ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (পর্ব-১৭)
নেপথ্য সংগীতের আড়ালে
অনন্যা দাশ
চার মাস পর নিউ ইয়র্ক থেকে বাবার লেখা ইমেল এল জিকো-কেকার নামে:আশাকরি তোমরা ভাল আছো আর মন দিয়ে পড়াশোনা করছ। এখন এখানে রবিবার দিন রাত্রিবেলা তাই এই ইমেলটা লিখতে বসেছি। এই দু'দিন অভিজিতের বাড়িতে ভালই কটিল। সেই নিয়েই কয়েকটা ঘটনা তোমাদের জানাতে চাই। এই ইমেলটা সাগরকেও দেখিও। অভিজিতের বাড়ি নিউ ইয়র্ক রাজ্যের রাজধানী অলবানিতে। ছোট্ট কিন্তু মিষ্টি শহর।
আামি শুক্রবার রাতেই বাস ধরে অলবানি পৌছেছিলাম। অভিজিৎ গাড়ি নিয়ে বাস স্টপ থেকে আমাকে তুলে নিয় গিয়েছিল। ওর ছেলে অঙ্গজিৎকে তোমাদের মনে আছে? সেই যে খুব ভাল গান গাইত? সে তো এখন অনেক বড় হয়ে গোছে। করনেল ইথাকাতে গড়ছে। পড়ার চাপ খুব বেশি তাই প্রতি উইকেন্ডে বাড়ি আসতে পারে না। সেই জন্যে ওর সঙ্গে দেখা হল না।
অভিজিতের স্ত্রী লোপা অনেক কিছু রেঁধে রেখেছিল। শুক্রবার রাতে খাওয়াটা তাই ভালই হল।পরদিন সকালে অলবানির কয়েকটা দ্রষ্টব্য দেখে আমরা লেক জর্জের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। অলবানির সিটি হল আর অর্ধ ডিম্বাকৃতি একটা অডিটোরিয়াম, বেশ নতুন ধরনের লাগল। লেক জর্জ অভিজিৎদের বাড়ি থেকে এক ঘন্টার পথ এখন এখানে বসন্তকাল তাই চারিদিক খুব সুন্দর। গাছগুলো সব ফুলে ফুলে ভরে রয়েছে, একটাও পাতা নেই! থোকা থোকা ফুল দেখতে ভারি সুন্দর লাগছে। গোলাপি ম্যাগনোলিয়া, সাদা ডগউড, তাই ওই এক ঘণ্টার ড্রাইভটা খুবই মনোরম হল। পথে অবশ্য একবার ম্যাকডোনাল্ডে দাঁড়িয়ে চিকেন স্যান্ডউইচ খাওয়া হল।
লেক জর্জের দৃশ্য অতি মনোরম। আমরা এক ঘন্টার নৌকা-বিহার করলাম লেকে। নৌকাটার নাম “মিনি হা হা'। রেড ইণ্ডিয়ান নাম। সেটা একটা প্যাডেল-হুইল নৌকা। নৌকার গিছনে একটা বড়সড় লাল চাকা ক্রমাগত ঘুরছিল। আশপাশের দৃশ্য দেখে মন ভরে যাচ্ছিল। লেক জর্জের পার ধরে সব বড়োলোকদের বিলাসবহুল বাড়ি। বেশ রিল্যাক্সিং আরামের নৌকা বিহার হল।লেক জর্জ পাশেই গ্রেট এসকেপ থিম পার্ক। সেখানে বিশাল বিশাল সব রাইড। আমরা তিনজন বুড়োবুড়ি বলে আমরা আর ওখানে ঢুকলাম না, লোপা বলল, “বুড়ো হাড়ে আর ওই সব রোলার কোস্টার-টোস্টার সহ্য হবে না তাই আমরা ফোর্ট উইলিয়াম দেখতে গেলাম।
১৬৮৯-এ ইংরেজ আর ফরাসিরা সারা বিশ্ব দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল জল, স্থল সব জায়গায়। আধিপত্যর জন্যে ওরা পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছিল। ইউরোপে যুদ্ধ করে ওদের যুদ্ধ শেষ হল না, মার্কিন মুলুকে এসে গৌছল সেই যুদ্ধ। ১৭৫৬ থেকে১৭৬৩ টা হয়েছিল সেটাকে ফর ইয়ান ওয়ার বলা হয় আবার সেভেন ইয়ারস ওয়ারও বলা হয়। ফোর্ট হেনরি ১৭৫৫ থেকে ১৭৫৭ লেক জর্জের দক্ষিণ সীমানা রক্ষা করে। দুর্গের ইতিহাস ছোট কিন্ত শেষের দিকের ভয়ানক দিনগুলোর কথা জেমস এফ কুপারের বই দা লাস্ট অফ দা মোহিকান্স এ লিপিবন্ধ করা আছে। বইটা আমি অনেকদিন আগে পড়েছিলাম, দেখি লাইব্রেরি থেকে নিয়ে আবার পড়ে দেখতে হবে। ওখানে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন মিউজিয়ামও আছে কিন্তু সেটাতে আর গেলা না আমরা। আসলে রাতে একটা নিমন্ত্রণ ছিল তাই অলবানি ফিরে এলাম।
অমৃতপ্রসাদ গোয়েঙ্কার সঙ্গে অভিজিৎ আর লোপার আলাপ ওখানকার মন্দিরে । ভদ্রলোকের অলবানিতে বেশ কয়েকটারেস্টুরেন্ট আছে। উনি বেশ বড়লোক, বিশাল বাড়ি। রাধা-কৃষ্ণের মন্দির করেছেন একটা গোটা তলা জুড়ে। উনি নাকি ছোট বেলাটা কলকাতায় কাটিয়েছেন সে কারণে বাংলার প্রতি ওনার অগাধ টান। গানবাজনা খুব ভাল বাসেন তাই মাঝে মাঝে বাড়িতে লোক ডেকে গানবাজনার বড়সড় আসর করেন। সেই রকমই একটা আসরে আমাদের নিমন্ত্রণ ছিল। এদিক ওদিক থেকে শিল্পীদের ডেকে আনেন। অনেকেই এসেছিল সেখানে। সিগাড়া,ঘুখনি, পোড়া, চা-কফি ইত্যাদি দিয়ে জলযোগের পর অনুষ্টান শুরু হল। ভালই চলছিল। মমতা রায় বলে একজন স্থানীয় শিল্পী কিছু রবীন্দ্র সংগীত গাইছিলেন। প্রথমে 'অমল ধবল গালে গাওয়ার পর উনি ‘এ মনিহার' গানটার দুলাইন যেই না গেয়েছেন অমনি একটা গন্ডগোল হল। প্রভাদেবী বলে একজন অতিথি এসেছিলেন। উনি মিস্টার গোয়েঙ্কার বিশেষ অভিথি, নিউইয়র্ক থেকে এসেছিলেন সেদিন। উনি ওনার স্বামী জয়দেব সিং আর ছেলে ভূষণ সিংহ নাকি রাজস্থানের এক রাজবংশের ছেলে আর প্রভাদেবী সিসোদিয়া বংশের মেয়ে। ওদের ছেলে ভূষণ ইন্জিনিয়ারিং পাশ করে নিউ ইয়র্কে চাকরি করছে তাই ওনারা ছেলের কাছে বেড়াতে এসেছেন। যাই হোক, ওই গানের দু'লাইন শোনার পর প্রভাদেবী অজ্ঞান হয়ে চেয়ার থেকে পড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। সে তো এক হূলুস্থুল কান্ড, ভাগ্য ভালো ওখানে জমায়েত একজন ডাক্তার ছিলেন। প্রভাদেবীর জ্ঞান ফিরে আসার পর ওনার ছেলের সাথে আমাদের কথা হচ্ছিল। সে বলে যে ওই গানটার সঙ্গে ওর মার খুব ভয়াবহ একটা অভিজ্ঞতা জড়িত তাই উনি গানটা শুনে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলন। কুখ্যাত মণিমানিক্যের চোর কালনাগ যখন প্রভাদেবীর প্রসিদ্ধ পান্নার হারটা চুরি করে তখন প্রভাদেবীর ঘুম ভেঙে যায়, তাই কালনাগ ওনাকে আঘাত করেছিল এবং ওই গানের প্রথম লাইনটা বিকৃত করে শুনিয়েছিল, সেই জন্যেই ওই গানটা শুনে ওনার ওই রকম প্রতিক্রিয়া হয়। আমি তখন ওখানে উপস্থিত সকলকে আমার জানা গল্প বললাম কালনাগের ব্যপারে। তারপর ওদের আমাদের ওই অপহরণের অভিজ্ঞতাটা বলেছিলাম। আর অজিত পাঠক কিভাবে ধরা পড়লেন ইত্যাদি যাই হোক বাকি অনুষ্ঠান ভালো ভাবেই শেষ হল। বলা বাহুল্য আর গাননি। আমি আজ সকালে বাস ধরে নিউ ইয়র্ক ফিরে এসেছি। একটু আগে ভূষণের কাছ থেকে এবটা ফোন পেলাম। ও যা বলছে সেটা আরও সাংঘাতিক! সেটা আমি আর লিখলাম না ওর মুখ থেকে শুনলেই ভালো।তোমাদের মামাকে বলো ভূষণের ফোন নম্বর 212-758 - - - সাগর যেন পারলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে একটা ফোন করে।
ভালবাসা নিও।
ইতি বাবা
ইমেলটা জিকো সঙ্গ সঙ্গে মামাকে ফরওয়ার্ড করে দিল আর ফোন করে বলেও দিল।
মামা মনে হয় ভূষণ ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বললেন কিন্তু কি কথা হল সেটা জিকো-কেকাকে কিছু বললেন না। মামাকে জিজ্ঞেস করেও কোন ফল হল না।
চলবে...
আরও পড়ুন 👇👇
https://wwwankurisha.blogspot.com/2021/03/ankurisha-emagazine-bengali-poem-in_18.html

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন