নববর্ষের গল্প
খোঁজ
দেবব্রত ভট্টাচার্য্য
বাস থেকে নেমে ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছিলাম। অনেক আগেই রাত্রি নেমেছে। রাস্তার পাশের দোকানগুলো থেকে আলোর ফালি রাস্তার পিচ ওঠা ব্যস্ততায় এসে পড়েছে। অনেক পা এর সঙ্গে পা ফেলছিলাম। হঠাৎ সামনে দেখলাম একটা মেয়ে হাঁটছে অনেক মানুষের ধাক্কা বাঁচিয়ে। তার গতি যেন আমার গতির সাথে মেলানো। সমান দূরত্ব রেখে আমরা হাঁটছি অনেকক্ষণ। অন্যমনস্ক ছিলাম ।প্রথমটা চোখে পড়েনি। চলাটা যেন চেনা চেনা। পাড়ার কেউ? মনে হলো হরেনকাকুর মেয়ে, সুমি -সুমিতা। গতিটা বাড়িয়ে দিলাম। রেলগেটের আগেই পাশে এসে গেলাম একদম। 'সুমি ' বলে ডাকতেই সে পেছন ফিরলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি !কুঁচকানো ভুরু ! বিরক্তি সারা মুখ জুড়ে। বাধ্য হয়েই বলতে হলো -
-sorry ! খুব ভুল হয়ে গেছে। আমার চেনা একজন মনে হয়েছিল।
সহজ হলো সে।
-ঠিক আছে। আমি হালদার পাড়ায় থাকি।
আমার জিজ্ঞাসু তাকানোতে সে যেন বাধ্য হলো কথা বলতে। আরো কিছুটা আগে মোড় পেরিয়ে রেল গেটে আটকে গেলাম। মালগাড়ীর সহস্র চক্রের শব্দ আমাদের কথা ঢেকে দিল। নীরবতা নিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকলাম দুজনেই ।গেট পেরোতে সে প্রথম কথা বললো -
-আমি আপনাকে আগেও অনেকবার দেখেছি। এই সময় আমি কম্পিউটার ক্লাস থেকে ফিরি। রোববার বাদে প্রায় সবদিন।
আমি হাসলাম।
-আমি কিন্তু 'সুমি' না ।আমার নাম অজন্তা। একে কেউ কিন্তু ছোট করতে পারবে না।
বলে নিজেই হেসে ফেলল। প্রায় সাথে সাথেই আমরা হালদার পাড়া এসে গেলাম। একবার পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে ওর দিকে তাকালাম। ও তখন আমারই দিকে তাকিয়ে। ধন্যবাদ দিয়ে গলির পথ ধরলাম।
** ** * *
বাদামের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে এই পথটুকু আমরা দুজনে অনেক দিন হেঁটেছি পাশাপাশি। আমার হালদার পাড়ার গলি পেরিয়ে গেছি জেনে বুঝেই। অজন্তার ভাসান মোড় পেরিয়ে আরও অনেকটা । হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে পড়ে ও বলেছে -
-এবার তো বাড়ী যেতেই হবে। মা ঠিক জিজ্ঞেস করবে -দেরী হলো কেন রে?
-আর আমার ?
-সেটা তুমিই ভাবো। আমি চলি।
হাসি ভরা চোখ দুটো তে অনেক কথা বলে গলির আধ অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যায় অজন্তা।
বলছিলো, দু দিন কম্পিউটার ক্লাস নেই। সময় মত আসতে পারবে না। এদিকে আমার ও ভাড়া বাড়ীটা বদল করতে হবে। ব্যারাক বাড়ীতে অনেকের সঙ্গে আর থাকা যাচ্ছে না। প্রতি রাতে মাতালের আড্ডা। মা তাড়া লাগাচ্ছিল নতুন বাঁসা খোঁজার জন্য। ঘর পেলাম। সব কিছু separate ।কিন্তু এটা আরও কিছুটা ভেতরে। ভাড়া ও বেশ কিছুটা বেশী।
ঘর বদলের ব্যস্ততায় আমিও অজন্তা কে সময় মত meet করতে পারি নি। সোমবার অফিস ফেরৎ ওর জন্য মনটা ভীষন টানছিল। বাস থেকে নেমে প্রতি মুহুর্তে তার দেখা পাওয়ার আশা করছি। হাঁটতে হাঁটতে রেল গেট ।রেল ইয়ার্ডের উজ্জ্বল আলোতে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। ওর মুখটা কোথাও চোখে পড়ল না। ইচ্ছে করেই রাস্তার পাশের চা দোকানে দাঁড়ালাম। পাঁচ টাকার এক কাপ চা নিলাম। চা ও শেষ হয়ে গেল। সে এলো না। রেল গেট পেরিয়ে গেলাম। আমার হালদার পাড়াও পার হয়ে গেছি।কোত্থাও নেই সে। সময় কাটানোর জন্য আবার ফিরলাম রেল গেটে। অসংখ্য মুখের মধ্যে ঐ একটা মুখ হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছি। মেয়েটা গেল কোথায় ? ওর তো মোবাইলও থাকে না। একটা মোবাইল। সেটা সব সময় মায়ের কাছে থাকে। সে নম্বরটা ও নেওয়া হয় নি। বিদ্ধস্ত শরীর আর উদ্ভ্রান্ত মন নিয়ে বাড়ী ফিরলাম।
পরের দিন ও সে নেই। আমার মোবাইল নম্বর তো অজন্তার জানা। সে কেন একবার ও ফোন করছে না ? কেন এই নীরবতা ! শরীর খারাপ হলেও তো জানাতে পারতো ! আজ আর ফিরবো না। ভাসান মোড়ে এসে একে ওকে জিজ্ঞেস করলাম। দু একজন একটা আবছা হোদিস দিল। এগোতে এগোতে অনেকটা ভেতরে চলে গিয়েছিলাম। নাম বলতেই একটি কম বয়সী মেয়ে আমার দিকে সোজা তাকিয়ে প্রশ্ন করলো -
-কেন? তাকে কি প্রয়োজন ?
-না, মানে আমরা একসঙ্গে ক্লাস করি কিনা ! তাই।
-ক্লাস ? কি ক্লাস ? মিথ্যে কথা বলার জায়গা পান নি ? ও কোনদিন কোন ক্লাস করেনি।
আমার মাথায় কিছু ঢুকছিলো না। ফ্রক পরা মেয়েটা বলেই চলেছে -
- তা আপনার কত টাকা হাতিয়েছে ?
-টাকা ? মানে ?
-হ্যাঁ হ্যাঁ টাকা ! এখন পর্যন্ত তিনজন এসেছে। তাদের থেকে হাজার কুড়ি করে টাকা নিয়েছে করবী।
-করবী আবার কে ? আমি তো অজন্তা কে খুঁজছি। তুমি ভুল করছো।
মেয়েটি হাত মুখ নেড়ে বললো -
- অজন্তা ! আগের জন শিউলি কে খুঁজছিলো। তারও আগে পরমার নাম নিয়ে আর একজন এসেছিল। তা আপনার অজন্তা কত টাকা হাতিয়েছে পকেট কেটে ?
লজ্জায় বলতে পারলাম না, গত সপ্তাহে আমি সাত হাজার দিয়েছি ওর মায়ের গল ব্লাডার স্টোনের চিকিৎসায়। না না, ও কিন্তু চায় নি। আমি ই জোর করে -
জানলাম, ঐ ফ্রক পরা মেয়েটার দাদার সাথে দিন দুয়েক আগে কেটে পড়েছে করবী। যাওয়ার সময় ওর দাদাও সংসারের ভাঁড়ার থেকে বেশ কিছু সঙ্গে নিয়ে গেছে। রিক্সাওয়ালা বাবার সংসার থেকে হাজার তিনেক ।সাথে মায়ের একটা আংটি আর দুটো কানের মাকড়ি। নতুন বৌ কে পরাবে বোধহয়। খালি হাতে কি আর বৌ এর মুখ দেখা যায় ?
****************************** *********
আপনিও আপনার অপ্রকাশিত লেখা পাঠান।
মতামত জানান।
ankurishapatrika@gmail. com
****************************** ********

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন