতছানি ;

কেউ আমাকে জানাতে পারেনি নিরুদ্দেশের শেষ ঠিকানা।


আমার   প্রাণের 'পরে চলে গেল কে

বসন্তের   বাতাসটুকুর মতো ।

সে  যে   ছুঁয়ে গেল ,নুয়ে গেল রে--

ফুল    ফুটিয়ে গেল শত শত ।


আপনি বলুন ভানু, মানবিক ভূপতিকে কেন এতটাই নির্লিপ্ত স্বামী হতে হল, যে চারুলতার দুচোখ ভরা কৌতুহল , তাঁকে টপকে অন‍্য কাব্যভাষার দিকে চলে গেল ?

ভানুসিংহ আপনি  জানান, বিষণ্ণ বৌঠানের জন্মদিন কেন তার খেলা ও খুনসুটির দোসর দেবরই শুধু মনে রাখে ?

স্বামীর বুকে কি ভালোবাসার জলছাপ শেষ পর্যন্ত মুছে যাওয়া দিন হয়ে যায় ?


সে    চলে গেল বলে গেল না -- সে   কোথায় গেল ফিরে এল না।

সে    যেতে যেতে চেয়ে গেল   কী    যেন গেয়ে গেল ---


বিশ্বকবি ,দয়া করে বলে দিন শুভদৃষ্টির মালার গন্ধ থেকে আকেলে হাম আকেলে তুম-এর বিচ্ছেদ-সংস্কৃতিই কি হাহাকার জীবনের চরম সত‍্য ?


ঘুম-পাড়ানি ওষুধ, ঘুম না পাড়িয়ে কেন যমের বাড়ির ঠিকানা লেখা চিরকুট হাতে ধরিয়ে দেয় ?


প্রিয় ভানুসিংহ , ফরাসডাঙার মোরান সাহেবের বাংলোর দরাজ ছাদ যে আজও জাজিম পেতে অপেক্ষায় ....

 আকাশ আমি ভরব গানের সেই তারাদীপ জ্বলা রাত আরেকবার ফিরিয়ে আনা যায় না ? সাধের আসনে কবিতার খাতা নিয়ে প্রিয় কবি বিহারীলাল,বহুদূরের কুষ্ঠিয়া থেকে রবিদর্শনে পায়ে পায়ে হেঁটে আসা দোতারার লালন ফকির , অকুন্ঠ হৃদয়বান জ‍্যোতিদাদা, সব কিছুতেই বিস্মিত হতে ভালোবাসা নতুন বৌঠান ,আর প্রভাতসঙ্গীতের পটে আঁকা এক ও অদ্বিতীয়  যুবাপুরুষ রবীন্দ্রনাথ -- এই স্থির ও প্রতিবিম্বিত চিত্র আরেকবার ফিরিয়ে আনা যায় না ?

কেন চলে যেতে হয়- ওগো দুখজাগানিয়া নিঃসঙ্গ মানবীকে ? অমন একা একা ? বিসর্জনের নীলকণ্ঠ পাখির একটা পালক পর্যন্ত সঙ্গে থাকে না তার !

কেন আঁচল লোটানো অনিয়ন্ত্রিত পদক্ষেপে একগুচ্ছ অভিমানকে ক্রমশ অতীতের দিকে চলে যেতে হয় ,ভানু?


সে    ঢেউয়ের মতন ভেসে গেছে,  চাঁদের আলোর দেশে গেছে,

যেখান দিয়ে হেসে গেছে,  হাসি তার রেখে গেছে রে---


বিকেলের পড়ন্ত রোদে, শিলাইদহ থেকে জোড়াসাঁকোতে সদ‍্য ফেরা জমিদার রবীন্দ্রনাথ, মুহূর্তেই রবিবাউল হয়ে, নতুন বৌঠানের কানের লতি ছোঁয়া রূপোলি চুলের হালকা গুচ্ছের দিকে তাকিয়ে যদি বলে উঠতে পারতেন--বৌঠান, তোমাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে ...

সেও তো একধরনের বিপন্নতাবিহীন পাওয়া,ভানু !


নতুন বৌঠান , আপনার ভগ্নহৃদয়, ভেঙে টুকরো টুকরো কলিজা, প্রিয় আয়নায় দেখা শতচ্ছিন্ন প্রতিবিম্বকে কেমন করে বোঝানো যাবে-- পরিবারের সকলের সঙ্গে , সকলের আনন্দ দুঃখে, বেদনা-বিষাদে , প্রদীপে-মঙ্গলঘটে , সাংসারিক ইত্যাদি-প্রভৃতিতে মিশে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বকবি হবার শুভসংবাদ বয়ে আনা টেলিগ্রাম প্রৌঢ় দুচোখের আলোতে তুলে ধরবার যে অতিজীবিত আনন্দ ...


কুসুমবনের উপর দিয়ে কী কথা সে বলে গেল,

ফুলের গন্ধ পাগল হয়ে সঙ্গে তারি চলে গেল


হে চিরজীবী রবি-দিগন্ত , একমাত্র আপনিই হয়তো পারেন, অথবা পারেন না--

পথের শেষ কোথায় বলতে !


দাঁড়ান কাদম্বরী, দাঁড়ান ভালোবাসার স্তব্ধ মুখশ্রী,

আপনার জন্য গীতাঞ্জলি এনেছে হারানো নীলিমার প্রাণ জুড়নো সুবাতাস...


তাই   আপন-মনে বসে আছি 

কুসুমবনেতে...






আজই পাঠান আপনার সৃজন 👇👇



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন