বইমেলা সংখ্যার গল্প
উন্মেষ
ডঃ রমলা মুখার্জী ব্যানার্জী
দীপার মনটা আজ আকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গুমোট হয়ে আছে।জোর বৃষ্টি নামল। না, এরকম আবহাওয়াতে স্কুলে যাওয়া অসম্ভব।আসলে শীতের বৃষ্টি বড় মনকে উতলা করে,নতুন সম্ভাবনার আশা জাগায়, তাই যেন বার বার অভিমানের মেঘগুলো উড়ে আসছে পুরনো স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে দীপার মনের আনাচে কানাচে।
কিছুদিন ধরেই অয়নের ব্যবহারটা কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছে,কোথায় গেল সেই অনুরাগ।বিয়ের আগে তো কত স্তুতি ,কত প্রতিশ্রুতির বন্যা।আর এখন সব সময় চিৎকার চেঁচামেচি,পদে পদে অসম্মান।অয়ন বাইরের লোকের হাতে খাবে না,তাই দীপা নিজেই রান্না করে।কত সহযোগিতা করতো আগে অয়ন।কত খুনসুটি, কত রাগ-অনুরাগ।দুজনের কত সুখেই না দিনগুলো কাটছিল।কিন্তু সব্বনেশে ঐ দামী ফোনটা কেনার পর থেকে অয়ন সেই ফোন নিয়েই মশগুল।ফোনটার প্রতি প্রবল অনুরাগ অয়নকে ক্রমশই বাস্তব জগৎ থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাচ্ছিল।দীপাকেও অয়ন একটা ঐ রকম দামী ফোনই তো উপহার দিয়েছিলো,কিন্ত দীপা তো সব সময় সেটা নিয়ে পড়ে থাকে না,উপরন্তু কত কাজে লাগায় সেই ফোনকে।তার লেখা কবিতা গল্প সে পৌঁছে দেয় কত জায়গায় ঐ ফোনটার মাধ্যমেই তো!
না,এভাবে আর থাকতে পারছে না দীপা, আজ সকালেই তো কি অশান্তিই না করল অয়ন মাছ ভাজা হয় নি বলে।গ্যাস ফুরিয়ে গেল ,অয়নকে গ্যাস লাগানোর কথা কতবার বলল দীপা, কিন্তু কে শোনে কার কথা,মোবাইলে মশগুল সে।দীপাও দুকথা শুনিয়ে দিল।রোজ রোজ এ অশান্তি আর ভাল লাগছে না দীপার।অয়ন অফিস বেরুবার পর বৃষ্টির মধ্যেই চোখের জলের বন্যা নিয়ে দীপা সোজা গিয়ে উঠল ওর এক বান্ধবীর কাছে।
দীপাকে বাড়ি ফিরে অয়ন দেখতে না পেয়ে ভাবল বোধ হয় বাজার দোকান করতে গেছে।ইদানীং অয়ন প্রায়ই অনেক জিনিস আনতে ভুলে যায়,তাই অয়ন অফিস থেকে ফিরলে দীপাকে ক্লান্ত শরীর নিয়ে আবার বাজার ছুটতে হয়।কিন্তু বেশ রাত হওয়া সত্ত্বেও যখন দীপা ফিরল না,অয়ন চিন্তিত মনে দীপাকে ফোন করল,কিন্তু ফোনটা তো বন্ধ দেখাচ্ছে!এসেই ফোন নিয়ে ব্যস্ত ছিল,এক কাপ চাও পেটে পড়ে নি।কেই বা করে দেবে?
চা করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে গেল অয়ন।কিন্তু রাতে কি খাবে,দীপা ফিরে এসেই বা কখন রাঁধবে?এসব ভাবতে ভাবতে চা নিয়ে সোফায় বসে বুক সেল্ফ থেকে পুরনো অভ্যেস মত একটা বই টেনে নিল। বইটা খুলতেই একি,এটাই তো গত বছর বিবাহবার্ষিকীতে জামা প্যান্টের পিসের সঙ্গে দীপা তাকে উপহার দিয়েছিল।তলায় তারিখ লেখা ২২শে জানুয়ারী।আরে আজই তো ২২শে জানুয়ারী।হায় ভগবান,সকাল থেকে কত চেনা অচেনা লোকের সাথেই না মোবাইলে কথা, চ্যাটিং,মেসেজ কত কি করেছে! কিন্তু দীপার সাথে আজকাল তো ভাল করে কথাই বলার সময় পায় না।এমন সুন্দর দিনটা মোবাইলের মোহে তো সে ভুলেই গিয়েছিল।রোজ পড়ন্ত বিকেলে অফিস থেকে ফিরে ধুমাইতো চায়ের কাপটা তো দীপাই তার হাতে তুলে দেয়।রাতে রান্না তো দীপাই করে।অয়ন বুঝতে পারল যে মহা ভুল সে করেছে। দুজনে একসাথে মিলেমিশে কাজ করতে করতে হাসি গল্পে ছোট্ট বাড়িটা ভরে থাকতো।গত কয়েক মাসে সে কটা কথাই বা বলেছে দীপার সাথে?আত্মগ্লানি আর অনুশোচনায় পুড়তে পুড়তে অয়ন এক অন্য অয়নে রূপান্তরিত হল।
.............................. .................
কখনও জীবনে আর অন্য কোন নেশায় অয়ন পড়ে নি।একটা ছোট্ট ভুল তাড়াতাড়ি শুধরে জীবনের মোড়টা আবার সুখের সাত সমুদ্রে মিশিয়ে দিয়েছিল। হ্যাঁ,ঠিকই ধরেছেন তারা দুজনে পরম সুখে সংসার করছে আর পড়ন্ত বিকেলে অয়ন রোজ পাচ্ছে দীপার মিষ্টি হাতের এক কাপ গরম চা।
------------------------------------------------------------------------
এই বইমেলা সংখ্যার জন্য আপনিও অতিসত্বর মৌলিক ও অপ্রকাশিত গল্প পাঠান। মতামত জানান।
ankurishapatrika@gmail.com
-----------------------------------------------------------------

ধন্যবাদ।
উত্তরমুছুন