১৬ই ফেব্রুয়ারি বাণী বন্দনায় ছোটদের গল্প
মন তৈরির মেশিন
রূপকথা ২০২০
রতনতনু ঘাটী
একটা ছোট বন। তার পাশে পাতার একটা খুব ছোট কুটির। তিতাই আর তার দিদি মিঠি সে কুটিরে থাকে।
মিঠি রোজ সকালে বনে ফুল তুলতে যায়।
ফেরে বিকেলবেলা দূরের হাটে ফুল বিক্রি করে। হাট থেকে চাল, ডাল, শাক-সবজি কিনে আনে।
তিতাই
সারাদিন কুটিরেই থাকে। দু’জনের জন্যে রান্না করে। সন্ধেবেলা মিঠি ফিরলে
দু’ বোনে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ত।
তাদের মা
নেই। একদিন বনে ফুল তুলতে গিয়ে মা আর ফেরেনি। লোকে বলে, মা নাকি বেশি ফুল পাওয়ার
লোভে গভীর বনে গিয়েছিল। পথ হারিয়ে ফেলেছে। কেউ বলে হায়েনায় খেয়েছে। তিতাই ভেবে
দেখেছে, তার মাকে খেলে হায়েনাই খেয়েছে। কেন যে তার এরকম মনে হয়, কে জানে!
বাবাকে তিতাই
আর মিঠি কখনও দেখেনি। বাবার কথা যেটুকু সব মার মুখ থেকে শোনা। বাবার নাকি মাথায় ঝাঁকড়া
চুল ছিল। গায়ে ভীষণ শক্তি ছিল। বাবার মনটা ছিল খুব সরল। লোকের উপকার করে বেড়াত।
একদিন একটা লোকের কী জিনিস বনে হারিয়ে গিয়েছিল। বাবা তার জিনিসটা খুঁজতে বনে
গিয়েছিল। সে লোকটাও ফেরেনি, বাবাও আর ফেরেনি।
যখন হাতে
কাজ থাকে না, তখন তিতাই বসে-বসে ভাবে, লোকটার সেই জিনিসটার কথা। কী সেই জিনিস?
বাবা না জেনে-বুঝে হুট করে খুঁজতে গেলই বা কেন? ভেবে পায় না তিতাই।
সেদিন
সন্ধেবেলা মিঠি ফিরে এসে বলল, ‘তিতাই, খেতে দে। খিদে পেয়েছে।’
তিতাই বলল,
‘এ মা, রান্না করার কথা মনেই নেই!’
তিতাই
দিদিকে জিজ্ঞেস করল, ‘দিদি, তুই হাটে যাসনি?’
মিঠি মাথা
চুলকে বলল, ‘আরে, আজ ফুল তুলতে ভুলেই গিয়েছিলাম! হাটে যাওয়ার কথা মনে নেই তো!’
পরদিন
সকালে উঠে ও দু’ বোন দূরের গ্রামে মোড়লের বাড়ি গেল। কাজের কথা এরকম ভুলে যাওয়া ভাল
নয়?
মোড়ল উঠোনে
বসে ছিল সকালবেলা। তিতাই গিয়ে বলল, ‘মোড়লজেঠু, আমরা দরকারি কথা সব ভুলে যাচ্ছি?
একটা ব্যবস্থা করে দাও।’
মেড়ল মাথা
নেড়ে বলল, ‘ওরকম একটা অসুখ নাকি বিদেশ থেকে আমাদের দেশেও এসেছে বলে শুনেছি। শহরের
সকলেই নিজের নাম, ঠিকানা, কাজের কথা, সব ভুলে যাচ্ছে। অসুখটা মানুষের ভিতর থেকে
মনটা চুরি করে নেয়।’
এ কথা শুনে
তিতাই দিদির মুখের দিকে তাকাল। মোড়লকে জিজ্ঞেস করল, ‘এ আবার কী কথা জেঠু? মন কি
টাকা-পয়সা না খেলনাপাতি যে চুরি করা যাবে?’
মোড়ল ঘাড়
নেড়ে বলল, ‘তোরা বাড়ি যা! আমি একটা মেশিন তৈরির চেষ্টা করছি। তাতে যত খুশি মন তৈরি
করা যাবে। তৈরি হয়ে গেলেই তোদের খবর দেবখ’ন!’
একদিন তিতাই আর মিঠির কাছে মন তৈরি-করা মেশিনের
খবর উড়ে এল। দু’ বোন ফুল তুলে যেটুকু টাকা পেয়েছিল, হাট থেকে ফেরার পথে মোড়লের
বাড়ি গিয়ে হাজির। দেখল, মন কেনার জন্যে মস্ত লম্বা লাইন পড়ে গেছে। ওদের দেখতে পেয়ে
মোড়লজেঠু হাত নেড়ে বলল, ‘তোদের লাইনে দাঁড়াতে হবে না। তোরা তো আগেই বলে গিয়েছিলি?’
সব টাকায়
যতগুলো মন পাওয়া গেল, ওরা কিনে ফেলল। বাড়ি ফেরার পথে দিদির মুখের দিকে তাকাল
তিতাই। দিদির মুখভার দেখে বলল, ‘মন খারাপ করিস না দিদি। আজ কিছু খেতে পাব না ঠিক।
কিন্তু মন না থাকলে কী করে চলবে রে? মনটা খুব দরকারি। একদিন না খেতে পেলে কিছু
ক্ষতি হবে না!


পড়তে পড়তে নিজেকে ছোট্ট কিশোর মনে হচ্ছিল। ভালো লাগা অফুরান।
উত্তরমুছুন