রবিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২১

বইমেলা সংখ্যার গল্প ।। আধ ভেজা রাত — মানসী মিশ্র হালদার

 




বইমেলা সংখ্যার গল্প   

আধ ভেজা রাত

মানসী মিশ্র হালদার


অকস্মাৎ ধেয়ে আসা মহামারীতে বিপর্যস্ত মানুষ।মৃত্যু আর মৃত্যুর মিছিলে থমথমে আবহাওয়া ।বন্ধ স্কুল, কলেজ, অফিস।গণমাধ্যম সর্বদা জাগ্রত ।বারবার সাবধান করছে ।একটাই কথা ---'সবাই বাড়িতে থাকুন।'

ডিসটেন্স মেনে চলা,মাস্ক আর স্যানিটাইজার-ই এর একমাত্র প্রধান ওষুধ ।

গ্রামের সব বাড়িগুলো কেমন থমথমে ।একে অপরের বাড়ি যাওয়া, হৈ হুল্লোড়,কোলাহল -সব যেন থমকে গেছে করোনা আবহে।

সরকার থেকে চলছে বিনা পয়সায় রেশন ব্যবস্থা।স্কুল গুলো থেকেও চলছে চাল,ডাল, আলু দেওয়ার ব্যবস্থা ।

লকডাউনে মানুষের রোজগার বন্ধ হতে চলেছে।দারিদ্র্য আর হাহাকার মানুষের দৈনন্দিন চিত্র ।

      মানুষের প্রয়োজন কোনদিন সাহায্যে মেটানো যায়না ।তবু যতটুকু পারা যায়-

অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মতোএগিয়ে আসে বিদ্যাসাগর বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবির রায়।

    মোটর বাইক নিয়ে মুখে মাস্ক বেঁধে ঘুরে বেড়ায় আবির।সহৃদয় শিক্ষক ও সমাজসেবী হিসাবে পরিচিত মুখ আবির।এর আগে দু-একবার খবরের কাগজে ও প্রকাশিত হয়েছে আবিরের নাম।

তাই রাস্তায় পুলিশকর্মীরা আবিরকে নমস্কার করে।বাধা দেয়না তার কোন কাজে।

সারাদিন স্কুলের ছেলে মেয়েদের খবর নিয়ে, পাশাপাশি গ্রামের মানুষের খবর নিয়ে অনেক রাতে বাড়ি ফেরে আবির।

আবিরের বাড়ি বলতেএকটা ভাড়া বাড়ি।বাড়ির মালিক কোলকাতায় থাকেন ।মেদিনীপুরের এই বাড়ি তার ফাঁকাই পড়ে থাকে ।তাই আবিরকে পুরোটাই ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দিয়েছেন ।আবির অবশ্য বলেছিল ---এত বড়ো বাড়ি কি হবে?

বাড়ির মালিক ভালোবেসে বলেছিলেন-যা খুশি করবেন ।সেই থেকে আবির এখানেই থাকে।

        কাজের মেয়ে পরমা-ই আবিরের সব কাজ করত।কিন্তু এখন পরমার আসা বন্ধ ।তাই আবির রাতে বাড়ি এসে ফ্রেস হয়ে চাল,ডাল আর সবজি একসঙ্গে নিয়ে কড়াইতে বসিয়ে দিল।সুন্দর খিচুড়ি হয়ে গেল ।

আবির খেতে খেতে ভাবছে--কতদিন এমন চলবে?মানুষ কিভাবে বাঁচবে?

ভাবনার স্রোতে ভাসতে ভাসতে কোনরকমে একটু খেয়ে বিছানায় আশ্রয় নিল আবির।চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেই সব দিন —

        পূর্ব মেদিনীপুরের বাসুদেব পুরের ছোট্ট টালির ঘর।বাবা চাষের কাজ করে ক্লান্ত আর মা লোকের বাড়ি কাজ করে ক্লান্ত ।

কিন্তু আবিরের রেজাল্ট, শিক্ষকদের ভালোবাসা আবিরের বাবা -মায়ের সব ক্লান্তি দূর করে দিত।

আবির এইচ.এস-এ ভালো রেজাল্ট করে তমলুক কলেজে ভর্তি হোল।অন্য ছেলেদের মতো খুব উজ্জ্বল ছিলনা সে।সব সময় একটা আতঙ্ক ঘিরে থাকত ।ভালো রেজাল্ট করতে হবে,চাকরি পেতে হবে,বাবা -মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে হবে-এগুলোই তার ভাবনা।

কলেজে ছেলেরা আবিরকে খুব ভালোবাসতো।আবির যেমন শান্ত তেমন স্থির ।অনেক বড়োলোক বাড়ির সুন্দরী মেয়েরাও আবিরকে কাছে পেতে চেয়েছিল।আবির কোনদিকে তাকায়নি।লক্ষ্য একটাই --মা-বাবার মুখের হাসি।

     কলেজ থেকে কেমিস্ট্রিতে ভালো নম্বর পেয়ে আবির বিদ্যাসাগর ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হোল।এই সময় থেকে শুরু হোল এডুকেশান্যাল লোন নিয়ে পড়াশোনা ।কিন্তু বি,এড না হলে শিক্ষকতা করা যাবেনা ।তাই লোনের পরিমান বাড়িয়ে শুরু হোল বি,এড পড়া।তার সাথে শুরু হোল টিউশন পড়ানো ।

এমন সময় হঠাৎই আবিরের বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন।আবিরের মা দিশাহারা ।আবির বাবাকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করল।কিন্তু সরকারি হাসপাতালের গাফিলতি কেড়ে নিল আবিরের বাবা দয়াময় রায়ের প্রাণ। 

বাবার চিতার আগুন স্পর্শ করে মনে মনে শপথ নিল আবির ---বাবা, আমি তোমার মতো আর কাউকে অসহায় ভাবে মরতে দেবনা।আমি আমার লক্ষ্যে পৌঁছবই বাবা ।

     বাবার সমস্ত পারলৌকিক কাজ সেরে আবির মাকে বলল---মা,তোমাকে কারও বাড়ি কাজ করতে হবেনা ।আমি রোজগার করব ।তুমি শুধু রান্না করবে।একদম মন খারাপ করবেনা ।দেখবে আমি বাবার আশা পূরণ করবো ।

—কিন্তু তোর পড়াশোনা?

—সব হবে ।আর তো মাত্র কটা মাস।বি.এড কমপ্লিট হয়ে গেলে অনেক টিউশন পড়াব।

—তোর কষ্ট হবে বাবা!

—তুমি অনেক করেছো মা,এবার শুধু আমার মা হয়ে থাকো।আর কিছু না!

      শুরু হোল লড়াই আর লড়াই ।একদিকে টিউশন অন্যদিকে চাকরির পরীক্ষা আর বি.এড পড়া ।একসময় বি.এড কমপ্লিট  হোল কিন্তু চাকরি হোলনা।

           এস .এস.সি পরীক্ষার গতি ক্রমশ ধীর হয়ে আসছে।কয়েক বছর পরীক্ষা হয়নি ।অবশেষে হাতে এলো সেই শুভ ক্ষন ।এস.এস.সি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা হোল ।

পরীক্ষা দেওয়ার প্রায় এক বছরের মাথায় রেজাল্ট প্রকাশিত হোল।তার ও প্রায় এক বছর পর ভাইভা হোল।তার ও প্রায় ছয় মাস পর রেজাল্ট বেরোল।আবির পাশ করেছে।

প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রেজাল্ট দেখে বাড়ি ফিরছে আবির ।ঘরের সামনে অনেক লোকের ভীড় ।

আবির জিজ্ঞেস করলো-কি হয়েছে?

গ্রামের মানুষের চোখে জল পড়ছে।

রানু কাকিমা বলল,ঝড়ে ঘরের টালি এসে তোর মায়ের মাথায় পড়েছিল।তোর মা আর নেই আবির!  এই কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়লো রানু কাকিমা ।

হঠাৎ একটা ফোন আসতে বাস্তবে ফিরল আবির ।

--হ্যালো,

-আবির, আমি তোমাদের গ্রামের হরি কাকাকে বলেছিলাম এখন তো লকডাউনের জন্য আমাদের কাজ একেবারে বন্ধ ।

-ঠিক আছে, আমি আশ্রমের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছি ।তুমি গ্রাম আর আশ্রমটা দেখ কাকা।এখন লকডাউনে অতদূর যাওয়া যাবেনা ।মাস খানেক পরে লকডাউন খুললে আমি যাব।এখানের গ্রাম গুলো আমি দেখেছি ।আর আমার স্কুলের ছেলে গুলো ও খুব আমার ওপর নির্ভর করে আছে।এদিকটা আমি দেখেছি।টাকা পাঠিয়ে দেব।ওদিক টা তুমি দেখ কাকা।

—ঠিক আছে ।সাবধানে থেকো ।

—তোমরা ও সাবধানে থেকো কাকা

ফোন রেখে দিয়ে বাড়ির আশ্রমের কথা চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল আবির ।

      সকাল হতেই মোবাইল বেজে ওঠে।

—হ্যালো,

—স্যার, আমি রাতুল বলছি ।

—বলো।

— আজ অন লাইনে ক্লাস হবে তো স্যার?

—হ্যাঁ,সবাই কে বলে দাও এগারোটা থেকে দুটো পর্যন্ত ক্লাস নেব।

—স্যার, তোতন,অভ্র ফোন করেছিল ।ওদের তো—

—জানি,ওদের স্মার্ট ফোন নেই ।ওদের সবাই কে আমি নোটস দিয়ে দেব।বাকিটা ফোনে বুঝিয়ে দেব।ওদের আমাকে ফোন করতে বলবে।

—ঠিক আছে স্যার ।

—ওকে।

আবির বিছানা থেকে উঠে ফ্রেস হয়ে এক কাপ চা খেয়ে পঞ্চায়েত প্রধানের কাছে গিয়ে মানুষজনের খবর নিল।

প্রধান বললেন ,এখানে দু’বছর চাকরি করছেন ।অথচ আমাদের কত আপন হয়ে গেছেন আপনি।

---চাকরি যখন এত দূরে হোল ভেবেছিলাম নিজের বাড়ি ছেড়ে থাকব কি করে!কিন্তু আপনাদের ভালোবাসায় আমি নতুন জীবন পেয়েছি ।

----আপনার বাড়ি তো আশ্রম বানিয়েছেন?

-----হ্যাঁ,লকডাউন উঠলে ওখানে যাব।মাসে

দু’বার না গেলে মন হাহাকার করে ওঠে।

---কি আর করবেন, লকডাউন উঠুক, যাবেন।আপনি সাবধানে থাকবেন ।দিন দিন অবস্থা বড়ো খারাপ হচ্ছে। 

----সেই জন্যেই তো মন ভীষণ খারাপ ।কোন সমস্যা হলে জানাবেন ।যথা সাধ্য চেষ্টা কোরব।আজ তাহলে উঠি অলক বাবু।

----আসুন,সাবধানে যাবেন।

আবির পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাড়ি এসে স্নান করে রান্না চাপিয়ে দিল।দশটা থেকে রেডি হোল পড়াবার জন্য ।

টানা এগারোটা থেকে দুটো পর্যন্ত ক্লাস নিল আবির ।দুপুরের খাওয়া সেরে আবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চলল গ্রাম পরিদর্শন ।

বয়ে চলল ঘড়ির কাঁটা -----

এক সময় করোনাকে মেনে নিয়েই খুলল হাটবাজার ।খুলে গেল অফিসও বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ।এখন চলছে মাঝে মাঝে লকডাউন ।

         আবিরের স্কুলের কাজ অনেক বেড়ে গেছে ।আন অফিসিয়ালী প্রায় স্কুল খোলা ।চলছে অফিসিয়াল কাজ।তার সাথে ভালো মতো চলছে অন লাইন  ক্লাস ।

প্রতিদিনের মতো আজও অনেক রাতে বাড়ি ফিরল আবির ।তবে এখন আর রান্না করতে হয়না।পরমা দুবেলা এসে রান্না করে দিয়ে যায়।

আবির ফ্রেস হয়ে খাওয়া দাওয়া সেরে বিছানায় শুয়েছে ।হঠাৎ মনে হোল হরি কাকাকে ফোন করার কথা ।

আবির কল করল।ফোন রিসিভ করল হরি কাকা ।

-----আবির, ভালো আছো তো বাবু?

-----হ্যাঁ কাকা,তোমাদের কোন অসুবিধে নেই তো?

-----আশেপাশে অবস্থা খারাপ ।তবে আমাদের চলে যাচ্ছে এই যা।

-----ঠিক আছে কাকা, আমি কাল যাচ্ছি ।

------ট্রেন তো চলছেনা।বাস যদি ও এক আধটা চলছে ,খুব রিস্ক হয়ে যাবে ।

------ না কাকা,আমি বাইক নিয়ে যাব।

------ অনেক সময় লাগবে তো ?

------ সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ব।কোন অসুবিধে হবেনা।কতদিন তোমাদের দেখিনি ।খুব মন খারাপ করছে তোমাদের জন্য ।

------ আমাদের ও তো মন খারাপ ।সবাই তোমার আশায় বসে আছে।আবির কবে আসবে------

----- সবাই কে বলো আমি কাল যাচ্ছি ।

---- ঠিক আছে ।সাবধানে এসো।

---- হ্যাঁ কাকা ,রাখছি তাহলে।

----হ্যাঁ বাবা, ভালো থেকো ।

     হরি কাকার সাথে কথা বলে মোবাইলে নিউজ দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ল আবির ।

বাসুদেব পুরের আবিরের পুরোনো বাড়িতে গড়ে ওঠা নতুন দোতলা অসহায় আশ্রম করোনা প্রবাহেও কলরব মুখর।আবির আসছে।সকাল থেকে একটা খুশি খুশি হাওয়া ।রাধুনিরাও রান্না বান্না নিয়ে ব্যস্ত ।

হরি কাকা  সকাল সকাল ঘুম ভাঙিয়ে দেয় আবিরের ।সকাল পাঁচটায় মোবাইলে রিং হোল।

আবির কল রিসিভ করল।

----- উঠেছি কাকা।

------ ওয়েদার খুব খারাপ ।বৃষ্টি হতে পারে ।তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসো।

------ হ্যাঁ কাকা ।আমি রেডি হচ্ছি।

------ সাবধানে আসবে ।

----- হ্যাঁ হ্যাঁ,চিন্তা কোরোনা ।রাখছি ।

আবির বিছানা ছেড়ে ব্রাস করে স্নানে গেল।পরমা এসে কাজ শুরু করে দিয়েছে ।

আবির বাসুদেবপুর যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে গেল ।পরমা চা বানিয়ে দিল।

আবির চা খেতে খেতে বলল,দিন কাল খুব খারাপ ।সাবধানে থাকিস পরমা।চাবি তোর কাছে রাখবি।কোন কিছু প্রয়োজন হলে নিয়ে যাবি।

পরমা বলল,তুমি কবে আসবে মাস্টারমশাই?

------- সবে তো যাচ্ছি ।অনেক দিন যাইনি ।দিন কয়েক থেকে চলে আসব।

------ তোমাকে না দেখলে বড্ড মন খারাপ করে মাস্টারমশাই ।

আবির একটু হেসে বলল,ওটা তো আমার স্বর্গ পরমা ।ওখানে তো যেতেই হবে।ওখানে গেলে আসতে ইচ্ছে করেনা ।আবার তোদের ছেড়ে ও থাকতে পারিনা ।চলে আসব তাড়াতাড়ি ।

আবির চা খেয়ে ঘরের চাবি পরমাকে দিয়ে বাইক স্টার্ট করল।

পরমা বলল, সাবধানে যেও মাস্টারমশাই ।

হ্যাঁ,তোরা ও সাবধানে থাকিস-বলে বেরিয়ে গেল আবির। 

আবির বাইক চালিয়ে নিজের বাড়ি আসছে।যদিও মহামারী প্রবাহ চলছে তবুও মনের কোনে আনন্দ ।

শ্রাবনের আকাশ বেশ মুখ ভার করে আছে।রাস্তা ঘাটে লোকজন মুখে মাস্ক পরে চলছে।হাট বাজার সবই বসেছে।কে কতটা দূরত্ব মেনেছে তা তারা নিজেরাও জানেনা ।তবু সাবধান সবাই ।

           প্রায় বারোটার দিকে বাড়িতে এলো আবির ।অসহায় আশ্রমের মানুষেরা আনন্দে বিহ্বল ।আবিরের যত্ন আত্তিতে ব্যাকুল ।

আবির বলল,কেউ কাছে আসবেননা ।প্রত্যেকে সচেতন থাকুন -এটাই আমার চাওয়া ।

হরি কাকা বলল,যাও স্নান সেরে নাও।খাওয়া দাওয়া করতে হবে ।সেই কোন সকালে বেরিয়েছো।অতদূর বাইক চালিয়ে ----

-----না কাকা, আমার কোন অসুবিধে হয়নি ।ওখানে তো সারাদিন বাইক নিয়ে ঘুরি।

------অনেক হয়েছে, যাও।স্নান সেরে নাও।

-------যাচ্ছি কাকা ।

ক্রমশ আকাশের অবস্থা খারাপ হচ্ছে ।মনে হচ্ছে এই বৃষ্টি নামল বলে।

আবির স্নান সেরে একে একে সবার খবর নিল।হরি কাকা খাওয়ার জন্য তাড়া দিতে খেতে বসল আবির ।খাওয়া প্রায় শেষের পথে এমন সময় আবিরের মোবাইল বেজে ওঠে।

----- হ্যালো,

----- আবির, আমি তন্ময় বলছি ।

----- হ্যাঁ তন্ময় বল।

------ তুই বাড়ি এসে গেছিস?

------- হ্যাঁ,এসে গেছি।

------ শোন না ,আমাদের খঞ্জন চক গ্রামের মানুষের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে ।কয়েকজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ।এদের পাশে তো কেউ থাকতে চাচ্ছেনা।হরি কাকা বলেছিল তুই আজ আসবি।তাই তোকে ফোন করলাম ।তুই আসবি এখানে? আমরা কয়েকজন আছি যারা তোকে পেলে মনে জোর পাব।

------- আমি এখুনি বেরোচ্ছি।

------- একটু বিশ্রাম নে।না হয় কাল আসবি।

------- আরে বিশ্রামের কি আছে।আমি যাচ্ছি ।

------তাড়াহুড়ো করিস না ।সাবধানে আসিস।

--------ওকে।

আবির খাওয়া শেষ করে বলল,হরি কাকা, তন্ময় ফোন করেছিল ।খঞ্জন চক যেতে হবে।

--------সে তুমি যাও,কিন্তু ঝড় বৃষ্টি নামল বলে।

-------অত চিন্তা কোরোনা কাকা, তাড়াতাড়ি চলে আসব। 

------কিন্তু --

------কোন কিন্তু নয় কাকা।ঝড় বৃষ্টি আমার কিছু করতে পারবেনা ।আমি ঠিক ভালোভাবে পৌঁছে যাব।

-------ঠিক আছে ।সাবধানে যাও।

আবির বাইক নিয়ে বড়ো রাস্তায় উঠেছে এমন সময় শুরু হোল অঝর ধারায় বৃষ্টি ।সারি সারি আম,জাম, নারকেল, লিচু গাছগুলো ও মেতে উঠেছে বৃষ্টির আবেশে।

আবিরের সারা শরীরে যেন বৃষ্টির কাঁটা ফুটছে।বাড়ি ফেরার আনন্দিত মন ক্রমশ অজানা আশঙ্কায় ফিকে হয়ে যাচ্ছে ।

বৃষ্টি যেন কোন খেলায় মেতে উঠেছে ।মাঝে মাঝে গর্জন করছে আকাশ ।যেন কোন অজানা কাহিনীর সাক্ষী হতে চলেছে সে।

    অন্যমনস্ক আবিরের মন।গাড়ি ঘোরাতে গিয়ে চৌমাথার মোড়ে ধাক্কা লাগল মারুতির সঙ্গে ।আবির ছিটকে পড়ে গেল ।গাড়ি থেকে নেমে এলো এলাকার পরিচিত বড়ো অফিসার স্বর্নভ সেন।আশেপাশের লোকজন ছুটে এলো।স্বর্নভ মানুষ হিসেবে বেশ ভালো ।স্বর্নভকে দেখে কেউ কিছু বললনা।সবাই আবিরকে তুলল।

বৃষ্টি যেন আজ ছুটে চলেছে।বিরতি নেই কোন।

          আবিরের পায়ে একটু চোট লেগেছে ।তেমন কোন আঘাত লাগেনি ।এমন কি বাইকের ও বিশেষ কিছু ক্ষতি হয়নি ।হেলমেট আবিরের মাথাতেই ছিল ।তাই মাথা ও রক্ষা পেয়েছে ।

স্বর্নভ বলল,তোমরা ওকে গাড়িতে তোল।আমি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।

হেলমেট খুলে আবির বলল,দরকার নেই ।আমি ঠিক আছি ।

দুজনে দুজনের দিকে তাকাল ।অবাক দুজনেই ।

স্বর্নভ বলল, আবির!

একটু হেসে আবির বলল,স্বর্নভ!

উপস্থিত লোকজনের মধ্য থেকে একজন বলল,ও,দুজন দুজনকে চেনেন।ভালো ভালো ।চলো সবাই ।আর থাকার দরকার নেই ।

স্বর্নভ বলল, তোর সঙ্গে কতদিন পর দেখা ।তাও এভাবে! সে যাই হোক আমি তোর বাইক গ্যারেজে পাঠিয়ে দিচ্ছি ।একটু ঠিকঠাক করে দিক।তুই আমার গাড়িতে ওঠ।আমার বাড়ি চল।

--------প্লিজ স্বর্নভ, আমার কথা শোন।গাড়ি টা একটু দেখিয়ে আমি চলে যাব ।আমার কিছু হয়নি ।আর এখন কেউ কারো বাড়ি যায়না।যাওয়াটা ঠিক নয়।

স্বর্নভ একজন লোক দিয়ে বাইক গ্যারেজে পাঠিয়ে একরকম জোর করেই গাড়িতে তুলল আবিরকে ।

মাতাল বৃষ্টি একটু শান্ত হয়েছে ।ঘড়ির কাঁটা জানিয়ে দিচ্ছে সন্ধ্যার আগমন বার্তা ।আবিরকে নিয়ে বাড়িতে এলো স্বর্নভ ।

স্বর্নভের বাড়িতে অনেক দিনের পুরনো একজন মানুষ থাকেন ।তার নাম খোকা দা।বয়স পঞ্চাশ হলেও তিনি এখনো খোকা-ই।তার পরিচয় কাজের লোক হলেও এই বাড়িতে এক বিশেষ জায়গা দখল করে বসে আছে সে।খোকাদা কে সবাই সম্মান করে আর ভালোবাসে।

     স্বর্নভের সাথে আবিরকে দেখে খোকাদা বলল,দাদাবাবুর বন্ধু বুঝি?

স্বর্নভ বলল,তুমি জিনিয়াস খোকা দা ।সব বুঝতে পারো।আমার এই বন্ধু টি অনেক বড়ো মানুষ ।এর নাম আবির ।

--------কি সুন্দর নাম।

--------ওর সব-ই সুন্দর ।আমরা ফ্রেস হয়ে নিচ্ছি।গরম গরম চা নিয়ে এসো খোকা দা।

--------এখুনি চা বানাচ্ছি ।তোমরা তাড়াতাড়ি পোশাক পাল্টাও।দিন কাল যা খারাপ ।ঠান্ডা লাগলে যত জ্বালা। 

বকবক করতে করতে রান্না ঘর গেল খোকা দা।

স্বর্নভ ফ্রেস হয়ে একটা স্কাই কালারের পাজামা পাঞ্জাবি পরল। আবিরকে দিল সাদা পাজামা পাঞ্জাবি ।

স্বর্নভ আবিরকে  নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে বসাল।সুন্দর সাজানো বিছানা, আলমারি, টেবিল ।টেবিলের ওপর স্বর্নভ আর নিভার ছবি।

আবিরের চোখ পড়ল ছবির দিকে ।

স্বর্নভ বলল, তুই তো আগে দেখিসনি।এখন দ্যাখ আমার বউ নিভা।

আবির একটু হাসল।

খোকাদা চা নিয়ে এলো।

স্বর্নভ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বললো, খোকাদা, নিভা কটার দিকে আসবে কিছু বলে গেছে?

-----সন্ধে হবে বলেছিল ।

------যা বৃষ্টি হোল ।গাড়ি নিয়ে গেছে তো?

------হ্যাঁ দাদাবাবু ।

------এখন অবশ্য বৃষ্টি টাএকটু ধরেছে।

------ একটা ফোন করনা দাদাবাবু ।বাইরের পরিবেশ বেশ খারাপ ।

-------না থাক,আবার ডিস্টার্ব ফিল করবে ।

খোকাদা চলে গেলে আবির বলল--ম্যাডাম কোথায় গেছেন?

-------গান্ধী অনাথ আশ্রম ।নাম শুনেছিস তো?

-------হ্যাঁ শুনেছি ।

--------সপ্তাহে একদিন নিভা ওখানে যায়।ওখানে গেলে ও নাকি খুব শান্তি পায়।আমি কিছু বলিনা।যায় যাক।

------- এতো খুব ভালো কথা।অনেক ভাগ্য ভালো এমন বউ পেয়েছিস।

স্বর্নভ হাঃ হাঃ করে হেসে উঠল ।খোকাদা এগরোল আর চিকেন পকোড়া বানিয়ে নিয়ে এলো।

------- ওঃ খোকাদা, এই বৃষ্টিতে গরম গরম পকোড়া, থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ।আবির চলবে তো?

আবির পকোড়া হাতে তুলে বললো, খুব চলবে।

প্রায় ছটা বাজতে যায়।বাইরে বৃষ্টি একটু থামলেও সন্ধ্যা রাণী বেশ অভিমানীনী হয়ে আছে।যেন কোন চাওয়া থমকে গেছে মাঝ রাস্তায় এসে।

এমন সময় গাড়ি আসার শব্দ হোল ।খোকাদা ছুটে গিয়ে দরজা খুলল।

নিভা গাড়ি থেকে নামল।মুখে মাস্ক ,হাতে গ্লাভস,চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা ।খুব গম্ভীর মুখে খোকাদাকে বলল, দাদাবাবুর গাড়ি দেখছি।এসে গেছে?

------ হ্যাঁ বৌদিদি,দাদাবাবুর এক বন্ধু ও এসেছে।

----- ও!

নিভা গরম জলে স্নান করে হাল্কা গোলাপ রঙের একটা শাড়ি পরল।খোলা চুল ।সিঁথিতে সিঁদুর । বাইরে বৃষ্টির ঠান্ডা বাতাস ।মোহময়ী নিভা অথচ অভিমানী মুখ ।

নিভা যখন রুমে গেল তখন স্বর্নভ আর আবির কলেজ লাইফের গল্প বলতে বলতে হাঃ হাঃ করে হাসছে ।

নিভা বলল,বৃষ্টিতে খুব জমে উঠেছে তাই না?

------ এসো নিভা, আমাদের কলেজে লাইফের গল্প হচ্ছিল ।শুনলে তুমিও না হেসে পারবেনা ।ও,হ্যাঁ,এ আমার বন্ধু আবির ।

নিভা নমস্কার করল।সঙ্গে সঙ্গে আবির ও নমস্কার করল।

স্বর্নভ বলল, তোমার গান্ধী আশ্রমের খবর কি নিভা? সব ভালো তো?

------- হ্যাঁ,এখনো পর্যন্ত সব ভালো ।মাস্ক, স্যানিটাইজার আর কিছু খাবার দিয়ে এসেছি ।

------ তোমার সাথে আবিরের মিলবে ভালো ,তাই না আবির?

আবির একটু হাসল ।কোন কথা বললনা।

স্বর্নভ বলল, আবির ও তোমার মতো সমাজসেবী।আবার টিচার ।খুব ভালো টিচার ।স্টুডেন্টরা সব ওর বন্ধু ।

---------প্লিজ স্বর্নভ ,থাম এবার ।

-------আমার বন্ধু এত বড়ো একজন মানুষ, যাকে নিয়ে নিউজ পেপারে লেখা হয়-সে আজ আমার বাড়িতে ।এ যে কত বড় গর্ব বলে বোঝাতে পারবোনা ।

স্বর্নভ নিভার দিকে তাকিয়ে বলল, কি ব্যাপার বলোতো?আমি একাই বকে যাচ্ছি ।তোমরা সব চুপচাপ ।কিছু তো বলো -----

নিভা বলল, তুমি না থামলে কি করে বলি বলোতো?তোমরা বরং জমিয়ে গল্প করো।আমি রান্নাঘরে যাই।

-------কেন খোকাদা, না না চিকেনটা তুমি ভালোই বানাও।তাহলে যাও।ও হ্যাঁ,আমি ন’টার দিকে বেরোব।

------- আজ ও অন্যের হয়ে নাইট করবে?

-------কি কোরব, সমরেশের মিসেস একটু অসুস্থ তাই----

------- তোমার বউ সবসময় সুস্থ ,তাই কখনো সময় দেওয়ার প্রয়োজন মনে করনি।আমি রান্নাঘরে যাচ্ছি ।

নিভা রুম থেকে বেরিয়ে গেলে আবির বলল, তুই রাতে বাড়িতে থাকবিনা?

--------আরে এক কলিগের হয়ে নাইট করতে হবে।

--------তাহলে আমাকে নিয়ে এল কেন?

-------তোর সাথে কতদিন পর দেখা ।নিয়ে আসবনা!তোকে খুব মিস করতাম ।তোর নম্বর ও ছিলনা  যে ফোন কোরব।ও তোর মোবাইল নম্বর টা দে ।সেভ করে নিই।

আবিরের বুকে যেন মেঘের গর্জন ডেকে উঠলো।মোবাইল নম্বর দিয়ে স্বর্নভকে বলল,তাহলে চল,গ্যারেজ থেকে গাড়ি নিয়ে আমি ও চলে যাব।

--------আমি বলে দিয়েছি ।ওরা বাড়িতে গাড়ি দিয়ে যাবে ।ওরা আমার খুব পরিচিত ।তুই আজ থাক ।আমি সকালে এলে-------

--------নারে,তোর সাথে এভাবে অ্যাক্সিডেন্ট না হলে আজই খঞ্জন চক যেতাম।ওখানে মানুষের পরিস্থিতি খুব খারাপ ।ওরা আমার আশায় আছে।বেশি কিছু তো পারিনা, যেই একটু ওদের পাশে দাঁড়াই।

-----------ঠিক আছে, আজ না,কাল যাস।

------কিন্তু ----

-----কোন কিন্তু না।প্লিজ!

-----ওকে ।তবে আমি কিন্তু খুব ভোর ভোর বেরিয়ে যাব।তোর সঙ্গে দেখা না ও হতে পারে ।

--------ঠিক আছে ।আমি ফোনে যোগাযোগ করে নেব।

--------তুই সেই আগের মতোই আছিস স্বর্নভ ।

------তুই ও একই আছিস।

দুজনে দুজনের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল।দুজনের দু'চোখে কত না জমানো কথা -যা কখনো শেষ হওয়ার নয়।

------আমি এবার রেডি হব আবির ।

---- ঠিক আছে ,তুই যা।আমি একটু নিউজ দেখি।

আবির নিউজ দেখছে।মন আরও খারাপ হচ্ছে।একদিকে মহামারী, বন্যা অন্যদিকে কিছু মানুষের দালালি আর চক্রান্তের শিকার আমাদের দেশ ।কি হবে?কিভাবে বাঁচবে ভারতবর্ষ? বুকের ভেতর বিপ্লব আর চোখের কোনে প্লাবন ।বড় অসহায় মনে হোল নিজেকে ।

হঠাৎ মনে হোল তন্ময়ের কথা ।আবির কল করল তন্ময়কে।

------ হ্যালো আবির, বল।

------ শোন না ,আমি তোর কাছে যাচ্ছিলাম ।কিন্তু রাস্তায় একটা অ্যাক্সিডেন্ট----

--------অ্যাক্সিডেন্ট!

------- আরে তেমন কিছু না ।আমাদের বন্ধু স্বর্নভ।চৌমাথার মোড়ে ওর গাড়ির সাথে আমার বাইকের ধাক্কা লেগেছিল ।

--------তারপর?

-------আমার কিছু হয়নি ।পায়ে একটু আঘাত লেগেছে। কোন অসুবিধে হয়নি ।ভালো আছি।কিন্তু ও জোর করে আমাকে ওর বাড়িতে এনেছে ।আমি এখন স্বর্নভের বাড়িতে ।কাল খুব ভোর ভোর তোর কাছে চলে যাব।

------ ঠিক আছে ,সাবধানে আসবি । অসুবিধে হলে বলবি আমি স্বর্নভের বাড়ি থেকে তোকে নিয়ে আসব।

--------আরে না না, আমি চলে যেতে পারব।এখন রাখছি ।

------ওকে।

তন্ময়ের সাথে কথা বলে ফোন রাখবে এমন সময় হরি কাকার ফোন এলো।

-------হরি কাকা বলো।

--------ভালোভাবে পৌঁছেছো তো?

আসলে কাকা তন্ময়ের কাছে যাওয়ার পথে আমার বন্ধু স্বর্নভের সাথে দেখা ।ও আমাকে ওর বাড়ি এনেছে।আমি স্বর্নভের বাড়িতে আছি কাকা।খুব ভালো আছি ।কাল সকালে তন্ময়ের কাছে যাব ।

--------ঠিক আছে ।সাবধানে থেকো ।

-------হ্যাঁ কাকা, রাখছি ।

অ্যাক্সিডেন্টের কথা শুনলে কাকা চিন্তা করবে।তাই অন্যভাবে কথা বলে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল আবির ।

এমন সময় স্বর্নভ রেডি হয়ে এলো।

-------আবির, আমি যাচ্ছি ।খাওয়া দাওয়া করে বৃষ্টিতে ভালো একটা ঘুম দিয়ে নিস।আর গ্যারেজ থেকে  ফোন করেছিল ।ওদের একটি ছেলে বাইক নিয়ে আসছে।খোকাদাকে বলেছি বাইক ঠিক করে রেখে দেবে ।সকালে চা খেয়ে বেরোবি। সাবধানে যাবি।আমি ফোন করব। আসি তাহলে ।

আবির, স্বর্নভের হাত শক্ত করে ধরে বলল,তুই ও সাবধানে যাবি।খুব ভালো লাগলো আজ।আমি কাজ সেরে বাড়ি ফিরে তোকে ফোন করব।ভালো থাকিস ।

স্বর্নভ বেরিয়ে গেল ।আবির বাইরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।গাড়ি চলে গেলে আবির পেছন ফিরতেই দেখে এক স্থির মূর্তি ।হাজার স্বপ্ন দু'চোখে ।না বলা কথা ভীড় করে আছে  অস্ফূট ঠোঁটে।হাজার ব্যথা ঢেকে ফেলেছে সারা মুখ ।

আবিরের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই নড়ে উঠল অস্ফূট ঠোঁট ।কথা বলল নিভা ।

--------বাইরে বেশ ঠান্ডা, তাই না?

---------বৃষ্টির আবহাওয়া তো তাই -----

-------বাইরে বেশ অন্ধকার!

-------হুম।

---------বৃষ্টি বেশ কমে গেছে ।শুধু উদাসী মন নিয়ে রাত্রি এগিয়ে যাচ্ছে ।

আবির কোন উত্তর পেলনা।যেন এক মায়া মোহ অকস্মাৎ জড়িয়ে ধরেছে তাকে।

নিজেকে সামলে নিয়ে আবির বলল,ঠান্ডা লেগে যাবে, ভেতরে চলুন ।

-----আপনি ডিনার করে নিন।আমি দিয়ে দিচ্ছি ।

সবে রাত সাড়ে ন'টা।এত তাড়াতাড়ি খাওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও নিভাকে না বলতে পারলনা আবির ।

আবিরকে খেতে দিয়ে নিভা ও খেতে বসল।

নিভার সব মিষ্টতা কেড়ে নিয়েছে তার হতাশা ভরা চোখের তারা ।কোথায় যেন একটা লুকোনো ব্যথা মোচড় দিচ্ছে সারাক্ষন ।

আবির মাঝে মধ্যেই তাকিয়ে ফেলে নিভার দিকে।কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছেনা ভয়ে ।

       নিভা বলল, কেমন লাগছে আমাদের এখানে?

------ভালো ।

--------শুধু ভালো ।

---------খুব ভালো ।

আবির হাল্কা হাসল।নিভার মুখে ও মিষ্টি হাসি ।আবিরের বুক কেঁপে উঠল ।এত সুন্দর যার হাসি সে কেন এত ম্লান হয়ে থাকে !

নিভা বলল,খাওয়ার পর আমার লাইব্রেরি দেখাব।দেখবেন তো না ঘুমোবেন?

----------এত তাড়াতাড়ি আমি ঘুমোইনা।তাছাড়া আপনার সাথে তো ভালো করে কথাই হোলনা ।লাইব্রেরি দেখব আর গল্প করব ।

--------আপনি গল্প করবেন? আমার সাথে?

আবিরের ভয় হোল ।কিছু কি ভুল বলা হোল!

ভয়ার্ত চোখে আবির বলল,না মানে।

---------আসলে আজ দু’বছর গল্প, হাসি, ভালোবাসা সব আমার জীবন থেকে চলে গেছে।এমন কাউকে পাইনি যার সাথে সময় কাটাব,একটু গল্প কোরব।

---------কেন,স্বর্নভ তো খুব গল্প করে।

-------ও সব বন্ধুদের সাথে ,কলিগদের সাথে, কিন্তু বউয়ের সাথে নয়।বাদ দিন ।খাওয়া হয়ে গেছে উঠে পড়ুন ।লাইব্রেরিতে যাব।

       আবির কিছু না বলে উঠে পড়ল।নিভা, আবিরকে নিয়ে লাইব্রেরিতে গেল ।

বাইরে  বৃষ্টি থেমে গেছে ।হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছে ।চারিদিক যেন থমথম করছে ।

          নিভা  বলল ,এদিকে আসুন আবির বাবু,এদিকে আমার প্রান আছে ।পুরোটাই রবীন্দ্রনাথ ।

---------বা!সুন্দর করে সাজিয়েছেন তো লাইব্রেরি।রবীন্দ্রনাথের পরই নজরুল !

--------এটাই তো আমার সংসার আবির বাবু।আর একটু আনন্দ খুঁজে পাই অনাথ আশ্রমে গিয়ে ।

আবির আর নিভা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে ।দুজনেই ছুঁয়ে আছে রবীন্দ্রনাথ ।

---------একটা কথা বলব ম্যাডাম?

--------বলুন ।

------আপনাকে এত বিমর্ষ দেখাচ্ছে কেন?

নিভা একটু হেসে বলল, না তো।

--------আমাকে বন্ধু ভাবতে পারেননা?

দুজনে দুজনের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।মনে হচ্ছে বাইরে জোরে বাতাস বইছে ।সারা পরিবেশ বড্ড আনমনা হয়ে আছে ।

কখন যে দুজনে দুজনের কাছে এসে গেছে বুঝতেই পারেনি ।

আবিরের অস্ফূট ঠোঁট প্রথম নড়ে উঠল,

------ম্যাডাম!

নিভা ছুটে গিয়ে লাইব্রেরির চেয়ারে বসল।আবির একটু দূরে একটা চেয়ার নিয়ে বসল।আবির আবার বলল, ম্যাডাম ।

---------বলুন ।

--------কি হয়েছে আপনার?

নিভা চিৎকার করে কেঁদে বলল,আমি আর পারছিনা ।প্রচন্ড কষ্ট আমার !

-----কেন ম্যাডাম?

-------ওসব বাদ দিন ।আপনি রুমে যান।শুয়ে পড়ুন ।আমি একটু পরে যাব।

---------বলুন না কি হয়েছে! বন্ধুকে কষ্টের কথা বললে মন অনেক হাল্কা হয়।

আবির, নিভার কাছে গিয়ে বোসল ।

---------প্লিজ, আমাকে বলুন ।আপনার তো কোন অভাব নেই!

নিভা বলল,না,আমার কোন অভাব নেই ।বিয়ের আগেও ছিলনা, বিয়ের পরেও নেই ।কিন্তু দুটো জায়গাতেই একটা জায়গায় বড়ো মিল।আমি বড়ো অসহায়।

--------অসহায় কেন ম্যাডাম?

নিভা নিজেকে একটু সংযত করে বলল,ছোট বেলায় মাকে হারিয়েছি ।বাবা অনেক যত্ন করে বড়ো করেছেন ।আমার ইচ্ছে ছিল নিজে স্বাধীন হব।নিজের পরিচয়ে বাঁচব।হিস্ট্রি আর মিউজিক দুটোতেই এম.এ করলাম ।বাবা হঠাৎই বিয়ের ঠিক করলেন ।ভালো ঘর,ভালো বর -এই আর কি! আমার ইচ্ছে অসহায় হয়ে গেল ।

--------তাতে কি হয়েছে? বিয়ের পর কি মেয়েরা চাকরি করছেনা না নিজেকে প্রতিষ্ঠা করছেনা?

নিভা একটু হেসে বলল, আমার স্বামী কথা করেই বিয়ে করেছেন ।বিয়ের পর চাকরি করা যাবেনা ।

আপনার কি মনে হয় আবির বাবু,চাকরি মানে কি শুধু অর্থ উপার্জন? এখানে কি নিজের শিক্ষাকে প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়না?

------অবশ্যই চেয়ারের একটা আলাদা মর্যাদা আছে।সে যত সহজে নিজের শিক্ষাকে কাজে লাগাতে পারে অন্যরা তা পারেনা।

-------এখানেও  তো আমি অসহায় আবির বাবু ।

------আশ্রমে গিয়ে তো আপনি আনন্দ পান ম্যাডাম ।

--------সপ্তাহে একদিন ।স্বামীর দয়া ।

---দয়া কেন ম্যাডাম?ভালোবাসা -----

------প্লিজ আবির বাবু,আমি আর পারছিনা ।

------পারতে হবে ম্যাডাম ।আপনি সব পারবেন ।

-------সব পারিনা আবির বাবু ।তাহলে এতদিনে স্বামীর মনের কাছাকাছি যেতে পারতাম ।কিন্তু পারিনি !

কেন,স্বর্নভ আপনাকে —

—স্বর্নভ সব দিয়েছে, কিন্তু বোঝেনি আমাকে।

ও ভাবে আমার কিসের অভাব,আমি ভালো আছি ।কিন্তু আমি ভালো নেই আবির বাবু ।

দিন -রাত ডিউটি —ডিউটি ।আর আমি সারা সময় একা।

পৃথিবীতে সব থেকে যন্ত্রনাদায়ক বোধ হয় একাকীত্বের যন্ত্রণা ।

আবির হাল্কা হাসল ।

—আপনি মজা পাচ্ছেন আবির বাবু?

—পাচ্ছি, নিজের জীবন নিয়ে মজা।স্বামী থেকেও আপনি একা আর আমি একেবারেই একা।

আসলে ম্যাডাম আমরা একা নয়,আমাদের জগৎ আলাদা ।তাই সহজে কেউ আমাদের বুঝতে  চায়না বা বুঝতে পারেনা।

একটু ভেবে দেখুন -আপনার আশ্রমের ছেলে মেয়ে আর আমার স্কুলের স্টুডেন্ট, আপনার আশ্রমের মানুষজন ,আমার গ্রামের মানুষজন -এই নিয়েই তো আমাদের জীবন ।এর মধ্যেই তো পৃথিবীর সব শান্তি, সব সুখ ।

নিভা ,আবিরের বুকের কাছে গিয়ে বলল,কিন্তু আমি তো মানুষ আবির বাবু... 

—স্বর্নভ অনেক বিশ্বাস করে আপনাকে ।ও খুব সরল।হয়তো এমন করে ভাবেনি  কখনো ।

নিভার বুকে তখন দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে।মনে হচ্ছে এই ভেজা রাত এক মুহূর্তে জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাবে ।

আবির তখন স্থির ও শান্ত ।মৃদু স্বরে সে বলল,যান,একটু ঘুমিয়ে পড়ুন।

নিভা বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল আবিরের দিকে।তারপর ধীর পায়ে নিজের রুমে চলে গেল।

আবির লাইব্রেরিতে বসে রইল ।জীবনে এমন রাত কখনো আসবে,এমন ভেজা পৃথিবী এক বিস্ময়কর সময়ের সাক্ষী হয়ে থাকবে ভাবেনি কখনো সে।

এখন শুধু ভোরের অপেক্ষা ।তারপর আবার সময়ের চাবি হাতে ঘুরে বেড়ানো এপার ওপার ।শুধু এই রাত তার জীবনে আধ ভেজা রাত হয়েই রয়ে গেল ।




----------------------------------------------------------------

আপনি পড়ুন ও পড়ান। 

মতামত জানান।



ankurishapatrika@gmail.com


-----------------------------------------------------------------              

                           

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন