বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২১

ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস(পর্ব-৮) ।। নেপথ্য সংগীতের আড়ালে— অনন্যা দাশ

 




ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস(পর্ব-৮)    

নেপথ্য সংগীতের আড়ালে

অনন্যা দাশ    


১২,

পরদিন সকালে আনন্দমোহন এসে ওদের প্রিয়ব্রতর বাড়ি নিয়ে গেল। প্রথমে সে তো দরজাই খুলছিল না, তারপর বাণীব্রত
বাবুর দেওয়া চিঠিটা দরজার তলা দিয়ে গলিয়ে দিতে তখন দরজা খুলল।
কি চেহারা হয়েছে তার। বাণীব্রতবাবুর দেওয়া ছবির সাথে প্রায় কোন মিলই নেই। চোখগুলো কোটরে বসা, চুল উসকো
খুসকো, উদ্ভ্রান্তের মতন দৃষ্টি প্রথমে মামা আর অখিলবাবুকে বেশ সন্দেহের চোখেই দেখছিল সে তারপর জিকো-কেকাকে সাথে দেখে মনে হয় বুঝল যে ওরা ওকে মারতে আসেনি।
“ভিতরে ঢুকতে দেওয়ার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ!” 
“আমাকে তুমি করেই বলুন প্লিজ। আপনাদের বাধা দেওয়ার জন্যে আমি লজ্জিত কিন্তু কাল রাতেও দুজন এসেছিল এই
বাড়িতে। একজন লাল আর একজন কালো পা পর্যন্ত জামা পরে। খুব লম্বা তারা আর বীভৎস তাদের মুখ। আমি একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যেতে দেখি ঘরে ওরা! আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে চিৎকার করতে শুরু করি। সেই চিৎকার শুনে আমার বাঁড়িওলা ছুটে আসেন। ওঁর কাছে এই ফ্লাটের একটা চাবি আছে। আমিই দিয়েছি, কয়েকবার চাবি নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিলাম বলে। সদর দরজাঁটা টানলেই বন্ধ হয়ে যায়। উনি এসে বললেন যে কাউকে দেখেননি উনি। তারপর থেকে ভয়ানক অশান্তিতে ভুগছি আমি। কারণ ফোন করা এক জিনিস আর বাড়িতে চলে আসা আরো ভয়ানক।”

“কোথায় দেখেছিলে ওদের একটু দেখাতে পারবে?”
“হ্যাঁ, দুটোই তো মোটে ঘর। এটা বসবার ঘর আর ওদিকে শোওয়ার ঘর। আর ওইটা এক চিলতে রান্নাঘর।”
শোওয়ার ঘরে ঢুকে দেখা গেল যেদিকে দরজা তার একদম উপ্টোদিকে জানালা থেঁসে খাট। এক দিকের দেওয়ালে লাগানো একটা টেবিলচেয়ার। টেবিলের উপর একটা ল্যাপটপ ।
“কোথায় দেখেছিলে ওদের?”
“ওই তো আমি খাটের উপর ছিলাম আর ওরা এই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।”
“মামা ওই দ্যাখো!” জিকো হঠাৎ চিৎকার করে বলল।
দরজার কোনে লাল রঙের ছোট্ট কি একটা পড়ে রয়েছে।
“তোমার কি কোন লাল রঙের বোতাম দেওয়া জামা আছে? এই রকম বোতাম?” মামা রুমাল দিয়ে বোতামটা তুলে
মেলে ধরলেন। 
“না, লাল রঙের বোতাম দেওয়া কোন জামা আমার নেই। আর ওই রকম বোতাম তো নয়ই!”
“তার মানে ঘরে কেউ এসেছিল। সেটা কালকে না আগে তাতে কিছু যায় আসে না। দেখি আমি পুলিশের সঙ্গে গিয়ে
কথা বলি, তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যারা এসেছিল তারা মোটেই অশরীরী নয় বা তোমার কল্পনা নয়!”
এতক্ষণে প্রিয়ব্রতর মুখে হাসি ফুটল, “বাঁচালেন আপনারা! আমি কেবল ভাবছিলাম আমার বুঝি মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে!
আমি হ্যালুসিনেশান দেখছি।”
“তোমার বাড়িওলার অঙ্গে একবার কথা বলতে পারলে ভালো হয়। সেটা কি করা যাবে?”
“হ্যাঁ, উনি রিটায়ার্ড মানুষ। বাড়িতেই থাকেন।”  
তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার দশটায় একটা ব্লাস আছে যাবো ভাবছি। বেশ কিছুদিন ধরে ব্লাস করতে
যেতেও ভয় হচ্ছিল। আপনাদের দেখে বুকে বেশ একটা বল পাচ্ছি। যেন কুয়াশ৷ কেটে গেছে। ওরা যেই হোক দিনেরবেলায় কলেজের মধ্যে ওরা আমার ক্ষতি করতে পারবে না বলেই মনে হয়।”
“হ্যাঁ, তা হয়তো পারবে না। তবে ফিরতে রাত কোরো না যেন।”
এরপর প্রিয়্রতর বাড়িওলার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেন মামা কিন্তু তেমন কিছু পাওয়া গেল না। উনি সন্দেহজনক কাউকেই দেখেননি, এবং ওঁর স্ত্রীর বিশ্বাস প্রিয়র মাথায় গোলমাল হচ্ছে এবং ওকে ডাক্তার দেখানো দরকার।
গাড়িতে উঠে মামা বললেন, “পরবর্তী স্টপ পুলিশ স্টেশান কারণ অঙ্গদের বাড়িতে একবার যেতে হবে আর প্রিয়র ব্যাপারটাও ওদের বলতে হবে। দেখি সুগ্রীবজিকে ফোন করে, উনিও যদি আসতে পারেন।”
সুগ্রীব মিন্তলকে ফোন করতে উনি পুলিশ স্টেশানে চলে এলেন। ওঁর কাছে জানা গেল যে অঙ্গদের অবস্থা একই রকম।
কোন পরিবর্তন হয়নি।
থানার ওসি মনোজ জৈন বললেন, “ভীষণ নাজেহাল করছে আমাদের ওই কালনাগ। ভয়ানক নৃশংস আর ধূর্ত সে।
“অঙ্গদের বাড়ির চাবি এখন আমাদের কাছে রয়েছে। আমি প্রভাকরকে আপনাদের সাথে পাঠিয়ে দিচ্ছি ও সব দেখিয়ে
দেবে। আমরা তো বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজে কিছু পাইনি। তার মানে কালনাগ নীলজ্যোতিটাকে নিয়ে ভেগেছে। চালের ড্রাম পর্যন্ত খুঁজেছি আমরা জানেন। অত্যন্ত দুঃখের ব্যাপার।” .

“চালের ড্রাম?”
“হ্যাঁ, অঙ্গদকে সুমিত্রা উপদেশ দিয়েছিল যে চালের ড্রামে ঢুকিয়ে রাখতে মণিটাকে। সেটা সুমিত্রা আমাকে বলেছিল, আমিই তখন ওনাদের বলি,” সুগ্রীব মিত্তল বললেন। 
প্রিয় ব্যাপারটা নিয়ে ওসিকে বলতে উনি বললেন, “ঠিক আছে আমরা ফাইলটা বার করে দেখছি। তবে এই রকম
ক্ষেত্রে হাতেনাতে না ধরতে পারলে কিছু করা যায় না। তবে বাড়িতে কেউ ঢুকেছিল সেই প্রমাণ যখন পাওয়া যাচ্ছে আমরা
সাহায্য করব। তবে পুলিশ প্রোটেকশান দেওয়ার মতন পুলিশ ফোর্স তো নেই বুঝতেই পারেছন।”
“হ্যাঁ, তা তো নিশ্চয়ই। যে চাইবে তাকেই পুলিশ প্রোটেকশান দিতে গেলে তো মুশকিল।”
“ ওকে বলবেন ভয় না পেয়ে একটু চোখ কান খোলা রাখতে। কিছু দেখলেই যেন আমাদের খবর দেয়।”
ওসির কাছে বিদায় নিয়ে অঙ্গদের বাড়ি যাওয়া হল। প্রভাকর দারোগা ভালা খুলে দিতে ওরা সবাই মিলে তিনতলার খুদি
বাড়িটাতে ঢুকল। বাড়ি বলতে একটাই ঘর, রান্নাঘর আর বাথরুম। পুলিশ যে এই বাড়ি সার্চ করেছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই কারণ চারিদিকে জিনিসপত্র ছত্রাকার করে ছড়ানো। 
অখিলবাবু সুগ্রীব মিত্তলকে বললেন, “ইশ বেচারা! কিসের থেকে কি যে হয়ে গেল।”
টেবিলের উপর কিছু ইংরাজি হিন্দি বই আর একটা ফাইন্যানশিয়াল টাইম্স রাখা রয়েছে।
সুগ্রীবজি বললেন, “ওর ল্যাপটপটা পুলিশ নিয়ে গেছে যদি কিছু উদ্ধার করতে পারে সেই আশায়।”
দেওয়ালে বীর হনুমানের একটা ছবি। বুক চিরে রাম সীতা লক্ষ্মণকে বার করেছেন। কোন একটা ক্যালেপারের অংশ। টেপ
দিয়ে দেওয়ালে লাগানো। সচিন তেন্ডুলকার আর ধোনির ছবিও রয়েছে দেওয়ালে।
মামা খাটের নীচে এদিক-ওদিক একটু উকি দিয়ে দেখছিলেন এমন সময় রান্নাঘর থেকে কেকার উৎসাহী চিৎকার শোনা
গেল, “মামা শিগ্গিরর এদিকে এসো দেখে যাও!” সবাই ছুটে রানাঘরে গেল। রান্নাঘরটা এতটাই, ছোট যে তিনজনের বেশি
ঢোকাই যায় না।
ডিপ ফ্রিজ থেকে বরফ রাখার পাত্রটা বার করেছে কেকা। তার মধ্যে থেকে বরফ ভাগ করার খোপ খোপ দেওয়া জিনিসটা
বার করে শুধুই জল ঢেলে দেওয়া হয়েছে, আর স্বচ্ছ বরফের মধ্যে দিয়ে নীল পাথরটা সহজেই দেখা যাচ্ছে!
“নীলজ্যোতি।”
সুগ্রীব মিত্তল হাঁ করে কেকার দিকে তাকালেন, “তুমি কি করে বুঝলে?”
কেকা হাসল, “রকেট সাইনটিস্ট হতে লাগে না। ওই টেবিলের উপর রাখা ফাইন্যানশিয়াল টাইনসটাতে প্রথম পাতাতেই
ফ্লোজেন আ্যাসেট্স নিয়ে একটা লেখা আছে। আমি ভাবছিলাম আপনার ভাইয়ের মাথায় যদি ওর আক্ষরিক অর্থ থেকে কোন ফন্দি আসে তাহলে সে কি করতে পারে? ব্যাস সেটা ভেবেই আমি ডিপ ফ্রিজ খুলে দেখতে এলাম।”
মামা বললেন, “বেশ ভাল ভেবেছিস!” 
সুগ্রীব মিত্তল সঙ্গে সঙ্গে বোনকে ফোন করে বলতে লাগলেন যে নীলজ্যোতি ঠিক আছে। কালনাগের হাতে পড়েনি।
প্রভাকর দারোগাও ওসিকে ফৌন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। জিকো ব্যাজার মুখ করে বলল “তুই বেশ হিরোইন হয়ে গেলি
দেখছি!”

মামা ওকে ধমক দিলেন, “জিকো আর হিংসে করতে হবে না! কাগজটা তো টেবিলের উপরেই রাখা ছিল আমরা সবাই
দেখেছি। আমাদের তো মাথায় আসেনি, ওর মাথায় যখন এসেছে তখন ও হিরোইন হওয়ারই যোগ্য।”


চলবে...

--------------------------------------------------------------------------------

অঙ্কুরীশা-র পাতায়  এই ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাসটি প্রতি শুক্রবার  ক্লিক করে পড়েনিন। 
মতামত জানান। 

ankurishapatrika@gmail. com

 ---------------------------------------------------------------------------------------------                       



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন