শনিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২১

রবিবাসরীয় বিভাগ।। আজকের গল্প।। ছাদ — ইলা হাইত দে।। Ankurisha ।।E.Magazine ।। Bengali poem in literature ।।




রবিবাসরীয় বিভাগ

আজকের গল্প 


ছাদ 

ইলা হাইত দে


--'বাড়িটা কিন্তু এমাসেই ছাড়ছেন আপনারা!' 

বাজখাঁই গলায় কথাটা শুনেই হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। কদিন ধরে সমানে বাড়ি খুঁজছি দুজনেই। সস্তায় একটা বাড়ি কোথাও পাচ্ছি না।  বাড়ি মেলাই দুষ্কর  যদিও  বা পাওয়া যায়, যে ভাড়া চাইছে সেটা দিতে গেলে আর খেতে পাবো না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে দৌড়াচ্ছি। যে যেখানে বাড়ি ভাড়ার খবর দিচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই কোনো সুরাহা হচ্ছে না 

অবশেষে একটা সস্তার বাড়ি পাওয়া গেলো, মোটামুটি চলন সই। 

একদিন আগে থেকেই জিনিস পত্র গোছানো শুরু করলাম। হঠাৎ করেই ছেলেটার খুব জ্বর। ভাদ্র মাসের আবহাওয়ায়  ছেলেটা অসুস্থ হয়ে পড়ল।  কিন্তু উপায় নেই এই অবস্থায় বাড়ি ছেড়ে যেতেই হবে। সকালে উঠে দেখি আকাশ কালো মেঘে ঢেকে আছে। যেকোনো সময় বৃষ্টি নামবে। 

  সকাল সকাল দুটো আলুসেদ্ধ ভাত খেয়ে জিনিস পত্র গুছিয়ে নতুন বাসার উদ্দ্যেশে রওনা দিলাম। ছেলেকে একটা মোটা চাদরে জড়িয়ে নিলাম। বেশ জ্বর গায়ে। শুধু ঠাকুর কে ডাকছি, কিছুক্ষন যেন বৃষ্টি না হয়। 

অসুস্থ ছেলের দিকে বার বার দেখছে তার বাবা। মুখে কিছু না বললেও চোখের মধ্যে আকুলতার ছাপ। অসহায় অবস্থার ছাপ। কোথায় অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে একটু যত্ন করবো, তা নয় এই আবহাওয়ার মধ্যে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলেছি। কারোর মুখে কথা নেই, দুজনেই একবার করে ছেলেকে দেখছি একটু করে রাস্তা চলছি। 

কাছাকাছি আসতেই আমাকে বললো, ওখানে পৌঁছে আগে খাট পেতে বিছানা রেডী করবো। ওকে শুইয়ে দিয়ে তারপর ধীরে সুস্থে জিনিস পত্র গোছানো হবে।

দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম নতুন বাসায়। দুটো ভ্যান ভর্তি জিনিস। ওদের বললাম ভাই একটু হেল্প করে দেবেন। 

ভ্যান চালক ভাই রা দড়ি খুলে জিনিস পত্র নামাতে যাবে, রুমের সামনে এসে দেখি কে যেন দরজায় তালা দিয়ে দিয়েছে। 

আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছি দরজায় তালা দিল কে? 

হঠাৎ দেখি একটি মস্তান টাইপ ছেলে এসে আমাদের বললো, তালা আমি দিয়েছি। এ বাড়িতে আমরা দশ বছর আছি, এ বাড়িতে আর কোনো পরিবার কে আমরা থাকতে দেবো না। বাড়ি ওয়ালার সঙ্গে বাড়ি ভাড়া নিয়ে কথা বলার আগে আমার সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল। 

আমরা তো আকাশ থেকে পড়লাম। এ আবার কি কথা!

অনেক তর্ক বিতর্ক এর পর বুঝলাম কোনো ভাবেই উনি এখানে থাকতে দেবেন না।

এদিকে ঝিম ঝিম করে বৃষ্টি পড়তে শুরু হয়েছে। ছেলের গায়ের তাপ উত্তরোত্তর বাড়ছে। 

আমি ছেলেটিকে অনুরোধ করলাম, ভাই আমার ছেলে খুব অসুস্থ, দেখুন জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। এরকম করবেন না চাবিটা খুলে দিন। এই অবস্থায় অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে কোথায় যাবো? হঠাৎ করে এখুনি বাড়ী বা পাবো কোথায়? 

ছেলেটি মুখ বিকৃত করে জানালো জাহান্নামে যান। এখানে আমি থাকতেই দেবো না। 

মাথায় বাজ পড়লো।  

 বুঝলাম এখানে আর সময় নষ্ট করে লাভ নেই। এদিকে বেলা ক্রমশ গড়িয়ে আসছে। আকাশের সঙ্গে মনের মধ্যে ঘন কালো মেঘ ছেয়ে গেছে। কোথায় যাবো? কি করবো? হা ঈশ্বর পথ দেখাও। 

একটা বড়ো গাছের তলায় ছেলে কে আরো একটা চাদর জড়িয়ে ঈশ্বর নাম জপ করছি, আকাশের বৃষ্টি আর চোখের জলের প্রতিযোগিতা চলছে।

ছেলের বাবা চললো উদভ্রান্তের মত নতুন ঠিকানার খোঁজে। পাগলের মত যাকে দেখছে তাকেই বলছে, দাদা জানেন বাড়ি ভাড়া কোথায় পাওয়া যাবে? 

ভাড়া যাই হোক আপাতত অসুস্থ ছেলেটাকে একটা আশ্রয় দেওয়া খুব দরকার। 

প্রায় ঘন্টা তিনেক  হয়ে গেলো। সূর্যদেব পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছেন। ঝিম ঝিম বৃষ্টি পড়তেই আছে। আমি ভিজে গেছি। ছেলেকে  বহু কষ্টে বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছি।  বাড়ি বাড়ি সন্ধ্যে দেওয়ার  পর্ব চলছে। আমার খুব ভয় করছে। ক্রমশ অন্ধকার বাড়ছে। মনে হচ্ছে যেন অসুস্থ ছেলে কে নিয়ে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছি। 

 হঠাৎ দেখি ভ্যান  চালক ভাইরা  দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বললো, দিদি একটা বাড়ি পাওয়া গেছে। ভাড়া একটু বেশি। 

— তোমাদের দাদা কোথায়? 

— উনিও আসছেন পেছনে। বাড়ীওয়ালার সঙ্গে কথা বলছেন। আমরা একটু এগিয়ে এলাম। ভ্যান স্টার্ট দিই। আমাদের সঙ্গে আসুন। দাদার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে।

ওখানে গিয়ে রুম টা পরিষ্কার করতে হবে। বাড়িতে বাড়িওয়ালা কাঠ রেখেছেন। অনেক কাঠ। ঘর ভর্তি। থাকতে হলে নিজেদের সমস্ত কাঠ সরিয়ে নিতে হবে । 

ভাড়াও বেশি। 

পাওয়া গেছে এই মুহূর্তে এটাই আশীর্বাদ। আপাতত একমাস তো থাকি। একবেলা না খেয়ে থাকতে পারবো, কিন্তু অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে কোথায় যাবো? 

একটা ছাদ চাই যে মাথার ওপর।








এই বিভাগে আপনিও আপনার  সেরা লেখাটি পাঠিয়েদিন। মনে রাখবেন লেখাটি  যেন মৌলিক ও অপ্রকাশিত  হয়।
মেল—ankurishapatrika@gmail.com


২টি মন্তব্য:

  1. লেখাটার ভেতর দিয়ে বেশ সুন্দরভাবে ঈশ্বরবিশ্বাসকে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রিয় গল্পকার। ভালো লাগলো পড়ে।

    উত্তরমুছুন
  2. খুব সুন্দর গল্পটি। মাথার উপর ছাদ না থাকলে কি
    অবস্থা হয় মানুষের তাই তুলে ধরেছেন লেখিকা। একটা
    তুমুল উত্তেজনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি পাঠকের মনে যখন বাড়ির নিকট পৌঁছেও দাদাদের পাল্লায় পড়লেন
    তিনি । এখানে তথাকথিত দাদাদের পাল্লায় পড়ে তাঁর সন্তানের জন্য সুগভীর চিন্তায় পড়লেন তিনি।

    উত্তরমুছুন