বুধবার, ১৩ মে, ২০২০

নির্বাচিত কবিদের কবিতাগুচ্ছ

 



রতনতনু ঘাটী 






------------------------- ---------- 
র ত ন ত নু ঘা টী  
------------------------- ----------   
  




আত্মহননের পাঠশালা  

আমি কেমন করে যেন একদিন ওদের পাল্লায় পড়ে গেলাম!
ওদের মানে, ওই ঢ্যাঙা মঈদুল, হাতকাটা নিকুঞ্জ, ভোঁতকা অ্যালবার্ট...।
ওদের সঙ্গে দেখা হয় ভাঙা মন্দিরের পিছনের লতা-গুল্মের মধ্যে
দাঁত বের করা ব্যর্থ প্রাইমারি স্কুলের দরজাহীন অন্ধকার ক্লাসঘরে। 
প্রতিদিন ওদের সঙ্গে দাদা-মতো নতুন একজন আসে,
সে আমার গালে পরপর তিন-চারটে বিরাশি সিক্কার থাপ্পড় মারে,
কখনও যাওয়ার সময় দমাস করে পাছায় লাথি মেরে চলে যায়।

একদিন এক দাদা একটা সিমেন্ট ভরতি বস্তা আমার পিঠে বেঁধে দিয়ে
মোরাম বিছানো রাস্তায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তে বলল।
তারপর বলল, ‘সাপের মতো বুকে হেঁটে হাফ কিলোমিটার এগিয়ে যা!’
পারলাম না দেখে আমার পিঠে শিলাবৃষ্টির হিসেবে দমাদ্দম লাথি আর ঘুসি!
যাওয়ার সময় আমার চুলের মুঠি ধরে বলে গেল, ‘এর বিষদাঁত ভেঙে দাও!’

দিলও তাই। বিষদাঁত মানে, ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল আমার মান-সম্মান,
আমার মাকে নিয়ে আধ ঘণ্টা ধরে কুৎসিত কাঁচা খিস্তি করল, 
আমার বোনকে বখাটে গালাগালিতে চাঁদের এপিঠ-ওপিঠ করে ছাড়ল!

তারপর থেকে জরদ্গব ছেলেদের পিঠে বেঁধে চলেছি মাইন,
সাঁইসাঁই শব্দে আগ্নেয়গিরির দিকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছি নিধুবন,
বাঁইবাঁই ভঙ্গিতে ঘটের কেষ্ট আর পটের কেষ্টকে ছুড়ে মারছি 
চরাচরের আরও ওদিকের এক কুচ্ছিত লাভাস্রোতে,
কাঁইকাঁই করে গর্ত খুঁড়ে পুঁতে রাখছি মা-মাসির গরিয়সী স্তন্যদান।

আমাকে রোজ একটা অন্ধকার ঘরে অগুনতি মাইন গুনতে হয়
প্রথম থেকে শেষ, শেষ থেকে প্রথম। 
বিস্ফোরকের গন্ধ দিয়ে ভাত মেখে খেতে শেখাচ্ছি আজানুলম্বিতদের।               
ভুসভুস করে বারুদের উর্ধ্বমুখী পোড়া গন্ধে
কাদের যেন ফুসফুস ভরিয়ে তুলতে বাধ্য করছি প্রতিদিন!

আমাকে ওরা আত্মহননের পাঠশালায় এনে ভরতি করে দিয়েছে।
বিস্ফোরক হয়ে ওঠার কঠিন পাঠ দিচ্ছে দিনের পর দিন!

কিন্তু ক’ দিন ধরে একটা বরাভয় ঢেউ এসে আনচান করে তুলছে আমাকে, 
আমি টের পাচ্ছি, একটা মারাত্মক বারুদ গনগনিয়ে উঠছে আমার ভিতরে।
সে চিৎকার করে বলছে, ‘আমাকে ব্যবহার করো! আমাকে ব্যবহার করো!’
                       
বনান্তের রূপকথা  
                       
মারতে মারতে ওরা মেরে ফেলে যদি
টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে ওরা ফেলে দেয় যদি খাদে?
থ্যাঁৎলানো মাথা তুলে আমি দেখবই,
সে খবর যদি টেলিকাস্ট হয় সকালের সংবাদে?
ধড় থেকে মাথা ছিন্ন করার পরে
হৃৎপিণ্ডটা উপড়ায় যদি দশ জোড়া বাঘনখে
গর্জে উঠেই চুপ করে যাব আমি
দোষ দেব কাকে? বিপ্লব আমি আনতে এসেছি শখে!
আকাশের সব তারা গোনা শেষ হলে
পাহাড়ের খাঁজে দশ-বারো দিন আটকে থাকার পর
টেলিভিশনের ওবি ভ্যান আসে যদি
সাক্ষাৎকারে চেঁচিয়ে বলব, ‘ওরা ছিল বর্বর!’
পিঁপড়েরা এসে কুরে কুরে খায় যদি
আমার সজীব হৃৎপিণ্ডটা টানা এক মাস ধরে
বলব ওদের, ‘মহাভোজ পেয়েছিস?’
তিন-তিনখানা হৃৎপিণ্ড যে জাগবে নতুন করে।
তার একখানা মায়ের জন্যে দেব
আর-একখানা বাবাকে পাঠাব সকালের পার্সেলে।
শেষ হৃৎপিণ্ডটা অয়ন্তিকার
ওকে দিতে যাব খুব ভোরবেলা রাতজাগা শেষ হলে।
আমার জন্যে কিছু রাখব না কাছে
এমন অচেনা শরীর নিয়ে কি বাড়ি ফেরা যায় নাকি? 
না-পোড়া মাইন বুকে বাঁধা হয়ে থাক
ভুল বিপ্লব আর আমি একা বনান্তে পড়ে থাকি।
            

বিস্ফোরণ

ওরা একদিন স্বপ্ন দেখাল
বারুদের সংস্রবে
যা কিছু হয়নি একদিন ঠিক
হবে হবে সব হবে!
বুকে বেঁধে দিল বিস্ফোরক
মাইন বাঁধল পিঠে
ঘষটে ঘষটে পৌঁছে দিয়েছে
পাথরে ও কংক্রিটে।
চরাচর যেই নির্জন হল
বসল চাঁদের হাট
চেঁচিয়ে বলল, ‘‘আজ তুমি বীর,
হে যুবক, স্টার্ট! স্টার্ট!’’
ভয় পেলে ওরা ফিরতে দেবে না,
কখনো না যেন থামি।
বুঝতে পারিনি সে বিস্ফোরণে
ভস্ম হয়েছি আমি!
      
আকাশপ্রদীপ

সাগর ডুবছে সাগরের তলদেশে
পাহাড় বাড়ছে পাহাড়ের সংশ্রবে
মহাদেশগুলো ঢুকে পড়ে মহাদেশে
তবু কারা বলে, ‘হবে হবে সব হবে!’

গিরিখাতগুলো গিরিখাতে ডুবে যায়
উপত্যকারা গড়িয়ে পড়ছে তাই
মা দাঁড়িয়ে থাকে পলক পড়ে না চোখে
কেন যে মায়ের বাড়া ভাতে পড়ে ছাই।

ছানি-পড়া চোখে বাবার দৃষ্টি ক্ষীণ
পথ চেয়ে থাকে কখন আসবে ছেলে
মনে মনে ভাবে সোনার ছেলেটা তার
কী করে যে হল এমন বেআক্কেলে?

আইবুড়ো বোন ঘরবার করে শুধু
কাল ভাইফোঁটা দাদা ফিরবে না রাতে?
এবারেও তবে দেওয়ালে পরাবে ফোঁটা?
দু’ চোখে বৃষ্টি, চন্দনপিঁড়ি হাতে।

তিরিশ পেরনো ভাই গজরায় রাগে
দাদা না এলে যে আঁধার হবে না ফিকে।
আর কতদিন স্তোক দিয়ে দিয়ে যাবে
বাগদান করা অসুখী বান্ধবীকে?                                      

মাটির বাড়িটা, তুলসীমঞ্চ আজ
মাথা তুলে আছে সে-দিকচক্রবালে।
কীসের আশায় জননীর বেশে দেখি
এই সংসার আকাশপ্রদীপ জ্বালে।
       
ওলংটুসি

একটা গোটা লাইন লিখে মেঘকে দেব দিনের শেষে
তখন দেখি অধোবদন তিন-চারটে শব্দ এসে...

বন্ধুরা কে গান গাইছে, আড্ডাখুশি চতুর্দিকে
ভাসাই আমি নদীর জলে আধখানা সে পঙক্তিটিকে।

তাকিয়ে দেখি, ও মা, সে তো আধখানা নয়, এইটুকুনি!
“আর আধখানা লাইন পেলে কখন তুমি জুড়বে শুনি?”

বলেই সেই যে চৌপাট সে, ভাসছে
দূরে...ভাসছে...ভাসছে...
আমি ভাবলাম মেঘের মতোই, রাগ কমেছে, ফিরে আসছে!

দূরে তখন চাঁদ উঠেছে, নীলের পরে, নীলের পরে...
মেঘবর্ণ একটা মেয়ে মুখ বাড়াল তেপান্তরে!

মেঘ নিয়ে আজ হচ্ছেটা কী? সমস্তটাই মেঘাম্বরী?
এত্ত ক’টা মেঘলু নিয়ে এই সন্ধ্যায় কী যে করি!

সংহিতাটি লেখার পরে দাঁড়িয়ে আছেন একলা মনু
নাম জানাতে আমি বললাম, “আমি রতন, রতনতনু।”

“এটা করবে, ওটা করবে,” তিনি বললেন হেনতেন,
“আমি কবি,” বলেই ভাবছি, কবি হলাম কখন যেন?

কবি বললে মেঘ খুশি হয়, আর কে খুশি? আর কে খুশি?
না-ই বা হলাম কবি, তবু, আমি তো সেই ওলংটুসি।

‘ওলং’ মানে লাজুক ছেলে, ‘টুসি’র মানে? বলব না হে !
ও শব্দটা নিজের মতো আটকে থাকুক হিমবাহে।

তাই বা আমি বলছি কেন? আধখানা ও আসুক ফিরে,
খোঁপায় দেব চাঁদের মালা, নাকছাবিতে থাকবে হিরে!

আর কী দেব? আর কী দেব? সবই দেব, আয় না কাছে!
তখন দেখি ছেলেবেলার সেই মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে।

তার দু’ পায়ে ইচ্ছেনদী, দু’ হাত মাখা শুধুই বালি
যেই বলেছি, “উপমা নিই, একটুখানি দাঁড়াও খালি!”

“তুমি তো সেই তনুদা না, শ্যামলারঙা, ভ্যাবলা মতো?
তোমায় নিয়ে ছড়া কাটতে রাত ফুরোত, দিন ফুরোত!”

মনে ভাবছি, বলছে কী এ, আলাপ ছিল? কোথায়, কবে?
কিছুই মনে পড়ছে না তো, নাম জেনেছে সত্যি তবে?

নাকি এমনি বলেই খুশি টিনটিনাটিন ডিডিং ডিলে
আর আধখানা লাইন লিখি হতচ্ছাড়া অন্ত্যমিলে...।

সে-ই বলল, “দাঁড়াই যদি, আমায় তুমি কী কী দেবে?”
“মেঘকে আমি সব দিয়েছি। দাঁড়াও তবে বলছি ভেবে।”

তখন থেকে ভাবছি বসে, দিন পেরোল বছর ঘুরে
অনেক ক’টা যুগ ফুরোল সে আধখানা লাইন জুড়ে।

আর কিছু তো হয়নি লেখা, কাগজ এবং কলম হাতে
বয়সহারা যুবক, এ কী! বটের ঝুরি নামছে তাতে।

এখনো মেঘ যায়নি চলে, দাঁড়িয়ে থাকে নীলের বাঁকে,
সে আধখানা লাইন দেখি একলা বসে পড়তে থাকে!
             


৪টি মন্তব্য:

  1. পড়তে পড়তে কোথায় যে নিয়ে চলে যান কবি ! বুঝতেই পারি না কখন পথ হারিয়ে ফেলেছি ফেরার ! আপনি হ্যাঁ আপনিই আঙুল ধরে নিয়ে যান আপনার দেশে ! বাধ্য মুগ্ধ পাঠক অনুসরণ করি ! রূপ অরূপ । সুখ অসুখ । দুঃখ আনন্দ । জীবন মহাজীবন । ধন্য অহম !

    উত্তরমুছুন
  2. প্রাণের স্পর্শ ! ( মধুসূদন দরিপা । বাঁকুড়া )

    উত্তরমুছুন