শুক্রবার, ২৬ মার্চ, ২০২১

বসন্তের গল্প।। মনে যখন বসন্ত… শুভশ্রী দে।। Ankurisha ।।E.Magazine ।। Bengali poem in literature ।।

 

বসন্তের  গল্প

মনে যখন বসন্ত…  

শুভশ্রী দে


নীহারিকা বড় বড় চোখ তুলে তাকালো।

বিপরীতে বসে থাকা ভদ্রমহিলা বোধহয় কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।"কাকিমা, আপনি কি করতেন আমার জায়গায় থাকলে? নিজেকে একবার আমার জায়গায় বসিয়ে দেখুন।""তুমি হয়তো ঠিকই করছো। আমি বোধহয় সত্যিই বেয়ারা আবদার করে ফেলছি তোমার কাছে। আমার ছেলেটা… "নীহারিকা তাকিয়ে দেখলো, ভদ্রমহিলা বোধহয় কষ্টে আছেন এটা ঠিকই তবে ওর পক্ষে আর কিছু করা সম্ভব নয়। উনি চলে গেলেন। নীহারিকা বসে রইলো। ধীরে ধীরে ওর চোখের নিচে বাষ্প জমা হলো, মন আর্দ্র হয়ে এলো। তবু ও জানে জীবনের কিছু কিছু রাস্তায় আর কখনো ফিরে যেতে নেই, কোনোদিনও না। রূপকথার গল্পের মতো, চলে যাবার সময় পিছন থেকে অনেকে বহুবার নাম ধরে ডাকবে আর ফিরে তাকালেই সব পরিশ্রম আর কষ্ট বৃথা হয়ে যাবে!



ছয়মাস আগে —


– ডিনার করলে? 

– হ্যাঁ হলো। তোমার?

– হ্যাঁ।

– ওকে।

– ওকে, গুডনাইট।

– গুডনাইট।


প্রতিদিনের অভ্যাস মতো মেসেজ করে ঘুমোতে যায় নীহারিকা। অনি ওর বয়ফ্রেন্ড। ওদের তিন বছরের সম্পর্ক। এখন আর আগের মতো জৌলুস নেই, উদ্দীপনা কমে এসেছে যেন। তবে নীহারিকা সেইজন্য দুঃখ পায়না, ও বোঝে পরিণত হলে সম্পর্ক এমনি হতে শুরু করে।

পরেরদিন সকালে ঘুম ভাঙে ফোনের ডাকাডাকি শুনে। বন্ধুর ফোন।মেয়েটা ফোনে ওকে যা বললো সেসব শুনে তো ওর পায়ের তলার মাটি কেঁপে গেল! অনি নাকি সৃজাকে ভালোবাসে, তলায় তলায় নাকি ওদের সম্পর্ক চলছে! সৃজা হল নীহারিকার বেস্টফ্রেন্ড। কলেজ পড়ুয়া, সুন্দরী, আধুনিকা মেয়েটি এইসময় ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলোনা ওর করণীয় কি! আসলে গতবছরও এইধরণের একটা খবর কানাঘুসো শুনেছিল তবে অনি অস্বীকার করে। সেটা অন্য একটি মেয়ের সাথে… নাহ! এভাবে চলতে পারেনা। অনিকে এবার উত্তর দিতেই হবে। সৃজা এটা কিভাবে করতে পারে! আদৌ কি বিশ্বাসযোগ্য এই কথাগুলো! নানারকম চিন্তা ভাবনারা জট পাকিয়ে গেছিলো নীহারিকার মাথার ভিতরে।তারপরের ঘটনাগুলো পরপর ঘটে গেছিলো ওর জীবনে। এবারে অনি স্বীকার করে যে ও সৃজার সাথে একটা সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে। সেটা নিজের ইচ্ছাতেই। সৃজাও সবকিছু স্বীকার করেছিল। এরপর আর নীহারিকার কিছু করার ছিলনা। অনি ক্ষমা চেয়েছিলো। এইসব যখন ঘটছিলো নিজের কাছে নিজেই যেন হেরে যাচ্ছিলো নীহারিকা। ওর মনে হচ্ছিলো যেন এসব ওর জীবনে নয়, অন্য কারোর জীবনে ঘটছে। ও বোধহয় সিনেমা দেখছে, এটা কখনোই ওর জীবন হতে পারেনা। কোনোভাবেই অনি এসব করতে পারেনা। ওর প্ৰিয় বান্ধবী সৃজা সব জেনেশুনে ওর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেনা।তারপরে অন্ধকার রাতগুলো কাটতে চাইতোনা। নিজেকে অস্তিত্বহীন মনে হতো নীহারিকার। বেঁচে থাকার কারণ খুঁজে পেতোনা ও। কারোর সামনে দাঁড়াতে ইচ্ছে হতোনা, কারোর সাথে কথা বলতে মন চাইতোনা, রাস্তায় বেরুতে ভালো লাগতোনা। কলেজ যেতে রীতিমতো ভয় করতো ওর এটা ভেবে যে সৃজার মুখোমুখি হলে ও কি করবে সেটা ভেবে! নিজের কষ্টগুলোকে বুকে চেপে ঘুরতে কেমন ক্লান্ত লাগতো! সারাক্ষন যেন দমবন্ধ লাগতো মনের ভিতর। মনে হতো, যারা জানতো ওদের সম্পর্কের ব্যাপারে তারা বোধহয় ওকে দেখে করুণা করছে। নিজের আত্মসম্মান যেন নষ্ট হয়ে গেছে এমন একটা ধারণা মনের মধ্যে ঘুরতো সারাদিন।এভাবেই কয়েকটা মাস পেরিয়ে গেছিলো।



আস্তে আস্তে অবস্থার উন্নতি হয়েছে। কষ্টগুলোর তীব্রতা কমেছে। মনের ভার কিছুটা সময়ের সাথে লাঘব হয়েছে। নীহারিকা এখন একা থাকতে ভয় পায়না। পুরোনো স্মৃতিগুলো এখন মনকে আগের মতো যন্ত্রনা দেয়না। গত পরশুদিন অনির মা ওকে ফোন করেছিলেন।

– নীহারিকা আমি অনির মা বলছি। 

– হ্যাঁ, কাকিমা বলুন।

– আমি জানি তোমাদের সম্পর্কটা নেই। তবু আমার তোমার সাথে একটু দরকার ছিল। তুমি একবার দেখা করবে?কাকিমার অনুরোধে আজ বিকেলে নীহারিকা গেছিলো দেখা করতে। একটা ক্যাফেতে বসেছিল দুজনে। কাকিমা বললেন, "অনি সৃজার সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে সেটা আমি মাস তিনেক আগে জানতে পারি। কিন্তু, সৃজা মেয়েটা সত্যিই ভালো নয়। ওর সাথে মেলামেশা করার পর অনি অনেক বদলে গেছে। তুমি হয়তো জানোনা আজকাল ও আমার সাথে ভালোভাবে কথা পর্যন্ত বলেনা। আমার মনে হয় তুমি পারবে ওকে বোঝাতে। তুমি ওর সাথে যোগাযোগ করলে ও হয়তো নিজের ভুল বুঝে তোমার কাছে ফিরে আসবে। আমি বলছি, সব ঠিক হয়ে যাবে। "

"কাকিমা, আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু, আমার পক্ষে আর যোগাযোগ করা সম্ভব নয়। আমি অপমানিত হতে চাইনা। " নিজের দৃপ্ত কণ্ঠস্বর শুনে নিজেরই ভালো লেগেছিলো নীহারিকার। তারপরও কিছু কথা হয়, তবে নীহারিকা নিজের সিদ্ধান্তে অনড় রইলো। 

বাড়ি ফেরার সময় রাস্তার ধারের রাধাচূড়া গাছটা হলুদ ফুলে ভর্তি হয়েছিল। আর ঠিক তার পাশে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে আগুনরঙা প্রচুর ফুল ফুটেছিল। নীহারিকা গাড়ির ভিতর থেকে মুগ্ধ নয়নে বাইরের দিকে তাকিয়েছিল। ও বুঝতে পারছিল ক্যালেন্ডার বলছে, বসন্ত এসে গেছে। ওর মন বলছিল এটাই সময় নিজের সাথে নিজে বসন্তকে উপভোগ করার। আজ বহুদিন পর নিজেকে আবার ফিরে পেয়েছে যেন। ওর মনে হচ্ছে এবার সব ঠিক হয়ে যাবে। আজ কাকিমা যে প্রস্তাব দিলেন একসময় ও নিজে কতবার ভেবেছে অনির সাথে কথা বলবে। আজ থেকে তিনমাস আগেও কেউ এমন বললে ও হয়তো লুফে নিতো, অনিকে ফিরে পাবার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইতোনা। কিন্তু, আজ সত্যিই মন সায় দেয়নি। নিজেকে ভালবেসে নিজের জীবনটা স্বাধীনভাবে কাটাবে ও। পিছুটান ওকে আর কাবু করতে পারবেনা। হাসিমুখে ও সামনের দিকে তাকায়। মনে মনে বলে ওঠে, "জীবনের প্রতিটা বাঁকে এভাবেই যেন সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি, ঈশ্বর তুমি আমায় শক্তি দাও। প্রভু, তুমি আমার সঙ্গে থেকো আজীবন। "




আরও পড়ুন👇👇👇


https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/03/ankurisha-emagazine-bengali-poem-in_79.html



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন