বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২১

ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (পর্ব-৭) ।। নেপথ্য সংগীতের আড়ালে — অনন্যা দাশ

 




ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (পর্ব-৭)     


নেপথ্য সংগীতের আড়ালে

অনন্যা দাশ   

   

১০.

ঘুমোচ্ছিল প্রিয়ব্রত। আজকাল রাতে ভাল করে ঘুম হয় না ওর তাই এই সন্ধ্যাবেলাতেই চোখটা জুড়িয়ে এসেছিল। হঠাৎ

কিসের একটা খু শবে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। ধড়মড় করে উঠে বসল সে। ওর শোবার ঘরের দরজার কাছে দুজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিশাল লম্বা তারা। একজনের পোশাক লাল আর একজনের কালো। বীভৎস তাদের মুখ। চোখ বন্ধ করে চিৎকার করতে লাগল প্রিয়ব্রত। ওর চিৎকারে বাড়িওলা সিস্টার মদন ছুটে এলেন কিছুক্ষণ পরে। ওনার কাছে একটা চাবি থাকে। প্রিয়ব্রতই দিয়েছে।
চাবি নিয়ে বেরতে ভুলে গিয়ে সমস্যা হয়েছে কয়েকবার। সেই চাবি দিয়েই দরজা খুলে ছুটে এলেন তিনি।
হিন্দিতে বললেন, “কি ব্যাপার? কি হয়েছে? এত চেঁচাচ্ছ কেন?” প্রিয়ব্রত বাড়িওয়ালাকে দেখে চিৎকার থামিয়ে বলল, “ঘরে
দুজন লোক ঢুকেছিল!”  
“কী আজেবাজে কথা বলছ! ঘরের দরজা জানালা সব বন্ধ লোর ঢুকবে কোথা দিয়ে? বাথরুমের পাইপ দিয়ে?”
“আমি দেখলাম আপনি যেখানে রয়েছেন ঠিক সেইখানে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল দুজন বিশাল লম্বা লোক।”
মিস্টার মদন মুখে চুকচুক করে একটা শব্দ করে বললেন, “তুমি ডাক্তার দেখিয়েছো? তোমাকে যে আমি ডাক্তার দেখাতে
বলেছিলাম! অনেক দিন ধরেই ওই সব কিম্ভূত চিন্তা তোমার মাথায় আসছে।”
“না, মানে ..”
“এক কাজ করো তুমি, তোমার কলকাতার বাড়ির ফোন নম্বরটা আমাকে দাও। আমি তোমার বাড়িতে ফোন করে তোমার
পরিবারের লোকের সাথে কথা বলি। ওঁদের সঙ্গে কথা বলা দরকার আমার।”
ওর টেবিলে গিয়ে একটা কলম আর কাগজ তুলে নিয়ে উনি বললেন, “হ্যাঁ, বলো।” 
অনিচ্ছার সঙ্গে দাদার মোবাইল নম্বরটা ওনাকে দিল প্রিয়ব্রত। বুকটা এখনও ধ্বক ধ্বক করছে। সত্যিই কি ও তাহলে ভুল
দেখেছিল? সত্যি কি ওর মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে? বাড়িওলা চলে যেতে প্রিয়ব্রত উঠে গিয়ে নিজের ফেসবুকের স্ট্যাটাসে লিখল,
“আ্যাম আই গোয়িং ক্রেজি? আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?”
লেখার দু মিনিটের মধ্যে ওর কোন এক ফেসবুক বন্ধু সেটাকে“লাইক' করে দিল!

১১,

রাজেশ্বর ঝার বাড়িতে যাওয়ার পথেই মামার মোবাইলটা বেজে উঠল।
মামা ধরে বললেন, “হ্যাঁ, বাণীব্রতবাবু বলুন?”
কিছুক্ষণ কথা বলার পর মামা ফোনটা ছেড়ে বললেন, “খুব গণ্ডগোল । প্রিয়ব্রতর বাড়িওলা ওঁকে একটু আগে ফোন
করেছিলেন। প্রিয় নাকি ঘরের মধ্যে কাদের সবাইকে দেখে ভয়ে চিৎকার করছিল। বাড়িওলা নিজের চাবি দিয়ে ঢুকে দেখেছেন কেউ নেই। জানালা দরজা সব বন্ধ। তাই উনি বলছিলেন যে ওর হয়তো কিছু সমস্যা হচ্ছে যে জন্যে ওকে মনোরোগ চিকিৎসক দেখানো উচিত। বাণীব্রতবাবু সেটা শুনে খুব ঘাবড়ে গেছেন। আমরা প্রিয়র সঙ্গে দেখা করেছি কিনা জিজ্ঞেস করছিলেন। আজকে তো আর সময় হবে না রাজেশ্বর ঝার সঙ্গে দেখা করার পর, কিন্তু কাল সকালেই ওর সাথে দেখা করতে যাবো।”
রাজেশ ঝার ফ্ল্যাট বাড়িটা অন্য সবার চেয়ে অনেক ছোট। বসার জায়গা প্রায় নেই বললেই চলে। বিছানার উপরেই
বসতে হল।
উনি বললেন, “আমার বাড়ি আসলে পাটনায়। এই জায়গাটাকে তিন মাসের জন্যে ভাড়া নিয়েছি। রাজীব জৈনের বাড়ির
ইতিহাস লেখার জন্যে।” 
“রাজীব জৈন কে? নাম করা কেউ কি?”
“ওঁর বাবা খুব ভাল পোলো খেলতেন। যেমন সুপুরুষ চেহারা তেমন মানানসই মেজাজ তার সাথে। অনেক গল্প আছে ওনাকে নিয়ে। আমি তীর জীবনী নিয়েই লিখছি আমার পরবর্তী বইটা।”
“আপনি তো ইতিহাসবিদ বলে শুনেছিলাম।”
রাজেশ্বর ঝা হাসলেন। বাকিদের চেয়ে এনাকে অনেক বেশি অমায়িক মনে হল। বললেন, “ইতিহাসবিদ মানে ইতিহাস
নিয়ে আমার ডিগ্রিগুলো কিন্তু এখন আমার পেশাটা একটু অন্য রকম। আমাদের দেশে অনেক বিখ্যাত পরিবার আছে যাদের সদস্যদের জীবন এবং পরিবারের ইতিহাস বেশ রোমাঞ্চকর। তারা নিজেদের সেইসব গল্প শোনাতে চায় আর সাধারণ লোকও তাদের ওই সব গল্প জানতে আগ্রহী তাই আমি সেই ব্যবস্থা করে দিই। কিছু অর্থের বিনিময়ে আমি যে কোন পরিবারের ইতিহাস নিয়ে বই লিখে দিই। ইংরেজিটা আমার বরাবরই ভাল ছিল আর লিখতে ভালবাসি। সব থেকে বড় কথা হল বেশিরভাগ সময়ই এই গল্পগুলো এমনই মুখরোচক আর রোমাঞ্চকর হয় যে প্রকাশক পেতে সময় লাগে না। আমার চেনাশোনা প্রকাশকও আছে বেশ কয়েকজন।”
“ও আচ্ছা! ইন্টারেস্টিং!” 
“বাড়িতে ভীষণ খাবার কড়াকড়ি। মাছ মাংস ডিম ঢোকা নিষেধ আর আমি ঘোরতর আমিষ খেকো তাই আমি এই ঘরটা ভাড়া নিয়েছি।”
“হিম্মতলাল খুরানার সঙ্গে আপনার পরিচয় হল কি করে?”
“জয়পুরের রাজাদের নিয়ে আমার একটা বই আছে। রাজা ভবানী সিংহই ওটার স্পন্সর। সেই সূত্রে সিটি প্যালেসে অনেকবার যেতে হয়েছিল। তখন থেকেই হিন্মতলালের সঙ্গে আলাপ।“
“আপনি কি এখনই বইটা পুরো লিখে ফেলছেন?”
“না, না, আমি ওদের গল্পগুলো রেকর্ড করে নিই। তথ্য কাগজ ইত্যাদি ফটোকপি করে নিয়ে পাটনা গিয়ে নিজের বাড়িতে
আরামে বসে লিখি।”
“ও, আচ্ছা, তা সেদিন গৌরবমণিটাকে নিয়ে যে ব্যাপারটা হল সেটার সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করতে পারবেন কি?”
“আপনারা দেখেছেন মণিটাকে?”
“না, সেই সৌভাগ্য হয়নি।” 
“অসাধারণ দেখতে মণিটাকে। ওই রকম আ্যামেথিস্ট খুব কম দেখা যায়। আ্যামেথিস্ট বেগুনি হল কি করে সেই নিয়ে
গ্রিক মাইথলজিতে বেশ কিছু গান আছে। আমার যেটা সব চাইতে বেশি পছন্দ সেটা হল গ্রিক দেবতা ডাঁয়ানাইসাসকে পৃথিবীর কেউ একজন অপমান করে। রাগে অন্ধ হয়ে তিনি প্রতিজ্ঞা করেন যে মর্তের যাকে তিনি প্রথম দেখতে পাবেন তাকেই শেষ করে ফেলবেন। সেই কার্যসিদ্ধির জন্যে নিজের রাগ থেকে ভয়াবহ কয়েকটা বাঘ তৈরি করেন তিনি। আ্যামেথিসটোস বলে একটি সুন্দরী মেয়ে আর্টেমিসকে পুজা করতে যাচ্ছিল এবং বাঘেদের খঙ্পরে পড়ে। বাঘের থাবা থেকে তাকে প্রাণে বাঁচাবার জন্যে দেবী আর্টেমিস তাকে সাদা ধবধবে কোয়ার্টজের একটা মূর্তি বানিয়ে দেন যাতে বাঘের আঁচড়েও যেন ওর কোন ক্ষতি না হয়। ডায়ানাইসাস সেটা দেখে নিজের কাজে লজ্জিত হন এবং ওনার চোখে দিয়ে জল পড়তে থাকে। সেই জল মুর্তিটার গায়ে পড়তে মূর্তির রঙ বেগুনি হয়ে যায়। আর তবে থেকেই অ্যামেমেথিস্টের রংও বেগুনি হয়ে যায়।” 
অখিলবাবু চট করে পকেট থেকে নোটবই বার করে কিসব জানি লিখে ফেললেন।
“হ্যাঁ, গল্পটা ভালই তবে আমি গৌরবমণির চুরির ব্যাপারটা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিলাম।”
“ও হ্যাঁ, আর বলবেন না। একেবারে নাজেহাল অবস্থা। পুলিশ এসে আমাদের সবাইকে সার্চ করল।”
তারপর গলা নামিয়ে বললেন, “শেঠজি প্রচণ্ড খেপে ছিলেন। পারলে সবার মুন্ডু কেটে দেন আরকি! তবে একটা কথা
আমি কাউকে বলিনি, কিন্তু আমার মনের মধ্যে খচখচ করছে সবসময়। আলো যখন যায় তখন আমার যতদূর মনে হয় মনিটা অজিত পাঠকের হাতে ছিল। অথচ ও পুলিশকে মিথ্যা বলেছে যে ওটা ধূর্জটি কর্মকারের কাছে ছিল।”
“কিন্তু উনি তো বললেন যে উনি মণিতে হাত দেননি?” 
“তাহলেই বুঝুন! মিথ্যা কথা। আমি, হিম্মত, তথাগত সবাই দেখেছিলাম। শেঠজি সার্চ করবেন বলতে ধূর্জটির কাঁধের
ঝোলায় ওটা ঢুকিয়ে দেওয়াটার চেয়ে সহজ আর কিছু হতে পারে না। উনি আবার সেদিন মুখ খোলা একটা কাঁধের ঝোলা এনে ছিলেন।”
“মিস্টার খুরানা তো কিচ্ছু বললেন না।” 
“আরে বাবা কে চায় ঝামেলায় পড়তে? আমিই কি চাই? বিবেকের দংশন হচ্ছিল তাই বলে দিলাম। খুরানা তো আবার
পাঠকের বন্ধু তাই বলেনি। ধূর্জটি কর্মকারের হাতে ছিল বললে সবার সুবিধা।”
এর পর আর নতুন কিছু বলতে পারলেন না। মামা অবশ্য ওঁর কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার আগে ওঁর লেখা দুটো বই
চেয়ে নিলেন। খুব খুশি হয়ে বই দুটো দিলেন রাজেশ্বর ঝা। 




(চলবে...)



--------------------------------------------------------------------------------------------

প্রকাশিত এই ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাসটি প্রতি শুক্রবার  অঙ্কুরীশা-র পাতায় ক্লিক পড়ুন ও পড়ান। 

মতামত জানান 
ankurishapatrika@gmail. com

--------------------------------------------------------------------------------------------                          

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন